আল-কোরানে মৎস্য চাষ ও সংশ্লিষ্ট প্রসংগে

গত সংখ্যার আলোচনায় আমরা উল্লেখ করেছিলাম যে সৃষ্টি স্রষ্টার নিয়ন্ত্রন মেনে চলে। সেজন্যই নীলনদের পানি তার স্রষ্ঠার নির্দেশ অনুযায়ী মূসা (আঃ) এবং তার সংগীদের পার করে দেওয়ার জন্য তার ভিতর দিয়ে রাস্তা করে দেয় আর ফিরআউন ও তার সংগীদেরকে মাঝ নদীতে ডুবিয়ে দেয়। ঘটনাটি নবী মুসা (আঃ) এর জীবদ্দশায় সংগঠিত। বলা যায় পৌরানিক। বর্তমান যুগের ঘটনা হিসাবে আমরা সুনামীর কথা উল্লেখ করেছি। আমাদের এ লেখাটি প্রকাশ হওয়ার পর পরই উত্তর পূর্ব জাপানে শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিকটারস্কেলে যার মাত্রা ছিল ৭.৯ এবং তা প্রায় ৫ মিনিট যাবৎ স্থায়ী ছিল। এ ভূকম্পনের ফলে জান মালের ব্যাপক ক্ষতি ও স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি সুনামীর সৃষ্টি হয়ে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চ জলোচ্ছাস জলবন্দরে রক্ষিত জাহাজ ও প্রায় সকল প্রকার স্থাপনা এক ধাক্কায় একসাথ করে ধুয়ে মুছে সরিয়ে নিয়ে যায়। খবরে প্রকাশ এতে ফুকুশিমা পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একাধিক পারমানবিক চুল্লি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে পারমানবিক বিষ্ফোরন ঘটে এবং এর তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে যাওয়ার ফলে নিদারুন মানবিক বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টি পুনরোল্লেখ করার কারণ সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা হিসাবে সৃষ্টির উপর তার একচ্ছত্র আধিপত্য সর্বক্ষণ বিরাজিত থাকার বিষয়টির প্রতি পুনঃদৃষ্টি নিবন্ধ করা। মানুষ আল্লাহর ক্ষমতার কাছে কত ক্ষুদ্র ও অসহায় সংঘঠিত ঘটনাবলী থেকে তা চিন্তাশীলগণ সহজেই অনুমান করতে পারে। খোদার এ সৃষ্টিতে মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে মানুষ তাকে প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অনেক নুতন নুতন আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবন যাত্রাকে সহজ ও আরাম দায়ক করার চেষ্টা করেছে। মানুষকে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে কোরানে হাকীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ওয়ালাক্বাদ  কাররামনা বনি আদমা ওয়া  হামালনা হুম ফিল বারইর ওয়াল  বাহরি ওয়ারাযাক্বনা হুম মিনাত্ ত্বেয়ায়িৎ বাতি ওয়াফদ্বদ্বালনাহুম আ‘লা কাছারিম মিম্মান খালাক্বনা তাফ্দ্বীলা’ (বনি ইসরাঈল-৭০)।

অর্থাৎ ‘‘নিশ্চয়ই আমরা বনি আদমকে শ্রেষ্ঠত্ব বৈশিষ্ঠ্য দান করেছি। তাদেরকে স্থল ও জল পথে চলার বাহন দান করেছি। এবং তাদেরকে দিয়েছি নানাবিধ উত্তম জীবনোপকরণ এবং আমরা তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি অনেক সৃষ্টির উপর এসব আমারই দয়া ও অনুগ্রহ’’। কাজেই বুঝা যাচ্ছে দুনিয়ার কোন কোন বিষয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব একান্তভাবে আল্লাহরই অনুগ্রহ। এ অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয়ে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে যাওয়া নিতান্তই বোকামী ও মূর্খতারই নামান্তর। কারণ মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও সংগঠন বিষয়ে মানুষের জ্ঞান এতই সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ যে আল্লাহর জ্ঞানের সাথে এর কোন তুলনাই হয়না এ জন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, “ওয়ামা উত’য়তুম্ মিনাল ইলমে ইল্লা ক্বালীলা’’ অর্থাৎ (আমার জ্ঞানের অফুরন্ত ভান্ডার থেকে) তোমাদেরকে কিনচিৎ এল্ম্ ই প্রদান করা হয়েছে। কাজেই জ্ঞানের মহাসমুদ্র থেকে এক ফোটা পানি সংগ্রহ করে সমুদ্রকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা কখনও বুদ্ধিমান ও জ্ঞানবান লোকের আচরণ হতে পারেনা। এরূপ আচরণ প্রত্যক্ষ করেই হয়তো কবি লিখেছিলেন, ‘‘শৈবাল দিঘীরে বলে উচুঁ করি শির’’ লিখে রেখ এক ফোটা দিলেম শিশির।”

চিন্তাশীল মানুষ লক্ষ্য করলেই দেখতে পারে মহান আল্লাহ মানুষকে অগণিত নেয়ামত দান করেছেন। আর মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন এ নেয়ামতের শুকরীয়া আদায় করার জন্য তাহলে তিনি নেয়ামতকে বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “লাইন্ শাকারতুম লা আজীদান্নাকুম।” তোমরা আমার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর, তাহলে আমি আমার নেয়ামতকে আরও বৃদ্ধি করে দেব। শুকরিয়া আদায়ের পদ্ধতি হচ্ছে দুই স্তরের প্রথমতঃ মৌখিক শুকরীয়া যা মৌখিকভাবে আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি এবং তদনুযায়ী আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাকেই বুঝায়। আর বাস্তব শুকরীয়া হলো খোদা প্রদত্ত নেয়ামতটি যে কাজে ব্যবহারের জন্য প্রদান করা হয়েছে ঠিক সেই কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার করা। মৎস্য আল্লাহ তা’য়ালার একটি বিরাট অনুগ্রহ ও বিশেষ নেয়ামত। মৎস্য সম্পদ সাধারনতঃ দুইটি উৎস থেকে আহরণ করা হয়। লোনা পানি বিশিষ্ট সমুদ্র থেকে (ঝবধ ভরংয) এবং নদী বা মিঠা পানি থেকে (ঝবিবঃ ধিঃবৎ ভরংয) । এতদসংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহ তা’য়ালা কোরানে হাকিমে উল্লেখ করেন। “ওয়ালা ইয়াসতাবিল বাহরানি হাযা আ’যবুন ফোরাতুন সাইগুন শারাবুহূ ওয়ালা মিলহুন উজ্বাজ্ব; ওয়ামিন কুল্লিন তা’কুলূনা লাহমান ত্বরিয়্যাওঁ ওয়া তাস্তাখ্রিজুনা হিলয়াতান তালবাসূনাহা ওয়াতারাল ফুলকা ফীহি মাওয়াখিরা লিতাব তাগূ মিন্ ফাদ্বলিহী ওয়ালা’য়াল্লাকুম তাশকুরুন (ফাতির-১২) অর্থাৎ আর সমুদ্রের দুইটি পানির ধারা সমান নয়। একটি তো মিঠা পানি পিপাসা নিবারণকারী  এর পানি পান করায় সুস্বাদু। আর অপর ধারা তীব্র লবনাক্ত পানি বিশিষ্ট ও বিস্বাদ। কিন্তু এই উভয় ধারা থেকেই তোমরা টাটকা তাজা গোস্ত (মাছ) লাভ করে থাক, এবং আহরণ কর মনি মুক্তার অলংকারের জিনিস যা তোমরা পরিধান কর এবং এ পানিতেই তোমরা দেখছ নৌকাগুলো উহার বুক চিরে চলাচল করছে যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ কর এবং যাতে তোমরা শুকর আদায়কারী হও।

আর সমুদ্রের দুইটি পানির ধারা সমান নয়। একটি তো মিঠা পানি পিপাসা নিবারণকারী  এর পানি পান করায় সুস্বাদু। আর অপর ধারা তীব্র লবনাক্ত পানি বিশিষ্ট ও বিস্বাদ। কিন্তু এই উভয় ধারা থেকেই তোমরা টাটকা তাজা গোস্ত (মাছ) লাভ করে থাক, এবং আহরণ কর মনি মুক্তার অলংকারের জিনিস যা তোমরা   পরিধান কর।

আহকামুল হাকিমীন মহান রাব্বুল আলামীন ষ্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন যে লোনা পানি ও মিঠা পানি এ উভয় উৎস্যেই মানুষের জন্য মৎস্য সম্পদ রয়েছে। মানুষ এ’দু উৎস থেকেই তা আহরণ করতে পারে। কোরানে হাকিমের এ নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষ একদিকে আহরণ করছে লোনা ও মিঠা পানির মাছ। অন্য দিকে মিঠা পানির মাছকে সঙ্করায়ণ পদ্ধতি অনুসরণ করে নুতন জাত উদ্ভাবন এর মাধ্যমে দ্রুত বর্ধনশীলতা ও অন্যান্য উৎকর্ষ্য আনায়ন করা হয়। কৃত্রিম সঙ্করায়ণ এর যেমন সুবিধা আছে তেমনি তার নেতিবাচক দিকও রয়েছে। মৎস্য গবেষণায় নিয়োজিত বিজ্ঞানীগনের মতে এ পদ্ধতির জন্য যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে মৎস্য হ্যাচারিতে উন্নত মানের পোনা উৎপাদন ব্যহত হতে পারে। এ জন্য ভালগুন সম্পন্ন ও যথাযথ বয়স প্রাপ্ত ব্র“ড মাছ পোনা উৎপাদন সঙ্করায়ন কাজে ব্যবহার করতে হবে। ব্র“ড মাছ সিলেকশনের ক্ষেত্রে আন্তঃ প্রজনন অর্থাৎ একই বা ঘনিষ্ঠ বংশ জাত স্ত্রীও পুরুষ মাছ ব্যবহার সমীচিন নহে। এর ফলে অন্তঃ প্রজনন জনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর ফলে মাছে বংশ পরস্পরায় বৈচিত্রহীনতা বৃদ্ধি উৎপাদন হ্রাস প্রজনন বিফলতা, বিকলাঙ্গতা ও রোগ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মৎস্য বিজ্ঞানীগণ এ সকল বিষয় বিবেচনায় রেখেই তাদের সংশ্লিষ্ট গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে অগ্রসর হচ্ছেন। আর সে কারণেই বর্তমান সময়ে মাছের বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মহান আল্লাহর ঘোষণা, আকাশ পৃথিবীর সৃষ্টি নৈপূন্যে রাত ও দিনের আবর্তনে নিশ্চিত নির্দশন রয়েছে চিন্তাশীল ও জ্ঞানবানদের (গবেষকদের) জন্য এ ঘোষণা অনুসরণ করে মানুষ মৎস্য চাষের গবেষণা করেছে। তারই ফলশ্র“তিতে আজ সম্ভব হচ্ছে মৎস্য চাষের নুতন প্রযুক্তি উদ্ভাবন। পরম করুনাময় আল্লাহ তা’য়ালা তার অনুগ্রহকে মানুষের জন্য অবারিত করেছেন। ফলে ধনী কিংবা নির্ধন, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, ছোট বড় নির্বিশেষে সবাই তার অনুগ্রহের দান সমূহ ভোগ করছে উপকৃত ও লাভবান হচ্ছে। অনুরূপভাবে মানুষের জীবন পরিচালনায় যে নির্দেশনা তার পক্ষ থেকে নবী রসুলগনের মাধ্যমে জারী করা হয়েছে মানুষ যদি তা সঠিক ভাবে মেনে চলে তবে তা মানুষের জীবনে সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তারই নির্দেশনা অনুসরণ করে জিন্দেগী যাপনের মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ ও একটি সুন্দর পৃথিবী গঠনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

ড. মোঃ আবু বকর

লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জয়দেবপুর, গাজীপুর। পুনঃপ্রকাশ

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *