উপকূলীয় অর্থনীতিতে ইলিশের অবদান

নিতাই চন্দ্র রায়

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে  মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ এবং মৎস্য চাষে ৫ম। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৭ অনুসারে দেশের জিডিপির ৩.৬১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির ২৪.৪ শতাংশ অবদান মৎস্য খাতের। সারাদেশের প্রায় ১৫ লাখ নারীসহ  ১ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। আমাদের প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৬০ ভাগের যোগান দেয় মৎস্যখাত। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বাংলাদেশ আজ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এটা  মৎস্য চাষি, মৎস্য বিজ্ঞানী এবং বর্তমান মৎস্যবান্ধব সরকারের জন্য এক বিরাট অর্জন ও গৌরবের বিষয়। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশে মাছের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন, যার প্রায় ১২ শতাংশ হলো ইলিশ। আন্তর্জাতিক  মৎস্য গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে আহরিত ইলিশের ৭৫ শতাংশ হয় বাংলাদেশে। বাকি ২৫ শতাংশের মধ্যে ১৫ শতাংশ মিয়ানমারে, ৫ শতাংশ ভারতে এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য দেশে। স্বাদে ও গন্ধে বাংলাদেশের ইলিশের কোনো তুলনা হয় না। এজন্য ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও রয়েছে বাংলাদেশী ইলিশের বিপুল চাহিদা ও সুখ্যাতি। দেশের জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। প্রায় ২৫ লাখ লোক ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও এ সংক্রান্ত কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। স্মরণাতীত কাল হতে ইলিশ মাছ উপকূলীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। সুফলভোগীদের অংশ গ্রহণে অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ শিকার নিষিদ্ধকরণ, জাটকা সংরক্ষণ, সম্মিলিত বিশেষ অভিযান এবং মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানসহ  ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ইলিশ সম্পদ রক্ষায় সরকারিভাবে সামাজিত নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে জাটকা সমৃদ্ধ ১৭ জেলার ৮৫ টি উপজেলায় জাটকা আহরণে বিরত ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৩টি জেলে পরিবারকে  মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য মোট ৩৮ হাজার ১৮৮ মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময় ছাড়াও মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালীন ২২ দিনের জন্য ২০ কেজি হিসেবে মোট ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৭২৩ টি জেলে পরিবারকে মোট ৭ হাজার ১৩৪ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। মৎস্য চাষিদের জন্য প্রদেয় প্রণোদনা ও সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইলিশ আহরণে সম্পৃক্ত মৎস্যজীবীসহ দেশের ১৪ লাখ ২০ হাজার মৎস্যজীবীকে পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। এসব মৎস্য ও সমাজবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণের ফলে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়। অথচ ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ২ লাখ  ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে শতকরা প্রায়  ৬৬ শতাংশ। ইলিশের মতো একটি অন্যন্য প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার অন্যতম কৌশল হচ্ছে জাটকা সংরক্ষণ ও মা ইলিশ  সুরক্ষা। প্রজননের পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশকে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। তাই জাটকা সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবারের ন্যায় এ বছরও ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ ‘ জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০১৮’  উৎযাপন করা হয়েছে। ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে এবছরের শ্লোগান  হলো- ‘জাটকা ধরে করবো না শেষ, বাঁচবে জেলে হাসবে দেশ’। বিশেষজ্ঞগণের মতে, বছরে যে পরিমাণ জাটকা ধরা হয়, তার অর্ধেক রক্ষা করা গেলেও ইলিশের উৎপাদন ৫০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। কারো কারো মতে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরার ওপর আট মাস  নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সরকার জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয় মাত্র চার মাস- মার্চ থেকে জুন। বাকি চার মাস জেলে পরিবারের সদস্যদের  মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। তাই এই অবস্থা উত্তরণে সরকরের উচিত বাকি চার মাসের জন্যও জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

প্রজনন মৌসুমে যদি সর্বাধিক সংখ্যক ইলিশ ডিম ছাড়তে পারে এবং ছোট ইলিশ নির্বিঘেœ বড় হতে পারে,  তা হলেই বাংলাদেশের ছোট-বড় নদীগুলো আবার রূপালী ইলিশে ভরে উঠবে। দেশের ধনী-গরীব সবাই উপভোগ করতে পাববে সুগন্ধী ইলিশের স্বাদ।

দেশের রপ্তানি আয়েও  ইলিশের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে তিন হাজার ৬৮০ টন ইলিশ রপ্তানি করা হয়। উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে ২০১০-১১অর্থ বছরে ইলিশ রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৫৩৮ টনে এবং তাতে আয় হয় তিন হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালের ৩১ জুলাই থেকে  ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কিছু সংখ্যক অসৎ জেলে ও  মৎস্য ব্যবসায়ী অবৈধভাবে চোরাই পথে প্রতিবেশি দেশ ভারতে ইলিশ পাচার করছে। এতে দেশ হারাচ্ছে  প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। তাই দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে  সরকার  রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদীকেন্দ্র চাঁদপুর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। ওই সময় সমুদ্রের লোনা পানি থেকে ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য নদীর মিঠা পানিতে আসে। এ বছর বৃষ্টিপাত, ঝড়ো হাওয়া ও নদীতে পানির প্রবাহ ছিল বেশি। অনুকূল পরিবেশে  বেশি সংখ্যক মা ইলিশ সমুদ্রের লোনা পানি ছেড়ে নদীর মিঠা পানিতে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য। ইলিশের নিরাপদ প্রজননের জন্য ১ থেকে ২২  অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ ছিল। ১১ সদস্যের একটি দল ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ শে অক্টোবর পর্যন্ত ২৫ দিন নদীতে গবেষণা চালায়। গবেষণায় শিকার করা ইলিশের মধ্যে কত শতাংশ পুরুষ ইলিশ , কত শতাংশ স্ত্রী ইলিশ, ধরা পড়া মাছের পরিমাণ, কত ভাগ মাছের পেটে ডিম রয়েছে, কোনো অঞ্চলে কত সংখ্যক মাছ ডিম দিচ্ছে এবং তার মধ্যে কত শতাংশ পোনা বেঁচে থাকে-  প্রভৃতি বিষয়গুলি গুরুত্ব সহকারে  নিরীক্ষণ করা হয়।  শরীয়তপুরের তারাবানিয়া, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও ঈশানবালা, লক্ষèীপুরের রামগতি, নোয়াখালির হাতিয়া, ভোলার মনপুরা, দৌলতখান ও ইলিশা এবং বরিশালের মেহেদীগঞ্জ এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এ বছর ৪৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ মা ইলিশ প্রজননে সক্ষম হয়েছে। এ সময়ে নদীতে পোনা ছাড়ার সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার কোটি। নদীতে ২৪ ঘণ্টায় দু‘বার জোয়ার ভাটার সৃষ্টি হয়। ওই সময় জেলেরা দু‘বার ইলিশ শিকার করেন। একটি ইলিশ মাছ ১০ থেকে ১২ লাখ পোনা ছাড়তে পারে। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এ বছর আড়াই শতাংশ বেশি পোনা উৎপন্ন হয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে ও পরে ইলিশের ব্যাস ও পরিপক্কতারমান সর্বোচ্চ পাওয়া যায়। ইলিশ সাধারণত সন্ধ্যায় ডিম ছাড়ে।  চাঁদের সঙ্গে ইলিশের ডিম ছাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। পানির গুণাগুণের ওপর নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু উৎপাদিত হওয়ার সময় নির্ভর করে। আর জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি ইলিশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। ইলিশের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার। আগে এই এলাকায় প্রতিবছর বড় পূর্ণিমার ৩ দিন আগে ও ১১ দিন পরে মোট ১৫ দিন মা ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করা হতো। ২০১৬ সাল থেকে বড় পূর্ণিমার ৪ দিন আগে ও পূর্ণিমার দিন এবং পরের ১৭ দিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়।  এতে পূর্ণিমার সাথে পরবর্তী অমাবশ্যাকে যুক্ত করা হয়।এ কারণে গত দুই বছর ধরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ বছর নদীতে যে পরিমাণ পোনা আছে, তাতে চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরে ৬ লাখ টনের বেশি ইলিশ পাওয়া  যেতে পারে। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হিসেবে যার বাজার মূল্য  হবে ২৪ হাজার কোটি টাকা।

————————————–

লেখকঃ

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিঃ, ৪৫/১ হিন্দু পল্লী , ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

মোবাইল;০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইল:netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare