ইঁদুর নিধন অভিযান সফল হোক

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জমি হ্রাসের প্রেক্ষাপটে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের জন্য ইতিমধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে দানাজাতীয় শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি খাদ্যশস্য রপ্তানিও করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ভৌগলিকভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রব বেশি। তবে এত প্রতিকূলতার মাঝেও কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষিবিদ তথা কৃষি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, প্রতি বছর কৃষকের উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। ইঁদুর মাঠ থেকে শুরু করে ফসল কর্তনের পরেও গুদামজাত অবস্থায় বা গোলায় তোলার পরও ক্ষতি করে। সুতরাং ইঁদুর আমাদের ফসলের এমন একটি অনিষ্টকারী বালাই যা সর্বাবস্থায় কৃষির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। ইঁদুর শুধু যে ফসলের ক্ষতি করে তা নয় মানুষেরও ব্যাপক ক্ষতি করে এবং রোগজীবাণুর বাহক হিসাবে কাজ করে। কৃষকদের ফসলের মাঠে সময় মতো ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতি বছরই ইঁদুর নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

ইঁদুর স্তন্যপায়ী, সর্বভুক ও নিশাচর  প্রাণী। ফসলের জন্য ক্ষতিকর স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মধ্যে ইঁদুর মানুষের প্রধান শত্রু। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে ইঁদুর আমাদের প্রধান সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (১৯৬৭) হিসাব মতে, ইঁদুর প্রতি বছর বিশ্বের ৩ কোটি ৩৩ লাখ টন খাবার নষ্ট করে। বিশ্বে প্রতি বছর ইঁদুর যে পরিমাণ খাবার নষ্ট করে, সে খাবার খেয়ে অনায়াসেই ২৫/৩০টি দরিদ্র দেশের মানুষ এক বছর বাঁচতে পারে। প্রতিবছর দেশে ইঁদুরের কারণে গড়ে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ফসলের ক্ষতি করে থাকে। দৈনিক প্রথম আলো ২২ জুন ২০১৫ তারিখের সূত্র মতে, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ইঁদুর প্রায় ৭২৪ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি করেছে । কৃষি সংস্থা ইউএসডি এর ২০১০ সালের বিশ্বব্যাপী ইঁদুরের ক্ষতি করা নিয়ে গবেষণায় বলাহয়েছে, ইঁদুর এশিয়ায় বছরে ১৮ কোটি মানুষের ১২ মাসের খাবার নষ্ট করে। বাংলাদেশে প্রায় ৮-১০ শতাংশ ধান ও গম ইঁদুর নষ্ট করে যা ৫০-৫৪ লাখ লোকের একবছরের খাবারের সমান। ইঁদুর বছরে আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গমের শতকরা ৪-১২ ভাগ, গোল আলুর শতকরা ৫-৭ ভাগ, আনারসের শতকরা ৬-৯ ভাগ নষ্ট করে । ইঁদুর শুধুমাত্র গম ফসলে বছরে প্রায় ৭৭,০০০ মেট্রিক টন ক্ষতি করে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।  ইঁদুর দ্বারা বছরে ফসলের প্রায় ১.৫-২.০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। তাছাড়াও ইঁদুর প্রায় ৪০ প্রকার রোগ ছড়ায়। বেশির ভাগ ইঁদুর গর্তে বাস করে বলে সম্পূর্ণভাবে দমন বা নির্মূল করা সম্ভব হয় না।

ইঁদুর সমস্যা দীর্ঘদিনের। এ সমস্যা পূর্বে যেমন ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। একা ইঁদুর নিধন করার সাথে সাথে অন্যদের ইঁদুর নিধনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। একা ইঁদুর নিধন করলে সাময়িকভাবে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়, তবে অল্প কিছু দিনপরই আবার অন্য স্থানের ইঁদুর এসে সমস্যার সৃষ্টি করে। ঘরবাড়ি, গুদাম, হাঁস-মুরগির খামার, অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিনিয়ত ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই করে ইঁদুর নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইঁদুর নিধন অভিযানের সফলতা নির্ভর করে সর্বস্তরের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণের ওপর। আমরা সরকার ঘোষিত ‘ইঁদুর নিধন অভিযান-২০১৫’ এর সার্বিক সফলতা কামনা করি।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *