অপার সম্ভাবনাময় অর্গানিক কৃষি

নিতাই চন্দ্র রায়

পোকামাকড় দমনের নামে ফসলের মাঠে যেসব বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে তা জনস্বাস্থের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ক্ষেতে বাাইনাশক ছিটানোর  এক সপ্তাহ পর সবজি খাওয়ার নিয়ম থাকলেও কৃষক তা পরের  দিনই তুলে বাজারে বিক্রি করছেন। ফলে শাকসবজিতে কীটনাশকের বিষক্রিয়া মানবদেহে গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইসব বিষাক্ত শাকসবজি খেয়ে  মানুষ  হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, প্যারালাইসিস, কিডনি, লিভার ও চোখ বেড়িয়ে আসার মতো মারত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই ভোক্তার স্বাস্থ্য, প্রাণ বৈচিত্র ও পরিবেশ রায় রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত জৈব চাষাবাদ সম্প্রসারণের আহবান জানিয়েছেন দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিদ ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্গানিক এগ্রিকালচার নেটওয়ার্ক (বিওএএন) ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ভোক্তা’ এর উদ্যোগে রাজধানীর জাতীয় প্রেসকাবে ‘জৈব খাদ্য: ভোক্তার স্বাস্থ্য, জীব বৈচিত্র ও পরিবেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তরা বলেন, ‘সারা দেশে ফসল উৎপাদনে  মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে নানা মাত্রায় বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি বেড়ে যাচ্ছে। মানব দেহে জমা হচ্ছে পারদ, সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারি ধাতব পদার্থ। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র। এরই মধ্যে ৩২ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে দেশ থেকে। আর ও অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে রয়েছে।’  রাসায়নিক পদ্ধতির চেয়ে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসল, মাছ ও মাংসের  খাদ্যগুণ, স্বাদ, চাহিদা ও বাজার মূল্য  অনেক বেশি। এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত অর্গানিক কৃষি পণ্য যেমন চা, চিংড়ি, শাকসবজি, মসলা, মাছ, মাংস ও মধু বিদেশে রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে বিষের ব্যবহার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই জৈব চাষাবাদে দিকে মনোযোগ দিতে হবে। গত ৫০ বছর ধরে কৃষি কাজে অবিবেচকের মতো অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করে আমরা মাটির উপকারি অনুজীবগুলো মেরে ফেলেছি। বিনষ্ট করেছি কৃষি জমির উর্বরতা শক্তি। আর এসব বিষের অশেষ জলাশয়গুলিতে জমে ধ্বংস করে ফেলেছে আমাদের সুস্বাদু দেশি মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। বাংলাদেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ হওয়ায় জৈব কৃষি সম্প্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সহনীয় মাত্রায় সারা বছর প্রকৃতিতে জৈব উপাদান, গাছপালা পুষ্ট হয়, প্রকৃতি সতেজ ও সবুজ থাকে। এ আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে ও জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ প্রবর্তন ঘটিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের অর্গানিক কৃষির রোল মডেলে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু কার্যকরী উদ্যোগ, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং নীতিমালা প্রণয়ন। ষাটের দশকের আগে কৃষি পণ্য উৎপাদনে কৃষক জমিতে গোবর, কম্পোষ্ট আবর্জনা সার, ছাই, হাড়েরগুড়া ও খইল প্রভৃতি জৈব সার ব্যবহার করতেন। পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহারের কথা তারা চিন্তাও করতেন না তখন। সবুজ বিপ্লবের নামে দেশে উচ্চফলনশীল ধান চাষ শুরু হলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বেশি ফলন ও লাভের আশায় কৃষি পণ্য উৎপাদনে কৃষক রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার শুরু করেন। কৃষি বিভাগ থেকে তখন বিনা মূল্যে কৃষকদেরকে কীটনাশক প্রদান  করায় ফসলের অনিষ্টকারী পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে কৃষক অতিমাত্রায়  বালাইনাশক ব্যবহার করতে থাকেন। জানা যায়, যশোরে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য কৃষক ৬০ বার পর্যন্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন। ফল উৎপাদনকারীরাও অপরিপক্ক ফল পাকাতে  ও সংরক্ষণে কার্বাইড ও ফরমালিনের মতো বিষ ব্যবহার করেন। এ নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। গত বছর ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশ পথে ভেজাল বিরোধী অভিযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আম, জাম, লিচু ও কাঠালসহ নানা রকম ফল   ধ্বংস করা হয়। এতে ফল উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির শিকার হন। এ অবস্থায় কৃষি জাত পণ্য উৎপাদনে আবার জৈব পদ্ধতিতে ফিরে আসার বিষয়ে তাগিদ দিচ্ছেন কৃষি বিশেষজ্ঞগণ। জৈব কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীট নাশকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক। এতে কৃষক  বেশি লাভবান হন। কারণ এতে ফসল উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়। পরিবেশের ভারসাম্যরা হয়। জনস্বাস্থ্য থাকে নিরাপদ। কিন্তু সারা দেশে অর্গানিক কৃষি পণ্য উৎপাদনের মতো এখনও  প্রয়োজনীয় জৈব সার, জৈব বালাইনাশক, প্রশিক্ষিত চাষির যতেষ্ট অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে জনসচেতনতারও। বর্তমানে

অর্গানিক পণ্য রফতানিতে কেনিয়া, তানজানিয়া, ভূটান, শ্রীলঙ্কা ও ভারত ভালো অবস্থানের রয়েছে। বাংলাদেশ অর্গানিক চিংড়ি, চা, মুগডাল, সয়াবিন, সয়াফুড সহ বেশ কিছু অর্গানিক পণ্য রফতানি করছে। অর্গানিক পণ্য উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এতে কৃষক বেশি লাভবান হন। এ ছাড়া অর্গানিক পণ্য স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বলে  উন্নত বিশ্বে এর একটা বড় রকমের ভোক্তা শ্রেণি রয়েছে। ফলে পণ্যের বাজার কখনো নিম্নমুখী হয় না। বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে বিশেষ করে শহরের সুপারমলগুলোতে অর্গানিক পণ্যের চাহিদা ব্যাপক রয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে এর  সরবরাহ কম। এ ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রীর বক্তব্য হলো- অর্গানিক পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ খুব সহজেই পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারে। এটি অর্জন করতে হলে পণ্যের মান নির্ধারণের জন্য  আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ঠিক করে দিতে হবে। একটি অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ডও গঠন করতে হবে, যাতে রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের মান নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা না থাকে। ইউরোপীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এফআইবিএলের এক গবেষণায় দেখা যায়, গত এক দশকে অর্গানিক কৃষি পণ্যের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০০ শতাংশ। অর্গানিক পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্স। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এর বাজার ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইউরোপে এর বাজার ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলার এবং জার্মানী ও ফ্রান্সে এর বাজার ছিল যথাক্রমে  আট ও চার বিলিয়ন ডলার। ১৯৯৯ সালে বিশ্ব বাজারে অর্গানিক পণ্যের রফতানি মূল্য ছিল  ১৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১২ সালে ৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগামী কয়েক বছরে এটি ১৩৮ বিলিয়র ডলারে দাঁড়াবে। ১৬৪ দেশে বর্তমানে সার্টিফাইড অর্গানিক পণ্য সারা পৃথিবীতে রফতানি করছে। এর বেশির ভাগ দেশই বাংলাদেশের মতো  স্বল্পোন্নত। তাই একটি কৃষি ভিত্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অর্গানিক পণ্য উৎপাদন ও রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অর্গানিক পণ্য উৎপাদনের উপযুক্ত জমি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, নদী ও উপকূলীয় চরাঞ্চল এবং বসতভিটার আঙিনা ও চারপাশ, এবং নগর এলাকার বাড়িঘরের ছাদগুলিকে নির্বাচন করা যেতে পারে। বর্তমান কৃষি নীতিতে রফতানি পণ্য উৎপাদনে ও বিদেশের বাজার ধরতে  উৎসাহ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে যে জিনিসটি জরুরি তা হলো-প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি তৈরী করে এ পণ্যের উৎপাদন ও রফতানিতে সত্যিকারের সহায়তা দেয়া। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা পত্রে দেখা গেছে, দেশের মোট জমির অন্তত ১০ শতাংশ অর্গানিক পণ্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত।  বিশেষজ্ঞগণের মতে, অর্গানিক পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অর্গানিক সুগন্ধি চাল, শাকসবজি, ফল, মাশরুম, চা, অর্গানিক পাট, অর্গানিক মাছ ও অর্গানিক মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রেই বেশি নজর দিতে হবে। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইনকানুন তৈরীর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে ২০কোটি টাকার কৃষি পণ্য রফতানি করছে। এ কৃষি পণ্যগুলো উন্নতদেশগুলোর সুপারমল গুলোতে জায়গা পায় না। তাদের  সস্তা বাজারে সাধারণত কম দামে বিক্রি করা হয়।  কিন্তু অর্গানিক পণ্য রফতানি  করলে তা ওইসব দেশগুলোর সুপার মার্কেটে স্থান পাবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব দেশে অর্গানিক কৃষি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশ অর্গানিক প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারি অ্যাসোসিয়েশন (বিওপিএমএ) এর  মাধ্যমে ইতিমধ্যে  দেশের এক লাখ একর জমিকে অর্গানিক কৃষির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে পুরো দেশকে অর্গনিক কৃষির আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে সংস্থাটি কাজ করছে। উগান্ডার কৃষি  এক সময় বাংলাদেশের মতোই ছিল। বর্তমানে দেশটি ৫০কোটি ডলার মূল্যের অর্গানিক পণ্য রফতানি করছে। জানা গেছে, এশিয়ার ৩৬ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয় এবং প্রায় সাড়ে ৭ লাখ উৎপাদনকারী এর সঙ্গে জড়িত। এর বেশির ভাগই চীন ও ভারতে। অর্গানিক চাষে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে ইউরোপ। মোট অর্গানিক চাষের ২৫ শতাংশ হয় এই  মহাদেশে।  ৯৩ লাখ হেক্টর জমির এই চাষাবাদে আড়াই লাখেরও বেশি খামার জড়িত। আফ্রিকায় ১০ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয় এবং প্রায় ৫লাখ কৃষক এর সাথে জড়িত। অর্গানিক কৃষি প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি একবারে কম নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রত্যাশা ভবিষ্যতে বিজ্ঞান ভিত্তিক অর্গানিক পণ্যই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে এবং বিদেশে রফতানি করে কোটি কোটি ডলার আয় করবে। এতে কৃষক পণ্যের অধিক মূল্য পাবেন এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশও থাকবে দূষণ মুক্ত।

লেখকঃ

ডিজিএম(সম্প্রঃ)

সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস্ লিঃ

সেতাবগঞ্জ দিনাজপুর

মোবাইল:০১৭২২৬৯৬৩৮৭

 

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *