এ সময়ের কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. এ. মান্নান

প্রিয় পাঠক,
সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি এ সময়ের কৃষি৷ চলুন জেনে নেই কী কী থাকছে এ পর্বে৷ প্রথমেই ধান৷
ধান
ধান গাছের বয়স ৪৫-৫০ দিন হলে ইউরিয়ার শেষ কিস্তি উপরি প্রয়োগ করে দিন৷ ইউরিয়া সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করে নিন এবং সার দেয়ার সময় জমিতে ছিপছিপে পানি রাখুন৷
এ সময় বৃষ্টির অভাবে খরা দেখা দিতে পারে৷ খরায় আমন ধানের ফলন কমে যায়৷ এ জন্য সম্পূরক সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করুন৷ ফিতা পাইপ দিয়ে সম্পূরক সেচ দিতে পারেন৷ মনে রাখবেন সম্পূরক সেচ আমন ধানের ফলনকে বাড়িয়ে দেয়৷ এ সময় ধানক্ষেতে রোগ পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে৷ সতর্কতার সঙ্গে রোগ পোকা দমনের ব্যবস্থা করতে হবে৷ ক্ষেতে ডাল বা কঞ্চি পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি পোকা ধরে খাবে৷
হাতজাল দিয়েও পোকা ধরা যায়৷ রোগ পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেই কেবল অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করুন৷ তবে এ ক্ষেত্রে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করুন৷ নিচু এলাকায় এখনো আমন ধানের চারা রোপণ করা যাবে৷ আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্থানীয় জাতের উন্নতশাইল ধানের চারা রোপণ করা যাবে৷ আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্থানীয় জাতের উন্নতশাইল ধানের চারা রোপণ করতে পারেন৷ তবে এ ক্ষেত্রে প্রতি গুছিতে ৫-৭টি চারা রোপণ করুন৷ দেরিতে চারা রোপণের জন্য কিছুটা বেশি বয়সের চারা লাগাতে হবে এবং ইউরিয়া সারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে৷
আখ
18
আখের চারা উত্‍পাদন করার উপযুক্ত সময় এখন৷ সাধারণত বীজতলা পদ্ধতি এবং পলিব্যাগ পদ্ধতিতে চারা উত্‍পাদন করা যায়৷ তবে পলিব্যাগে চারা উত্‍পাদন করলে বীজ আখ কম লাগে এবং চারার মৃতু্যহার কম হয়৷ এছাড়া পলিব্যাগের চারা বাড়ির আঙিনায় সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তর করা যায়৷ চারার বয়স ১-২ মাস হলে মূল জমিতে রোপণ করুন৷
বিনা চাষে ফসল
জমি থেকে পানি নেমে গেলে বিনা চাষে বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করা যায়৷ পলিপড়া জমিতে ভুট্টা, গম, সরিষা, মাসকলাই, মুগ বুনে দিন৷ এতে কম খরচে দ্রুত ফসল পাবেন৷
সবজির চারা উত্‍পাদন
শীতকালীন সবজি উত্‍পাদনের জন্য বীজতলায় চারা উত্‍পাদনের উপযুক্ত সময় এখন৷ উঁচু জমি যেখানে পানি জমে না এবং জমিতে আলো-বাতাস লাগে এমন জায়গায় বীজতলা তৈরি করুন৷ বীজতলার জন্য জমিতে ভালো করে চাষ দিন এবং চাষের সময় প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ১০ কেজি জৈব সার ও ৩০০ গ্রাম টিএসপি মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিন৷ জমি দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা করে বেড তৈরি করুন৷ দু’টি বেডের মাঝখানে ৬০ সেন্টিমিটার ফাঁকা রাখুন৷ এ ফাঁকা স্থানের মাটি কোদাল দিয়ে দু’ বেডে উঠিয়ে দিন৷ এ ক্ষেত্রে নালার গভীরতা হবে ১৫ সেন্টিমিটার৷ মাটির এক থেকে দেড় সেন্টিমিটার গভীরে বীজ বপন করতে হয়৷ প্রতি বর্গমিটার জায়গার জন্য ফুলকপির বীজ ৪০-৫০ গ্রাম, বাঁধাকপির বীজ ৫০-৬০ গ্রাম, বেগুনের বীজ ৮০-১০০ গ্রাম, টমেটোর বীজ ৮০-১০০ গ্রাম প্রয়োজন হয়৷ বীজ বোনার পর বেডগুলো চাটাই বা পলি শীট দিয়ে ঢেকে রাখুন৷ চারা গজানোর পর সকালে ও বিকেলে হালকা রোদ লাগার ব্যবস্থা করুন এবং কড়া রোদ যাতে না লাগে সেদিকে খেয়াল করুন৷
19
শাক সবজি চাষ
শীতের সবজি উত্‍পাদনের জন্য উপযুক্ত জমি ভালো করে চাষ দিন৷ চাষের সময় পরিমাণ মতো জৈব ও রাসায়নিক সার মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিন৷ এ সময় বিভিন্ন ধরনের শাক যেমন- মূলা, লালশাক, পালংশাক, চিনাশাক, সরিষা শাকের বীজ বপন করতে পারেন৷ ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, টম্যাটো, বেগুনের চারা মূল জমিতে রোপণ করতে পারেন৷ শিম, লাউ, মিষ্টি কুমড়ার বীজ/চারা রোপণ করুন৷ নিয়মিত সেচ দিন, আগাছা পরিষ্কার করুন এবং রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ করুন৷
কলা
এ সময় হলো কলার চারা রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়৷ বিশ্বস্ত চাষির কাছ থেকে কলার চারা সংগ্রহ করুন৷ অমৃত সাগর, মেহের সাগর দুই থেকে আড়াই মিটার দূরে দূরে রোপণ করুন৷ চারা রোপণের জন্য ৬০ সেমি. গভীর এবং ৬০ সেমি. চওড়া গর্ত করুন৷ প্রতি গর্তের মাটির সঙ্গে ৫-৭ কেজি গোবর, ১২৫ গ্রাম ইউরিয়া, ১২৫ গ্রাম টিএসপি, ১২৫ গ্রাম এমওপি, ৫০০ গ্রাম খৈল এবং ৫ গ্রাম বরিক এসিড ভালোভাবে মেশাতে হবে৷ সার মেশানোর ৫-৭ দিন পর কলার চারা রোপণ করুন৷
গাছপালা
রোপণ করা চারা কোনো কারণে মরে গেলে সেখানে নতুন চারা রোপণ করুন৷ বড় হয়ে যাওয়া চারার সঙ্গে বাঁধা খুঁটি সরিয়ে দিতে পারেন এবং চারার চারদিকের বেড়া প্রয়োজনে সরিয়ে বড় করে দিতে হবে৷ মরা বা রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে৷ বৃক্ষজাতীয় গাছের গোড়ার দিকে ছোট ছোট ডালপালা ছেঁটে দিন৷ চারা গাছসহ অন্যান্য গাছে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় এখন৷ গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করে গোড়ার মাটি ভাল করে কুপিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে৷ দুপুর বেলা গাছের ছায়া যতটুকু স্থানে পড়ে ঠিক ততটুকু স্থান কোপাতে হবে৷ কোপানো স্থানে জৈব ও রাসায়নিক সার ভালো করে মিশিয়ে দিন৷
20
ইঁদুর নিধন
এ সময়ে দেশব্যাপী ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়৷ ক্ষেতে ইঁদুরের কারণে সফলের ক্ষতি কমানোর জন্য আপনিও এ অভিযানে অংশ নিন৷ সম্মিলিতভাবে ইঁদুর নিধন করুন৷ ইঁদুর নিধনের ক্ষেত্রে যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় সেগুলো হ’ল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক চাষাবাদ, গর্তে ধোঁয়া দেয়া, ফাঁদ পাতা, উপকারী প্রাণী যেমন- পেঁচা, গুইসাপ, বিড়াল দ্বারা ইঁদুর দমন, বিষটোপ এবং গ্যাস বড়ি ব্যবহার করুন৷
পশুপাখি
এ সময়ে গবাদিপশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো দরকার৷ গর্ভবর্তী গাভীর, সদ্য ভূমিষ্ঠ বাছুর ও দুধালো গাভীর বিশেষ যত্ন নিন৷ গবাদিপশুর তড়কা, গলাফোলা, মুরগির রাণীক্ষেত এবং হাঁস-মুরগির কলেরা রোগের প্রতিষেধক টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করুন৷ মুরগির ছোট ছোট বাচ্চার ককসিডিয়া রোগ সারাতে জরুরিভিত্তিতে চিকিত্‍সার ব্যবস্থা করুন৷
মাছ চাষ
বর্ষায় পুকুরে জন্মানো আগাছা পরিষ্কার করুন এবং পুকুরের পাড় ভালো করে বেঁধে দিন৷ আপনার পুকুরের মাছকে নিয়মিত পুষ্টিকর সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করুন৷ এ সময় পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য উত্‍পাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করুন৷ তাছাড়া পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন এবং রোগ সারাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন৷ এ সময় সরকারি ও বেসরকারি মাছের খামার থেকে জিয়ল মাছের পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে পারেন৷
প্রিয় পাঠক, কৃষিবিষয়ক যেকোনো পরামর্শ জানতে যোগাযোগ করুন আপনার নিকটস্থ কৃষি কর্মীর সঙ্গে, পত্রলিখুন কৃষিবার্তায়, ফোন করুন-০১৯১৫৪৭৩৩০৮ নাম্বারে, শেষ করছি এসময়ের কৃষি৷ ততদিন ভালো থাকুন, সুন্দর থাকুন৷ আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন৷
Dhaka villages 139

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *