আল কোরানে ফলের আলোচনা

ড. মো: আবু বকর*

 

জীবন ধারণ করার জন্য মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন। এ খাদ্যে রয়েছে অনেক প্রকারের উপাদান, যা মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু মানুষের খাদ্য হিসাবে যে সকল দ্রব্যাদী নির্ধারিত হয়েছে তার সবগুলোতে সব উপাদান বিদ্যমান থাকেনা। তাই সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজনে মানুষকে বিভিন্ন প্রকার খাদ্যের সন্ধান করতে হয়। ফল মানুষের জন্য একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য। মানুষের খাদ্যে যে সকল উপাদন প্রয়োজন প্রায় সবগুলোই বিভিন্ন প্রকার ফল থেকে পাওয়া যায়। এরই ফলে মানুষ ফলফলাদীকে উৎকৃষ্ট খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেছে অনাদীকাল থেকে। মানুষ কেবল মাত্র ফল খেয়েই সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। ফলে যেমন রয়েছে ভিটামিন, খনিজ, শর্করা, পানি তেমনি বিভিন্ন ফলে রয়েছে ¯েœহ জাতীয় উপাদান। আমিষের চাহিদাও ফল থেকে পূরণ হয়ে থাকে। কাজেই এ ফল আদিকাল থেকেই মানুষের খাদ্য তালিকায় উল্লেখ্যযোগ্য স্থান দখল করে আছে। মহান আল্লাহ মানুষের ¯্রষ্টা এবং লালন-পালনকারী “রবৃ। তিনিই মানুষের জন্য খাদ্য পানীয়ও বাহন বাসস্থান এর প্রয়োজন পূরণকারী। তিনিই মানুষের সকল অভাব অভিযোগ শ্রবণকারী এবং সকল প্রয়োজন পূরণে সক্ষম। অন্য কোন সত্ত্বাই এ ক্ষমতার অধিকারী নন। কাজেই মানুষের খাদ্যের সংস্থান কিভাবে হবে তা সে মহান সত্ত্বারই করতলগত। তারই নিদর্শন তিনি পেশ করেছেন কোরআনুল কারীমের বিভিন্ন সুরা ও আয়াতের বনর্ণার মাধ্যমে। এরশাদ হয়েছে, “আল্লাজী যায়া’লা লাকুমুল আরদ্বা ফিরাশাও ওয়াস সামাআ বিনাআ, ওয়া আঞ্জালা লাকুম মিনাস সামায়ি মা আন ফাআখ্রাজা বিহী মিনাস্ ছামারাতি রিজকাল্ লাকুম ফালা তাজআ’লূ লিল্লাহি আন্দাদাও ওয়াআনতুম তা’লামূন “(সুরা বাকারা, আয়াত: ২২)”। অর্থাৎ তিনিই সেই মহান সত্ত্বা যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য শয্যা বানালেন, আসমানকে বানালেন ছাদ এবং আসমান থেকে (বৃষ্টির আকারে) পানি বর্ষন করে তার সাহায্যে নানাহ ফলমূল উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করলেন, অত:পর তোমরা জেনে বুঝে (এ সব কাজে) অন্য কাউকে আল্লাহর সমতুল্য সাব্যস্থ করোনা। অনুরূপভাবে সুরা ইয়াসীনে বলা হয়েছে এভাবে, “ওয়া আয়াতুল্ লাহুমূল আরদ্ধুল মাইতান আহ্ ইয়াইনাহা ওয়া আখরায্না ফীহা মিনাল য়ূ’ইউন। লিয়া কুলূ মিন্ ছামারিহী ওয়ামা আ’মিলাত্হু আইদীহিম, আফালা ইয়াশকুরুন (সুরা ইয়াসীন, আয়াত: ৩৩-৩৫)”। অর্থাৎ এই লোকদের জন্য নিম্প্রাণ যমীন একটি নিদর্শন বিশেষ। আমরা তাকে জীবন দান করেছি, তা হতে ফসল বের করেছি, যা তারা খেয়ে থাকে। আমরা উহাতে খেজুর ও আংগুরের বাগান বানিয়েছি, উহার মধ্য হতে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছি। যেন তারা উহার ফল-ফলাদী খেতে পারে। এ সব কিছু তাদের হাতের বানানো নয় তাহলে এরা কেন শোকর আদায় করেনা। সুরা বাকারার ২২ নং আয়াতটিতে সাধারণভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালাই পৃথিবীকে বিছানার মত করে বানিয়েছেন। যাতে তা মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়। একই সাথে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে পৃথিবীকে শয্যা হিসাবে বানিয়ে আকাশকে করেছেন তার ছাদ স্বরূপ। অতএব মানুষের জন্য পৃথিবী ও আকাশের মধ্যবর্তী স্থানটি বসবাসের জন্য উপযোগী ও নিরাপদ। অত:পর তিনি জানিয়ে দিলেন যে মানুষের জন্য তিনি শুধু মাত্র বাসস্থানেরই ব্যবস্থা করেননি তার খাদ্যের ও যোগান দিয়েছেন তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টির আকারে পানি বর্ষণ করেছেন। আর এ বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে উদগত করেছেন মানুষের রিজিকের জন্য বিভিন্ন ফলফলাদী। এ কাজের তিনিই একমাত্র কর্তা অন্য কোন সত্ত্বা তার কোন অংশীদার নাই। বিষয়টির প্রতি মানুষের সর্তক দৃষ্টি রাখার আহবান জানিয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে মানুষ যেন ¯্রষ্ঠা ও “রবৃ হিসাবে অন্য কোন সত্ত্বাকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ মনে না করে। কারন, কি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ মানুষের রিজিকের ব্যবস্থা করেন তা সম্যক দৃষ্টিতেই রয়েছে। মানুষ একটু চিন্তা করলেই তা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারে। মানুষের জন্য বসবাসের স্থান এবং রিজিক এর সংস্থানে মহান আল্লাহ তায়ালার নিরংকুশ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারণা প্রদানের পর আরও বিশদ বিবরণ প্রদাণ করা হচ্ছে সুরা ইয়াসীন এর উদৃত আয়াত সমূহে। এখানে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, যারা আল্লাহ তায়ালাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন সত্ত্বা, শক্তি ও কার্যকারনকে “ইলাহ” স্থানে স্থাপন করে কিংবা আল্লাহ তায়ালার পাশাপাশি ঐ সকল সত্ত্বা ও শক্তিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করে তাদের জন্য নিস্প্রাণ জমীন একটি প্রকৃষ্ট নির্দশন। আকাশ থেকে বৃষ্টির আকারে পানি বর্ষণের মাধ্যমে এ যমীনকে জীবন দান করেন তিনিই। তারা দেখতে পায় প্রাণহীন এ ধূসর ভূমি থেকে উত্থিত হয় সবুজ গাছগাছালী ও তৃণলতা, সবুজ শ্যামল বাগবাগিচা, ঘটায় জীবনের সমারোহ। এ সবকিছু সংঘটনের একচ্ছত্র এবং একমাত্র অধিকারী তিনি যিনি সমগ্র সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেছেন। অতএব তাদের রিজিক ও অন্নের সংস্থান করার একমাত্র মালিক তিনি। তিনিই এ যমীনকে তাঁর নির্দেশনার মাধ্যমে শস্য ও ফলফলাদী উৎপাদনক্ষম করেন যা মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্যের সংস্থানে ব্যবহৃত হয়। এতদপ্রসংগেই এরশাদ হয়েছে “ওয়া আখরায্না মিনহা হাব্বান্ ফামিনহু ইয়া’কুলূন” অর্থাৎ আমরা উহা (মৃত প্রায় যমীন) থেকে ফসল বের করেছি যা তারা খেয়ে থাকে। এরপর আরও বনর্ণা করে বললেন, “ওয়া যায়া,লনা ফীহা জান্নাতিম্ মিন্নাখীলিও ওয়া আ’নাবিও ওয়া ফায্যারানা ফীহা মিনাল য়ূ’ইউন, লিয়া’কুলু মিন ছামারিহি ওয়ামা আ’মিলাত্হু আইদিহিম” অর্থাৎ আমরা উহাতে খেজুর ও আঙ্গুর এর বাগান বানিয়েছি এবং উহার মধ্য হতে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছি যেন তারা উহার ফলফলাদী খেতে পারে। এসব কিছু তাদের হাতে বানানো নয়। অণুরূপ ভাবে কোরানুল কারীমের সুরা আল মুমেনুন এর একটি আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের খাদ্যের জন্য ফলফলাদীর সন্ধান দিয়ে এরশাদ করেন “ফা আন্শা’না লাকুম বিহী জান্নাতিম্ মিন্নাখীলিও ওয়া আ’নাবিন লাকুম ফীহা ফাওয়াকিহু কাছিরাতুও ওয়া মিন্হা তা’কুলুন (আল মু’মেনুন-১৯)” অর্থাৎ (লক্ষ্য কর) তারপর (সংরক্ষিত) সেই পানি দিয়ে তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করি। তোমাদের জন্য তাতে প্রচুর ফলফলাদী ও (উৎপাদিত) হয়, আর তা থেকে তোমরা (পর্যাপ্ত পরিমাণে) আহার ও (গ্রহণ) করো।

উল্লেখ্য যে ইতোপূর্বে সুরা বাকারার উদৃত আয়াতটিতে সাধারণভাবে মানুষের খাদ্যের জন্য শস্য ও ফল উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে এসে মহান আল্লাহ ফলের বাগান এবং বিশেষ বিশেষ ফলের নাম উল্লেখ করেছেন যা মানুষ খাদ্য হিসাবে খেয়ে থাকে কিন্তু তা মানুষ নিজে বানায়নি উদাহরণ স্বরূপ খেজুর ও আঙ্গুর এর কথা উদৃত আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। খেজুর এমন একটি ফল যাতে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। কোরানূল কারীমের আরও বিভিন্ন আয়াতে খেজুর এর পুষ্টিগুণের কথা উল্লিখিত হয়েছে। নবী ঈসা (আ:) এর মাতা বিবি মরিয়ম প্রসব বেদনায় অস্তির হয়ে শিশু পুত্র ঈসা (আ:) কে প্রসব এর পর তার প্রসব পরবর্তী দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা বিবি মরিয়মকে খেজুর খাওয়ার জন্য ওহী করেন। সুরা মারিয়মে তা বিবৃত হয়েছে এই ভাবে “ফাআ যা আহাল মুখাদু ইলাঝিজ্য়্যিন্ নাখ্লাতি, ক্বালাৎ ইয়া লাইতা’নী মিত্তু ক্বাবলা হাজা ওয়া কুন্তু নাছইয়াম মানছিয়্যা। ফানাদাহা মিন তাহহিহা আল্লা তাহযানী ক্বাদ যায়া’লা রাব্বুকি তাহ্তাকি ছারিয়্যা। ওয়াহুজ্জি ইলাইকি বিঝিজ্য়্যিন নাখলাতি তুছাকিত আ’লাইকি রুতোয়াবান ঝানিয়্যা। ফাকুলী ওয়াশরাবী ওয়া র্কারি আ’ইনান ফাইন্নি তারাইন্যা মিনাল বাশারি আহাদান ফাকূলী ইন্নি নাযারতু লিররহমানি সাত্তমান ফালা নুকাল্লিমুল ইয়াত্তমা ইন্ছিয়্যা” (সুরা মারয়িয়াম: ২৩-২৬)। অর্থাৎ তার পর তার প্রসব বেদনা  তাকে এক খেজুর গাছের নিচে নিয়ে এলো সে বললো হায়। এর আগেই যদি আমি মরে যেতাম এবং আমি যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিম্মৃত হয়ে যেতাম। তখন একজন (ফেরেশতা) তাকে তার নিচের দিক থেকে আহবান করে বললো (হে মারয়িয়াম), তুমি কোন দু:খ করোনা, তোমার মালিক (তোমার পিপাসা নিবারণের জন্য) তোমার (পায়ের) নিচে একটি (পানির) ঝর্ণা বানিয়ে দিয়েছেন। তুমি এ খেজুর গাছের কান্ড তোমার দিকে নাড়া দাও (দেখবে) তা তোমার উপর পাকা ও তাজা খেজুর ফেলছে। তারপর এ খেজুর তুমি খাও এবং এ (ঝর্ণার) পানীয় পান করো এবং (সন্তানের দিকে তাকিয়ে তোমার) চোখ জুড়াও (এরই মধ্যে) যখনি তুমি মানুষের মধ্যে কাউকে দেখো তাহলে বলবে, আমি আল্লাহ তায়ালার নামে রোজা মানত করেছি (এ জন্য) আমি আজ কোন মানুষের সাথে কথা বলবোনা।

সুরা মারয়িয়াম থেকে উঁদৃত চারটি আয়াতে মানুষের পুষ্টি বিষয়ে যে ইংগীত পাওয়া যায় তা মানব জাতির জন্য অতীব প্রণিধানযোগ্য। আসন্ন সন্তান প্রসবা কোন নারী সন্তান প্রসবের পরপর শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল থাকে। তার এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার জন্য অধিক মিষ্টি বা চিনি সমৃদ্ধ ফল খাওয়ার পরামর্শ প্রদান করা হয়। উদৃত আয়াতে মহান আল্লাহ বিবি মারয়িয়ামকে সন্তান প্রসবের পূর্বে খেজুর খাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে দুটি কল্যাণ রয়েছে। প্রথমত: এতে তার প্রসবকালীন শক্তি যোগানোর এবং দ্বিতীয়ত: প্রসব পরবর্তী অবস্থায় শরীর সতেজ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থাটি প্রদান করেছেন সমগ্র সৃষ্টিলোকের মহান ¯্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা। যার নিকটই রয়েছে সৃষ্টিলোকের সকল বিষয়ের সম্যক জ্ঞান। মানুষকে প্রদত্ত আল্লাহ তায়ালা জ্ঞানের যৎকিঞ্চিৎ এর মাধ্যমে গবেষণার ফলে মানুষ পরবর্তীতে উক্ত গুনাগুণের কথা উদঘাটন করতে পেরেছে। মানুষ জানতে পেরেছে যে খেজুরে কিংবা আঙ্গুরে শুধু কার্বোহাইড্রেট নয় বরং এতে আরও অনেক খাদ্যো উপাদান বিদ্যমান। গবেষনায় আরও জানা যায় যে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ধাতু (ঊষবসবহঃ) গুলোর মধ্যে অন্তত: ১০টি ধাতু খেজুরে বিদ্যমান আছে। ফলে খেজুর পরিণত হয়েছে নারী পুরুষ ও বয়স নির্বিশেষে সবার জন্য একটি অতিউৎকৃষ্ট খাদ্য হিসাবে। কোন কোন পুষ্টিবিদ এর মতে মানুষ কেবল খেজুর আর পানি খেয়ে বহু বৎছর সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এ জন্যই মহান আল্লাহ কোরানুল কারীমে ফলের বিষয়ে আয়াত নাযিল করেছেন এবং ফল মানুষের জন্য একটি অতীব উপকারী ও উৎকৃষ্ট খাদ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। মানুষের উচিৎ খোদা প্রদত্ত ফলফলাদী তার পুষ্টি যোগানোর জন্য পর্য্যাপ্ত পরিমাণে আহার করা এবং এরই কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য জীবন পরিচালনায় সকল খোদায়ী নির্দেশ মাথা পেতে গ্রহণ করা।

——————————————

*লেখকঃ

চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার (অবঃ)

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *