এ সময়ের কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. এ. মান্নান

ধান

ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের ভাষা রক্ষায় শহীদ হয়েছেন সালাম, বরকতসহ আরও অনেকে। তাঁদের প্রতি ছালামও শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু করছি এ সময়ের কৃষি। ফেব্র“য়ারি মাস মানেই বসন্তের শুরু। ঘন শীতকে বিদায় জানিয়ে বসন্ত শুরু হয় নতুন সাজে। বসন্তের প্রকৃতি সত্যিই অতুলনীয়। গাছে গাছে নব পল্লবের সবুজ আভা, বনে বনে ফুলের সমাহার, কোকিলের মিষ্টি সুর, নির্মল বাতাস সবই বসন্তের অপরূপ শোভা।

ধান

এখন বোরো ধান লাগানোর শেষ অবস্থা কোন কোন ক্ষেত্রে ধানের বাড়ন্ত অবস্থা। ধানের চারার বয়স ৩৫-৪০ দিন হলে ইউরিয়া ২য় কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করুন। তবে সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করুন এবং জমির পানি সরিয়ে নিন। অবশ্য আপনার ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া দিয়ে থাকলে ইউরিয়ার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে না। মনে রাখবেন, ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩-৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখা প্রয়োজন। এ সময় বোরো ধান ক্ষেতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয়ে থাকে। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অবলম্বন করুন। আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, ক্ষেতে ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে পোকা নিয়ন্ত্রণ করুন। এসব পদ্ধতিতে পোকা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক সঠিক পদ্ধতিতে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে প্রয়োগ করে পোকা নিয়ন্ত্রণ করুন। মনে রাখবেন, বালাইনাশক প্রয়োগ করে পোকা নিয়ন্ত্রণ হলো সর্বশেষ পন্থা।

আর কিছু দিন পরেই বৃষ্টিনির্ভর উচ্চফলনশীল আউশ হিসেবে বিআর ২০, বিআর ২১ এবং বিআর ২৪ জাতের ধান চাষ করতে পারেন। এ জাতগুলো স্বল্পমেয়াদি এবং ফলনের দিক থেকে দেশী আউশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ছিটিয়ে বা লাইন করে এগুলো বপন করা যায়। ছিটিয়ে বুনলে হেক্টরপ্রতি ৭০ কেজি এবং লাইনে বুনলে হেক্টরপ্রতি ৪৫ কেজি বীজ প্রয়োজন। এসব ধানের জন্য সারের মাত্রা হলো- প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ১৩০ কেজি। শেষ চাষের সময় ইউরিয়া তিন ভাগের এক ভাগ ও অন্যান্য সার সবটুকু জমিতে দিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া পরে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। চারার বয়স ৪০-৪৫ দিন হওয়া পর্যন্ত জমিতে যেন আগাছা না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

ভুট্টা

বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করতে পারলে ভালো হয়। জমিতে ৭০-৮০% গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করা যায়।  সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। ভুট্টার দানা মোচা থেকে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। ভুট্টার দানা মোচা থেকে ছাড়ানো বেশ কষ্টকর। অনেকে এ কাজটি হাত দিয়ে করে থাকেন। অবশ্য হস্তচালিত ভুট্টা মাড়াইযন্ত্র দিয়ে অতি সহজে ভুট্টা ছাড়ানো যায়। যন্ত্রটির দামও খুব বেশি নয়। ভুট্টা গাছ জ্বালানি ও পশু খাদ্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সতর্কতার সাথে গাছ তুলে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। খরিফ মৌসুমে ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই উন্নত জাতের ভুট্টার বীজ সংগ্রহ করে বপন করুন ও প্রয়োজনীয় যতœ নিন।

শাকসবজি

এ সময় বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে গ্রীষ্মকালীন শাক সবজি যেমনঃ ডাঁটা, কলমিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটল চাষের উদ্যোগ নিতে পারেন। তাছাড়া মাদা তৈরি করে চিচিঙা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়ার বীজ বুনে দিন। সবজি চাষের জন্য পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করুন।

অন্যান্য ফসলঃ ঝড়-বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আগেই পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, তেল ও ডাল ফসল ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। চিনা, কাউনের শীষ বের হওয়ার সময় মাটিতে রসের পরিমাণ সবুজ সার ফসল বিশেষ করে ধৈঞ্চা চাষের উদ্যোগ নিতে পারেন।

গাছপালা

এ মাসে আমের মুকুল আসে। এজন্য আমের মুকুলের রোগ/পোকার আক্রমণ থেকে সতর্ক থাকা উচিত। আমের মুকুল মটর দানার মত গুটি হয়ে মেঘলা আবহাওয়ায় কীটনাশক বা শুধু পানি ¯েপ্র করে হপার পোকা দমন করতে হবে। কাঁঠালের ফল পচা ও মুচি ঝরা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজনে রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এ সময় বাডিং পদ্ধতিতে বরই গাছের কলম করা যায়। এজন্য প্রথমে বরই গাছ ছাঁটাই করতে হয় এবং পরে উন্নত বরই গাছের কুঁড়ি দেশী জাতের গাছে সংযোজন করতে হয়।

মাছ

মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি ও সংস্কার করার উপযুক্ত সময় এখন। শীতের পরে এ সময় মাছের বাড়বাড়তি দ্রুত হয়। তাই পুকুরে প্রয়োজনীয় খাবার দিন এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন। মাছ চাষের ক্ষেত্রে স্থানীয় মৎস্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

পশুপাখি

গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিন এবং কৃমিনাশক খাওয়ান। গবাদিপশুকে উন্নত খাবার খেতে দিন, যেমন- সবুজ ঘাস, ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র, ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক, সংরক্ষণ করা ভুট্টা গাছ এসব। হাঁস-মুরগির প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিয়ে নিন এবং পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করুন।

প্রিয় পাঠক, কৃষি একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই এ ক্ষেত্রে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। আপনার যে কোনো সমস্যায় স্থানীয় কৃষিকর্মীর সাহায্য নিন। স্বনির্ভর দেশ গড়তে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করুন।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *