আল কোরানের আলোকে সমবায় ও পারস্পরিক সহযোগীতা

ড. মোঃ আবু বকর*

পূণঃ প্রকাশ

মানুষ জন্মগতভাবেই পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। কারণ মানুষের সৃষ্টি একজন নর এবং একজন নারী থেকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে উল্লেখ করেন, “ইয়া আয়ি্যূহান্নাসু ইন্না খালাক্বানাকুম মিন যাকারীন ওয়া ঊনছা ওয়াযা’য়ালনা কুম শু’উবাঁও ওয়াক্বাবায়ীলা লিতা’রাফু; ইন্না আকরামাকুম ইন্দাল্লাহি আত্কা কুম (সুরা আল হুজুরাত আয়াত-১৩) অর্থাৎ হে মানুষ তোমাদেরকে একজন পুরুষ একজন স্ত্রীলোক থেকে পয়দা করেছি অত:পর তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও কবীলায় বিভক্ত করা হয়েছে তোমাদের পরস্পরের পরিচিতির জন্য। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক মর্যাদাশীল ঐ ব্যক্তি যিনি তোমাদের মধ্যে অধিক আল্লাহকে ভয় করেন। মানুষের সঠিক পরিচয় জানাতে গিয়ে পবিত্র কোরানের অন্যত্র আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে বলেন, “ইয়া আইয়্যুহান্নাসুত্তাকূ রব্বা কুমুল্লাজি খালাক্বাকুম মিন নাফসিও ওয়াহিদাতিন ওয়াখালাকা মিনহা যাওজাহা ওয়াবাচ্ছা মিনহুমা রিজালান কাছীরাও ওয়া নিসাআ ওয়াত্তাকুল্লাযী তাসাআলুনাবিহী ওয়াল আরহাম। ইন্নাল্লাহা কানা আ’লাইকুম রাক্বীবা (সুরা আন নিসা আয়াত-১) অর্থাৎ হে মানুষ তোমরা ভয় কর তোমাদের রবকে যিনি তোমাদেরকে পয়দা করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং যিনি পয়দা করেছেন সেই ব্যক্তি থেকে তার জোড়া এবং ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দু’জন থেকে অনেক নর ও নারী। আর তোমরা ভয় কর আল্লাহকে যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে ছওয়াল করে থাক। আর সাবধান! তোমাদের জ্ঞাতিদের বিষয়ে সতর্ক থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর বিষয়টি মানুষকে সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “ওয়াহুয়াল্লাজী আনশা’য়া কুম মিন নাফসিও ওয়াহিদাহ ফামুস্তাক্বাররু ওয়া মুস্তাওদাও (সুরা আল আন আম আয়াত-১) অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে একই প্রাণ হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং প্রত্যেকের জন্যই থাকিবার স্থান ও সমাধি নির্দিষ্ট হইয়া আছে।

পরম স্রষ্টা ও কুশলী আল্লাহ তা’য়ালার ঘোষণা অনুযায়ী সকল মানুষের সৃষ্টি একই উৎস থেকে উৎসারিত। এর ফলে মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল, রহমদিল সহযোগিতা ও সহমর্মীতাপূর্ণ। কিন্তু খোদার পৃথিবীতে তার সৃষ্ট কোন অর্বাচীন মানুষ তার নির্দেশের প্রতি কখনও কখনও বিদ্রোহী হয়েছে এবং সহানুভূতি ও সহমর্মীতার পরিবর্তে গোত্রে গোত্রে বিদ্ধেষের আগুন প্রজ্জলিত করেছে। পৃথিবীর ইতিহাস এমনি ধরনের কিছু বিদ্রোহীর নাম রেকর্ড করেছে আর এদের একজন হচ্ছে ফিরআউন। নবী মুসা (সাঃ) এর জমানায় ফিরআউন ছিল এক পরাক্রমশালী খোদাদ্রোহী শাসক। সে নবী মুসা (আঃ) কে তার শক্তি সম্পদ ও সম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দী মনে করেছে এবং চরম স্বেচ্ছাচারিতা করে নিজের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বজায় রাখার সার্বিক প্রয়াস চালিয়েছে। ক্ষমতার মদমত্ততায় অহংকারী হয়ে নিজেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ঘোষণা করে স্রষ্টার কর্তৃত্বকেই অস্বীকার করেছে এবং ক্ষমতা পাকা পোক্ত রাখার জন্য বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিদ্ধেষ ছড়িয়েছে, এ সম্পর্কে পবিত্র কোরানে উদ্ধৃত হয়েছে “ইন্না ফিরআউনা আ’লা ফিল আরদ্বে ওয়া যা’য়ালা আহলাহা শিয়া’আন (সুরা আল কাছাছ আয়াত নং ৪)। অর্থাৎ ফিরআউন পৃথিবীতে অহংকার ও গর্ব করিয়াছে এবং উহার অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত করিয়াছে। ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রমাণিত যে ফিরআউন মিশরের অন্তরগত কিবতী ও অকিবতীর প্রতি পার্থক্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উভয়ের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কর্মনীতির প্রবর্তন করেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ফিরআউনের বিভেদ নীতির অন্তরালে দুর্বলের প্রতি নির্যাতন তার ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করতে পারেনি। কারণ এ নীতি মানুষের স্বাভাবিক নীতির পরিপন্থী। মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ এ নীতি ইসলাম অনুমোদন করেনা। মানুষের জন্য ইসলামের সকল নীতি পারস্পরিক মমতা, সম্মান, সহমর্মীতা ও সহযোগীতার উপর প্রতিষ্ঠিত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় মানুষের জন্য আল্লাহ তা’য়ালার নির্ধারিত ফরজ কাজ হচ্ছে ছালাত বা নামাজ। নামাজ আদায় করতে বলেননি বরং বলেছেন কায়েম করতে। কোরানে হাকীমের বহু জায়গায় আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন “আকীমুস্ সালাত ওয়াআতুয্যাকাত” অর্থাৎ সালাত কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর। সালাত কায়েমের পদ্ধতি হিসাবে নির্দেশ হয়েছে “ওয়ারকাউ মা’আর রাকিয়ীন” অর্থাৎ রুকুকারীগণের সাথে একত্রিত হয়ে রুকু কর। এ থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে আল কোরানে ঘোষিত মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিধান পারস্পরিক সহযোগীতারই নির্দেশনা প্রদান করে, কোন ব্যক্তি কেন্দ্রীক ধারণা থেকে এ বিধনাবলী সম্পূর্ন মুক্ত। আল্লাহ প্রদত্ত এবং রসুল (সাঃ) প্রদর্শিত বিধান ও নির্দেশাবলী কেবল মাত্র মানুষের কল্যাণই করে থাকে। পক্ষান্তরে এর বিপরীত বা মানুষের স্বেচ্ছাচারী বিধান সামগ্রীকভাবে মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। আল্লাহর বিধান মানার ক্ষেত্রে অর্থাৎ কল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগীতা প্রদানের বিষয়ে আল কোরানে নির্দেশনা রয়েছে। বলা হয়েছে, তা’য়াওয়ানু আ’লাল বিররে ওয়াত্তাক্বোয়া ওয়ালা তা’য়াওয়ানু আ’লাল ইছমে ওয়াল উ’ধ্ওয়ান ওয়াত্তাকুল্লাহ (সুরা আল মায়েদা; আয়াত-২)। অর্থাৎ তোমরা নেক ও কল্যাণমুলক কাজে পরস্পরকে সহযোগীতা করবে কিন্তু পাপ বিশৃঙ্খলা ও সীমা লংঘনমূলক কাজে একে অন্যকে সাহায্য করবেনা বরং সার্বক্ষনিকভাবেই আল্লাহকে ভয় করে চলবে। আলোচ্য আয়াতে শুভ ও কল্যাণমূলক কার্য সম্পাদনে পারস্পরিক সহযোগীতা প্রদানের নির্দেশনার পাশাপাশি অকল্যাণ বিশৃঙ্খলা ও আল্লাহ নির্দেশের অন্যথা হয় এমন কাজে সহযোগীতা না কারার ও নির্দেশনা দিয়ে মানুষকে একদিকে কল্যান সাধনের উৎসাহ ও অন্যদিকে অকল্যাণ ও খোদার নির্দেশের বিপরীত কাজে সহযোগীতা না করার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।

বাংলাদেশ একটি অধিক জনসংখ্যা অধ্যূষিত জনবহুল দেশ। এদেশের কৃষি জমি খন্ড খন্ডে বিভক্ত হওয়ার কারণে পারস্পরিক সহযোগীতা ব্যতিত কৃষি উৎপাদন কার্য্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন সময়ে কৃষিতে সমবায় পদ্ধতি প্রচলনের চেষ্টা করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি পূর্ন সফলতা না পেলেও অধিকাংশ উদ্যোগ সফল হয়েছে। মরহুম আকতার হামিদ খান প্রবর্তিত কুমিল্লা সমবায় পদ্ধতি সফলতার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যে সকল ক্ষেত্রে সমবায় উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে তার প্রধান কারণ হল কোন কোন সদস্যের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার ও নিজের মতকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। কিংবা ভিন্নমত হওয়ার ফলে বিভিন্ন গ্র“পে বিভক্ত হয়ে যাওয়া। কিন্তু আল কোরানের নির্দেশনা অনুযায়ী সমবায়ের মূলনীতি হতে হবে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে পরামর্শ ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত তথাকথিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যা সাধারণত অধিকাংশ সদস্যের মতামতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে তা কার্যকরী নয়। বরং সিদ্ধান্ত হতে হবে সকল সদস্যের ঐক্যমতের ভিত্তিতে। দলনেতাকে সকল সদস্যের মতামত গ্রহণের তাকিদ দিয়ে কোরানে পাকে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ফাবিমা রাহমাতিম মিনাল্লাহি লিনতালাহুম, ওয়ালাত্ত কুনতা ফায্যান গালীযাল ক্বালবি লান ফাদ্দু মিন হাওলিক, ফা’ফু আনহুম ওয়াসতাগফির লাহুম, ওয়াশাবির হুম ফিল আমরি, ফাইজা আযামতা ফাতাওক্কাল আ’লাল্লাহ, ইন্নাল্লাহা ইয়ূহিববুল মুতাওয়াক্কিলীন (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৫৯)। অর্থাৎ আর আপনার প্রতি আল্লাহ পাকের রহমত থাকার দরুন আপনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র চিত্ত ও কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। কিন্তু আপনি যদি কঠোর হৃদয় ও কর্কশ স্বভাবের হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং আপনি তাদের মাফ করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন আর কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। আর যখন কোন সংকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর উপর ভরসাকারীগণকেই পছন্দ করেন। কোরানে হাকীমের উদ্বৃত আয়াতে সমবায় কিংবা সামগ্রীকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কোন সংস্থার নেতার গুনাবলী ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের মূলনীতি আলোচিত হয়েছে। প্রথমত: নেতাকে হতে হবে খোদাভীরু, তার সাথী বা অন্য সদস্যগনের প্রতি দয়ার্দ্র চিত্ত, কোমল স্বভাব ও মনের অধিকারী, সদস্য গনের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ব্যবহারে বিনয়ী। খোদা ভীরু এবং উল্লিখিত চারিত্রিক গুনাবলী সম্পন্ন লোক যখন কোন নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয় তখন লোকেরা তার উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারণে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার প্রতি সার্বিক সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সকল প্রকার কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগীতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে এবং নি:সঙ্কোচে মনোভাব ও মতামত ব্যক্ত করে। এর ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। পক্ষান্তরে নেতা যদি কর্কস স্বভাবের উগ্রমেজাজী স্বেচ্ছাচারী ও সদস্য ও সংগী সাথীদের প্রতি আস্থাহীন হয় তা হলে তার আওতাভূক্ত সংঙ্গীদের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগীতা পায়না। কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বত:স্ফূর্থ মতামত প্রদান করেনা। সর্বাবস্থায় এক অস্থাহীনতা ও সন্দেহের আবর্তে ঘোরপাক খাইতে থাকে। নেতা ও অধীনস্থগণের মধ্যে সদ্ভাব ও হৃদ্যতা থাকেনা। সর্বোপরি নেতা যদি খোদাভীরু না হয় তার প্রতি আল্লাহ পাকের রহমত ও সাহায্য থাকে না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যেমনি জটিলতার সৃষ্টি হয় তেমনি তা বাস্তবায়নেও সমূহ সমস্যার মূখোমূখী হতে হয়। আল্লাহর আনূগত্যহীন কোন নেতা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আল্লাহর উপর ভরসা করেনা। ফলে তা বস্তবায়নে আল্লাহর সাহায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

(চলবে)

————————————–

*লেখকঃ প্রাক্তন চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও

প্রকল্প পরিচালক, বারী, (অবসর প্রাপ্ত) বাংলাদেশ

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *