অর্কিড : খাদ্য হিসেবে সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ

ড. মোঃ ওবায়েদুল ইসলাম

শত বর্ণে ও বৈচিত্রে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক আর্কষণীয় ফুলের নাম অর্কিড। এরা অর্কিডেসি পরিবারের উদ্ভিদ। এক বীজ পত্রী (গড়হড়পড়ঃুষবফড়হং) উদ্ভিদের অন্তর্ভূক্ত এ উদ্ভিদের আটশত গণ (এবহঁং) এবং পঁয়ত্রিশ হাজারেরও বেশী প্রজাতি রয়েছে। প্রজাতিভেদে এদের ফুলের গঠন, আকার, আকৃতি এবং বর্ণে অনন্য বৈচিত্র ও বিভিন্নতা (ফরাবৎংরঃু) পরিলতি হয়। অর্কিডেসি পরিবার উদ্ভিদ জগতের তিনটি বড় পরিবারের একটি । অনেকের মতে এ পরিবারে সর্বাধিক বেশী সংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতি বিদ্যমান। প্রাচীন চীনা গ্রন্থে তিন হাজার বৎসর পূর্বে প্রথম অর্কিড উদ্ভিদকে ঔষধী উদ্ভিদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জনক ‘থিওফ্রাস্টাস (খৃস্টপূর্ব ৩৭১-২৮৭) এ উদ্ভিদের নামকরণ করেন অর্কিড। অর্কিড শব্দটি গ্রীক শব্দ অর্কিস থেকে নেয়া। অর্কিস অর্থ অন্ডকোষ। ইউরোপীয়  অনেক স্থলজ অর্কিডের গোড়ায় অন্ডকোষ সদৃশ্য দুটি গঠন দেখা যায় (চিত্র-১) । থিওফ্রাস্টাস উদ্ভিদের এইরূপ  গঠন দেখেই  এদের নাম দিয়েছিলেন ‘অর্কিড’। বর্তমানে অর্কিডের ঐ দুটি বিশেষ গঠনকে টিউবার বলা হয়। তৎকালীন সমাজে অর্কিডের মূলাংশের টিউবার নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, পুরুষের অন্ডকোষ সদৃশ্য হওয়ায় এগুলি পুরুষত্ব বর্ধক জাতীয় কিছু। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, টিউবারে উদ্দীপক জাতীয় কিছু উপাদান রয়েছে। তাই পুরুষত্ব বর্ধক হিসাবে ঐ সমাজে এ উদ্ভিদের চাহিদা ছিল খুব বেশি। আবার অনেকে বিশ্বাস করত যে, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ‘ভেনাস’ অর্কিডের ঐ বিশেষ গঠনের প্রতি খুবই আসক্ত। এগুলি দেবীকে কামোদ্দীপ্ত করে। তাই যারা ঐ টিউবারকে ভালবেসে ভন করেন, দেবী তুষ্ট হয়ে তাদেরকে পুত্র সন্তান দিয়ে থাকেন। তাই পুত্র সন্তান লাভের বাসনায় অর্কিডের টিউবার খেতেন অনেকেই।

অধিকাংশ অর্কিড বহুবর্ষজীবী হার্ব বা বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। অঙ্গজ গঠনে ব্যাপক বিভিন্নতা থাকলেও ফুলের গঠনের সামঞ্জস্যতা এসব উদ্ভিদকে একই পরিবার ভুক্ত করেছে। অর্কিডের কিছু বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য রয়েছ যেমন: এরা টেরিষ্ট্রিয়াল, ইপিফাইট, স্যাপ্রোফাইট

বা কাইমবার হয়ে থাকে। এদের মূল ফেসি বা রাইজোমেটাস। মূলে ভ্যালামেন টিস্যু থাকে। এ টিস্যুর সাহায্যে বাতাস থেকে এ উদ্ভিদ পানি শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফুল এর উপরাংশ নিচের দিকে হয়ে থাকে (জবংঁঢ়রহধঃব) । ফুলে ৩টি সেপাল এবং ৩টি পেটাল থাকে । ১টি পেটাল (যাকে খধনবষষঁস বলা হয়) বড় ও বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। বর্ণ ও বৈচিত্রে ফুলগুলি খুবই আকর্ষণীয় হয়।

অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বে অর্কিডের রয়েছে বহুবিদ চাহিদা যেমন: খাদ্য, খাদ্য সহায়ক, ঔষধ, ঔষধ উপাদান, পানীয় উপাদান, পানীয় সহায়ক, আর্ট এন্ড ক্রাফট, অভ্যন্তরীন সজ্জায়নসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে অর্কিডের রয়েছে আভিজাত্যিক ব্যবহার। ধারাবাহিক এ লেখার বর্তমান প্রবন্ধে খাদ্য হিসাবে অর্কিডের অবস্থান তুলে ধরাই হবে মূল প্রতিপাদ্য।

পশ্চিমাবিশ্বের অনেক স্থানেই দেখা যায় যে, তারা অর্কিডের উপর কোন গ্রস্থ লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেন যে, অর্কিড সর্ববৃহৎ উদ্ভিদ পরিবার, আর তন্মধ্যে শুধু ভ্যানিলা  এবং অর্কিস খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এ উক্তিকে অনেকেই ব্যাঙ্গাতœকভাবে নিলেও একথা আজ চিরন্তন সত্য যে, প্রতি একক আয়তনে উৎপন্ন লাভজনক  উদ্ভিদের মধ্যে অর্কিডই প্রথম স্থানের অধিকারী। ইউরোপিয়ান রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায় যে, আফ্রিকানরা শত শত বছর আগে থেকেই অর্কিডকে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করেছেন। তারা প্রধানত ঙবপবড়পষধফবং এবং ঊঁষড়ঢ়ঃরধ  প্রজাতির অর্কিড খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করতেন। স¯প্রতি জীববিজ্ঞানিরা গবেষণায় দেখেছেন যে, আফ্রিকানরা প্রায় ৭৭ প্রজাতির অর্কিড খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। ‘’চিকানদা’ বা ‘কানাকা’ নামের ডিশে জাম্বিয়ার লোকজন স্থলজ অর্র্কিডের টিউবার ব্যবহার করেন। উরংধ, ঐধনবহধৎরধ এবং ঝধঃুৎরঁস গণভূক্ত অর্কিড এক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়। জাম্বিয়াতে এই অর্কিডগুলি দু®প্রাপ্য হয়ে পরায়, তারা পার্শ্ববর্তী দেশ তাঞ্জানিয়া থেকে অবৈধভাবে এগুলি আমদানি করতে থাকে। নিরূপায় হয়ে তাঞ্জানিয়া সরকার ‘কিটুলো’ অঞ্চলকে জাতীয় পার্ক  (সংরক্ষিত এলাকা) হিসাবে ঘোষনা করেন এবং এ অঞ্চলের অর্কিড প্রজাতিসমূহ সংরক্ষণের  ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

ভ্যানিলা বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত অর্কিড। কারণ এর ফ্লেভার বা সুঘ্রাণ খাদ্যের ও পানীয়ের মান বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। কিউবাতে ভ্যানিলার সুঘ্রাণ তামাক জাত খাদ্যাপাদানকে  আকর্ষনীয় করতে ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, ষোল থেকে ঊনিশ শতক পর্যন্ত প্রায় ৩ শত বৎসর কামোদ্দীপক ও থেরাপিতে অর্কিড ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়াও অনেক অর্কিড মাথা ব্যাথা দূরীকরণে, বিষাক্ত পোকার দংশন উপশমে এবং পেটের পিড়ার ঔষধ হিসাবে সমাদৃত হয়ে আসছে বহুকাল থেকে। সম্প্রতি কিছু গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে (গবহধংযরধহ বঃ ধষ., ১৯৭২) যে, ভ্যানিলার ফ্লেভার কেমোথেরাপি দেওয়া রোগীদের খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি করে এবং অবসাদ দূর করে বমিবমি ভাব থেকে মুক্ত করে। অতি সম্প্রতি গবেষক ঋষধফনু ও তার সহকারীগণ প্রমাণ করেছেন যে, আলজেইমার রোগ সনাক্তকরণে ভ্যানিলা ব্যবহার করা যায়, কারণ এ রোগে আক্রান্ত রোগী ভ্যানিলার গন্ধ সহ্য করতে পারেনা। ভ্যানিলা অর্কিডের অনেক ফুলই (চিত্র-২) সরাসরি  খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

ডেনড্রোবিয়াম গণভূক্ত অর্কিড ‘‘ফুড-অর্কিড’’ হিসাবে খ্যাত। আমেরিকায় হাইব্রিড ডেনড্রোবিয়াম অর্কিডের (নরমরননঁস  :ুঢ়ব) ফুল খাদ্য ডেকোরেশন করতে ব্যবহৃত হয়  (চিত্র-৩)। এশিয়ার অনেক দেশে হালকা পানীয় ক্যানে এ ফুল চিত্রাকর্ষণ  হিসাবে ব্যবহৃত হয়। জাপান এবং সিঙ্গাপুরে সস তৈরীতে ডেনড্রোবিয়াম ব্যবহার করা হয়। আয়ারল্যান্ডে এ জাতের ফুল বাটারের সাথে ফ্রাই করে সুস্বাদু খাবার তৈরী করা হয়। ইউরোপে ডেজার্ট এবং কেকে এ ফুল ব্যবহার করা হয় (চিত্র-৪) । কেকে অর্কিড বহুকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীগণ উবহফৎড়নরঁস শরহমরধহঁস উদ্ভিদের সিউডোবাল্বকে (কান্ডের গোড়ার স্ফীত অংশ) উপাদেয় খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে আসছে।

অর্কিডকে অষ্ট্রেলিয়ার অনেক উপজাতি আপদকালীন খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। উরঁৎরং সধপঁষধঃধ অর্কিডের টিউবার মিষ্টি স্বাদের এবং এক একটি টিউবার আমেরিকায় ত্রিশ ডলারে অভিজাত এলাকায় বিক্রি করা হয়। চীনে উবহফৎড়নরঁস পধঃযবহধঃঁস টিনজাত করা হয় এবং উষ্ণ চায়ের সাথে পান করা হয় প্রধানত অসুস্থতার পর বা যৌন মিলনের পর (চিত্র-৫) উবহফৎড়নরঁস পযৎুংড়ঃড়ীঁস নেপালে কিছু প্রজাতির অর্কিড ফুলসমূহ শুকায়ে চায়ের সাথে খাওয়া হয় সুস্বাস্থের আশায়। নেপালের তামিল অধ্যুষিত এলাকায়  অর্কিডের ফুল দিয়ে উপাদেয় আচার বানানো হয়। গ্রামাঞ্চলে অনেক অকির্ডের সিউডোবাল্ব এবং টিউবার তৃষ্ণা নিরাময়ককারী হিসাবে খাওয়া হয়।

পানীয় জগতে অর্কিডের ব্যবহার ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে টার্কিতে স্থলজ অর্কিডের টিউবার থেকে ‘‘সাহলেপ’’ নামক আইসক্রিম ও পানীয় প্রস্তুত করা হয়।

 

 

আরবী সাহলেপ শব্দটি ইংরেজীতে ‘সালেপ’ শব্দে প্রচলিত হয়েছে। ‘সালেপ’ স্টার্চ সমৃদ্ধ মিষ্টি  উপদান। এটি রুটিতে মিশিয়ে খাওয়া যায়, আবার পানীয়তে মিশিয়েও খাওয়া যায়। ঐতিহ্যগতভাবে এটি পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং টুরিস্টগণ দুপুরের খাবারের বিকল্প হিসাবে ‘সালেপ’ গ্রহণ করতেন। টার্কিতে অহধপধসঢ়ঃরং সড়ৎরড় (যা পূর্বে ঙৎপযরং সড়ৎরড় নামে পরিচিত ছিল) এবং একই শ্রেণীভুক্ত ঙৎপযরং সধংপঁষধঃধ প্রজাতি থেকে ‘সালেপ’  প্রস্তুুত করা হয়। টার্কিরা সালেপের ঔষধী গুণাগুণ সম্পর্কে প্রথম অবগত হন ইংল্যান্ড থেকে। ১৫৬৮ সালে ’উইলিয়াম টারনার’ নামে বিখ্যাত একজন হার্বালিস্ট অর্কিডের চারটি ঔষধী গুণাগুন প্রচার করেন। এগুলি হল এন্টি-পাইরেটিক, এন্টি-কনজ্যামশন, এন্টি-ডায়ারিয়া এবং এন্টি-এলকোহলিক গ্যাসট্রাইটিস।

১৬৪০ সালে বিখ্যাত চিকিৎসক জন পার্কিনসন বলেছেন, অর্কিডজাত খাদ্য মানব দেহে পুনরুৎপাদন (ভবৎঃরষরঃু) মতা বৃদ্ধি করে। উনিশ শতকে ‘ইড়ঁৎনড়হ    :বধ’ পশ্চিমাদেশসমূহে খুবই জনপ্রিয় ছিল। ঐ চা এক প্রকার অর্কিড মিশিয়ে তৈরী করা হত। মনে করা হত, এই চা একধরনের ‘সিডেটিভ’ গুণ সম্পন্ন এবং  এতে ‘জুমেলিয়া’ নামক সুগন্ধী পাওয়া যেত।

আফ্রিকান অঞ্চলের তাঞ্জানিয়া, জাম্বিয়া এবং মলাবিতে সুদীর্ঘকাল থেকেই অর্্ির্কডের টিউবার খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে অর্কিড টিউবার বাণিজ্যিকভাবেও ক্রয়-বিক্রয় করা হত। টিউবার দিয়ে তৈরী খাদ্যকে তারা মাংসের স্থলাভিষিক্ত মনে করতেন। এ ব্যবসা ব্যাপক হওয়ায় এ অঞ্চলে অর্কিড নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়।

অর্কিড প্রেমিকদের এবং পশ্চিমা দেশগুলির অর্কিড উৎপাদনকারীদের মতে অর্কিড উপাদেয় ফাইবার ও ভিটামিন যুক্ত খাবার। কেমন স্বাদ এ খাবারের? জরিপে বিভিন্ন মতামত পাওয়া গিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, কিছুটা মিষ্টি স্বাদের অর্কিড খুবই ভালো লাগে। কেউ কেউ বলেছেন, এদের স্বাদ কিছুটা ট্যানিন যুক্ত খাবারের মত আবার কেউ কেউ বলেন, খাদ্য হিসাবে এটি তাদের পছন্দের সর্বশেষ তালিকায়।

সাম্প্রতিককালেও হাওয়াই দীপপুঞ্জে অর্কিড বিভিন্নভাবে খাদ্য হিসাবে প্রচলিত আছে বিশেষ করে খাদ্য ভান্ডার ডেকোরেশনে এবং খাবার প্লেট ডেকোরেশনে (চিত্র-৬) হোটেলে ও রেস্তোরাগুলিতে অর্কিডের কদর অনেক। তারা সালাদ হিসাবে খাদ্যের ডিশে অর্কিড ব্যবহার করছেন। সুগার কোটেড করে অর্কিড দিয়ে বিভন্ন স্বাদের মূল্যবান ক্যান্ডি তৈরী করছেন। কোন অর্কিডই বিষাক্ত নয় বিধায় খাদ্য পরিবেশনায়- রকমারিকরণে, সহায়ক স্বাদের সংযোজনে এবং খাদ্য পরিবেশনায় ডেকোরেশনে অর্কিড দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে।

লেখক  :

অধ্যাপক ফসল উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *