আমের বাম্পার ফলন পেতে করণীয়

কৃষিবিদ এম এ মজিদ

Thotapuri_Mango_tree_in_Kolar

বাংলাদেশে আম হল ফলের রাজা এবং গাছ হল জাতীয় গাছ৷ আম সাধারণত উষ্ণ ও অবউষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্বার্থকভাবে জন্মে৷ ইন্দো-বার্মা অঞ্চলে আমের উত্‍পত্তিস্থল বলে ধারণা করা হয় তবে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহামহাদেশে আম সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল কারণ এ ফল বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান ও স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়৷ বাংলাদেশে প্রায় সব অঞ্চলে আম জন্মে কিন্তু দেশের উরাঞ্চলে এর বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে৷ আম চাষীরা প্রতি বছর অনেক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকেন সাধারণত দুই প্রকারের সমস্যার কারণে যথা : (অ) প্রাকৃতিক কারণ (যেমন- ঝড়, শিলাবৃষ্টি, খরা প্রভৃতি) এবং (আ) রোগ ও পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়ে৷ সঠিক পরিচর্চা ও রোগ-পোকামাকড় দমন করে প্রথম ক্ষতি আংশিক এবং দ্বিতীয় রুক্ষতি প্রায় সমপূর্ণ রুপে সমাধান করা সম্ভব৷ নীচে ইহা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলঃ-
(অ) ফলন্ত আম গাছের পরিচর্চা :
আম গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফলন বাড়ানোর জন্য নিম্নলিখিত পরিচর্চাগুলি করা একান্ত প্রয়োজন৷
পরগাছা দমন :
আমগাছে একাধিক জাতের আগাছা জন্মাতে দেখা যায় যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের প্রতি ক্ষতিকর৷ পরগাছাসমুহে শিকড়ের মত এক প্রকার হষ্টোরিয়া হয় যা গাছের মধ্যে প্রবেশ করে রস শোষণন করে খায় এবং দুর্বল করে৷ পরগাছার প্রাদুর্ভাব বেশী হলে গাছের পাতার আকার ছোট হয় ও ফ্যাকাসে হয় এবং অনেক সময় গাছ মারা যায়৷ এর ফলে গাছের ফলন মারাত্মক ভাবে কমে যায়৷ তাই ভাল ফলন পেতে হলে অবশ্যই পরগাছা অপসারণ করতে হবে৷
সার প্রয়োগ :
গাছের বৃদ্ধি ও ফল উত্‍পাদনের জন্য সারের ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন৷ ফলন্ত গাছের আকার, বয়স ও মাটির উর্বরতার উপর সারের পরিমাণ নির্ভর করে৷ দুপুর বেলা যতটুকু স্থানে ছায়া পড়ে সেটুকু স্থানে মাটি কুপিয়ে সার মাটির সাথে মিশে দিতে হবে৷
সেচ প্রয়োগ :
সাধারণত জমির উপর স্তরে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান থাকে বা সার হিসাবে মাটিতে মিশে দেয়া হয় তাই আম বাগানের উপরের ২-৩ মিটার অংশকে জমির পানি সংরক্ষণ স্তর হিসাবে ধরা হয়৷ তাই শুস্ক মৌসুমে আম বাগানে পানি সেচ দেয়া দরকার৷ আমের গুটি মটর দানারমত হওয়ার পর থেকে ১৫-২০ দিন পর পর ২-৩ বার সেচ দিলে আমের গুটি ঝরা বন্ধ হয়৷
বয়স্ক টক আমগাছকে মিষ্টি আমগাছে রূপান্তরকরণ : বাগানের কোন গাছের আমের গুনাগুণ খারাপ হলে সে গাছকে নষ্ট না করে ভিনিয়ার কলমের মাধ্যমে উন্নতি সাধণ করা য়ায়৷ বয়স্ক গাছের ২-৩ টি ডাল কেটে দিলে সেখান থেকে নতুন শাখা বের হলে তার পর নতুন শাখাতে ভিনিয়ার কলম করে নিতে হবে৷ এ ভাবে ৩-৪ বারে কাজ সম্পন্ন করতে হবে৷

পুরাতন বাগান নবায়ন :
আম বাগানের বয়স বেশী হলে ফল ধারণ কমে যায়, তাই এ ক্ষেত্রে গাছ কেটে না ফেলে পুরাতন গাছের ভারী শাখা কেটে দিলে সেখানে নতুন শাখা বের হবে এবং গাছ নবায়ন হয়ে যাবে৷ এ ভাবে ২-৩ বছরে বাগান নবায়ন করা যায়৷

ফসল সংগ্রহ :
ফল ধরার ৩-৫ মাসের মধ্যেই জাত ভেদে ফল পাকা শুরু করে৷ বাণিজ্যিক ভাবে কখনো সম্পুন্ন পাকা ভাবে আম গাছ থেকে পাড়া ঠিক নয়৷ গাছের ফল দুই চারটি পাকা শুরু করলে বাঁশের কোটার মাথায় থলে সদৃশ্য জালতি লাগিয়ে আম পাড়তে হবে যেন আঘাত না লাগে৷ গাছের নীচে সাময়িক ভাবে রাখতে হলে খড় বিছিয়ে তার উপর রাখতে হবে৷ নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখে ফল সংগ্রহ করতে হবে :- (১) আমের বোটার নীচে হলুদ বর্ণ ধারণ করবে৷ (২) পানিতে দিলে ডুবে যাবে৷ (৩) কস বের হলে দুধ শুকে যাবে৷ (৪) দুই একটি পাকা আম গাছ থেকে ঝরে পড়বে৷
ফল সংরক্ষণ : আম পচনশীল ফল৷ বেশী পাকা অবস্থায় সংগ্রহ করলে সংরক্ষণকাল কম হয়৷ অধিকাংশ জাতের আম ১৩-১৭ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় ও ৮৫-৯০% আপেক্ষিক আদ্রতায় বাঁশের ঝুড়ি, বাস্কেট, খড়বিছানো প্রভৃতিতে স্থানে ৪-৭ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়৷

(আ) রোগ দমন :
অ্যানথ্রাকনোজ (অহঃযত্‍ধপহড়ংব)
এ রোগ আমের পাতা ও ফলে হয়ে থাকে৷ ইহা কোলিটোর্টিকাম গোলেসপোরিওডিস (ঈড়ষষবঃড়ঃত্‍রপযঁস মষড়বড়ংঢ়ড়ত্‍রড়রফবং) নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা হযে থাকে৷ এ রোগের কারণে আমের ফলন শুন্যের কাছাকাছি আসতে পারে৷

লক্ষণসমুহ :
(১) এ রোগ নুতন পাতা, পুষপমঞ্জুরী ও ফলে দেখা যায়৷ (২) পাতায় ধূসর-বাদামী ছোট কৌষিক দাগ পড়ে এবং পরে সমস্ত পাতায় ছড়িয়ে পড়ে ও এক পর্যায় পাতা ঝরে পড়ে৷ (৩) ফলের উপর প্রথমে গাঢ় বাদামী দাগ পড়ে৷ (৪) দাগগুলি পরে বড় হয়ে কাল বর্ণ ধারন করে৷ (৫) আক্রমণ মারাত্মক হলে পরবতীতে সম্পুর্ণ আম পচে যায়৷
অনুকূল অবস্থা : (১) তাপমাত্রা ২৫-২৮ ডিগ্রী সে.৷ (২) আপেক্ষিক আদর্্রতা ৭০-৮০%৷ (৩) অধিক বৃষ্টিপাত৷ (৪) ঘন কুয়াশা ও আকাশ মেঘাছন এ রোগের প্রকোপ বাড়ায়৷

দমন ব্যবস্থা :
(১) ফল সংগ্রহের পর বাগানের অবশিটাংশ ধংস করতে হবে৷ (২) স্বাস্থ্যবান গাছ রোপণ করতে হবে৷ (৩) বোর্দো মিশ্রসার ০.৩% হারে ৩-৪ বার সপ্রে করতে হবে (ফুল ধরার পূর্বে ও পরে এবং ফল সংগ্রহের পর্ূেব)৷ (৪) বাভিসটিন ডবলিউ/পি ০.২ % হারে অথবা ডাইথেন-এম ০.৩ % হারে দুই বার (ফুল ধরার পূর্বে ও পরে ) সপ্রে করতে হবে৷
আমের বোটা ও ফল পচাG

রোগের কারণ :
এ রোগ বোর্টিডিপ্লডিয়া থিয়োবোরমি (ইড়ঃত্‍ুড়ফরঢ়ষড়ফরধ :যবড়নত্‍ড়সধব) নামক এক প্রকার ছাত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে৷ এ রোগ আমের বোটা ও ফলে হয়ে থাকে৷
রোগের লক্ষণসমুহ : (১) প্রথমে বোঁটার চতুর্দিকে কিছু জায়গা জুড়ে কাল দাগ পড়ে৷ (২) পরবর্তীতে আমের অধিকাংশ ও সর্বশেষ অংশ পচে কাল রং ধারণ৷ (৩) আক্রান্ত স্থানে চাপ দিলে ভিতর থেকে পচা কাল গন্ধযুক্ত আমের রস বের হয়ে আসে৷

রোগ দমন : ক)
যে কোন একটি পদ্ধতিতে রোগ দমন করবেন :(১) ডাইথেন-এম-৪৫, ০.৩ % হারে ২-৩ বার সপ্রে করতে হবে৷ (২) রিডোমিল ০.১ % হারে ২-৩ বার সপ্রে করতে হবে৷ (৩) রোভরাল ০.১ % হারে ২-৩ বার সপ্রে করতে হবে৷ (খ) আম হারভেষ্ট করার পর ৪৩ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় ৫ মিনিট ৬% বোরাক্স দ্রবণে চুবাতে হবে৷ (গ) ফল সংগ্রহ করার পর ডালপালা, অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতে হবে৷
আমের পাউডারি মিলডিউ
রোগের কারণ :
এ রোগ ওডিয়াম মেংগিফেরা (ঙরফরঁস সধহমরভবত্‍ধব) নামক ছাত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে৷
রোগের লক্ষণসমুহ : (১) পুষপমঞ্জুরী ও ইহার সংলগ্ন কঁচিপাতা এবং ছোট ফলের উপর সাদা-ধুসর পাউডার দেখা যায়৷ (২) সাধারণত সংক্রামণ পুষ্পমঞ্জুরী অগ্রভাগ ক্ষত শুরু করে নীচের দিকে ধাবিত হয় এবং কুচকে যেয়ে ডাই-বেক লক্ষণ প্রকাশ পায়৷ (৩) ফল অপরিপক্ক অবস্থায় ঝরে পড়ে এবং বিকৃত ও বিবর্ণ হয়৷
দমন ব্যবস্থা : (১) আমের বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছিন্ন রাখতে হবে৷ (২) ছত্রাকের গঠন ধংস করতে মাঝে মাঝে গাছে পানি সপ্রে করতে হবে৷ (৩) থিয়োভিট ০.৩ %হারে ফুল ফোটার পূর্বে এক বার ও পরে দুই বার সপ্রে করতে হবে৷ (৪) ম্যালাথিয়ন ০.২ % হারে ফুল ফোটার পর একবার ও গুটি আসার পর ১৫ দিন পর পর দুই বার সপ্রে করতে হবে৷

(ই) পোকামাকড় দমন :
আমের শোষক পোকা/ আমের হপার (গধহমড় যড়ঢ়ঢ়বত্‍)
এই পোকার তিনটি প্রজাতি ক্ষতি করে থাকে৷ নিম্ন্নে ক্ষতির প্রকৃতি ও দমন ব্যবস্থা দেয়া হল৷
ক্ষতির প্রকৃতি : আমের অনিষ্টকারী পোকার মধ্যে এ পোকা সব চেয়ে বেশী ক্ষতিসাধন করে থাকে৷ আমের পাতা ও বোটায় এরা ডিম পাড়ে৷ এজন্য আক্রান্ত পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায় এবং গুটি আসার পূর্বেই ফুল ঝরে যায়৷ এতে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়৷ এ পোকার আক্রমণের অন্যতম লক্ষণ হল, আক্রান্ত গাছের নীচে দিয়ে হাঁটলে পোকা লাফিয়ে গায়ে পড়ে৷

দমন ব্যবস্থা :
এ পোকা দমন করতে হলে মুকুল আসার আগে অথবা মুকুল আসার মূহুর্ত থেকে নিম্নলিখিত কীটনাশক সপ্রে করতে হবে : ডায়াজিনন ৬০ ইসি বা লেবাসিড ৫০ ইসি চা চামচের ৪ চামচ ৮.৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর দুই বার সপ্রে করতে হবে৷ অথবা ম্যালাথিয়ন বা এম.এস.টি ৫৭ ইসি উপরোক্ত মাত্রায় সপ্রে করতে হবে৷
ফলের মাছি বা আমের মাছি পোকা :
ক্ষতির প্রকৃতি :
এ পোকার কীড়া পাকা আমের মধ্যে প্রবেশ করে শাঁস খেয়ে ফেলে৷ এতে ফল পচে যায় ও ঝরে পড়ে৷ আক্রান্ত আম কাটলে অসংখ্য পোকা দেখা য়ায়৷ পোকার আক্রমণ বেশী হলে গাছের সমস্ত আম খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়৷

দমন ব্যবস্থা :
আম পাকার পূর্বে যখন পূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ডিপটেরেক্্র চা চামচের ৪ চামচ ৮.৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর দুই বার সপ্রে করতে হবে৷ অথবা ডায়াজিনন ৫০ ইসি ২মিলি/লিটার পানিতে মিশে ফলে সপ্রে করতে হবে ( উক্ত সময়ে ফল খাওয়া যাবে না)৷

আমের বিছা পোকা :
ক্ষতির প্রকৃতি :
এ পোকার কীড়া আম গাছের পাতা খেয়ে ফেলে৷ আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে গাছ পত্র শূন্য হয়ে যায় এবং ফুল-ফল হয় না বা হলেও ঝরে পড়ে৷ তবে কোন গাছ একবার আক্রান্ত হলে বার বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভনা থাকে৷
দমন ব্যবস্থা : আক্রান্ত গাছে ডাইমেক্রম ১০০ ইসি ৩০০ মিলি বা ডায়াজিনন ৫০ ইসি ৪০০ মিলি বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি ৪৫৪ মিলি ২২৫ লিটার পানিতে মিশে সপ্রে করতে হবে৷

লেখক : পি-এইচ.ডি গবেষক, রাবি৷
প্রভাষক, কৃষিশিক্ষা বিভাগ, নাটোর সিটি কলেজ, নাটোর
মোবাঃ ০১৭২২৪০৩২২০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *