এ সময়ের কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. এ. মান্নান

সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি এ সময়ের কৃষির বিস্তারিত পরিবেশনা।
ধান
অগ্রহায়ণ মাস কৃষিতে করনীয়।
কৃষিজীবী ভাই ও বোনেরা নবান্নের শুভেচ্ছা রইল। এ লেখা যখন আপনাদের হাতে পৌঁছবে তখন হবে নবান্নের মাস অগ্রহায়ণ। আপনারা সবাই এখন ব্যস্ত আমন ধান কাটা মাড়াই-ঝাড়াই ও সংরক্ষণ নিয়ে। তবু বলছি আমন ধান কাটার পুরো মৌসুম এখন। ক্ষেতের শতকরা ৮০ ভাগ ধান পাকলে আর দেরি না করে ফসল কাটতে হবে। ক্ষেতের ধান কেটে মাড়াই-ঝাড়াই এর পর রোদে ভালভাবে শুকিয়ে নিন যাতে বীজের আদ্রতা ১২% এর নিচে থাকে। এ বীজ পরবর্তী আমন মৌসুমের জন্য ভালভাবে সংরক্ষণ করুন।
নতুন ধরণের নানা ব্যঞ্জনায় এ মাসটা হয়ে উঠে আমদের কাছে অত্যন্ত আনন্দ মুখর। নতুন ধানের চিড়া, মুড়ি, পায়েস, পিঠা-পুলি এসব খাওয়ার উৎসব চলে এ মাসে। পাশাপাশি এ বাড়ি ও বাড়িতে নিমন্ত্রণ চলে উৎসব মুখর পরিবেশে। নতুন ধানের চালের গরম ভাত খেয়ে সকালে আপনারা বেরিয়ে পড়েন ফসলের মাঠে।
এ রবি মৌসুমের চাষাবাদ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। উচ্চফলনশীল বোরো ধানের বীজতলা তৈরী, গম বীজ বপন, আলু, মিষ্টি আলুসহ অন্যান্য রবি ফসল ও শীতকালীন সবজির পরিচর্যা এসব বিষয়ে ব্যস্ততা আর কর্মমুখরতায় কেটে যাবে আপনাদের সারাটা মাস। আসুন এবার দেখা যাক, এ মাসে আমাদের ফসল, বনজ, মৎস্য ও পশু সম্পদ বিষয়ক করণীয় বিভিন্ন দিকের সংক্ষিপ্ত বিবরণী।

অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত গম বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। গমের আধুনিক কয়েকটি জাত হচ্ছে- আনন্দ, বরকত, আকবর, সোনালি, অঘ্রাণী, কাঞ্চন, প্রতিভা, সৌরভ, গৌরব ইত্যাদি। মাটি ভালবাবে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। শেষ চাষের সময় নিম্নবর্ণিত সার প্রয়োগ করুন।

সেচ ছাড়া চাষ করলে সবগুলো সার একত্রে জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। সেচ দিয়ে চাষ করলে তিন ভাগের দু’ভাগ ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের সম্পূর্ণ জমি তৈরির সময় এবং বাকি ইউরিয়া পরবর্তিতে। তবে মনে রাখতে হবে মাটি পরীক্ষা করে সার দেওয়া ভাল।
বীজ বপনের ১৭-২০ দিন পর (তিন পাতা হলে) উপরি প্রয়োগ করতে হবে। বীজের পরিমান হেক্টর প্রতি ১২০ কেজি বা বিঘা প্রতি ১৬ কেজি বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স প্রতি ১ কেজি বীজে ৩ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিন।
উফশী বোরো ধানের বীজতলা তৈরি

পুরো অগ্রহায়ণ মাসেই উফশী বোরো ধানের বীজতলা তৈরি করা যায়। আলো বাতাসপূর্ণ উর্বর জমি যেখানে পানি দাঁড়ায় না, অথচ প্রয়োজনীয় সেচের ব্যবস্থা আছে এমন জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করতে হবে। বীজতলার জমিতে প্রথমে পানি দিয়ে ভিজিয়ে পরে ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে থকথকে কাদাময় ও সমতল করে তৈরি করা প্রয়োজন। জমি তৈরির পর জমিকে কয়েকটি খন্ডে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। এক মিটার চওড়া ও যে কোন দৈর্ঘ্যেরে বীজতলা তৈরি করা যায়। বীজতলার দু’ পাশ থেকে মাটি তুলে বীজতলায় দিলে বীজতলা উঁচু হবে। এবং ৪০-৫০ সে: মি: চওড়া নালা তৈরি হবে, যা সেচ বা পানি নিকাশের জন্য সহায়ক হবে। আগাছা দমন ও অন্যান্য পরিচর্যার জন্য নালা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ৮০ গ্রাম অংকুরিত বীজের দরকার হয়। উর্বর বীজতলায় সাধারণত সারের প্রয়োজন হয় বা তবে মাটি খুব অনুর্বর হলে প্রতি বর্গমিটারে ২ কেজি গোবর বা আবর্জনার পচা সার ব্যবহার করা যেতে পারে। পরবর্তিতে চারা যদি হলদে হয়ে যায় তাহলে চারা গজাবার দু’ সপ্তাহ পর প্রতি বর্গমিটার ৭ গ্রাম হারে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

আজকাল শুকনা বীজতলার জনপ্রিয়তার বাড়ছে। শুকনা বীজতলা নিয়ে অন্য কোন দিন বিস্তারিত বলব। শুধু এতটুকু বলব, শীতের প্রকোপ বেড়ে গেলেও শুকনা বীজতলার চারা শীতের ক্ষতিতে পড়ে না।
সরিষা ফসলের যতœ
সরিষা গাছের বয়স ২০-২৫ দিন হলে এ সময় হেক্টরপ্রতি ৭০ কেজি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করা দরকার। তবে সোনালী জাতের সরিষার বেলায় হেক্টর প্রতি ৯২ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করা দরকার। সুযোগ থাকলে উপরি সার প্রয়োগের পর একটি হালকা সেচ দেওয়া ভাল।
জাব পোকা সরিষা গাছের রস চুষে খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। গাছের ফুল আসার সময় সাধারণত এরা আক্রমণ করে। আক্রমণ ব্যাপক হলে গাছ নিস্তেজ হয়ে যায় এবং ফলন্ত গাছের শুটিতে দানা হয় না। ম্যালাথিয়ন বা ডায়জিনন জাতীয় তরল কীটনাশক সঠিক মাত্রায় জমিতে ছিটিয়ে এ পোকার আক্রমণ দমন করা যায়।
গোল আলু ক্ষেতে উপরি সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা

চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর দু’সারির মাঝখানের মাটি কুপিয়ে দু’পাশ থেকে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে কেইল তৈরি করুন। চারার বয়স ৪০-৫০ দিন হলে চারার পাশ দিয়ে হেক্টর প্রতি ১৬০ কেজি ইউরিয়া ও ১৫০ কেজি এমপি সার উপরি প্রয়োগ করুৃন। সার উপরি প্রয়োগের পর কেইল উঁচু করে দিতে হবে এবং দু’একদিনের মধ্যে কেইলের আধাআধি ভরে সেচ দিন। সেচের পর ‘জো’ আসলে মাটির আস্তর ভেঙে দিতে হবে। ক্ষেতে রোগাক্রান্ত বা অস্বাভাবিক গাছ দেখা গেলে তা তুলে ফেলুন। বীজ লাগানোর ৬০ দিন পযন্ত আলুর জমিতে আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবে না। আগাছা দমন গাছের গোড়ায় মাটি দেয়া একই সময় করা যেতে পারে।
অন্যান্য করণীয়

* গত মাসে রোপণকৃত আখের জমিতে কিছু চারা মারা গিয়ে থাকলে এসব ফাঁকা জায়গায় এসময় সমবয়সী চারা রোপণ করে শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে। এছাড়া আগাছা দমন, মাটি আলগাকরণ, গোড়ায় মাটি দেয়া, সার প্রয়োগ, সেচ এসব পরিচর্যা করতে হবে।
* ইতিমধ্যে আলু, মিষ্টি আলু, চিনা, কাউন, কেসারি, মসুর, মটরশুটি, ছোলা, সয়াবিন, মরিচ, পিয়াঁজ, রসুন ইত্যদি লাগিয়ে না থাকলে এ মাসেই এসব ফসলের বীজ বপনের কাজ শেষ করতে হবে।
* শীতকালীন সবজি যেমন- ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রেককি, ওলকপি বড়ো হওয়ার সাথে সাথে চারার গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া দরকার। চারার বয়স ২-৩ সপ্তাহ হলে ইউরিয়া ও এমপি সার উপরি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
* তুলার চারার বয়স ১০-১২ সপ্তাহ হলে শেষবারের মত হেক্টরপ্রতি ৩০ কেজি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন।

পশুসম্পদ
এ সময় গবাদিপশুর খুরা রোগ, তড়কা, গলাফুলা, মুরগীর রাণীতে, কলেরা, বসন্ত, এবং হাঁসের প্লেগ, রোগ দেখা দিতে পারে। তাই গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিকে অবিলম্বে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

মৎস্য
এ সময় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি চুন প্রয়োগে শোধন করে নেয়া দরকার যাতে মাছের রোগ প্রতিরোধ হয়। এ ছাড়া পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ পরীক্ষা করে নিতে হবে। এ সময় পানিতে পরিমাণমত রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা দরকার।

বনজসম্পদ
বর্ষায় রোপিত ফলজ ও বনজ গাছের চারার এ সময় যতœ দিতে হবে। গাছের গোড়ার মাটি আলাদা করে দিতে হবে। আগাছা পরিস্কার করতে হবে এবং খুঁটি পুঁতে চারা গাছকে শক্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলন্ত গাছ কিংবা দীর্ঘমেয়াদী বনজ গাছের গোড়ায় পরিমাণমত রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *