ইউরিয়া সারের বৈশিষ্ট্য এবং ফসল উৎপাদনে প্রভাব

 

ড. মো: শহিদুল ইসলাম

ভূমিকা

ওলন্দাজ বিজ্ঞানী হারমান বোওরহাভ সর্বপ্রথম ১৭২৭ সালে মূত্রে বা প্রসাবে ইউরিয়া আবিষ্কার করেন। ফরাসী বিজ্ঞানী হিলাইওে রোয়েলেও ১৭৭৩ সালে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে প্রসাব থেকে ইউরিয়ার স্ফটিক আবিষ্কারের কথা দাবি করেন। এর অনেক পরে ১৮২৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ ফেডারিক হোলার কৃত্তিম উপায়ে সিলভার ছায়েনেটের সহিত এ্যামোনিয়াম কোরাইডের বিক্রিয়া ঘটায়ে ইউরিয়া উৎপাদন করেন। অজৈব দ্রব্যের সহিত বিক্রিয়া ঘটিয়ে এটাই প্রথম জৈব উপাদান যা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। এজন্য তাকে জৈব রসায়নের পিতা বলা হয়ে থাকে। বসচ্ছ-মেয়সইনার ইউরিয়া উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণ করে বাণিজ্যিকভাবে ইউরিয়ার উৎপাদন শুরু হয় ১৯২২ সন থেকে। এ পদ্ধতিতে দু’টো প্রক্রিয়ার মাধ্যেমে ইউরিয়া উৎপন্ন করা হয়। প্রথম প্রক্রিয়ায় এ্যামোনিয়ার সহিত কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিক্রিয়ায় এ্যামোনিয়াম কার্বামেট তৈরি হয়। দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় পরিক্ষয়ের মাধ্যমে এ্যামোনিয়াম কার্বামেট থেকে ইউরিয়া উৎপন্ন হয়।

সারণী: ১। বাংলাদেশে স্থাপিত ইউরিয়া সার কারখানা এবং তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ও দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন

*এমএমএসসিএফডি: মিরিয়ন মেট্রিক টন স্যান্ডারড কিউবিক ফিট প্রতিদিন;     ** এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি

বাংলাদেশে ফেঞ্চুগঞ্জে স্থাপিত প্রাকৃতিক সার কারখানায় প্রথম ইউরিয়া উৎপন্ন করা হয় ১৯৬১ সালে। তারপর পর্যায়ক্রমে ইউরিয়া সার কারখানা লি:, ঘোড়াশালে; জিয়া সার কারখানা, আশুগঞ্জে; পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা, পলাশে; চট্রগ্রাম ইউরিয়া সার লি:, রংগোদিয়া; যমুনা সার কোম্পানী লি:, তারাকান্দিতে এবং বেসরকারী উদ্যোগে কর্ণফুলি সার কোম্পানী লি:, রংগোদিয়ায় স্থাপন করা হয়। যমুনা সার কোম্পানী লি: এবং কর্ণফুলি সার কোম্পানী লি:তেই শুধু দানাদার ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়, আর অন্য সার কারখানায় প্রিল্ড আকারে ইউরিয়া উৎপন্ন করা হয়। ফেঞ্চুগঞ্জে শাহজালাল নামক আর একটি ইউরিয়া কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। আশা করা যায় এ বৎসরেই এ সার কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে। এ সার কারখানায় ৫.৬১ লক্ষ টন ইউরিয়া উৎপন্ন করা হবে।

সারণী: ২। প্রতি টন ইউরিয়া সার উৎপাদনে প্রকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা।

*হাজার স্টান্ডারড কিউবিক ফিট

সারণী ২তে দেখা যায় যে, আমাদের দেশের ইউরিয়া সার কারখানার বিশেষ করে পুরাতনগুলোর উৎপাদন দক্ষতা খুবই কম। ফেঞ্চুগঞ্জে প্রাকৃতিক গ্যাস সার কারখানায় যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করে এক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করা হয় তা দিয়ে উন্নত বিশ্বে তিন টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। সংস্কারের জন্য অনেক দিন বন্ধ থাকার পর ঘোড়াসালে ইউরিয়া সার কারখানা লি: চালু হলেও উৎপাদন দক্ষতা খুব বেশী বৃদ্ধি পায়নি। পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার দক্ষতাও খুবই নিম্ন মানের।

কর্ণফুলি সার কোম্পানী লি: ব্যতীত সব ইউয়িয়া কারখানাগুলো বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প কর্পোরশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন। বিসিআইসি সার্বক্ষণিক উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং মাঠ পর্যায়ে বিতরণের ব্যবস্থা করে আসছে।

ইউরিয়া উৎপাদন এবং আমদানী

বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে, পক্ষান্তরে আমদানী বেড়েই চলছে (সারণী ৩)। ছয়টি সরকারী কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ২৩.১৫ লক্ষ মেট্রিক টন হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না করার কারণে উৎপাদন হ্রাস পেয়ে বিগত বৎসরে ১০ লক্ষ টনে নেমে এসেছে। এ বৎসর উপাদন লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৯ লক্ষ টনে। বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য বেশী গুরুত্ব দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া পুরাতন কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এমন অবস্থা মোটেই কাম্য নয়। পুরাতন সার কারখানাগুলো সংস্কার করে এবং প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে এ সার কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে স্থাপিত লক্ষ্য মাত্রায় পৌঁছার জন্য বিশেষ নজর দিতে হবে।

 

এখানে উল্লেখ্য যে, ইউরিয়া সারের ব্যবহার দিন দিন কমানো হয়েছে। ২০০৬-০৭ সনে ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়েছে ২৮.৭৫ লক্ষ টন । তা ক্রমান্বয়ে কমে সর্ব নিম্নে পৌঁছে ২০১২-১৩ সনে (২২.৪৬ লক্ষ টনে)। ইউরিয়া সার মূল পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন সরবরাহ করে। তাই এপুষ্টি উপাদানের ব্যবহার কমে গেলে ফলনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এবৎসর ইউরিয়ার আমদানীর লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ১৮.০০ লক্ষ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বিসিআইসি আমদানী করবে ১৭.০০ লক্ষ টন এবং বিএডিসি করবে ১.০০ লক্ষ টন।

ধান ক্ষেতে নাইট্রোজেনের অভাব                 প্রিল্ড ইউরিয়া এবং ধান ফসলে তার প্রভাব

বাংলদেশ সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার ৪০-৪৫ টাকায় ক্রয় করে কেজি প্রতি ২৮-২৯ টাকা ভর্তুকি দিয়ে কৃষক পর্যায়ে ১৬ টাকায় বিক্রি করছে। ১লা জুন ২০১১ সনের পূর্বে ইউরিয়ার বিক্রয় মূল্য ছিল কেজি প্রতি ১২ টকা। ১লা জুন ২০১১ হতে ভর্তুকি কমায়ে এসারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২০ টাকায়। বিগত ২০১৩ সনের ২৫ আগষ্ট এ সারের মূল্য পুন:নির্ধারণ করা হয় কেজি প্রতি ১৬.০০ টাকায়। বর্তমানে এ মূল্যে ইউরিয়া সার সারা দেশে বিক্রয় হচ্ছে।

ইউরিয়া সারের বৈশিষ্টঃ

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের তীব্র নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদান ঘাটতি মাটিতে ইউরিয়া বহুল ব্যবহৃত একটি নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার।

ইউরিয়া প্রিল্ড, গ্রানুলার, পেলেট, পাউডার এবং ক্ষুদ্র স্ফটিক হিসাবে উৎপাদিত হয়। সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়। দেখতে সাদা ধবধবে বা অনেক ক্ষেত্রেই রংবিহীন। ইহার কোন গন্ধ নেই। ইহা অম্লীয় বা ক্ষারীয় নয়। ব্যবহারের সুবিধার্থে ইউরিয়া প্রিল্ড (ক্ষুদ্র দানা<২মিমি) এবং দানাদার (২-৫মিমি) হিসাবে বাজারজাত করা হয়। আইএফডিসি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে গুটি ইউরিয়া বা ইউএসজি বাজারজাত করার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ সরকার ইউরিয়া সারের তিনটি বিনির্দেশ জারী করেছে।

উপরের বিনির্দেশে দেখা যায় যে প্রতিটি ইউরিয়াতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমপক্ষে শতকরা ৪৬.০ ভাগ থাকতে হবে। বাইয়িরেটের পরিমাণ সর্ব উচচ শতকরা ১.৫ ভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে যা ফসল উৎপাদনের জন্য খুবই নিরাপদ। বাইয়িরেট গাছের জন্য ক্ষতিকর। ইহা গাছে বিষ ক্রিয়া সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে উৎপাদিত ইউরিয়ার গুণগত মান ভাল এবং বিনির্দেশও মানসম্মত।

ইউরিয়ার প্রভাব: ইউরিয়া পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন সরবরাহ করে থাকে যার ঘাটতি বাংলাদেশের প্রায় সব মাটিতে বিদ্যমান। নাইট্রোজেনের ঘাটতির মূল কারণগুলো হচ্ছে:

– মাটিতে জৈব পদার্থের তীব্র বিয়োজন;

– এ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট খনিজ দ্রব্য দ্রুত চোয়ায়ে মাটির নীচের স্তরে পরি:সরণ এবং

– ফসল কর্তৃক অপসারণ।

বাংলাদেশের মধুপুর গড় এবং বরেন্দ্র ভূমির মাটিতে সবচেয়ে সর্ব নিম্ন নাইট্রোজনের পরিমাণ সনাক্ত করা হয়েছে। অন্য দিকে পিট মাটির কোন কোন নমূনায় শতকরা ০.২০% ভাগ পর্যন্ত নাইট্রোজেন পাওয়া যায়। কোন মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ যদি শতকরা ০.০৯% ভাগের নীচে থাকে, তাহলে ঐ মাটি নাইট্রোজেন ঘাটতি বলে বিবেচিত হবে।

নাইট্রোজেন গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। কুশি উৎপাদনে সহায়তা করে। শাক সবজির পর্যাপ্ত পাতা উৎপাদনে সহায়তা করে। আমিষ ও নিউক্লিক এসিড উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনের মাধ্যমে গাছকে সবুজ বর্ণ দান করে। শর্করা উৎপাদন বাড়ায়। অন্যান্য সকল আবশ্যক উপাদানের পরিশোষণ হার বাড়ায়।

মাটিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হলে কোরোফিল সংশ্লেষণের হার কমে যায়। ফলে গাছ স্বাভাবিক সবুজ বর্ণ হারিয়ে ফেলে। গাছের পাতা হালকা সবুজ থেকে হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে এবং অকালেই ঝড়ে পড়ে। পাতার আকার ছোট হয় এবং শাখা প্রশাখার বৃদ্ধি হ্রাস পায়, ফলে গাছ খর্বাকার হয়। পুরাতন পাতার অগ্রভাগ হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। বৃন্ত এবং শাখা প্রশাখা সরু হয়।

নাইট্রোজেনের প্রয়োগ মাত্রা বেশী হলে গাছের কাঠামো ও গঠন দুর্বল হয়। ফুল ও ফল উৎপাদনে বিলম্বিত হয়। পোকা মাকড় ও রোগ আক্রমণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে অনেক ফল পানসে হয়।

সীম এবং ডাল জাতীয় ফসল ব্যতীত অন্যান্য ফসলে সকল মৌসুমে নাইট্রোজিন ঘাটতি মাটিতে ইউরিয়া প্রয়োগের প্রভাব খুবই উল্লেখযোগ্য। সত্যিকার অর্থে সব ফসলের আধুনিক জাত এবং কলা ইউরিয়া প্রয়োগে যথেষ্ট সাড়া দেয়। এসব ফসলের ভালো ফলন পেতে হলে প্রচুর পরিমাণে এসার প্রয়োগ করতে হবে। কোন কোন সীম এবং ডাল জাতীয় ফসলে অল্প পরিমাণ ইউরিয়া সার জমি প্রস্তুতের শেষ পর্যায়ে প্রয়োগ করতে হয়। এতে নাইট্রোজেন সংযোজনকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। ফসলের ফলন কাংখিত মাত্রায় পাওয়া যায়।

আধুনিক ধান এবং গম ফসলের উপর দেশে অনেক ইউরিয়া- নাইট্রোজেন প্রয়োগের গবেষণা কার্যক্রম সম্পাদিত হয়েছে। গবেষণা ফলাফলে দেখা যায় নাইট্রোজেন প্রয়োগে এ দুটো ফসলের ফলন শতকরা ৩০-৭৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে আধুনিক ধান এবং গম ফসল ইউরিয়া সার প্রয়োগ ছাড়া কোন ফলনই দিতে পারে না। পক্ষান্তরে ১০০ কেজি ইউরিয়া-নাইট্রোজেন অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের সহিত সুষম হারে প্রয়োগ করে যথাক্রমে ধান ফসলে হেক্টর প্রতি ৬.০-৭.০ টন এবং গম ফসলে টন ৪.০-৪.৫ পাওয়া গিয়েছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে ইউরিয়া সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে যে সকল রাসায়নিক সার ব্যবহার হয় তার শতকরা ৫৪ ভাগই ইউরিয়া সার। অথচ এসারের কার্যকারিতা শতকরা ৪৫ ভাগের বেশী নয়। দু’ভাবে এসারের অপচয় হয় – চোয়ায়ে মাটির নিম্ন স্তরে চলে যায় এবং এ্যামোনিয়া গ্যাস হিসাবে আকাশে উড়ে যায়। সবচেয়ে চিন্তার কথা হল- যে অংশ নীচে চলে যায় তা আবার ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রাস অক্সাইড হিসাবে আকাশে চলে যায়। এক মোলিকুল নাইট্রাস অক্সাইড ৩০০ মোলিকুল কার্বন অক্সাইডের সমতুল্য। নাইট্রাস অক্সাইড এবং কার্বন অক্সাইড দুটোই গ্রীনহাউস গ্যাস যা জলবায়ু পরিবর্তনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে। তাই উপযুক্ত মাটি এবং সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যেমে ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।

লেখকঃ

মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এবং প্রাক্তন মহাপরিচালক

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *