উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ হাবিপ্রবিঃ সফলতার ১৭ বছর

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ও মুনিরুজ্জামান

হিমালয়ের কুয়াশার কিছুটা নিদর্শনের দেখা মেলে, লিচুর রাজ্য নামে খ্যাত উত্তরের  বৃহত্তম জেলা দিনাজপুরে। শিক্ষিত করেছে হাজারো ছাত্রছাত্রি। উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ  দিনাজপুরে অবস্থিত বিদ্যাপিঠ হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ১৭ বছরের সফলতায় পদার্পণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার মান ও আসন সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে বিদেশী ছাত্রছাত্রিদের সংখ্যাও। লিচুর ক্যাম্পাস, সুন্দর পরিবেশের এই ক্যাম্পাসের মান বেড়েছে সারাদেশে, নিজের অবস্থান করে নিয়েছে এটি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে ছাত্রছাত্রী ভর্তির দিক দিয়ে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে এটি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক দিয়ে এটির অবস্থান দ্বিতীয়। বিজ্ঞান, মানবিক, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, ফিসারিজ, ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্স এবং বিজনেস স্টাডিস সহ এখন ২২ টি বিষয়ে ডিগ্রি দেয় এখান থেকে। বিভিন্ন অনুষদের বিদেশী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পায় ১৬৫ জনেরও অধিক। এই ক্যাম্পাসে পড়ার সুযোগ পেয়ে অনেকে নিজেকে ধন্যে করেছেন ভাল ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে। যারা এখন অধ্যায়ন করছেন তারা দেখছেন সোনালী ভবিষ্যত। ১৯৯৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে আজ সফলতায় শিখরে অবস্থান করছে হাবিপ্রবি।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য ও গর্বিত ঐতিহ্যের প্রতীক হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে রয়েছে এক ঐতিহ্যবাহী ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। স্বাধীনতার পরপরই উচ্চ শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকের আশা আকাঙ্খা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকার একটি বিজ্ঞান ও কারিগরি ভিত্তিক শিক্ষানীতি গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৭৩ সালে গঠন করেছিলেন ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। সে কমিশনের রিপোর্টও তৈরী হয়েছিল। সেই রিপোর্টে দেশের পশ্চাৎপদ উত্তরাঞ্চলকে এগিয়ে নেওয়াসহ দেশে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য দিনাজপুরে একটি বিজ্ঞান ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ ছিল। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার মত কলংকজনক ঘটনার পর সেই প্রগতিশীল শিক্ষা রিপোর্ট আর বাস্তবায়িত হয় নাই। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে এখানে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই) স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে ৩ বৎসর মেয়াদী কৃষি ডিপ্লোমা ডিগ্রী দেয়া হত। ১৯৮৮ সালে এটিআই-কে কৃষি কলেজে উন্নীত করা হয়।

কলেজটি দিনাজপুর তথা উত্তরবঙ্গের কৃতি সন্তান, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হাজী মোহাম্মদ দানেশ-এর নামে নামকরণ করা হয়।

১৯৯৬ সালে জাতির জনকের যোগ্য উত্তরসূরী বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃতাধীন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে। তারই ফলশ্রুতিতে সারা দেশে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রাথমিকভাবে রংপুর, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, পটুয়াখালী, টাঙ্গাইল ও রাঙ্গামাটিতে ৬টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যেগ নেয়। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরের বড় ময়দানে এক বিশাল জনসমাবেশে হাজী মোহাম্মদ দানেশ কৃষি কলেজকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ১৯৯৯ সনের ১১ই সেপ্টেম্বর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক স্বর্নোজ্জ্বল দিন। এ অঞ্চলের মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন উত্তরবঙ্গে প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়Ñহাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর-এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন।

অবস্থান

দিনাজপুর শহর হতে ১০ কি.মি. উত্তরে এবং দিনাজপুর-রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক সংলগ্ন পশ্চিমে সুরম্য অট্টালিকা ও বহু প্রজাতির সবুজ বৃক্ষ ঘেরা এই দৃষ্টি নন্দন ক্যাম্পাসটি অবস্থিত।

কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা

রিজেন্ট বোর্ড ও একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের আলোকে প্রশাসন ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে বিশ্ববিদ্যালয় তার যাবতীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা যেমন ফিন্যান্স কমিটি, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি, অনুষদীয় কমিটিসমূহ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কমিটি ও সকল একাডেমিক বিভাগের পাঠ্যক্রম কমিটির সহায়তা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ভাইস-চ্যান্সেলর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী। তিনি রিজেন্ট বোর্ড ও সরকারের নীতি-নির্দেশনা ও কর্ম কাঠামোর আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যাবলী পরিচালনা করে থাকেন। বর্তমান ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. রুহুল আমিন।

শিক্ষা কার্যক্রম

২০০০ সালে বি.এসসি এজি (অনার্স) প্রোগ্রামে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল একটি মাত্র অনুষদ “এগ্রিকালচার অনুষদ” নিয়ে। এ অনুষদের অধীন ১৪টি শিক্ষা বিভাগে ৫৩জন শিক্ষক, ১১ জন কর্মকর্তা, ১১০ জন কর্মচারী ৬৭ জন শ্রমিক ও পূর্ব থেকে ভর্তিকৃত ৭০০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে সীমিত পরিসরে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল। জানুয়ারি ২০০৩ এ আরও তিনটি নতুন অনুষদ কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস স্টাডিজ এবং ফিশারিজ অনুষদ খোলা হয় এবং ২০০৪ এ আরও একটি নতুন অনুষদ এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ফুড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং যুক্ত হয়। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৮ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত কলেজ “দিনাজপুর সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ” কে আত্তীকরণের মাধ্যমে ৭ম অনুষদ হিসেবে ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স” অনুষদ যুক্ত হয়। ২০১৫ সালে বিজ্ঞান অনুষদ নামে নতুন একটি অনুষদ চালু করা হয়। বর্তমানে ৮টি অনুষদের আওতায় ৪৩টি শিক্ষা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।

গবেষণা

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম দুটি প্রধান ধারায় পরিচালিত হয়ে থাকে। একটি ডিগ্রী গবেষণা ও অপরটি প্রকল্প গবেষণা। এমএস ও পিএইচ ডি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রী চাহিদার অংশ হিসেবে ডিগ্রী গবেষণা শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে, পক্ষান্তরে বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কোন বহিঃস্থ সংস্থার অর্থানুকূলে প্রকল্প গবেষণার কাজ পরিচালিত হয়। গবেষণা প্রকল্পসমূহ সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বিগত ২০০৪ সনে আইআরটি (Institute of Research and Training) প্রতিষ্ঠা করা হয়।

লাইব্রেরি

হাবিপ্রবিতে একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি রয়েছে। যার নিচ তলায় অফিস ও ইস্যু, দ্বিতীয় তলায় রেফারেন্স লাইব্রেরি ও ৩য় তলায় টিচার্স রিডিং রুমের ব্যবস্থা রয়েছে। লাইব্রেরিটিতে পঁচিশ হাজারেরও বেশী বইসহ গবেষণালদ্ধ থিসিস, রিপোর্ট ও জার্নাল রয়েছে।

আবাসন ব্যবস্থা

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ৩টি ছাত্রী হলসহ ৬টি আবাসিক হল।

জনবল

বিশ্ববিদ্যালয়টি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ২৬০ জন শিক্ষক, ১৫৯ জন কর্মকর্তা ও ৩৫০ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।

ভৌত অবকাঠামো

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত হাজী মোহাম্মদ দানেশ কৃষি কলেজের অবকাঠামোর উপর ভিত্তি করে কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল ও ক্রমবর্ধমান কর্মকান্ড সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনার জন্য আরও ভৌত সুবিধাদি গড়ে উঠেছে। এগুলোর মাঝে রয়েছে ৪টি একাডেমিক ভবন, ৩টি ছাত্রী হলসহ ৬টি আবাসিক হল, ১০০ আসন বিশিষ্ট ১টি সেমিনার রুম ও প্রশাসনিক ভবন। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে  সৌহার্দ ও সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে রয়েছে টিএসসি যেখানে রয়েছে ক্যাফেটেরিয়া ও ছাত্র সংসদ ভবনসহ সংস্কৃতি চর্চার সুব্যবস্থা। পঁচিশ হাজারেরও বেশী বইসহ গবেষণালব্ধ থিসিস, রিপোর্ট ও জার্নাল সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, টিএসসি, উন্নতমানের ক্রীড়া সরঞ্জাম সমৃদ্ধ জিমনেসিয়াম, খেলার মাঠ, নিজস্ব ৪জন ডাক্তার ও একটি এম্বুলেন্সসহ ১২ শয্যার আধুনিক মেডিকেল সেন্টার, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ, দুটি সুসজ্জিত অডিটোরিয়াম, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য কাবসমূহ, একটি ভিআইপি গেস্ট হাউজ, ২টি সুরম্য মসজিদ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসনের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরির আবাসিক ভবন, ১টি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ১টি শিশু পার্ক, রূপালী ব্যাংকের শাখা, মেঘনা ব্যাংকের শাখা,   পোস্ট অফিস, শ্রমিক ব্যারাক, স্কুল প্রভৃতি। রয়েছে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সুবিধা এবং নিজস্ব বৈদ্যুতিক লাইন এবং গবেষণা ও প্রশিণের সমন্বয় ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ইনস্টিটিউট অভ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইআরটি)। এছাড়া যাতায়াতের সুবিধার্থে ৮টি বড় বাস, ৩টি মিনিবাস, ২টি মাইক্রোবাস, ৪টি জীপ, ২টি পিক আপ এবং একটি এ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। অধিকন্তু, দুস্পাপ্য গাছ গাছালির আকর্ষণীয় সংগ্রহ নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি সমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং বিভিন্ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে গবেষণার জন্য বিভিন্ন জার্মপ্লাজম সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

————————————–

লেখকঃ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্স অনুষদ, ৪র্থ বর্ষ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর । মোবাইলঃ ০১৭২৩৭৮৬৮৭৭

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *