আল কোরানের আলোকে সমবায় ও পারস্পরিক সহযোগীতা

ড. মোঃ আবু বকর*

পূর্ব প্রকাশের পর

কোরানে বর্ণিত সমবায় ও পারস্পরিক সহযোগিতার মূলনীতি অনুযায়ী যদি কোন সমবায় সমিতি গঠিত হয় এবং এই গাইডলাইন অনুযায়ী তার কার্যক্রম পরিচালিত  হয় তা হলে এ ধরণের সমবায়ের সাফল্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সকলেই প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবে। এরূপ সমিতির ঐক্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। এ জাতীয় উদ্যোগের সাফল্যের জন্য ঐক্যের তাকিদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন “ওয়াতাসিমু বিহাবলিল্লাহি জ্বামীআও ওয়ালা আফাররাকু ওয়ায কুরু নে’মাতাল্লাহি আ’লাইকুম ইয্কুন্তুম্ আ’দাআন্ ফা আল্লাফা বাইনা ক্কুলুবিকুম ফাআস্বাহ্তুম্ বিনি’মাতিহী ইখ্ওয়ানা, ওয়াকুন্তুম্ আ’লা শাফাহুফ্রাতিম্ মিনান্নারী ফআন্ কাজাকুম্ মিনহা, কাযালিকা ইয়ূবায়্যিনুল্লাহু লাকুম আয়াতিহি লা’আল্লাকুম তাহ্তাদূন। (সুরা আলে ইমরান: আয়াত- ১০৩)। অর্থাৎ আর তোমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেওনা এবং স্মরণ কর আল্লাহর সে অনুগ্রহের কথা যা তোমাদের উপর রয়েছে, তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্র“, আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের হৃদয়ে মহববত সৃষ্টি করেন। ফলে তাঁরই অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের কিনারে, আল্লাহ তা’য়ালা তা থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেন। এভাবেই আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের জন্য স্বীয় নিদর্শন সমূহ বর্ণনা করে থাকেন যেন তোমরা সঠিক পথ নির্দেশনা পেতে পার।

কোরানে হাকীমের উক্ত আয়াতে তদানীন্তন সমাজের গোত্রে গোত্রে হানাহানি থেকে আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়ার ফলে সামাজিক শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইঙ্গিত ই প্রদান করা হয়েছে। এ আয়াতে যে সকল নির্দেশনার প্রতি ইশারা করা হয়েছে তার প্রথমটি হচ্ছে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করা অর্থাৎ সকল কার্যক্রমের মূলনীতি হিসাবে আল্লাহর নির্দেশকে মেনে নেয়া। দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে তা হচ্ছে ঐক্য বজায় রাখা, যে কোন কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যেমনি সকল সদস্যের সম্মিলিত মতামত প্রয়োজন তেমনি গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সম্মিলিত ও একীভূত প্রয়াস চালু রাখার প্রতিও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তৃতীয় যে বিষয়ের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে তা হল কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী সকল সদস্যগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বোধ, শত্র“তা নয় সহযোগীতা ও সহমর্মিতা ও পরস্পরের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা বোধ এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের বড় সহযোগী শক্তি হিসাবে কাজ করবে। চতুর্থ যে বিষয়টি সার্বক্ষণিক অন্তরে জাগরুক রাখতে হবে তা হলো আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তির আশা। যে বিষয়টির জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে তা যদি আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনা ও মৌলনীতির আলোকে হয়ে থাকে তাহলে সে কার্যক্রম বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই থাকবে এ আশা সর্বক্ষণ অন্তরে জাগরুক থাকতে হবে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের বিপরীত কোন নীতি গ্রহণ অত্যন্ত বিপদ সঙ্কুল এবং এটাকে প্রজ্জলিত অগ্নিকুণ্ডের কিনারায় অবস্থানের সাথে তুলনা করা হয়েছে। জীবন থাকা অবস্থায় হয়তো বা উক্ত অগ্নিকুণ্ড দৃশ্যমান হচ্ছেনা কিন্তু মৃত্যু যবনিকা পার হওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহর বিধান লংঘণকারী প্রজ্জলমান অগ্নিকুণ্ড দর্শন করবে। যারা আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ পূর্বক সে অনুযায়ী জীবন যাপন করবে তাঁরাই কেবল এ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পাবে। কাজেই সে মর্মণ্ডুদ শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য বুদ্ধিমান ও জ্ঞানবানদেরকে আল্লাহর আয়াতের অনুসরণই হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্ত।

পরস্পর সহযোগীতার নীতি বা সমবায়ের নীতি অনুসরণ জনসাধারণ বিশেষত: দরিদ্র ও অত্যাচারিতদের স্বার্থ রক্ষার অন্যতম প্রধান পন্থা। সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া জাগতিক কিংবা পারলৌকিক কোন ক্ষেত্রেই উন্নতি লাভ করা যায় না। অন্ধকার যুগে অর্থাৎ শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) শৈশবকালে আরবের জাহেলী সমাজের লোকেরা ব্যক্তি স্বার্থের লোভে পড়ে সমাজ জীবনে এক শোচনীয় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। তাদের মধ্যে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে স্বার্থের সংঘাতের কারণে ভ্রাতৃত্বের মনোভাব লোপ পেয়েছিল। তারা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে সমাজ জীবনে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। আল্লাহর নির্দেশিত ও রসুল মোহাম্মদ (সাঃ) এর প্রদর্শিত কোরানী নীতি ও শিক্ষার উপর ভিত্তি করে একটি সুস্থ সুন্দর সামাজিক ও জাতীয় জীবন গড়ে উঠে। আজকের যুগে মুসলমানেরা ইসলামের সেই শিক্ষাকে ভুলে যেতে বসেছে। ফলে তাদের জীবনে নেমে এসেছে নির্যাতনের স্টীম রোলার, সমাজের সবলদের দ্বারা চলছে দুর্বলের শোষণ ও নির্যাতন, ব্যক্তি স্বার্থের দিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সামগ্রিক ও সামাজিক স্বার্থ জলাঞ্জলী দেয়া হচ্ছে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে হিংসা ও জিঘাংসার ফলে নেমে এসেছে নারকীয় দুরাচার। নির্যাতিত মানবতা আজ চিৎকার করে বলছে হে আমাদের প্রভু যালেম অধ্যূষিত জনপদ থেকে আমাদের উদ্বার কর। আমাদের জন্য সাহায্যকারী পাঠাও। কিন্তু মুমিনদের কার্যক্রম যদি ইসলামের মৌলনীতির বিপরীত ভাবে ঘটতে থাকে তা হলে সে সাহায্য আসবে কিভাবে? আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে আল্লাহর নির্দেশিত পথে এগুতে হবে। এজন্যই তো আল্লাহ তায়ালা কোরানে হাকীমে বলেন, “ওয়াল্লাজীনাস্তাযাবূ লিরাব্বিহিম ওয়া আক্বামুস সালাতা, ওয়া আমরুহুম সুরা বাইনাহুম ওয়া মিন্না রাযাক্বনাহুম ইয়ুণ ফিকূন।  ওয়াল্লাজীনা ইজা আসাবাহুমুল বাগইয়ূ হুম ইয়ানতাসিরুন। ওয়া যায্যা’য়ূ সাইয়্যে আতিন সাইয়ো আতুম মিছলুহা, ফামান আ’ফা ওয়া আস­াহা ফা আযরুহু আ’লাল্লাহ, ইন্যাহু লাইয়ূ হিবুয্ যোয়ালিমীন। ওয়া মানিন্ তাছোয়ারা বা’দা যোলমিহী ফাউলায়িকা মা আ’লাইহীম মিন্ ছাবীল ইন্নামাস সাবীলু আ’লাল্লাজীনা ইয়াযলিমুনান্নাসা ওয়া ইয়াবঘুনা ফিল আরদ্ধি বিগাইরিল হাক্কি, উলায়িকা লাহুম আ’যাবুন আলীম (সুরা আশশুয়ারা-৩৮-৪২)। অর্থাৎ আর যারা তাদের রবের নির্দেশে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে পারস্পরিক কর্ম সম্পাদন করে এবং যে রিজিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। এবং যারা নির্যাতিত হলে সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করে কারণ মন্দ কাজের প্রতিফল মন্দই হয়ে থাকে, তবে যে ক্ষমা করে দেয় এবং এসলাহ্ বা আপোষ মীমাংসা করে দেয় তার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিফল ও পুরষ্কার রয়েছে। নিশ্চয় তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।  তবে নির্যাতিত হওয়ার পর সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করা হলেও তার জন্য দোষের কিছু নেই। তবে অবশ্যই অভিযোগের বিষয় রয়েছে তাদের প্রতি যারা নিরীহ মানুষের প্রতি অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে বেপরোয়াভাবে (আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঙ্গন করে) কেবল বিদ্রোহ করে বেড়ায়, এরূপ লোকদের জন্যই রয়েছে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

এ নির্দেশের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে একদিকে তাঁর নির্দেশ মেনে চলতে আদেশ করেছেন অন্য দিকে তাদের সামগ্রিক কার্যক্রমে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকেও উদ্বুদ্ধ করেছেন। ফলে তাদের মধ্যে ঐক্যের মনোভাব গড়ে উঠবে। আর এ ঐক্যই তাদেরকে খোদা দ্রোহী শক্তির নির্যাতন থেকে রক্ষা করবে। ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে মুমিনগণ যখন অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে তখনও যেন তারা বাড়াবাড়ী না করে (ক্রোধের আতিশয্যে তারা যেন যালেমদের তাদের কৃত অত্যাচারের তুলনায় অধিক শাস্তি প্রদান না করে সে দিকে সর্তক সৃষ্টি রাখার নির্দেশনা দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, নির্যাতিত (ব্যক্তি দল বা জাতি) নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে ততটুকুই প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবে ঠিক যতটুকু নির্যাতিত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ক্ষমার নীতি অনুসরণের উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কারণ ক্ষমাই মহত্তের দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম। আর ক্ষমাই মানব সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে ঐক্যের সুত্রে আবদ্ধ হয়ে সকল প্রকার যুলুম এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে শান্তির সমাজ কায়েমের জন্য যথাযথ ভূমিকা পালনের তৌফিক দান করুন।

————————————-

*লেখকঃ

চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত),

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare