আলকোরআন এর আলোকে বৃষ্টির কল্যাণ

ড. মো. আবু বকর*

মহান আল্লাহ তায়ালা সমগ্র সৃষ্টিলোকের ¯্রষ্টা ও ‘রব’ বা লালন পালনকারী। এ সৃষ্টিলোকের মধ্যে মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাশীল সৃষ্টি। মানুষ সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেন, “ওয়ালাক্কাদ র্কারামনা বনি আদামা” অর্থাৎ আমরা আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি। মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেই পৃথিবীতে ছেড়ে দেননি। একটা নিদৃষ্ট সময় সৃষ্টির প্রথম মানুষ আমাদের আদি পিতা আদম (আ:) এবং মা হাওয়া (আলাইহাস সালাম) কে বেহেশতে রাখা হয়েছিল। অত:পর যখন পৃথিবীতে প্রেরিত হলেন তখন পৃথিবীতে জীবন যাত্রা কত কঠিন ছিল তা উপলব্ধি করা তাদের জন্য সহজ হয়েছে। পৃথিবীর সেই সমস্যা সঙ্কুল জীবনে মানুষের দয়াল প্রভূ মহান আল্লাহ তায়ালা খর¯্রােত নদী কিংবা উত্তাল সমুদ্রে কান্ডারী বিহীন নৌকার মত মানুষকে একা ছেড়ে দেননি। বরং পদে পদে গাইড করেছেন ওহী প্রেরনের মাধ্যমে। তারই ধারাবাহিকতায় নাযিল হয়েছে আলকোরআন যা মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ওহী এবং যা নাযিল হয়েছে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মাদুর রাসুলল্লাহ (সাঃ) এর উপর। এতে মানব জীবনের সকল বর্ননা রয়েছে। এরশাদ, হচ্ছে “ওয়া নায্যাল্না আলাইকাল কিতাবা তিবয়ানাল্লি কুল্লি শাইয়ি্যুও ওয়াহুদাও ওয়ারাহমাতাও ওয়াবুশরা লিল্ মুসলিমীন” (সুরা আন নাহল: ৮৯)। অর্থাৎ (হে নবী) আমি এ কিতাব আপনার উপর নাযিল করেছি যাতে সকল বিষয়ের বর্ননা সন্বিবেশিত হয়েছে, যা হচ্ছে সঠিক পথ নির্দেশনা আর রহমত ও সুসংবাদ বহন করে ঐ লোকদের জন্য যারা আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে। এই হলো কোরান সম্পর্কে স্বয়ং কোরান নাযিল কারী মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভাষ্য। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই এ প্রত্যাশা করা যায় যে মানব জীবনের সকল চাহিদা ও প্রপ্তির বিষয়ের বর্ননা কোরআনে পাওয়া যাবে। মানুষের জীবন ধারনের জন্য কতগুলো মৌলিক ও প্রাকৃতিক বা সৃষ্টিগত উপাদান রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে বায়ু, পানি ও আগুন। মানুষের জীবনকে বাচিয়ে রাখতে তাপ দরকার হয়, তা আসে আগুন কিংবা সূর্যের আলো থেকে। মনে রাখা অবশ্যক যে সকল আগুনের মূল উৎস্য হলো সূর্য। মানুষ ও জীবনযুক্ত সকল প্রাণীর প্রাণকে বাচিয়ে রাখতে প্রয়োজন (ঙীুমবহ) অক্সিজেন, যা মিশে আছে বাতাসের সাথে। আর পানির উৎস হলো সমুদ্র নদীনালা খাল বিল ও বৃষ্টির পানি। কিভাবে মহান আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিলোকের জন্য পানিকে “পানি চক্রের” মাধ্যমে চলমান রেখেছেন এ কলামে আমরা ইতোপূর্বে তা আলোচনা করেছি। পানি চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বৃষ্টিপাত। কোরআনুল কারীমে বৃষ্টিপাত কেন হয় কিভাবে হয়, তার বিভিন্ন প্রকার উপকারিতাও ক্ষেত্র বিশেষে অপকারিতার বিষয়ে আলোচিত হয়েছে। বক্ষমান লিখাটিতে আমরা কোরানে বর্নিত বৃষ্টি পাতের কল্যান বিষয়ে যৎকিনচিৎ আলোচনায় প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ্।

মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনুল কারীমের সুরা আন্ নাহল এ এরশাদ করেন, “হুয়াল্লাজী আঞ্জালা মিনাস্ সামায়ি মা আল্লাকুম মিনহু শারাবুও ওয়ামিন্হু শাজারুন ফীহিতুছীমূন। ইয়ূম্বিতু লাকুম বিহিয্ যার’য়া ওয়ায্ যাইতুনা ওয়ান্ নাখ্ীলা ওয়াল আ’নাবা ওয়ামিন কুল্লিস্ সামারাত, ইন্যাফী জালিকা লা আয়াতাল্লি কাওমিই ইয়াতা ফাক্কারুন (সুরা আন নাহল ১০-১১)। অর্থাৎ (সেই মহান আল্লাহ) যিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে বৃষ্টির আকারে পানি বর্ষন করেন, যা পান করে তোমরা নিজেরা পরিতৃপ্ত হও এবং যার সাহায্য তোমাদের পশুদের জন্যও খাদ্য উৎপন্ন হয়। এ পানির সাহায্যে তিনি (মহান আল্লাহ) শস্য উৎপন্ন করেন এবং জয়তুন, খেজুর, আংগুর এবং নানাবিধ ফল জন্মান। নিশ্চয়ই এ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে চিন্তাশীলগনের জন্য বিশেষ চিন্তা ও গবেষনার নিদর্শন রয়েছে।

সুরা আন নাহল থেকে উদৃত দুইটি আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য পাঁচটি কল্যান এর কথা উল্লেখ করেছেন। বৃষ্টি পাতের মাধ্যমে মানুষ যে পাঁচটি কল্যান লাভ করে থাকে তার প্রথমটি হচ্ছে (১) পান করার যোগ্য পানির সংস্থান হয়। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট এ পৃথিবীতে পানির কোন অভাব নাই। পুকুর, দিঘী, নদীনালা, খাল-বিল হাওর-বাওর, ঝর্ণা, হ্রদ সাগর-মহাসাগর, সর্বত্রই পানি আর পানি। তবে সবচেয়ে বেশি পানি যেই সাগর মহাসাগর গুলোতে তা পান করাতো দুরে থাক মোটেই ব্যবহার উপযোগী নয়। কারন সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় রয়েছে প্রচুর ধাতব লবন। ফলে তা হয়ে আছে লোনা ও বিষাক্ত। কাজেই বিরাট বিরাট সমুদ্রে অথৈ জলরাশি থাকার পরেও পান করার পানির খুবই শংকট। শ্রীলংকার দক্ষিনে অবস্থিত অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ নাম তার “মালদ্বীপ” এই দেশটি সমুদ্র বেষ্টিত হওয়ার কারনে এতে কোন মিঠা পানির উৎস্য নেই সব হলো লোনা পানি। পান করার পানি কিনে নিতে হয় যা খুবই চড়াদামে পাওয়া। তবে দেশটিতে যথেষ্ট বৃষ্টিপাত হওয়ার কারনে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি পানীয় পানি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেকটি ইমারতের উপরেই বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। এতে যতটুকু সংস্থান করা যায় তার বাকীটুকু অন্যদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। অথবা যান্ত্রিক উপায়ে বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করতে হয় যা অতীব ব্যয়বহুল। এটি হল এমন উদাহরন যেখানে চারিদিকে প্রচুর পানি কিন্তু তাসত্বেও ব্যবহারের কিংবা পানীয় জলের বড়ই অভাব। অন্যদিকে রয়েছে এমন দেশ যেখানে কোন পানিই নেই। হাজার বর্গকিলোমিটার এরিয়া ধূধূ বালুচর। অথবা পানি পাওয়ার প্রাকৃতিক বা খোদা প্রদত্ত কোন উৎস নেই। বহুদুর দুড়ান্ত থেকে নদীর পানি পাইপের মাধ্যমে এনে উচ্চ মূল্যে শোধন করে পানযোগ্য পানির সংস্থান করতে হয়। আফ্রিকা মহাদেশে এরূপ অনেক ছোট ছোট দেশ আছে যাদের আহার এবং পানি জোটানো তাদের জন্য বড়ই কঠিন ব্যাপার। সেখানে বৃষ্টি হয় কদাচিৎ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষনে কোন সিন্টেম চালু নেই। এমতাবস্থায় যদি কখনও হঠাৎ করেই বৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে ঐ এলাকার অধিবাসীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। অতএব বুঝা গেলো যে আল্লাহ্র নেয়ামত বৃষ্টি মানুষের মধ্যে পান করার পানির সংস্থান করার মাধ্যমে অপরিসীম কল্যান সাধন করে থাকে।

বৃষ্টির কারনে মানুষের দ্বিতীয় যে কল্যান সাধিত হয় তা হচ্ছে এই যে (২) বৃষ্টি শস্য উৎপাদনে সহায়তা করে। শস্য হিসাবে যাদের নাম জানা যায় তার সবই হচ্ছে জীবন্ত। এমন কোন শস্যের নাম জানা যাবেনা যার জীবন নেই। তবে শস্যের ক্ষেত্রে জীবনের দুইটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ আছে। একটি হলো তার শারীরীক রূপ এবং আরেকটি হলো তার আত্মীক রূপ। শারীরীক রূপ হচ্ছে অস্থায়ী আর আত্মীক রূপ হচ্ছে স্থায়ী। আমরা যদি মানুষের ক্ষেত্রে জীবন বিষয়ে চিন্তা করি তাহলেও অনুরূপ অবস্থা পাব। মানুষের সৃষ্টি হয় মায়ের ঔরশে একটি শুক্রানু ও একটি ডিম্বানুর সম্মিলনে। অত:পর একটি নিদৃষ্ট সময়ে এসে মহান ¯্রষ্টা সেখানে ‘রূহ’ বা আত্মার সংমিশ্রন ঘটান। এর পর দেহ বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্য্যায় পার হয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি মানব শিশু পৃথিবীতে আসে। তার ওজন হয় অল্প কয়েক কেজি অর্থাৎ সাধারনভাবে দুই থেকে পাঁচ কেজি। এখন থেকে মানুষ তার দৈহিক বৃদ্ধির পর্য্যায়টি দেখতে পায়। ছোট্ট একটি শিশু থেকে পর্য্যায়ক্রমে সে রূপান্তরিত হয় কিশোরে, কিশোর থেকে যুবক অত:পর সে হয় এক জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক ধারায় বংশগতি রেখে এক সময় সে মারা যায়। অর্থাৎ তার দেহ থেকে জীবন বা আত্মাটি পৃথক হয়ে যায়। তবে এ আত্মাটি মানুষের দেহ থেকে পৃথক হলেই এর পরিসমাপ্তি ঘটে এমনটি কিন্তু নয়। বরং দেহ থেকে পৃথক হয়ে চলে যায় তার নির্ধারিত সংরক্ষন স্থান “ইল্লিন” অথবা “সিজ্জিন” এ। মহান আল্লাহ তায়ালাই হলেন সকল আত্মার ¯্রষ্ঠা, লালন পালনকারী ও সংরক্ষনকারী। তিনি যেমনিভাবে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তেমনিভাবে বারবার সৃষ্টি করতে সক্ষম। কোরানে হাকীমে মহান আল্লাহর সৃষ্টি ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে এ ভাবে “আওয়ালাম ইয়া-রাল ইন্সানু আন্না খালাক্বনাহু মিন্নুৎফাতিন ফাইজা হুয়া খাছিমুম্ মুবীন। ওয়া ধোয়ারাবালনা মাছালাও ওয়ানাসিয়া খালকাহু, ক্বালা মাই ইয়ূহ্য়িল ইজামা ওয়াহিয়া রামীম। কুল ইয়ূহ্য়িহাল্লাজি আন্শাহা আওয়্যালা র্মারা ওয়াহুয়া বিকুল্লি খালকিন আলীম”। (সূরা ইয়াসীন: ৭৭-৭৯) অর্থাৎ এ মানুষগুলো কি দেখেনা, আমি তাদেরকে একটি (অতিক্ষুদ্র) শুক্রানু থেকে পয়দা করেছি, অথচ (ক্ষুদ্র শুক্রানু থেকে সৃষ্ট) সে (মানুষটিই আমার সৃষ্টির ব্যাপারে) খোলাখুলি বিতন্ডাকারী হয়ে উঠলো। সে আমার (সৃষ্টি ক্ষমতা) সম্পর্কে (নানা) কথা রচনা (করতে শুরু) করলো (এবং এক সময়) সে (লোকটি) তার নিজ সৃষ্টি কৌশলই ভুলে গেলো। সে বললো, কে (মানুষের এ) হাড় পুনরায় জীবিত করবে যখন তা পঁচে গলে যাবে। (হে নবী) আপনি (এদেরকে) বলেদিন হাঁ তাতে প্রান সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি প্রথম বার সৃষ্টি করে ছিলেন এবং তিনি সমস্ত কিছুর সৃষ্টি কৌশল সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। সৃষ্টি ও পুন:সৃষ্টি সম্পর্কে উপরোক্ত ভাষ্য প্রদান করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। এ থেকে এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, সৃষ্টির সকল প্রক্রিয়া ও কৌশল তারই করাত্ত্ব। তিনি যেমনি পারেন কোন কিছু থেকে কোন কিছু সৃষ্টি করতে, তেমনি সক্ষম কোন কিছু ছাড়াই কিছু সৃষ্টি করতে। তিনি এ অবস্থাটি নির্দেশ করেছেন এ ভাবে, “ইন্নামা আমরুহু ইজা আড়াদা শাইয়্যান আই্ ইয়্যাক্কুলা লাহু কুন্ ফাইয়াকুন,” (ইয়া-সীন: ৮২)। অর্থাৎ তিনি যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেন তখন তিনি কেবল এটুকই বলেন ‘হও’-অত:পর তা সাথে সাথে (তৈরি) হয়ে যায়। কাজেই এ বিষয়টি সূস্পভাবেই ধরে নেয়া-কিংবা বুঝে নেয়া যায় যে মানুষের আত্মা থেকে পূর্নবার মানুষ সৃষ্টি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যেখানে মহান আল্লাহ কোন কিছু ছাড়াই কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম বলে উম্মুক্ত ঘোষনা প্রদান করেছেন। অত:পর আমরা শস্যের ক্ষেত্রে জীবনের বিভিন্নতার বিষয়ে আলোকপাত করার প্রচেষ্টা গ্রহন করবো ইনশাআল্লাহ। (চলবে)

————————————– *লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *