ইক্ষুর রোগ ও তার প্রতিকার

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান

পরিবর্তিত জলবায়ুগত কারণে রোগের অনুকূল আবহাওয়ায় ইক্ষুর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ইক্ষুর রোগবিস্তার ও প্রসার লাভের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশ সুগার ক্রপ রিচার্স ইনস্টিটিউট জরিপ ও গবেষণা দেখেছে বাংলাদেশে মোট ৪০টি ইক্ষুর রোগ আছে। এদের মধ্যে ২২টি ছত্রাক, ৪টি ব্যাকটেরিয়া, ২টি মাইকোপ্লাজমা, ১টি ভাইরাস, ২টি কৃমি, ২টি পরজীবী আগাছা দ্বারা সংগঠিত হয় এবং বাকি ৭টি রোগ অন্যান্য কারণে সংগঠিত হয়ে থাকে। সনাক্তকৃত ৪০টি রোগের মধ্যে ১০টি মুখ্য এবং বাকি রোগগুলো গৌণ। ইক্ষু রোগের নাম, রোগের কারণ, রোগের বিস্তার, রোগের লক্ষণ ও রোগের প্রতিকার নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১। রোগের নামঃ লাল পচা (Red rot) রোগ

রোগের কারণঃ কোলেটোট্রিকাম ফ্যালকাটাম (Colletotrichum falcatum নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ রোগাক্রান্ত বীজ আখ, ক্ষেতের পরিত্যক্ত অংশ বা মুড়ি ফসল, বাতাস. বন্যার বা সেচের পানির বা বৃষ্টির ছিটার মাধ্যমে আক্রান্ত গাছ থেকে ছত্রাকের কনিডিয়া অন্যান্য আখ গাছের সংস্পর্শে আসে এবং সুস্থ গাছে আক্রমণ  করে।

রোগের লক্ষণঃ লাল পচা রোগের লক্ষণ প্রধানত আখের ৪টি অংশে বেশী প্রকাশ পায়। সে অনুসারে এ রোগকে মধ্য শিরা, পত্রফলক, কুশি এবং কান্ডের লাল পচা রোগ বলা হয়।

১. মধ্য শিরার লাল পচা রোগ (Mid rib red rot)

  •  প্রথমত মধ্য শিরায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাল দাগের সৃষ্টি হয় এবং উভয় দিকে মধ্যশিরা বরাবর বিস্তৃত হয়।
  •  পরবর্তীতে মধ্যশিরার লাল রং খড়ের রং ধারণ করে থাকে। এ অবস্থায় অসংখ্য রোগ-জীবাণু বহনকারী কাল এসারভূলি দেখা যায়।
  •  জুন-জুলাই মাসে বর্ষাকালে এ লক্ষণ বেশী দেখা যায়।

২. পত্র ফলকের লাল পচা (Lamina red rot)

  •             গাছের বয়স যখন কম থাকে, তখন পত্রফলকে অসংখ্য লালচে বাদামী দাগের সৃষ্টি হয় এবং পাতার উপরে লালচে বাদামী আবরণের মত দেখা যায়।
  •             পরবর্তীতে অন্যান্য পাতাও হলদে হয়ে শুকিয়ে যায়।
  •             শুস্ক পাতায় অসংখ্য রোগ জীবানুসহ বাদামী কাল রঙের এসারভূলি দেখা যায়।

৩. কুশির লাল পচা রোগ (Tiller red rot)

  •             আখের ৪/৫ মাস বয়সে কুশিতে এ রোগ দেখা যায়।
  •             কুশির পাতা এবং মধ্য শিরায় প্রথমতঃ লাল রঙের দাগ দেখা যায় যা পরবর্তীতে খড়ের রং ধারণ করে।
  •             খড়ের রঙের স্থানে রোগ-জীবানু বহনকারী অসংখ্য কাল এসারভূলি দেখা যায়, যা বিস্তৃত হয়ে সমস্ত পাতা, মধ্যশিরা ও কুশির গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং অনুকুল পরিবেশে গোড়ায় পচন সৃষ্টি করে এবং গাছ মারা যায়।

৪. কান্ডের লাল পচা রোগ (Red rot)

  •             বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে যখন আখের বয়স সাধারণতঃ ৯-১০ মাস হয় এবং আখে চিনি জমতে শুরু করে তখনই এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
  •             কান্ডের গায়ে অবস্থিত পাতার গোড়া, বৃদ্ধিজনিত ফাটল কিংবা পোকা ক্ষতের মাধ্যমে এ রোগের জীবাণু গাছের ভিতরে প্রবেশ করে।
  •             প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে ৩য় বা ৪র্থ পাতা হলুদাভ রং ধারণ করে এবং শেষে শুকিয়ে যায়।
  •             প্রধান বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণ হলো আক্রান্ত ইক্ষু লম্বালম্বিভাবে চিড়লে কান্ডের অভ্যন্তরে লম্বালম্বি লাল দাগ দেখা যায় এবং দাগের মাঝে মাঝে আড়াআড়িভাবে সাদা দাগ (White patch) দৃশ্যমান হয়।
  •             আক্রান্ত আখের কান্ড পচে যায় এবং এক ধরনের টক গন্ধযুক্ত গন্ধ বের হয়।
  •             আক্রান্ত আখের অভ্যন্তরে ছত্রাকের  মাইসেলিয়াম দেখা যায়।
  •             আক্রান্ত গাছ কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায় এবং শুকিয়ে যায়।
  •             আক্রান্ত আখ থেকে চিনি বা গুড় তৈরী করা যায় না কারণ রোগ-জীবাণু চিনিকে (সুক্রোজ) নষ্ট করে দেয়, ফলে আক্রান্ত রস জ্বাল দিলে শুধুমাত্র কালচে নালী (মোলাসেস) তৈরি হয়।
  •             সাধারণতঃ আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশী হয়।

রোগের প্রতিকার ঃ

  •             রোগাক্রান্ত আখের জমিতে পুণরায় আখের চাষ করা যাবে না।
  •             রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
  •             ৫৪০ সে তাপমাত্রায় ৪ ঘন্টাকাল আর্দ্র গরম বাতাসে বীজ শোধন করতে হবে।
  •             রোপণের পূর্বে কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) নামক ছত্রাকনাশক (১ ভাগ ছত্রাকনাশকঃ ১০০০ ভাগ পানি) দ্রবনে ৩০ মিনিট কাল বীজ ভিজিয়ে রেখে শোধন  করতে হবে ।
  •             রোগাক্রান্ত গাছ দেখা দিলে ছাড়সহ সম্পূর্ণ গাছ তুলে ফেলতে হবে।
  •             জমির আগাছা পরিস্কার রাখতে হবে।
  •             আখের জমিতে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  •             নীচু জমিতে আখের চাষ করা যাবে না।
  •             জমিতে রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রোপিকোনাজোল (টিল্ট ২৫০ ইসি) ১ লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।

২। রোগের নাম ঃ  ফাপা শুষ্ক কান্ড বা উইল্ট রোগ (Wilt) রোগ

রোগের কারণঃ ফিউজারিয়াম মনিলিফরমি (Fusarium moniliforme) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার ঃ

রোগাক্রান্ত বীজ আখ, বাতাস, বৃষ্টির পানি এবং সেচের পানির মাধ্যমে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। আখের গোড়া বা মাটির নিচের অংশের ক্ষতের বা পোকার ক্ষতের মাধ্যমে রোগ-জীবাণু আখের ভিতরে প্রবেশ করে। এ রোগের ছত্রাক মাটিতে বহু বছর বেচে থাকে, কাজেই অনুকূল পরিবেশ পেলেই বীজ আখ রোপণের পর হতে আক্রমণ শুরু করে।

রোগের লক্ষণ ঃ

  •             এই রোগ দেখতে প্রায় লাল পচা রোগের মতই।
  •             সাধারণতঃ আখের বয়স ৬-৭ মাস না হলে এ রোগের লক্ষণ বোঝা যায় না।
  •             প্রথমতঃ আখের পাতা হলুদ হয়ে ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায় এবং নেতিয়ে পড়ে।
  •             প্রাথমিক অবস্থায় কান্ডের অভ্যন্তরে গিড়ার নিকট গাঢ় লাল রং দেখা যায়।
  •             লাল পচা রোগের ন্যায় উইল্ট রোগে আক্রান্ত আখের অভ্যন্তরেও লাল হয় কিন্তু কোন সাদা ছোপ থাকে না।
  •             রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি হলে আখের ভিতরে ফাপা খোলের মত এলাকার সৃষ্টি হয়, কান্ড শুকিয়ে কুচকিয়ে ক্রমান্বয়ে ঢলে পড়ে এবং মারা যায় ।
  •             আক্রান্ত আখের ফাপা স্থানে ধুসর রঙের মাইসেলিয়াম দেখা যায়।
  •             জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারি মাসে আখের পরিপক্ক অবস্থায় জমিতে রসের অভাব হলে এ রোগের প্রদুর্ভাব বেড়ে যায় এবং আখ দ্রুত শুকিয়ে মারা যায়।

রোগের প্রতিকার ঃ

  •             আক্রান্ত গাছ জমি থেকে শিকড় সমেত তুলে ফেলতে হবে।
  •             রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করা যাবে না।
  •             রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে।
  •             ৫৪০সে তাপমাত্রায় ৪ ঘন্টাকাল আর্দ্র গরম বাতাসে বীজ শোধন করতে হবে।
  •             রোপণের পূর্বে কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) নামক ছত্রাকনাশক (২ ভাগ ছত্রাকনাশকঃ ১০০০ ভাগ পানি) দ্রবনে ৩০ মিনিট কাল বীজ ভিজিয়ে রেখে শোধন  করতে হবে ।
  •             জমির আগাছা পরিস্কার রাখতে হবে।
  •             আখের জমিতে পানির নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  •             নীচু জমিতে আখের চাষ করা যাবে না।
  •             ক্ষেতের ফসলের উচ্ছিষ্টাংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
  •             রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের চাষ করা যাবে না।
  •             রোগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় মাটিতে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। (চলবে)

————————————–

লেখকঃ উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, শিবগঞ্জ, বগুড়া, বাংলাদেশ। মোবাইলঃ ০১৯১১-৭৬২৯৭৮

ইমেইলঃ zaman.path@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *