আমন ধান ক্ষেতে মাছ চাষ : কৃষকের বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা

আমাদের দেশে মাছ চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা৷ আধুনিক প্রযুক্তি ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছ চাষ বাড়ানো সম্ভব ৷ কিন্তু বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতি পূর্ণ এলাকা হওয়ায় মানুষের জন্য দানাদার খাদ্য শস্যের চাহিদা মেটাতে যেয়ে ব্যাপক আকারে মাছ চাষ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না৷ তাই খাল, বিল, নদী, পুকুর, ডোবা প্রভৃতি জলাশয়ের সাথে ধান ক্ষেতে মাছ চাষ করতে পারলে দেশে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে এবং অপর দিকে ধান চাষিও লাভবান হবে৷ আমাদের দেশে বছরে অধিকাংশ সময় পানি থাকে বা সেচ সুবিধা আছে এমন নিচু ধানী জমিতে মাছ চাষ করা যেতে পারে৷ এতে ধানের কোন ক্ষতি হয় না বরং কৃষক বেশী লাভবান হয় ৷ ধান ক্ষেতে মাটি, পানি, সার, গোবর প্রভৃতির সংমিশ্রণে প্রাকৃতিক ভাবে যে খাবার তৈরী হয় তা মত্‍স্য উত্‍পাদনের জন্য খুবই উপযোগী ৷
ধানক্ষেতে মাছ চাষের সুবিধা ঃ (১) একই জমি থেকে একই সময়ে ধান ও মাছ দুটি ফসল পাওয়া যায়৷ (২) মাছের চলা চলে ধান ক্ষেতে আগাছা ও পোকামাকড় কম হয়৷ (৩) মাছের বিষ্টা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে৷ (৪) কর্ম সংস্থান বৃদ্ধি পায়৷ (৫) মাছকে সম্পূরক খাদ্য দিতে হয় না৷ (৬) মাছের নড়াচড়াতে ধানের ফলন বৃদ্ধি পায়৷
ধান ক্ষেতে মাছ চাষের ধাপ গুলি নিন্মে দেয়া হল ঃ
জমি প্রস্তুত ঃ
(১) বাঁধ নির্মাণ ঃ ধান ক্ষেতের চার পাশ্বর্ে উচু পাড় নির্মান করতে হবে যেন বর্ষা কালে পানি ক্ষেতের বাহিরে বা ভিতরে চলাচল করতে না পারে৷ (২) গর্ত খনন ঃ ক্ষেতের পানি কমে গেলে কিংবা পানি গরম হলে মাছ গুলি যেন ঠান্ডা পানিতে থাকতে পারে সেইজন্য প্রতি শতকরা দুই থেকে তিন ভাগ জমিতে দুই তিন ফুট গভীর গর্ত করতে হবে৷ জমিতে পোকার আক্রমন বেশী হলে কীটনাশক প্রয়োগের সময় এ গর্ত ব্যবহার হতে পারে৷ (৩) পানি নির্গমণ নালা তৈরী ঃ এমন ভাবে নালা তৈরী করতে হবে যেন বর্ষা কালে জমিতে পানি বেশী হলে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া যায়৷ (৪) জাল বা বানা ব্যবস্থা ঃ অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হলে জাল বা বানা দিতে হবে যাতে মাছ চলে না যায়৷ (৫) জমি চাষ ও চারা রোপণ ঃ স্বাভাবিক ভাবে জমিতে চাষ ও মই দিয়ে এবং প্রয়োজনমত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে৷ প্রচলিত নিয়ম অনুসারে ২০-২৫ সেঃমিঃ দুরে সারি করে ১৫-২০ সেঃমিঃ ফাঁকে চারা রোপন করতে পোনা মজুদ ঃ
ধান রোপণ করার ১৫-২০ দিন পর যখন কুঁশি বের হওয়া শুরু হয় তখন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যেমন – তেলাপিয়া, নাইলোটিকা, মিরর কার্প, রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, চিংড়ি ইত্যাদি পোনা মজুদ করা যেতে পারে৷ তবে যে মাছ দ্রুত বড় হয় সেগুলি উপযোগী৷ সকাল বা পড়ন্ত বিকেলে পোনার পাত্র কিছুক্ষণ আধা ডুবন্ত অবস্থায় ক্ষেতের পানিতে রেখে কিছু পানি পোনার পাত্রের ভেতর ঢোকাতে হবে এবং পোনার পাত্র কাত করলে আস্তে আস্তে ধান ক্ষেতের মধ্যে চলে যাবে৷
মাছের প্রজাতি নির্বাচন ও পোনা মজুদহার:
মাছের জাত ও আকারের উপর পোনা মজুদহার নির্ভর করে৷ ধান ক্ষেতে একর প্রতি পোনা মজুদ হারের একটি তালিকা মোটামুটি নিম্নরূপ হওয়া উচিত ৷
(ক) কমন কাপ, মিরর কাপ, সিলভার কার্প প্রতি একরে (মিশ্র/একক ভাবে) ১৩০০-১৬০০ টি মাছ ৷
(খ) রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউস প্রতি একরে ১০০০-১২০০ টি মাছ৷
(গ) তেলাপিয়া, নাইলোটিকা, সরপুটি, প্রতি একরে ২০০০-৩০০০ টি মাছ৷
(ঘ) চিংড়ি (প্রতি একরে) ৫৫০০-৭৫০০ টি মাছ৷
(ঙ) চিংড়ি ও মিশ্র-১৬০০-২০০০ চিংড়ি+৬০০-৮০০ টি সরপুটি +১৫০-২০০ টি রুই/কাতলা৷
মজুদ পরবর্তী পরিচর্য়া
এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে ধানের পোকা মাকড় মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়৷ কিন্তু মাছের দ্রুত বৃদ্ধি চাইলে মাছের ওজনের (মোটামুটি) শতকরা ৫ ভাগ পরিমাণ চালের কুড়া, গমের ভুষি, খৈল প্রভৃতি দেয়া যেতে পারে৷
মাছ আহরণ
মাছ ছাড়ার কিছু দিন পর মাছ বড় হলে অথবা কার্তিক-অগ্রাহয়ণ মাসে ক্ষেতের পানি কমে গেলে বেড় জাল দিয়ে সব মাছ আহরণ করা উচিত৷ সঠিক ভাবে মাছ চাষ করলে প্রতি একরে (১০০ শতাংশ) ৩০০-৪০০ কেজি মাছ পাওয়া যেতে পারে৷

লেখক: পি-এইচ.ডি গবেষক, রাবি৷ প্রভাষক, কৃষিশিক্ষা বিভাগ, নাটের সিটি কলেজ, নাটোর৷
মোবাইল:- ০১৭২২৪০৩২২০৷

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *