আমন ধানের  রোগ-বালাই দমনে করণীয়

কৃষিবিদ ড. এম এ মজিদ মন্ডল

এখন মাঠে মাঠে আমন ধানের গাছ বেড়ে উঠছে। এসময়ে নানারকম রোগবালাই দেখা দেয়, এসব রোগাবালাই নিয়ে এবারের প্রতিবেদন।

পাতা পোড়া রোগঃ

লক্ষণঃ (১) চারা অবস্থায় আক্রমণ করলে নেতিয়ে পড়ে একে চারা পচা এবং বয়স্ক আবস্থায় আক্রমণ হলে পোড়া বা ঝলসানো মনে হয়। (২) প্রথমে চারার বাহিরের অংশ পরে ভিতরের অংশ শুকে খড়ের মত হয়। (৩) বয়স্ক গাছে সবুজ জলছাপ প্রথমে কিনারায় পরে মাঝে দেখা যায়। (৪) দাগ গুলি বড় হয়ে সমস্ত পাতা ঝলসে যায়। (৫) রোগ সমস্ত জমিতে ছড়িয়ে পড়লে আগুনে পুড়ে গেছে মনে হয়। (৬) উচ্চ ফলনশীল জাতগুলি এ রোগ সংবেদনশীল।

প্রতিকারঃ (১) বীজতলা থেকে চারা উঠানোর সময় যে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। (২) রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে। (৩) সর্ব্বোচ্চ কুশি অবস্থায় এ রোগ হলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করলে রোগের তীব্রতা কমে। (৪) প্রাথমিক অবস্থায় রোগ আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলে পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে কুশি এনে ঐ স্থানে রোপণ করতে হবে। (৫) ঝড়ের পর পর নাইট্রোজেন সার উপরি প্রয়োগ না করা। (৬) আক্রান্ত জমির পানি ৭-৮ দিন শুকিয়ে দিলে রোগ কমে। (৭) ফসল সংগ্রহের পর নাড়া পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

ব্লাষ্ট রোগঃ পাইরিকরিয়া গ্রাসিসকা নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

লক্ষণঃ (১) পাতা, কান্ড ও শীর্ষ আক্রান্ত হয়। (২) প্রথমে পাতায় ডিম্বাকৃতি দাগ পড়ে পরে দুপ্রান্তে চোখাকৃতি হয়। (৩) দাগের মধ্যভাগ ছাই রং এবং বাহিরে গাঢ় বাদামী রং হয়। (৪) কয়েকটি দাগ একত্র হয়ে পাতাটি মেরে ফেলতে পারে। (৫) ধানের দুধ অবস্থায় আক্রান্ত হলে গোড়া পচে শীর্ষ ভেংগে পড়ে ও চিটা হয়।

প্রতিকারঃ (১) সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। (২) রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে। (৩) জমিতে সব সময় পানি রাখতে হবে। (৪) কুশি অবস্থায় রোগ দেখা দিলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাস দিলে রোগ কমে যায়। (৫) ট্রাইসাইকাজল (ট্রপার ৭৫ ডব্লিউপি) ৪০০ গ্রাম প্রতি হেক্টরে অর্থাৎ প্রতি লিটার পানিতে ১.৬২ গ্রাম মিশে ¯েপ্র করতে হবে।

বাদামী দাগ রোগঃ ডাসেসলেরা অরাইজি নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয় থাকে।

লক্ষণঃ (১) পাতায় প্রথমে তিলের দানার মত ছোট ছোট দাগ পড়ে। (২) দাগগুলি বড় হয়ে মাঝখানে সাদা ও কিনারা বাদামী হয়ে যায়। (৩) একাধিক দাগ মিলে বড় দাগ সৃষ্টি হয়ে পাতাটি মেরে ফেলতে পারে। (৪) রোগ আক্রান্ত গাছে অপুষ্ট বীজ হয় ও বাদামী বর্ণ হয়।

প্রতিকারঃ (১) সুস্থ বীজ বপন করতে হবে। (২) বীজ গরম পানিতে (৫০ ডিগ্রি তাপ মাত্রায় ৩০ মিনিট ভিজে রাখতে হবে) শোধন করতে হবে। অথবা কার্বেন্ডাজিম (সিনোডাজিম/ ব্যাভিসটিন/ নোইন) ৩ গ্রাম ঔষধ পানিতে গুলে প্রতি কেজি বীজ শোধন করতে হবে। (৩) জমিতে সঠিক পরিমাণ নাইট্রোজেন ও পটাস সার ব্যবহার করলে রোগ কমে যায়। (৪) কার্বেন্ডাজিম প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি মিশে ¯েপ্র করতে হবে।

খোল পোড়াঃ রাইজোকটিনা ছোলানি নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

লক্ষণঃ (১)পানির স্তর বরাবর খোলের উপর পানি ভেজা সবুজ রং এর দাগ পড়ে। (২) দাগগুলির কেন্দ্র ধূসর এবং প্রান্ত বাদামী রং ধারণ করে। (৩) দাগগুলি একত্র হয়ে পাতার খোল ও পাতায় ছড়িয়ে পড়ে যা দেখতে গোখরা সাপের মত মনে হয়। (৪) আক্রমণ বেশী হলে ক্ষেতের মাঝে মাঝে আগুনে পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়।

প্রতিকারঃ (১) রোগ সহনশীল জাত ব্যবহার করতে হবে। (২) সঠিক দুরত্বে চারা রোপণ করতে হবে (২০-২৫ সেমি দুরে)। (৩) অতিরিক্ত ইউরিয়া পরিহার করতে হবে এবং পটাশ সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। (৪) ছত্রাক নাশক যেমন-প্রপিকোনাজল (৪০০ মিলি/ একর, প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি হারে ৫ শতাংশ জমিতে) ¯েপ্র করতে হবে।

উফরা রোগঃ ডিকটেলেনসাস এনগুইনেটাস নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে ।

লক্ষণঃ (১) ধান গাছের পাতার রস শোষন করে খেয়ে ফেলে ফলে পাতার গোড়ায় সাদা দাগ দেখা যায়। (২) সাদা দাগগুলি শুকিয়ে পাতা মরে যায়। (৩) আক্রান্ত ছড়া মোটেই বের হয় না বা সামান্য বের হলেও মোচড় খেয়ে যায় ও চিটা হয়।

প্রতিকারঃ শস্য পর্যায়ে ধান ছাড়া অন্য ফসল চাষ করতে হবে। (২) নাড়া পুড়িয়ে দিতে হবে। (৩) জলি আমন ধান দেরিতে বুনলে এ রোগ হয়ে থাকে। (৪) প্রাথমিক অবস্থায় হলে গাছের আগা কেটে দিতে হবে। (৫) কার্বোফুরান- জমিতে ২ ইঞ্চি পানি থাকা অবস্থায় ৫ জি এর ক্ষেত্রে ৪ কেজি/ একর এবং ৩ জি এর ক্ষেত্রে ৬.৮ কেজি/ একর হিসাবে প্রয়োগ করতে হবে।

বাকানি ও গোড়াপচাঃ ফিউজেরিয়াম মনিলিপর্ম নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ সৃষ্টি হয়।

লক্ষণঃ (১) আক্রান্ত ধানের চারা সাধারণ চারার চেয়ে দিগুণ লম্বা হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। (২) আক্রান্ত চারার পাতা হলুদ-সবুজ হয়ে যায়। ( ৩) আক্রান্ত কুশি লিকলিকে হয়। (৪) নীচের দিকের গিটে অস্থানিক শিকড় দেখা যায়। (৫) গাছের গোড় পচে যায় এবং ধান হলেও চিটা হয়।

প্রতিকারঃ (১) রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে। (২) প্রতি কেজি বীজে ৩ গ্রাম হারে কার্বেন্ডিজম দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে।

————————————–

লেখক: প্রভাষক কৃষিশিক্ষা বিভাগ, নাটোর

সিটি কলেজ, নাটোর।

মোবাইল: ০১৭২২-৪০৩২২০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *