এ সময়ের কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. এ. মান্নান

প্রিয় পাঠক, যখন এ লেখা আপনার হাতে পৌঁছল তখন পৌষ মাস। কুয়াশা-ঢাকা, শিশির মাখা এ মাসে বাঙলার কৃষাণ-কৃষানীর মনে দোলা দেয় পৌষ পার্বণের আনন্দ সুপ্রিয় পাঠক, সাবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি এসময়ের কৃষি।

ধান

এ সময়ে বোরো ধানের বীজতলার যতœ নিতে হয়। বীজতলায় প্রয়োজনীয় সেচ দিন কারণ বীজতলা শুকিয়ে গেলে চারার শিকড়গুলো লম্বা হয়ে যায় এতে চারা তোলার সময় শিকড় ছিঁড়ে যেতে পারে আবার বীজতলায় কোন কারণে পানি জমে গেলে তা বের করে দিতে হবে বীজতলার চারার পুষ্টির অভাবে লাল হয়ে গেলে সামান্য ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিন  শীতের প্রাদুর্ভাব বেশি হলে রাতে পলিথিন শিট দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখুন মনে রাখবেন সুস্থ সবল চারা অধিক ফলনের পূর্বশর্ত।

চারার বয়স ৩৫-৪০ দিন হলে মূল জমিতে চারা রোপণ শুরু করতে পারেন  এ জন্য জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে কাদা করতে হবে  চাষের আগে জমিতে জৈব সার দিতে হবে এবং শেষ চাষের আগে ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য রাসায়নিক সার দিতে হবে  পরে চারা লাগানোর ৭ দিন পর চারটি গোছার মাঝখানে একটি গুটি ইউরিয়ার গুটি পুঁতে দিতে হবে। মাটি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে জমির উবর্রতার উপর সারের মাত্রা নির্ভর করে গড়ে প্রতি হেক্টর জমির জন্য সারের পরিমাণ হলো-জৈব সার ৫ মেট্রিক টন, ইউরিয়া ২২০-২৭০ কেজি, টিএসপি ১২০-১৩০ কেজি, পটাশ সার ৮৫-১২০ কেজি, জিপসাম ৬০-৭০ কেজি, দস্তা ১০ কেজি বীজতলা থেকে সাবধানে চারা তুলে এনে মূল জমিতে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার বজায় রেখে চারা রোপণ করতে হবে প্রতি গোছায় ১-২ টি সুস্থ চারা রোপণ করলে ফলন ভালো হয় আজকাল ড্রাম সিডার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ড্রাম সিডার মূলত কাদা জমিতে অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনার কাজে ব্যবহৃত হয় আপনি ইচেছ করলে ড্রাম সিডার দিয়ে অঙ্কুরিত রোরো ধান বীজ বুনতে পারেন  এত অল্প সময়ে অধিক জমিতে অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনা সম্ভব ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনা যায় বলে আলাদা বীজতলা থেকে চারা উত্তোলন, চারা রোপণ এসব আনুষঙ্গিক কাজগুলো করতে হয় না ফলে শ্রম ও খরচ দুই কম লাগে আবার সরাসরি বপণের ক্ষেত্রে ১০ দিন আগে ধান পেকে যায় এবং শতকরা ১০-১৫ ভাগ ফলন বেশি হয়  তাই আপনি ড্রাম সিডার দিয়ে অঙ্কুরিত ধান বীজ জমিতে বপণ করতে পারেন।

গম

গমের জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সেচ দেয়ার উপযুক্ত সময় এখন  চারার বয়স ১৭-২১ দিন হলে গম ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করে হেক্টর প্রতি ৩০-৫০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ সেচ দিন সেচ দেয়ার পর জমিতে জোঁ আসলে মাটির উপর চটা ভেঙে দিতে হবে তাছাড়া গমের জমিতে যেখানে ঘনচারা রয়েছে সেখানের কিছু চারা তুলে পাতলা করে দিন।

ভূট্টা

গমের মতোই ভূট্টা জমির আগাছা পরিষ্কার করুন এবং অতিরিক্ত চারা তুলে ফাঁকা স্থানে লাগিয়ে দিন এবং ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন এ সময় চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিন এবং প্রয়োজন মাফিক সেচ প্রয়োগ করুন।

আখ আখের মধ্যম জাতের বীজখন্ড রোপণ করার সময় কার্তিকের ১৬ হতে পৌষের ১৫ তারিখ পর্যন্ত তাই এখন মধ্যম সময়ের আখের বীজখন্ড রোপণ করতে পারেন।

আলু

আলুর চারা গাছের উচ্চতা ১০-১৫ সেন্টিমিটার হলে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন দুই সারির মাঝে সার দিয়ে কোদালের সাহায্যে মাটি কুপিয়ে সারির মাঝের মাটি গাছের গোড়ায় তুলে দিতে হবে ১০-১২ দিন পরপর এভাবে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিন তা না হলে গাছ হেলে পড়বে এবং ফলন কমে যাবে। মেঘলা আবহাওয়ায় বাতাসের আদ্রতা বেড়ে গেলে আলুর ‘নাবী ধসা’ রোগ হতে পারে  আক্রমণের তীব্রতা বেশি হলে ফলন খুবই কম হয় এ জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় জমিতে ভালোভাবে স্প্রে করুন তাছাড়া আলু ক্ষেত্রে সেচ প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার ও মালচিং সঠিকমতো করুন  অধিক ফলন পাবেন আশা করি।

শাকসবজি

শীতকাল শাকসবজির মৌসুম এ সময় নানান সবজিতে ক্ষেত ভরে থাকে  নিয়মিত পরিচর্যা করলে শাকসবজির বেশি ফলন পাওয়া যায় শাকজাতীয় ফলন যেমন- লালশাক, মূলাশাক, পালংশাক, বাটিশাক, সর্ষেশাক, ধনেপাতা, একবার শেষ হয়ে গেলে আবার বীজ বুনে দিন  অল্প দিনেই আবার ফলন পেয়ে যাবেন এছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুটি এসবের নিয়মিত যত্ন নিন  শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে নিয়মিত সেচ দিতে হয়  তাছাড়া আগাছা পরিষ্কার, গোড়ায় মাটি তলে দেয়া, সারের উপরি প্রয়োগ, রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

ডাল ও তেল ফসল

এখন বিভিন্ন রকম ডাল ফসল যেমন- মশুর, মুগ, মাসকলাই, খেসারি, মটর, ফেলন, সয়াবিন এবং তেল ফসল যেমন- সরিষা, তিল, তিসি ফসলের বাড়ন্ত পর্যায়  প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করলে এসবের ফসলের ভালো ফলন আশা করা যায়।

মরিচ বীজ বোনার সময়-মরিচ প্রায় সারা বছর ধরেই চাষ হয়। মরিচ অল্প দিনের ফসল। বছরের যে কোন সময়ে এর চাষ করা যায়। সাধারণত শীতকালীন মরিচের বীজ ভাদ্র-আশ্বিন মাসে, বর্ষাকালীন মরিচের বীজ বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এবং গ্রীষ্মকালীন মরিচের বীজ অগ্রাহায়ণ-পৌষ মাসে বীজতলায় বোনা হয়। হেক্টর প্রতি ৭৫০ গ্রাম বীজ লাগে। মোটামুটি ভাবে ৬০ বর্গ মিটার বীজতলায় উৎপাদিত চারা দ্বারা এক হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা যায়।

আদা গত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে লাগানো আদা পৌষ মাসে তোলার উপযোগী হয়। গাছের পাতা হলদে হলেও ডাঁটা শুকোতে শুরু করলে ফসল তোলা যাবে। কোদাল দিয়ে খুঁড়ে আদা তোলা উচিত। আদা তুলে মাটি পরিষ্কার করে সংরক্ষণ করতে হবে।

স্ট্রবেরী বারি স্ট্রবেরী-১- বাংলাদেশের সর্বত্র চাষোপযোগী অবমুক্তায়িত একটি উচ্চফলনশীল জাত। গাছের গড় উচ্চতা ৩০ সে.মি.এবং বিস্তার ৪৫-৫০ সে.মি.। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রোপণ করা হলে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ফল আহরণ করা যায়। গাছ প্রতি গড়ে ৩২ টি ফল হয়, যার মোট গড় ওজন ৪৫০ গ্রাম। হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ টন। হৃৎপিন্ডাকৃতির ফল ক্ষুদ্র থেকে মধ্যম আকারের যার গড় ওজন (১৪ গ্রাম)। পাকা ফল আকর্ষণীয় টকটকে লাল বর্ণের। ফলের ত্বক নরম ও ঈষৎ খসখসে। ফলের শতভাগ ভক্ষণযোগ্য। স্ট্রবেরীর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সুগন্ধযুক্ত ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি (টিএসএস ১২%)। জাতটি পর্যাপ্ত সরু লতা ও চারা উৎপাদন করে বিধায় এর বংশবিস্তার সহজ।

গাছপালা

গত বর্ষায় রোপণ করা ফল, ওষুধি বা বন গাছের যতœ নিতে হবে এখন গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিন এবং আগাছা পরিষ্কার করুন প্রয়োজনে গাছকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিন  রোগাক্রান্ত গাছের আক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করে দিন শীতকালে গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি সেচ দিন।

পশুসম্পদ

শীতকালে আপনার পশুপাখির যত্ন দিন  গবাদিপশুর টিকা দিয়ে নিন এবং কৃমির ওষুধ খাওয়ান বিশেষ করে ক্ষুরা, তড়কা, গালফুলা এসব রোগের আক্রান্ত থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিন প্রয়োজনে উপজেলা পশুসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করে আপনার চাহিদামফিক পরমর্শ গ্রহণ করুন।

মাছ

শীতে মাছের কম হয়  খাদ্য খেতেও মাছের অনীহা থাকে তাছাড়া শীতে মাছের ক্ষতরোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই এ সময় মাছের বিশেষ যতœ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে  পুকুরে মাছের প্রয়োজনে চুন, সার, সম্পূরক খাবার এসব পরিমাণমত দিন। পুকুরে যাতে রোদ পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখুন আর মাছ চাষ সংক্রান্ত যে কোন পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস অফিসে যোগাযোগ করুন।

প্রিয় পাঠক, কৃষিবিষয়ক পরামর্শ জানতে ০১৯১৫৪৭৩৩০৮ নাম্বারে ফোন করুন অথবা আপনার নিকটস্থ উপসহকারী কৃষি অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ব্যবহার করুন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি  আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষি নিয়ে  সবাই সুস্থ থাকুন, এই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *