আমের প্রধান রোগসমূহ ও তাদের দমন ব্যবস্থাপনা

মোঃ মোশাররফ হোসেন*

বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলসমুহের মধ্যে আম অন্যতম। স্বাদে, গন্ধে ও তৃপ্তি প্রদানে আম অতুলনীয় তাই আমকে ‘ফলের রাজা’ বলা হয়। আম পছন্দ করে না এমন লোক হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সব এলাকাতে আম গাছ দেখা গেলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় বাণিজ্যিকভিত্তিতে আম চাষ হয়ে থাকে। আমাদের আমের ফলন বেশ কম, হেক্টর প্রতি মাত্র ৪ টন। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রায় ১০ টন। ফলন কম হওয়ার কারণ অনেক, তবে রোগ বালাই সব চেয়ে বেশী ক্ষতি করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। রোগ বালাই এর উপর আবহাওয়ার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল হলে, রোগ জীবাণুর বেঁচে থাকা, বংশ বৃদ্ধি, আক্রমণ ও বিস্তার সহজ হয়। প্রধান প্রধান রোগগুলো আমের মুকুল, কচি পাতা, পাতার কুঁড়ি এবং সংগ্রহোত্তর আমে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে। পোকা দমনের ক্ষেত্রে আম চাষীগণ কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করলেও রোগ দমনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণা একেবারেই কম।

আমের উৎপাদন বাড়াতে হলে রোগ দমন অপরিহার্য। একটা কথা মনে রাখতে হবে রোগ দমনের চেয়ে প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ অতি উত্তম। পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, পরগাছা দমন, রোগাক্রান্ত ডালপালা নিয়মিত ছাটাইকরণ, নিয়মিত সার প্রয়োগ এবং সময়মত পোকা দমন প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। রোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৪ টি মূলনীতি মেনে চলা উচিত। যথাঃ সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন, সঠিক মাত্রা নির্ধারণ, সঠিক সময়ে দমন এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ। এই মূলনীতি না মানলে কাংক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অনেকে মনে করেন রোগ দমন অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক হবে কিনা সেটাও বিবেচনা করা উচিত। আম গাছ বেশ বড় বিধায় যথাযথভাবে স্প্রে করা অসুবিধাজনক তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। আমাদের দেশে আমের প্রধান রোগ সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এনথ্রাকনোজ (Anthracnose)

রোগের লক্ষণঃ এ রোগের আক্রমণ আমগাছের কচি পাতা, কান্ড, মুকুল, কুঁড়ি ও ফলে প্রকাশ পায়। পাতায় অসম আকৃতির ধুসর বাদামী বা কালচে রঙের দাগ পড়ে। পাশাপাশি দাগসমুহ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করতে পারে। বেশী আক্রান্ত পাতা ঝরে পড়ে। কচি পাতার আক্রান্ত স্থানের কোষগুলি দ্রুত মারা যায়। আমের মুকুল বা ফুল আক্রান্ত হলে কালো দাগ দেখা দেয়। আক্রান্ত ফুল মারা যায় ও ঝরে পড়ে। মুকুলে আক্রমণ হলে ফল ধারণ ব্যাহত হয়। আম ছোট অবস্থায় আক্রান্ত হলে আমের গায়ে কালো দাগ দেখা দেয়। আক্রান্ত ছোট আম ঝরে পড়ে। বাড়ন্ত আমে রোগের জীবাণু আক্রমণ করে সুপ্তাবস্থায় থাকে। এ সময় রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। আম পাকা শুরু করলে আমের মিষ্টতা বাড়তে থাকে তখন জীবাণু সক্রিয় হয়ে উঠে এবং পাকা আমে ধুসর বাদামী বা কালো দাগের সৃষ্টি করে। গুদামের আবহাওয়া অনুকুল হলে রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। আম বড় হওয়ার সময় ঘন ঘন বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করলে আমে আক্রমণ বেশী দেখা যায়।

প্রতিকারঃ

১.            প্রতি বছর  রোগাক্রান্ত বা মরা ডালপালা ছাঁটাই করে পুড়ে ফেলতে হবে।

২.           গাছের রোগাক্রান্ত ঝরা পাতা ও ঝরে পড়া আম সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে বা মাটি চাপা দিতে হবে।

৩.          মুকুলে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে মেনকোজেব গ্র“পের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করতে হবে। মুকুল ১০-১৫ সেমি লম্বা হলেই ফুল ফোটার আগেই প্রথম স্প্রে শেষ করতে হবে। আম মটর দানার মত হলে দ্বিতীয় বার স্প্রে করতে হবে। এতে কচি আমে আক্রমণ প্রতিহত করবে এবং আম ঝরে পড়া কম হবে। কীটনাশকের সাথে এসব ছত্রাকনাশক মিশিয়ে একত্রে স্প্রে করা যেতে পারে।

৪.           বাড়ন্ত আমকে রোগমুক্ত রাখতে হলে আম সংগ্রহের ১৫ দিন আগ পর্যন্ত মেনকোজেব গ্র“পের ছত্রাক নাশক বা একরোবেট এম জেড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে বা ব্যভিষ্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ১৫ দিনের ব্যবধানে ৩/৪ বার স্প্রে করতে হবে।

৫.           গাছ থেকে আম পাড়ার পরপরই গরম পানিতে (৫৫০ সেঃ তাপমাত্রায় ৫ মিনিট) ডুবিয়ে রাখার পর শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে।

বোঁটা পচা (Stem-end rot)

লক্ষণঃ আম গাছ থেকে পাড়ার পর পাকতে শুরু করলে বোঁটা পচা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রথমে বোঁটায় বাদামী অথবা কালো দাগ দেখা দেয়। দাগ দ্রƒত বাড়তে থাকে এবং গোলাকার হয়ে বোঁটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। জীবাণু ফলের শাঁসকে আক্রমণ করে এমজাইম নিঃসরণের মাধ্যমে আমের কোষগুলোকে দ্রƒত পঁচিয়ে ফেলতে পারে। আক্রান্ত আম ২/৩ দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। রোগের জীবাণু বোঁটা ছাড়াও অন্যান্য আঘাতপ্রাপ্ত স্থান দিয়ে আমের ভিতরে প্রবেশ করে আম পঁচিয়ে ফেলতে পারে।

প্রতিকারঃ

১.            মেঘমুক্ত রোদ্রোজ্জ্বল দিনে গাছ থেকে আম পাড়তে হবে। আম পাড়ার সময় যাতে আঘাত না পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

২.           ৫ সে.মি. (২ ইঞ্চি) বোঁটাসহ আম পাড়লে রোগের আক্রমণ  হওয়ার সম্ভাবনা কমে য়ায়।

৩.          আম পাড়ার পর গাছের তলায় জমা না রেখে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।

৪.           আম পাড়ার পর পরই গরম পানিতে (৫৫০ সেঃ তাপমাত্রার পানিতে ৫-৭ মিনিট) অথবা বাভিষ্টিন দ্রবনে (প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম) ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখার পর গুদামজাত করলে বোঁটা পচার ভয় থাকেনা।

পাউডারী মিলডিউ (Powdery mildew)

রোগের লক্ষণঃ পাউডারী মিলডিউ রোগের আক্রমণ প্রধানত আমের মুকুল ও কচি আমে প্রকাশ পায়। প্রথমে আমের মুকুলের শীর্ষ প্রান্তে সাদা বা ধূসর বর্ণের পাউডারের আবরণ দেখা যায়। এই পাউডার হচ্ছে ছত্রাক জালিকা ও তার বীজকণার সমষ্টি। হালকা বৃষ্টি, মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ এ রোগের জীবাণুুর ব্যাপক উৎপাদনে সহায়তা করে। অনুকুল আবহাওয়ায় এই পাউডার সম্পূর্র্ণ মুকুলে দ্রƒত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত মুকুলের সমস্ত ফুল নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থায় শুধুমাত্র মুকুলের দন্ডটি দাঁড়ায়ে থাকে। আক্রমণ বেশী হলে সমস্ত মুকুল নষ্ট হওয়ায় গাছে কোন ফল ধারণ হয়না। কোন কোন সময় কম আক্রান্ত মুকুলে আম ধরতে দেখা যায়। তবে এ ধরনের আমের চামড়া খসখসে হয়। বেশী আক্রান্ত কচি আম ঝরে পড়ে।

বিস্তার ঃ ছত্রাকের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে রোগাক্রান্ত মুকুল থেকে সুস্থ মুকুলে বিস্তার লাভ করে। আর্দ্র, গরম আবহাওয়া তৎসহ রাতের তাপমাত্রা কম থাকলে এ রোগ দ্রুত বাড়তে পারে। বীজকণা বাতাসের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে মুকুলের উপর পতিত হওয়ার ৫/৭ ঘন্টার মধ্যে অঙ্কুরোদগম হয়। মেঘাছন্ন ও সকালের ঘন কুয়াশায় রোগের জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

প্রতিকারঃ ১.       মুকুল আসার সময় প্রতিদিন আম গাছ পর্যবেক্ষণ করতে হবে মুকুলে পাউডারী মিলডিউ রোগ দেখা দিয়েছে কিনা। রোগের লক্ষণ দেখা দিলেই সালফার গ্র“পের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ভালভাবে স্প্রে করতে হবে।

আমের আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক (Gummosis and Suddendecline)

বর্তমানে আম গাছের  যে সমস্ত রোগ দেখা যায় তাদের মধ্যে আমের আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ এরোগে আক্রান্ত গাছ খুব অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায় ।

রোগের লক্ষণঃ  প্রথমে কান্ড বা ধড় অথবা মোটা ডালের কিছু কিছু জায়গা থেকে হালকা বাদামি থেকে গাড় বাদামি বা কলো রঙের আঠা বা রস বের হতে থাকে । বেশী আক্রান্ত ডগা বা ডালটি অল্প দিনের মধ্যেই মারা যায়। এ অবস্থায় মরা ডালে পাতাগুলো ডগায় আঁটকে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে পাতাগুলো কিছুদিন পর ঝরে পড়ে। কিছুদিন পর দেখা যায় আরেকটি ডাল একই ভাবে মারা যাচ্ছে। এভাবে এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ গাছ মারা যেতে পারে।

প্রতিকারঃ

১.            গাছে মরা বা ঘন ডাল পালা থাকলে তা নিয়মিত ছাটাই করতে হবে।

২.           আক্রান্ত গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোবর/ আবর্জনা পঁচা/ কম্পো¯ট সার এবং রাসায়নিক সার  ও পানির ব্যবস্থা করতে হবে ।

৩.          আঠা বা রস বের হওয়ার স্থানের ছাল/বাকল কিছু সুস্থ অংশসহ তুলে ফেলে দিয়ে উক্ত স্থানে  বোর্দো পেষ্টের ( ১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন  ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরী করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।

৪.           আক্রান্ত ডাল কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে রোগের আক্রমন প্রতিহত করার জন্য বোর্দো পেষ্টের  প্রলেপ দিতে হবে।

৫.           গাছে নতুুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্র“পের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ১৫ দিনের ব্যবধানে ২ বার স্প্রে করলে নতুন ডগায় আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।

আগামরা (Die back)

লক্ষণঃ  রোগের জীবাণু প্রথমে কচি পাতায় আক্রমণ করে। আক্রান্ত পাতা বাদামী হয় এবং পাতার কিনারা মোড়িয়ে যায়। পাতাটি দ্রুত মারা যায় ও শুকিয়ে যায়। আক্রমণ পাতা থেকে কুঁড়িতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ডগার অগ্রভাগ মেরে ফেলে। মরা অংশ নিচের দিকে অগ্রসর হতে থাকে ফলে বহু দুর থেকে আগামরা রোগের লক্ষণ বোঝা যায়। আক্রান্ত ডগাটির কোষ বিবর্ণ হয়ে উঠে। ডগাটি লম্বালম্বিভাবে কাটলে যা সহজেই নজরে পড়ে। পরিবহন কলায় বাদামী লম্বা দাগের সৃষ্টি করে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ দমন না করলে রোগ সমস্ত ডালে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রমণ বেশী হলে গাছ মারা যেতে পারে।

বিস্তারঃ রোগের জীবাণু মরা ডাল বা পুরাতন পাতায় অবস্থান করে। রোগের বীজকণা বাতাসের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে নতুন পাতা ও ডগায় আক্রমণ করে। উচ্চ তাপমাত্রা, শতকরা ৮০ ভাগের উর্দ্ধে বাতাসের আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত এ রোগের আক্রমণ ও বিস্তারে অনুকুল অবস্থার সৃষ্টি করে।

প্রতিকারঃ

১। আক্রান্ত ডাল কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বোর্দো পেষ্টের ( ১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন  ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরী করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।

২। গাছে নতুুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্র“পের ছত্রাকনাশক যেমন-  ডায়থেন এম ৪৫/ পেনকোজেব/ ইন্ডোফিল/ কাফা ইত্যাদি (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে) ১৫ দিনের ব্যবধানে ২/৩ বার স্প্রে করলে নতুন ডগায় আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।

লাল মরিচা (Red rust)

লক্ষণঃ  লাল মরিচা রোগ প্রধানত পাতায় দেখা যায় তবে কোন কোন সময় পাতার বোঁটা বা কচি কান্ডে দেখা দিতে পারে। প্রথমে পাতায় ধূসর-সবুজ রংবিশিষ্ট দাগ পড়ে। পরবর্তীতে এই দাগ সুস্পষ্ট লালচে বাদামী রং ধারণ করে। দাগগুলি প্রায় গোলাকার এবং কিছুটা উচুঁ মনে হয়। কয়েকটি দাগ একত্রিত হয়ে অসম আকৃতির বড় দাগের সৃষ্টি করে। দাগের মধ্যে অবস্থিত শৈবালের দেহ কিছুটা মখমলের মত কোমল মনে হয়। শৈবালের মাথায় বীজকণা থাকে যা বাতাসে ঝরে পড়লে দাগের রঙ ঘিয়ে রঙে রূপান্তরিত হয়। আক্রান্ত স্থানের কোষগুলি মারা যায়। আক্রমণ বেশী হলে পাতায় খাদ্য উৎপাদন এলাকা কমে যায় এবং গাছ দূর্র্বল হয়ে পড়ে।

বিস্তারঃ শৈবালের বীজকণা বাতাস অথবা বৃষ্টির ঝাপটার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে নতুন পাতাকে আক্রমণ করে। অধিক তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা এ রোগের বৃদ্ধি ও বিস্তারে সহযোগিতা করে তাই বর্ষাকালে রোগের আক্রমণ বেশী দেখা যায়।

প্রতিকারঃ

১.            রোগ প্রতিরোধী জাতের আমগাছ লাগাতে হবে। রোগাক্রান্ত ঝরা পাতা সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে।

২.           কপারঘটিত ছত্রাকনাশক যেমন- কুপ্রাভিট/ সালকক্স প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা বোর্দো মিক্সচার ১৫ দিন পর পর ৪/৫ বার ¯েপ্র্র করে গাছ রোগমুক্ত রাখা যায়।

৩.          ফলিকুর প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে স্প্রে করেও গাছ রোগমুক্ত রাখা যায়।

বিকৃতি (Malformation)

লক্ষণঃ  সাধারনত দুই ধরনের বিকৃতি লক্ষ্য করা যায় যেমন : কান্ড বা দৈহিক বিকৃতি এবং মুকুলের বিকৃতি ।

কান্ড বা দৈহিক বিকৃতি ঃ প্রধাণত  চারা বা ছোট গাছে দেখা যায়। আক্রান্ত কান্ডের মাথায় বা গিটে অসংখ্য নতুন কুঁড়ি বের হয়। কুঁড়িগুলি বেশ শক্ত ও ছোট ছোট পাতাযুক্ত হয়ে থাকে। কুঁড়িগুলি বড় হয়না বরং গিটের চর্তুদিকে আরো কুঁড়ি বের হয়ে জটলার সৃষ্টি করে। এক সময় নতুন কুঁড়িগুলি মারা যায়। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত চারাগাছের বৃদ্ধি হয়না এতে গাছ দূর্বল হয়ে মারা যেতে পারে। ৭/৮ বছরের বেশী বয়সের গাছে সাধারণত দৈহিক বিকৃতি দেখা যায় না।

মুকুলের বিকৃতিঃ মুকুলের বিকৃতি স্বভাবতই ফলবান গাছে পরিলক্ষিত হয়। রোগাক্রান্ত মুকুলে অসংখ্য শাখা প্রশাখা বের হয়। এসব শাখা প্রশাখা বেশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র্র, মোটা ও তুলনামুলকভাবে শক্ত হয়ে থাকে। দেখতে অনেকটা জটলার মত মনে হয়। বিকৃত মুকুলে উভলিঙ্গ ফুল তেমন না থাকায় কোন ফল ধারন করে না। বিকৃত মুকুল ২/৩ মাস পর্যন্ত গাছে আঁটকে থাকতে দেখা যায়। বিকৃতি রোগের বিস্তার কিভাবে হয়ে থাকে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে তবে এ রোগ বীজ দ্বারা বাহিত হয় না বলে জানা গেছে।

প্রতিকার ঃ

১.            রোগমুক্ত গাছের বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে হবে এবং কলম তৈরী করার সময় রোগমুক্ত গাছ থেকে ডগা বা সায়ন (ঝপরড়হ) সংগ্রহ করতে হবে।

২.           রোগমুক্ত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সস্পন্ন জাতের আমগাছ লাগাতে হবে। বারি আম-১, ২, ল্যাংড়া, ফজলী ইত্যাদি জাতে বিকৃতি রোগ খুব কম দেখা যায়।

৩.          দৈহিক বিকৃত কুঁড়িগুলি ভেঙ্গে ফেলতে হবে অথবা আক্রান্ত স্থান কেটে ফেলতে হবে।

৪.           বিকৃত মুকুল দেখা দেওয়া মাত্রই কেটে ফেলতে হবে।

৫.           ব্যাভিষ্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ১০ দিন পর পর ৪/৫ বার স্প্রে করে গাছ রোগমুক্ত রাখা যায় ।

৬.          মুকুল বের হওয়ার প্রায় ৩ মাস পূর্বে (অর্থাৎ অক্টোবর মাসে) ন্যাপথালিন এসিটিক এসিড (ঘঅঅ) শতকরা ০.০২ ভাগ হারে স্প্রে করলে রোগের তীব্রতা কমে যায়।

ঝুল রোগ (Sooty mould)

লক্ষণঃ ঝুল রোগের আক্রমণে পাতার উপর কালো আবরণ পড়ে। এই কালো আবরণ হচ্ছে ছত্রাকের দেহ (Mycelium) ও বীজকণার সমষ্টি। আমের শরীরেও কালো আবরণ দেখা দেয়।

বিস্তার ঃ রোগের বীজকণা বা কণিডিয়া বাতাসের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে থাকে। হপার বা শোষক পোকা আমের মুকুলের মারাত্মক শত্র“। এ পোকা মুকুল থেকে অতিরিক্ত রস শোষন করে এবং মধু জাতীয় এক প্রকার আঠাল পদার্থ (যা হানিডিউ নামে পরিচিত) নিঃসরণ করে। উক্ত হানিডিউ মুকুল ও পাতার উপর পতিত হয় তার উপর ছত্রাকের বীজকণা জন্মায় এবং কালো আবরণের সৃষ্টি করে। হপার ছাড়াও ছাতরা পোকা (মিলিবাগ) ও স্কেল পোকা (Scale insect) হানিডিউ নিঃসরণ করে এবং ঝুল রোগের আক্রমণে সহায়তা করে। হানিডিউ ছাড়া এ রোগ জন্মাতে পারে না।

প্রতিকার ঃ

১.            হানিডিউ নিঃসরণকারী হপার, মিলিবাগ বা স্কেল পোকা কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে দমনে রাখতে পারলে ঝুল রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

২.           আক্রান্ত গাছে সালফার গ্র“পের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করে এ রোগ দমন করা যায়।

দাদ (Scab)

লক্ষণঃ আম মটর দানার মত হলেই এ রোগের আক্রমণ শুরু হতে পারে। আক্রান্ত আমের শরীর বাদামী রং ধারণ করে, খোসা ফেটে যায় ও খসখসে হয়ে উঠে। আক্রান্ত আমের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা ঝরে পড়ে। রোগের আক্রমণে বাড়ন্ত আমের শরীরে বাদামী দাগের সৃষ্টি হয়। অনুকুল আবহাওয়ায় দাগগুলো বাড়তে থাকে এবং সম্পূর্ণ আমের শরীর ঢেকে ফেলে। আক্রান্ত স্থানের চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আমের শরীর খসখসে অমসৃন হওয়ার কারণে আমের বাজার দর কমে যায়।

প্রতিকার ঃ

১.            রোগের আক্রমণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোভরাল (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম) অথবা বাভিষ্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ৭-১০ দিন পর পর ৩/৪ বার  স্প্রে করে গাছ রোগমুক্ত রাখা যায় ।

————————————–

লেখকঃ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare