আইড় মাছের কৃত্রিম প্রজনন মাৎস্য গবেষণায় নতুন দিগন্ত

সাজ্জাদ আরেফিন:

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। স্মরনাতীতকাল থেকেই এ দেশের কৃষির পাশাপাশি মাছ চাষের ঐতিহ্য রয়েছে। কেননা মাছ আমাদের খাদ্য তালিকায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আসছে। আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ করি তার শতকরা আশিভাগ আসে মাছ থেকে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের উৎপাদন সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশে জন প্রতি মাছের প্রাপ্যতা, পুষ্টিহীনতা ও সার্বিক স্বাস্থ্যসমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তেমনি জাতীয় অর্থনীতি ও পারিবেশিক অবস্থারও ক্রমাগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।

আমাদের দেশের হাওড় বাওড়, নদী, খাল, বিল ও পুকুরে এক সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু পরিবেশ এবং মানুষ সৃষ্ট বিভিন্ন কারনে মাছের পর্যাপ্ততা দিন দিন কমে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ২৬০ টি প্রজাতি স্বাদু পানির মাছের মধ্যে ১২ টি জাত চরম বিপন্ন ও ১৪ টি জাত সংকটাপন্ন।

এই সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে অন্যতম আইড় মাছ । নদী মাতৃক বাংলাদেশের নদী ও খাল বিল থেকে হারিয়ে যাওয়া আইড় মাছের সন্ধান চলছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে আইড় মাছ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রকল্প এক বছর অতিক্রম করেছে। প্রজনন সফল হলেই রুই কাতলা ও তেলাাপিয়ার মতো আইড় মাছের পোনা সংগ্রহ করে খাল বিলে চাষ করা যাবে। আবার ছড়িয়ে পড়বে আমিষ সমৃদ্ধ এই ‘ক্যাট ফিস।’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের অধীনে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে গত বছর থেকে। আগামী বছরের জুনে শেষ হবে এর গবেষণা কাজ।

গবেষণা কাজের টিম লিডার হিসেবে কাজ করছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি ও জেনেটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব ইকবাল এবং কো-ইনভেষ্টিগেটর হিসেবে রয়েছেন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মিঞা।

টিম লিডার ড. মোহাম্মদ মাহবুব ইকবাল জানান, বাংলাদেশের সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে অন্যতম হল আইড়মাছ। এই মাছ এক সময় হাওড় বাওড়, নদী, খাল, বিলও পুকুরে প্রচুর পাওয়া গেলেও এখন আর তেমন দেখা মিলছেনা।

তিনি আরও জানান, প্রাকৃতিক জলাশয়, মুক্ত জলাশয় ও প্লাবন ভূমি ভরাট হয়ে যাওয়া, প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস এবং পোনা বড় হতে না দিয়ে অতিমাত্রায় ধরাই আইড় মাছের সংকটাপন্ন হওয়ার প্রধান কারন।

এছাড়াও কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার এর জন্য দায়ী।

সংকটাপন্ন এই আইড় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ঘটানোর জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (২০১২-১৪) মেয়াদী একটি গবেষণা এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে।

এতে সিলেটের জকিগঞ্জ থেকে আইড় মাছ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পুকুরে সফলভাবে প্রাকৃতিক প্রজনন ঘটানো হয়েছে। এছাড়াও মাছের বায়োলজি, কখন ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়ার পর মাছের পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়েছে।

ড. মোহাম্মদ মাহবুব ইকবাল জানান, এতে দেখা যায় বছরে দুইধাপে (মে-জুন), (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) প্রায় পচিঁশ হাজার থেকে ত্রিশ হাজার ডিম ছাড়ে মাছটি।

সাধারনত আইড় মাছের দুই ধরণের প্রজাতি পাওয়া যায়। তবে গবেষণা করতে গিয়ে এই দুই প্রজাতির বাইরে সিলেট অঞ্চলে নতুন একটা প্রজাতি পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান গবেষণা প্রজেক্টের টিম লিডার ড. মোহাম্মদ মাহবুব ইকবাল।

সফলভাবে প্রাকৃতিক প্রজননের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগীতায় তৈরী মিনিহ্যচারীতে কৃত্রিম প্রজননের কাজ চলছে। মাছের পিটুইটারী  গ্রন্থি থেকে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় আইড় মাছের কৃত্রিম প্রজনন করা যায় কিনা তা নিয়ে গবেষণা করছে গবেষণা দলটি।

টিম লিডার আশা করেন, প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সফল ভাবে কৃত্রিম প্রজনন করা সম্ভব হবে। যা বাংলাদেশের মাৎস্য গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

লেখকঃ

শিক্ষার্থী, সিলেট কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

2 Comments on “আইড় মাছের কৃত্রিম প্রজনন মাৎস্য গবেষণায় নতুন দিগন্ত”

  1. দেশি শিং, মাগুর , পাবদা, গুলসা মাছের মত আইড়মাছ খুব দ্রুত চাষের অনূকেলে চলে আসবে । বাজারে আইড়মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মৎস্য চাষীরা ও এই মাছ চাষ করতে অনেক আগ্রহী
    Thanks All
    Fishmarketbd.com

  2. আইর মাছ নিয়ে এই লেখাটা পড়ে আমার মনে হয় হাড় জোরাল। গত বছর আমি অনেক খুজেছি ত্রিশাল ময়মন্সিং এর অনেক হ্যাচারিতে। অবশেষে কংশ নদী থেকে আমি ২৬ টি সংগ্রহ করি। খুব ভাল আউটপুট পেয়েছি এক বছরে।

    আমি এই প্রজাতি টা চাস করতে খুব আগ্রহী।

    ধন্যবাদ এই গভেসকদের আর কৃষিবার্তা কে।

    কমল
    নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *