ইক্ষুর রোগ ও তার প্রতিকার

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৩। রোগের নাম ঃ কালো শীষ রোগ (Smut) রোগ

রোগের কারণ ঃ উস্টিল্যাগো স্কিটামিনি (Ustilago scitaminea) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার ঃ আক্রান্ত বীজ আখের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে এ রোগ ছড়ায়। বাতাস ও বৃষ্টির মাধ্যমে স্মাটের হালকা ছোট ছোট বীজাণুগুলি এক গাছ থেকে অন্য গাছ এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজাণুগুলি গাছের লীফসিথের নীচে গিড়ার নিকট আটকে পড়ে এবং সেখান থেকে সরাসরি আখের চোখে আক্রমণ করে। মুড়ি আখ ক্ষেতে বা মাটিতে আবর্জনা ও আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশে এই রোগের জীবাণু থেকে যায়, যাহা বৃষ্টি, বাতাস বা সেচের পানির মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিস্তার লাভ করে এবং পরবর্তীতে নতুন নতুন গাছে আক্রমণ করে।

আখ চাষ

পরাগের লক্ষণ

  •             আখের ৩/৪ মাস বয়স হতে এ রোগ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছের মাথা থেকে কালো চাবুকের মত একটা কালো শীষ বের হয়।
  •             শীষটি কয়েক ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
  •             রোগের প্রথম অবস্থায় শীষটি পাতলা স্বচ্ছ একটি আবরণে ঢাকা থাকে।
  •             পরে এই আবরণ ফেটে যায় এবং অসংখ্য কালো ধূলার মত ক্ল্যামাইডোস্পোর বের হয়, যা সামান্য বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
  •             এ রকম কালো শীষ প্রত্যেকটি মুকুল থেকেও বের হতে পারে।
  •             আক্রান্ত গাছ সাধারণতঃ সুস্থ গাছ অপেক্ষা খর্বাকৃতির হয়ে থাকে।
  •             কান্ড পেন্সিলের মত চিকন এবং শক্ত হয়ে যায় এবং কোন বৃদ্ধি হয় না।
  •             আক্রান্ত গাছের পাতাগুলি সরু, খাট এবং খাড়া (Errect) থাকে ও হালকা সবুজ রং ধারন করে।
  •             এ রোগ সাধারণতঃ মুড়ি আখে বেশী দেখা যায়।

রোগের প্রতিকার

  •             রোগ প্রতিরোধ শক্তি সম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
  •             আক্রান্ত আখের ঝাড়, শিকড় সমেত তুলে ফেলা এবং পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  •             আক্রান্ত ঝাড় তুলে ফেলার পূর্বে কালো শীষ পলিথিন ব্যাগ বা চটের ব্যাগে সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে যাতে কাল শীষ থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
  •             ৫৪০সে তাপমাত্রায় ৪ ঘন্টাকাল আর্দ্র গরম বাতাসে অথবা গরম পানিতে ৫০০সে. তাপমাত্রার গরম পানিতে ৩ ঘন্টাকাল বীজ শোধন করে বীজ বপন করতে হবে।
  •             রোপণের পূর্বে কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) নামক ছত্রাকনাশক (২ ভাগ ছত্রাকনাশকঃ ১০০০ ভাগ পানি) দ্রবনে          ৩০  মিনিট কাল বীজ ভিজিয়ে রেখে শোধন  করতে হবে ।
  •             রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের চাষ করা যাবে না।

৪। রোগের নামঃ পাইনআপেল রোগ (Pineapple disease) রোগ

রোগের কারণঃ সিরাটোসিসটিস প্যারাডোক্সা (Ceratocystis Paradoxa) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ জমিতে অবস্থানকারী ছত্রাকের মাইসেলিয়াম বা স্পোর বীজ আখে কর্তিত দুই প্রান্ত দিয়ে এবং বিভিন্ন ক্ষত স্থান দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। বাতাস ও সেচের পানি বা গড়িয়ে যাওযা পানির মাধ্যমে রোগ-জীবাণু এক জমি থেকে অন্য জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের জীবাণু মাটিতে মৃত জৈব পদার্থ থেকে খাদ্যবস্তু নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই রোপনকৃত বীজ আখকে আক্রমণ করে।

রোগের লক্ষণ

  •        বীজ আখ মাটিতে অবস্থানরত রোগ-জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অঙ্কুরোদগমের পূর্বেই পচে নষ্ট হয়।
  •       অনেক সময় আক্রান্ত বীজ অঙ্কুরোদগম হলেও গাছের উচ্চতা ৬-১২ ইঞ্চি হতেই মারা যায়।
  •      আক্রান্ত বীজ আখ (Affected sett) চিড়লে ভিতরে লালচে বা কালচে রং দেখা যায় এবং ঘ্রান নিলে রোগের প্রাথমিক অবস্থায় পাকা আনারসের মত গন্ধ পাওয়া যায়।
  •             আক্রান্ত আখ বাচলেও অত্যন্ত খর্র্বাকৃতি এবং পাতা ফ্যাকাশে হয়ে ঝরে পড়ে এবং গাছ মারা যায়।
  •             আক্রান্ত বীজ আখে শিকড় খুব কম গজায় এবং শিকড়গুলিও নষ্ট হয়ে যায়।

রোগের প্রতিকার

  •             রোগমুক্ত জমির অনুমোদিত বীজ আখ ব্যবহার করতে হবে।
  •             রোপনের পূর্বে কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) নামক ছত্রাকনাশক (২ ভাগ ছত্রাকনাশক ঃ ১০০০ ভাগ পানি) দ্রবণে ৩০ মিনিট কাল বীজ ভিজিয়ে রেখে শোধন  করতে হবে ।
  •             অধিক ভিজা বা অধিক শুকনা মাটিতে ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় আখ রোপণ করা যাবে না।
  •             জমি ভালভাবে চাষ করতে হবে ও পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  •             দ্রুত অঙ্কুরোদগম হয় এমন জাত নির্বাচন এবং অনুকুল আবহাওয়ায় আখ চাষ করতে হবে।
  •             বীজ তলায় চারা তৈরী করে রোপা পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে।

৫। রোগের নাম ঃ লাল টানা এবং ডগা পচা (Red strip & Top rot) রোগ

রোগের কারণঃ সিউডোমোনাস রুব্রিলিনিয়ান্স (Pseudomonas rubrilineans) নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

বাতাস এবং বৃষ্টির পানির দ্বারা একযোগে ব্যাকটেরিয়া এক গাছ হতে অন্য গাছে এবং এক প্ল­ট হতে অন্য প্ল­টে বিস্তার লাভ করে। পাতায় সৃষ্ট ক্ষত বা স্টোমাটার মুখ দিয়ে সহজেই আখের পাতা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

লালটানা (Red stripe) রোগের লক্ষণ

  •             আখের পাতায় শিরা বরাবর লম্বা, সরু এবং একই রকম লাল বা গাড় লাল রং – এর টানা টানা বা ডোরা দাগ এই রোগের বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন।
  •             প্রাথমিক অবস্থায় দাগগুলি আলাদা থাকলেও পরবর্তীতে অনেকগুলো দাগ একত্র হয়ে পাতার এক বিরাট অংশে বিস্তার লাভ করে।
  •             এই দাগগুলি প্রথম অবস্থায় পানি ভেজা সবুজ দাগের মত থাকে এবং পরে দ্রুত উপরে ও নীচে বিস্তৃতি লাভ করে লাল, মেরুন বা গাড় লাল রং এ রুপান্তরিত হয়।
  •             মারাত্মক অবস্থায় এই দাগগুলি পাতার নীচের দিকে বাড়তে থাকে এবং ডগা আক্রমণ করে এবং ডগা পচা রোগ সৃষ্টি করে।

ডগা পচা (Top rot) রোগের লক্ষণ

  •             ডগা পচা (Top rot) রোগের পর্যায়টি সাধারণতঃ জুন-জুলাই মাসে যখন অধিক গরম ও অধিক বৃষ্টিপাত হয় অর্থাৎ বাতাসের উষ্ণতা ও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যখন খুব বেশী থাকে তখন গাছের ডগার জড়ানো পাতার ঠিক নীচের কচি বাড়ন্ত কান্ডে পচনের সৃষ্টি হয়।
  •             এতে ডগার পাতাগুলি মরে যায় ও ডগার অংশ ভেঙ্গে যায়।
  •             আক্রান্ত ডগার পচা অংশ হতে এক প্রকার বৈশিষ্ট্যমূলক পচা গন্ধ বের হয়।
  •             অধিক আক্রান্ত ক্ষেতে দূর হতে এই রোগের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়।
  •             খুব কম ক্ষেত্রে পচনকৃত অংশের নীচে গিটের চোখ হতে পার্শ্বকুশি বের হয়।
  •             অধিকাংশ সময়েই একই ঝাড়ের সকল গাছ আক্রান্ত হয় না।

রোগের প্রতিকার

  •             রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে।
  •             তাপশোধিত বীজের বংশজাত অনুমোদিত বীজ খামারের নীরোগ বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  •             নিয়মিতভাবে রোগাক্রান্ত পাতা এবং আক্রান্ত গাছের অংশবিশেষ কেটে পুড়ে ফেলতে হবে।
  •             ব্যাকটেরিয়া নাশক মিউপিরোসিন (ব্যাকট্রোবান) ১ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ৩-৪ বার জমিতে স্প্রে করতে হবে।

৬। রোগের নাম ঃ মুড়ি খর্বা রোগ (Ratoon stunting) রোগ

রোগের কারণঃ ক্লাভিব্যাকটার সাইলি (Clavibacter xyli) নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ রোগক্রান্ত বীজ আখের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। আখের জমিতে ব্যবহৃত ছুরি, কাঁচি, কোদাল বা কৃষি যন্ত্রের ব্লেডের ফলক দ্বারা এ রোগ অসুস্থ আখ থেকে সুস্থ আখে সংক্রমিত হয়।

রোগের লক্ষণ

  •             বাহ্যিকভাবে এ রোগের নির্দ্দিষ্ট কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
  •             আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং পাতা হালকা বর্ণ ধারণ করে বিশেষ করে মুড়ি আখে গাছ অত্যন্ত খর্বাকৃতির হয়।
  •             আক্রান্ত প্লটের আখের গাছ উচু-নীচু বা অসম দেখায়।
  •             আক্রান্ত আখের গিটগুলো খুব ঘন ঘন হয় অর্থাৎ পর্বগুলি লম্বায় ছোট হয়।
  •             একটি আক্রান্ত আখ লম্বালম্বিভাবে ধারালো ছুড়ি দ্বারা পাতলা ফালি করলে গিড়ায় লাল, কমলা বা বাদামী রং এর ছোট ছোট বিন্দুর মত দাগ দেখা যায়।
  •             এই ছোট ছোট দাগই হচ্ছে এ রোগের বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন।

আক্রান্ত আখ     আখের অভ্যন্তরভাগ

রোগের প্রতিকার

  •             ৫৪০সে তাপমাত্রায় ৪ ঘন্টাকাল আর্দ্র গরম বাতাসে অথবা গরম পানিতে ৫০০সে. তাপমাত্রার গরম পানিতে ৩ ঘন্টাকাল বীজ শোধন করে বীজ বপন করতে হবে।
  •             রোগমুক্ত জমির অনুমোদিত বীজ আখ ব্যবহার করতে হবে।
  •             ফসল কাটার যন্ত্রপাতি পুড়ে রোগ-জীবাণু মুক্ত করে ব্যবহার করতে হবে।
  •             পূর্বে আক্রান্ত ক্ষেতের ফসলের উচ্ছিষ্টাংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
  •             রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের চাষ করা যাবে না।
  •             রোগ প্রতিরোধী আখের জাতের চাষ করতে হবে।
  •             ব্যাকটেরিয়ানাশক মিউপিরোসিন (ব্যাকট্রোবান) ১ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ৩-৪ বার জমিতে স্প্রে করতে হবে।

৭। রোগের নাম ঃ পাতার পোড়া ক্ষত (Leaf Scald) রোগ

রোগের কারণ

জ্যানথোমোনাস এ্যালবিলিনিয়ান্স (Xanthomonas albilineans) নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

আক্রান্ত বীজ আখের মাধ্যমে প্রথমিকভাবে এ রোগ ছড়ায়। বৃষ্টি বা বন্যার পানির ও ফসল কাটার যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণ

দীর্ঘকাল স্থায়ী লক্ষণ

  •             পাতার মধ্যশিরা বরাবর শিরা বা তার আশেপাশে খুব চিকন লম্বালম্বি সাদা দাগের উৎপত্তি হয় এবং তা লম্বালম্বিভাবে পত্রফলকের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
  •             পাতার অগ্রভাগ থেকে নিম্নদিকে ঝলসানো বা পোড়া ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
  •             পূর্ণ বয়স্ক আখে প্রত্যেকটি পর্বে পার্শ্বকুশি গজায় এবং ঐ সমস্ত পাতায় উপরোল্লি­খিত লক্ষণ দুটি প্রকাশ পায়।
  •             আক্রান্ত গাছের কান্ড চিড়লে পর্ব এবং মধ্যম মধ্যস্ত ভাসকুলার বান্ডেলে ছোট বা টানা লাল দাগ দেখা যায়।

তীব্র লক্ষণ

  •             বাহ্যিক কোন লক্ষণ না প্রকাশ পেলেও গাছ হঠাৎ করে শুকিয়ে মারা যায়।
  •             শুধুমাত্র পর্ব বা পর্ব মধ্যস্থ স্থানে ছোট বড় টানা লাল দাগ দেখা যায়।

রোগের প্রতিকার

  •             রোগ প্রতিরোধ শক্তিসম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
  •             ৫৪০সে তাপমাত্রায় ৪ ঘন্টাকাল আর্দ্র গরম বাতাসে অথবা গরম পানিতে ৫০০সে. তাপমাত্রায় ৩ ঘন্টাকাল বীজ শোধন করে বীজ বপন করতে হবে।
  •             ফসল কাটার যন্ত্রপাতি পুড়িয়ে রোগ-জীবাণু মুক্ত করে ব্যবহার করতে হবে।
  •             সঠিক অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যার ব্যবস্থা নিতে হবে।
  •             জমিতে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে এবং পানি নিস্কাশনের উত্তম ব্যবস্থা করতে হবে।
  •             ব্যাকটেরিয়া নাশক মিউপিরোসিন (ব্যাকট্রোবান) ১ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ৩-৪ বার জমিতে স্প্রে করতে হবে।

৮। রোগের নামঃ সাদা পাতা রোগ (Whit leaf) রোগ

রোগের কারণ

মাইকোপ্লাজমা (Mycoplasm)-এর আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

আক্রান্ত বীজ রোপণের মাধ্যমে ছড়ায়। ম্যাটসুমুরাটেট্টিক্স হিরোগ্লাইফিকাস (Matsumuratettix hiroglyphicus) বাহক পোকার মাধ্যম্যে এ রোগ ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ 

  •             আখ গজানোর কিছুদিনের মধ্যে গাছের পাতা সাদা হয়ে যায়।
  •             আখের চারা ঘাসের মত চিকন সবুজ বা সাদা রং মিশ্রিতভাবে বের হয়।
  •             আক্রান্ত গাছের কুশিসমূহ এবং বয়স্ক গাছের ডগার মধ্যস্থ পাতাও সাদা হয়।
  •             গড়ন খর্বাকৃতির হয়, বৃদ্ধি কম ও অধিক কুশি হয়।
  •             বয়স্ক আখের চোখগুলি ফুলে যায় এবং সম্পূর্ণ সাদা বা সবুজ সাদা মিশ্রিত পার্শ্ব কুশি বের হয়।
  •             অনেক সময় এক বা একাধিক সাদা স্ট্রাইপ সমস্ত পাতা বরাবর লম্বালম্বিভাবে দেখা যায়।
  •             আক্রান্ত ঝাড়ে মাড়াইযোগ্য আখের সংখ্যা কম হয়।
  •             কচি অবস্থ্য় এ রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে কিছুদিনের মধ্যেই গাছ মারা যায়।

রোগের প্রতিকার

  •             সুস্থ সবল রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  •             রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ঝাড়ের সব গাছ শিকড়সহ তুলে পুড়ে ফেলতে হবে।
  •             ৫৪০সে. তাপমাত্রায় ৯৫ আর্দ্র গরম বাতাসে ৪ ঘন্টাকাল বীজ শোধন করে রোপন করলে এ রোগ সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়।
  •             বাহক পোকা দমন করার জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড (অ্যাডমায়ার বা ইমিটাফ) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

৯। রোগের নাম ঃ মোজাইক রোগ (Mosaic) রোগ

রোগের কারণঃ ইক্ষু মোজাইক ভাইরাস (Rhopalosiphum maidis)-এর আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

আক্রান্ত বীজ আখের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। রোপালোসিফাম মেইডিস (Rhopalosiphum maidis) নামক একপ্রকার পোকার মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার ঘটে। ভূট্টা এবং অন্যান্য ঘাসে এই ভাইরাস দেখা যায় এবং ইহা বিকল্প পোষক গাছ (Alternate host) হিসাবে কাজ কবে। গ্রীস্মের অনুকুল পরিবেশে যখন তাপমাত্রা এবং বাতাসের আর্দ্রতা উভয়ই বেশী থাকে, তখন আখের কচি গাছে এ রোগ দ্রত বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণ

  •             গাঢ় সবুজ রং এবং পাতার মধ্যে হালকা সবুজ ফ্যকাশে বা হলদে রং এর বৈশিষ্টপূর্ণ ছোট ছোট টানা টানা দাগই এ রোগের প্রধান লক্ষণ।
  •             এ সমস্ত হালকা দাগের নির্দিষ্ট কোন আকার নেই, তবে উহার পাতার লম্বালম্বিদিকে সমস্ত পাতাজুড়ে সমভাবে বিস্তৃত থাকে।
  •             পুরানো পাতার চেয়ে আখের কচি পাতায় এ রোগের লক্ষণ অধিক পরিস্কার রোঝা যায়।
  •             আক্রান্ত আখের কান্ড দেখতে হালকা বা হলদে সবুজ এবং পাশাপাশি সুস্থ কান্ডের তুলনায় খর্বাকুতি দেখা যায়।
  •             পুরাতন বা যে সমস্ত পাতার বয়স বেশী সে সমস্ত পাতায় মোজাইক রোগের লক্ষণ অনেক সময় মিলিয়ে যায়।
  •             কান্ডের উপরিভাগে ছোট ছোট চির বা ফাটল ধরে।
  •             রোগাক্রান্ত গাছ আকারের ছোট হয়।

রোগের প্রতিকার

  •             মোজাইক রোগমুক্ত অনুমোদিত খামারের বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  •             মোজাইক রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে।
  •             আখের জমির পার্শ্বে বিকল্প পোষক ফসলের চাষ না করা এবং জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
  •             বাহক পোকা দমন করার জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড (অ্যাডমায়ার বা ইমিটাফ) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

১০। রোগের নামঃ  পরজীবী বিজলী ঘাস (Striga) রোগ

রোগের কারণ

বিজলী ঘাস (Striga) নামক এক প্রকার ঘাসের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

বিজলী ঘাসে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হালকা বীজ উৎপন্ন হয় যা বাতাস, বৃষ্টি ও বন্যার পানির মাধ্যমে সহজেই স্থানান্তরিত হয়। বিজলী ঘাসের বীজ মাটিতে দীর্ঘদিন (৪০ বছর) যাবৎ জীবন্ত থাকে (viable) এবং      উপযুক্ত পোষক গাছ পেলেই উক্ত বীজ গজায় এবং বংশ বৃদ্ধি করে। পশুপাখী ও মানুষের মাধ্যমেও এর বিস্তার হয়।

রোগের লক্ষণ 

  •             বিজলী ঘাস আক্রান্ত আখের পাতা প্রাথমিক অবস্থায় হলদে হয়ে যায়, পরবর্তীতে আখের বৃদ্ধি বন্ধ হয় এবং শেষে মারা যায়।
  •             দূর থেকে বিজলী ঘাস আক্রান্ত আখ দেখলে পুড়ে গেছে বলে মনে হয়।
  •             মাটির ১.৫ ফুট নীচেও এর বীজ অঙ্কুরোদগম হয় এবং মাটির নীচেই কান্ড গজায় যা উপর থেকে বোঝা যায় না।
  •             মাটির নীচে থাকা অবস্থা হতেই বিজলী ঘাস আখের শিকড় হতে খাদ্যরস নিতে থাকে, যে কারণে বিজলী  ঘাস মাটির উপরে জন্মানোর পূর্বেই আখের ক্ষতি হতে দেখা যায়।
  •             মাটির উপরে জন্মানোর পর বিজলী ঘাস দ্বারা আক্রমণ ব্যাপক হয় এবং আখ দূর্বল হয়ে মারা যায়।

ফুলসহ বিজলী ঘাস (Striga with flowers ) বিজলী ঘাস (Striga)

রোগের প্রতিকার

  •             বিজলী ঘাসের আক্রমণ হয় এরূপ চিহ্নিত জমিতে সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ইউরিয়া এবং পটাশ হেক্টর প্রতি যথাক্রমে ৩৯৫ কেজি এবং ২৪৭ কেজি হারে তিন কিস্তিতে রোপণ সময়ে নালায় এবং বৃষ্টিপাতের পর এপ্রিল ও জুন মাসে আখের গোড়ায় প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
  •             আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া দ্রবণ (১ কেজি সার ২০ লিটার পানিতে মিশিয়ে) বিজলী ঘাসের উপর দুপুরের রোদ্রের সময় প্রয়োগ করলে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই উহা  মারা যায়।
  •             বিজলী ঘাস দেখা গেলে ফুল ফোটার পূর্বেই তুলে ফেলা বা ইউরিয়া দ্রবণ ¯েপ্র করে দমন করতে হবে।
  •             বিজলী ঘাস আক্রান্ত জমিতে পরের বৎসর আখ বা ধান চাষ না করে পাট বা অন্যান্য ফসলের চাষ করতে হবে।
  •             বিজলী ঘাস আক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের চাষ করা যাবে না।

————————————–

লেখকঃ

উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, শিবগঞ্জ, বগুড়া, বাংলাদেশ।

ইমেইলঃ zaman.path@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare