আমন বীজের কৃত্রিম সংকট, প্রতারিত হচ্ছে কৃষক

নিতাই চন্দ্র রায়

এবছর পাহাড়ীঢল, অকাল বন্যা ও ব্লাষ্ট রোগের কারণে বোরো ধানের ফলন বিপর্যয় ঘটেছ। ফলে গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল কম উৎপাদন হতে পারে। চালের এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমদানি শুল্ক শতকরা ২৮ ভাগ থেকে ১০ ভাগে  হ্রাস করা হয়েছে। অর্থের অভাবে যাতে চাল আমদানি ব্যাহত না হয় সেজন্য ব্যবসায়ীগণকে চাল আমদানির পর খালাস করার সময় চালের মূল্য পরিশোধ করার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের শতকরা প্রায় ৩৫  ভাগ আসে আমন মৌসুমে। এক সময় আমনই ছিল দেশের প্রধান চাল উৎপাদন মৌসুম। আমন মৌসুমে তেমন সেচ ও সারের প্রয়োজন না হওয়ায় ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ হয় কম। বন্যা ছাড়া এ ফসলের তেমন কোনো দুর্যোগ ঝুঁকি নেই।

বিদেশ থেকে সব সময় আমদানি করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বোরো মৌসুমে দেশে চাল উৎপাদনে যে ঘাটতি হয়েছে, তার আংশিক পুষিয়ে নিতে আমন ধান উৎপাদনের ওপর আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমন ধানের জমির পরিমাণ কিছুটা হলেও বাড়াতে হবে। ধান চাষের আধুনিক প্রযুক্তিগুলি সময় মতো প্রয়োগ করে হেক্টর প্রতি ফলন বাড়াতে হবে। এজন্য কৃষকভাইদের গুণগতমানের বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহার করতে হবে। বিশুদ্ধ বীজ ফসলের ফলন ও গুণগতমান বৃদ্ধির পূর্বশর্ত-এ ব্যাপারে বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী কেলি বলেন, ‘মানসম্পন্ন বীজকে কেন্দ্র বিন্দু ধরেই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’ বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ বাড়ানো যায়। বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহারের ফলে ধানের ফলন যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, তা কৃষক হাতে-কলমে প্রমাণ পেয়েছেন। এ কারণে বিএডিসি ও বিভিন্ন বেসরকারী বীজ কোম্পানীর ধানের ভিত্তিবীজ, প্রত্যায়িত ও মান ঘোষিত বীজ ব্যবহারে দিন দিন কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এটা টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য একটি শুভ লক্ষণ। স্বাধীনতার পর  ৪৮ বছরে দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ আর খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে চার গুণ। খাদ্য উৎপাদনের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনে উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল বীজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া এর সাথে রয়েছে কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রচেষ্ঠা, সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার, সময় মতো সেচ, রোগ-বালাই  পোকা-মাকড় ও আগাছা দমনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। আগে কৃষক এত পরিশ্রম করতেন না। তাঁরা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগে এত সচেতনও ছিলেন না। কৃষক এখন রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, মোবাইল ফোন, ফেইসবুক, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন এবং সম্প্রসারণকর্মীদের নিকট থেকে ফসল চাষ সংক্রান্ত ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছেন। আমন মৌসুমে উঁচু জমিতে কোন জাতের ধান লাগাতে হবে, নিচু জমিতে কোনো জাতের ধান লাগাতে হবে? বিঘা প্রতি কি পরিমাণ সার ব্যবহার করতে হবে? কত ইঞ্চি দূরে দূরে কতদিন বয়সের চারা লাগাতে হবে- এসব বিষয়ে তাঁদের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে।

এখন আষাঢ় মাস। সারা দেশে চলছে আমন ধানের বীজতলা তৈরির কাজ। কৃষককূল ও সরকার যখন ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আসন্ন আমন মৌসুমে ফলন বাড়ানোর নানা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্যস্ত,  ঠিক তখন এক শ্রেণির অতিলোভী বীজ ডিলার ও ব্যবসায়ী   বাজারে আমন বীজের কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করে সরকার নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ মূল্যে আমন ধানের বীজ বিক্রি করে সাধারণ কৃষকদের প্রতারিত করছেন। বিএডিসির আমন ধানের ১০ কেজি ওজনের প্রতি প্যাকেট ভিত্তি বীজের সরকার নির্ধারিত মূল্য ৪০০ টাকা এবং প্রত্যায়িত ও মান ঘোষিত বীজের দাম যথাক্রমে ৩৫০ ও ৩৪০ টাকা। অথচ  বিএডিসির সেই ভিত্তি, প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত বীজ স্থান, ব্যবসায়ী ও ডিলার ভেদে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এভাবে প্রতি কেজি বীজে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন ২৫ টাকা। অর্থাৎ ১০ কেজি ওজনের প্রতি প্যাকেট বীজ থেকে ব্যবসায়ীরা কমিশন বাদে কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে নিয়োগকৃত বিএডিসির হাজার হাজার ডিলার উত্তোলনকৃত আমন ধানের বীজ ন্যায্য মূল্যে কৃষকদের নিকট বিক্রি না করে কালো বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন অথবা নিজেরাই কৃষকদের নিকট দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন। এভাবে আমন বীজ থেকে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা।

বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে আমন মৌসুমে ধান বীজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে প্রকাশ্যে দ্বিগুণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ডিলাররা। কৃষকরা হাটে-বাজারে সরকার অনুমোদিত বিএডিসির ডিলারদের দোকানে দোকানে ঘুরে সরকার নির্ধারিত দামে বীজ পাচ্ছেন না। ডিলাররা এসব বীজ কালো বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে  বীজের অভাবে চাষাবাদ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশংকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। কৃষকদের কথা মনোহরদী উপজেলার শেখের বাজার, চালাকচর বাজার বীরগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন বীজ ভান্ডারের মালিকগণ ধান বীজ গুদামে মজুদ রেখে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করে দ্বিগুণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ওই একই এলাকার কচিকাটা গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ শেখের বাজারের এক  ডিলারের নিকট থেকে ১০ কেজি ওজনের ২ প্যাকেট ব্রিধান-৪৯ জাতের বীজ ১ হাজার ২০০ টাকায় ক্রয় করেন, অথচ যার সরকার নির্ধারিত মূল্য হলো ৬৮০ টাকা। ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি না করার কারণে  কৃষক অতিরিক্ত দামে বীজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। জানা যায় চলতি মৌসুমে মনোহরদী  উপজেলায় আমন ধানের চাষ হবে ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এ জন্য ১৮ জন ডিলারের মাধ্যমে  ব্রিধান- ৩০, ব্রিধান- ১২, ব্রিধান- ৪৯, ব্রিধান- ৫১, ব্রিধান- ৩০, ব্রিধান- ২২, বিআর- ১১ও বিণা- ৭ জাতের প্রায় ৭৭ মেট্রিক টন বীজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু  কোনো ডিলারই সরকার নির্ধারিত দামে বীজ বিক্রি করছেন না। ফলে অনেক কৃষক হতাশ হয়ে খোলা বাজার থেকে নিম্নমানের বীজ কিনে বীজতলা স্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে আমন মৌসুমে ফলন বৃদ্ধির সম্ভাবনা শূণ্যেই মিলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সম্প্রতি নেত্রকোণার কমলাকান্দা সদরে  আমন ধানের বীজ কালো বাজারে বিক্রির দায়ে বীজ ব্যবসায়ী মোঃ মানিক মিয়াকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিএডিসির আমন বীজ অবৈধভাবে মজুদ করে সরকারি মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রির অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মোঃ হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে আদালত অভিযুক্ত মানিককে গ্রেফতারসহ তার দোকান থেকে ৪৫ বস্তা ব্রিধান- ৩২ জাতের আমন বীজ জব্দ করে। একইসঙ্গে আদালত ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে একমাস সশ্রম করাদণ্ড প্রদান করেছেন। কৃষক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান কথিত মানিকের দোকান থেকে সরকার নির্ধারিত ৩৪০ টাকা মূল্যের আমন ধানের বীজ ৬০০ টাকা দামে ক্রয় করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের  নিকট লিখিত অভিযোগ করেন এবং উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতেই ভাম্যমাণ আদালত অনুষ্ঠিত হয়। শুধু কমলাকান্দা ও মনোহরদী উপজেলাতেই নয়; হাওড় অঞ্চলের কয়েকটি উপজেলা বাদে সারা দেশেই আমনধানের বীজ নিয়ে চলছে এরকম রমরমা ব্যবসা। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, পাবনা ও নাটোরসহ সারা দেশেই নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে আমন ধানের বীজ। এ ব্যাপারে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান হচ্ছেনা। গত বছরও ১০ কেজি ওজনের প্রতি প্যাকেট আমন ধানের বীজ এ সময়ে বিক্রি হয়েছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। তখন ধানের দাম কম থাকায় বীজের চাহিদাও কমছিল এবং এসিআই, অটোক্রপ কেয়ার, ব্র্যাক, ইয়েন, ম্যাগডোনাল্ড প্রভৃতি কোম্পানীর ভিত্তি ও প্রত্যায়িত বিক্রি হয়েছে নির্ধারিত দামে। আর এ বছর আমন ধানের বীজ নিয়ে চলছে সারা দেশে এক তুগলকী কাণ্ড। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার জয়দা গ্রামের রফিকুল ইসলাম নামের একজন কৃষক  তাঁর ৪০ শতক জমিতে আমন ধান রোপণের জন্য ব্রিধান-৪৫ জাতের বীজ খুঁজছেন। তার কাছে ১০ কেজি ওজনের এক প্যাকেট বীজের দাম চাওয়া হচ্ছে সাড়ে ছয়শত টাকা। তিনি গত আমন মৌসুমে নিজের ব্যবহারের জন্য বাড়িতে  ধানের বীজ সংগ্রহ করে রাখতে পারেননি। একই উপজেলার কাঁঠাল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া পাড়া গ্রামের দেবেন সরকার দু’দিন আগে ৬৩০ টাকা দিয়ে বিএডিসির ব্রিধান ৪৯ জাতের ১০ কেজি বীজ সংগ্রহ করেন। কৃষকের অভিযোগ, সরকারী প্রতিষ্ঠান বিএডিসির ডিলার ছাড়াও এসিআই, অটোক্রপ কেয়ার, ইয়েনসহ  বিভিন্ন  বেসরকারী কোম্পানীর ডিলারগণ আমন বীজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কোম্পানীর নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বীজ বিক্রি করে অসহায় কৃষকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। ফলন বৃদ্ধির জন্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ২২ জন ডিলারের মাধ্যমে আনুমানিক শতাধিক টন আমন ধানের বীজ বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন। যতদূর জানা যায়, কোনো ডিলারই সরকার নির্ধারিত দামে আমন ধানের বীজ কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করেননি।

এ বছর অতিবৃষ্টি ও, পাহাড়ী ঢল ও ব্লাষ্ট রোগের কারণে বোরো ধানের উৎপাদন  অনেক কম হয়েছে এবং সম্প্রতি  মাত্রতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে কৃষকের খরিপ মৌসুমে রোপণকৃত সবজি ও মসলা ফসল বিনষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও তাঁদেরকে যদি আমন ধানের বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে  এভাবে হয়রানীর শিকার হতে হয়, দ্বিগুণ মূল্য দিতে হয়, তাহলে আমাদের খাদ্য যোগানদাতা কৃষক কোথায় দাঁড়াবেন? আর কেনই বা তাঁরা ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমন ধানের চাষ করে প্রতারণা ও বিড়াম্বনার শিকার হবেন? কৃষক ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলকে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় এর জন্য সমগ্র জাতিকে বিরাট মাশুল দিতে হবে ।

————————————–

লেখকঃ

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ,

৪৫/১হিন্দু পল্লী, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

মোবাইলঃ ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইল: netairoy18@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *