এ সময়ের কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. মান্নান

সুুপ্রিয় পাঠক, প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি এ সময়ের কৃষি। আসুন জেনে নেই এ সময়ের করণীয় কৃষি কাজগুলো।

ধান

এ সময় আমন ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম। চারার বয়স ৩০-৪০ দিন হলে জমিতে রোপণ করতে হয়। ভালো ফলন পেতে হলে আধুনিক জাতের ধান নির্বাচন করা দরকার। রোপা আমনের আধুনিক এবং উন্নতজাতগুলো হলো বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-৫, বিআর-১০, বিআর-২২, বিআর-২৩, বিআর-২৫, ব্রিধান-৩০, ব্রিধান-৩১, ব্রিধান-৩২, ব্রিধান-৩৩, িিব্রধান-৩৪, ব্রিধান-৩৭, ব্রিধান-৩৯, বিনাশাইল, বিনাধান-৪, নাইজারশাইল ইত্যাদি। বিআর-২২, বিআর-২৩, বিনাশাইল এবং নাইজারশাইল আগষ্ট মাসের শেষ অবধি রোপণ করা যায়। তাছাড়া উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জন্য ব্রিধান-৪০, ব্রিধান-৪১ এবং ব্রিধান-৪৭ চাষ করতে পারেন। বর্তমানে সুগন্ধি এবং সরু চালের বেশ চাহিদা থাকায় কাটারিভোগ, কালিজিরার মতো দেশী উন্নত জাতগুলোর চাষ করে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

আমন ধানের ক্ষেতে সুষম সার প্রয়োগ করা দরকার। এ জন্য জমির উর্বরতা অনুসারে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করুন। মাটি পরীক্ষা করে সুপারিশ অনুযায়ী সার ব্যবহার করা উত্তম। প্রতি হেক্টর বা প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমির জন্য রাসায়নিক সারের মাত্রা হলো ইউরিয়া ১৫০-১৮০ কেজি, টিএসপি ১০০ কেজি, এমওপি ৭০ কেজি, জিপসাম ৬০ কেজি ও দস্তা সার ১০ কেজি। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োগ করুন। চারা রোপণের ১২-১৫ দিন পর প্রথমবার ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন। প্রথম উপরি প্রয়োগের ১৫-২০ দিন পর দ্বিতীয়বার এবং তার ১৫-২০ দিন পর তৃতীয়বারে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন। অবশ্য গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে পরবর্তিতে আর ইউরিয়া ব্যবহার করতে হয় না। ইউরিয়া ব্যবহার করার আগে লিপ কালার চার্ট দিয়ে পাতার রং মেপে ইউরিয়া ব্যবহার করা উত্তম। জমি তৈরি হওয়ার পর ২৫ সেন্টিমিটার  দূরে দূরে লাইন করে ১৫ সেন্টিমিটার দূরে দূরে চারা রোপণ করুন। প্রতি গুছিতে ২-৩টি সুস্থ সবল চারা রোপণ করুন আজকাল বাজারে রাসায়নিক আগাছানাশক পাওয়া যাচ্ছে। ধান ক্ষেতের আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আপনি অনুমোদিত আগাছানাশক প্রয়োগ করতে পারেন। পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধানের ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি বা ডাল পুঁতে দিন যাতে পাখি বসতে পারে এবং এসব পাখি পোকা ধরে খেতে পারে।

এ সময় আউশ ধান পাকে। পাকা আউশ ধান কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে নিন। এ কাজের জন্য আপনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত থ্রেসার, ইউনোয়ার, ড্রায়ার এসব যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। এতে বেশ সহজে এবং কম খরচে ধানকাটা, মাড়াই-ঝাড়াই এবং শুকানোর কাজ করা যায়।

পাট

ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি পাট গাছ ফুল আসলে পাট কাটতে হয়। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়। পাট পচানোর জন্য আঁটি বেঁধে পাতা ঝরানোর ব্যবস্থা করুন এবং জাগ দিন। ইতোমধ্যে পাট পচে গেলে তা ছাড়ানোর ব্যবস্থা করুন। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ভালো করে ধোয়ার পর ৪০ লিটার পানিতে এক কেজি তেঁতুল গুলে তাতে আঁশ ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। এতে উজ্জ্বল বর্ণের পাট পাওয়া যায়।

বন্যার কারণে অনেক সময় সরাসরি পাট গাছ থেকে বীজ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পাটের ডগা বা কান্ড কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়ে তা থেকে খুব সহজেই বীজ উৎপাদন করা যায়। পাটের ডগা বা কান্ড ১৫-২২ সেন্টিমিটার লম্বা করে কেটে মাদা করা জমিতে একটু কাত করে রোপণ করুন। তবে খেয়াল রাখুন প্রতি টুকরায় পাতাসহ-৩-৪টি কুঁড়ি থাকে যেন।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীগণ পাটের জন্মরহস্য আরিষ্কারে সক্ষম হয়েছেন। পাটের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জল। সুতরাং পাট চাষী ভাইয়েরা আগামী দিনগুলিতে আরও সফলতার সাথে পাট চাষ করবেন এবং লাভবান হবেন বলে আশা করছি।

তুলা

আমাদের দেশের যেসব স্থানে আগাম শীত আসে যেমন- রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলে শ্রাবণ হতে ভাদ্রমাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তুলা বীজ বপন করতে হবে। অন্যান্য এলাকায় শ্রাবণের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত তুলা বীজ বপন করা যাবে।

বেলে দো-আঁশ মাটি তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত। তবে এঁটেল দো-আঁশ ও পলিযুক্ত এঁটেল দো-আঁশ মাটিতেও তুলা চাষ করা যায়। বর্ষাকালে বৃষ্টির সুযোগ বুঝে ‘জো’ অবস্থায় ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। জমি তৈরির সময় জৈব সার প্রয়োগ করুন। হেক্টর প্রতি ৫-৬টন গোবর বা আবর্জনা পচা সার ব্যবহার করা উচিত। জমি তৈরি ও জৈব সার প্রয়োগের পর বীজ বপন করা দরকার। বীজ সংগ্রহ ও তুলা চাষ বিষয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা বা কর্মীর অথবা নিকটস্থ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিলে উপকৃত হবেন।

শাকসবজি

এ সময়ে শিমের বীজ লাগানো যায়। তাছাড়া মুলা বীজও এ সময়ে বপন করা যাবে। বৃষ্টির কারণে গ্রীষ্মকালীন সবজির গোড়ায় পানি জমে থাকলে নিকাশের ব্যবস্থা নিন এবং গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিন। লতাজাতীয় সবজির বাড়বাড়তি বেশি হলে ১৫-২০% ডগা, পাতা কেটে দিন। এতে ফুল ফল তাড়াতাড়ি আসবে।

গাছপালা

সারাদেশে গাছ রোপণের কাজ চলছে পুরোদমে। ফল, বনজ এবং ওষুধি গাছের চারা বা কলম রোপণের ব্যবস্থা নিন। উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে একহাত চওড়া এবং এক হাত গভীর গর্ত করে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক জৈব সারের সঙ্গে ১০০গ্রাম টিএসপি এবং ১০০ গ্রাম এমওপি ভালো করে মিশিয়ে দিন। সার ও মাটির এ মিশ্রণ গর্তে ভরাট করে রেখে দিন। দিন দশেক পরে গর্তে চারা বা কলম রোপণ করুন।

চারা বা কলম হতে হবে স্বাস্থবান ও ভালো জাতের। চারা রোপণ করে গোড়ায় মাটি তুলে দিন ও খুঁটির সঙ্গে সোজা করে বেঁধে দিন। গরু-ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রোপণ করা চারার চারপাশে বেড়া দিন। ফলবৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করতে হবে।

  •              ভালোজাতের সুস্থসবল নীরোগ চারা/কলম রোপণ
  •              সুষম সার ব্যবস্থাপনা
  •              আগাছা পরিষ্কার ও অন্যান্য পরিচর্যা
  •              পানি সেচ বা নিকাশ
  •              গাছ ছাঁটাইকরণ ও অন্যান্য পরিচর্যা
  •              আইপিএম পদ্ধতিতে রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ

প্রিয় পাঠক, অধিকহারে বারোমাসী ফলগাছের চারা/কলম রোপণ করুন যাতে সারা বছর আপনি ফল পেতে পারেন। এতে পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে। সর্বোপরি আপনি যেসব ফলগাছ লাগাতে পারেন সেগুলো হলো- কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল, বেল, কদবেল, লেবু, বাতাবিলেবু, জাম আতা, শরিফা, কামরাঙা, ডালিম, আমড়া, সফেদা, জামরুল, নারকেল, জলপাই, চালতা, আমলকি, তেঁতুল, লটকন, করমচা, গোলাপজাম, তাল ইত্যাদি।

পশুসম্পদ

এ মাসে কচুরীপানাসহ প্রচুর জলজ ঘাস পাওয়া যায়। তবে গবাদি পশুকে জলজ ঘাসের সঙ্গে শুকনো খড় মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। কারণ শুধু জলজ ঘাস খাওয়ালে গবাদিপশুর মল পাতলা হতে পারে। এ সময় গবাদিপশুর ও হাঁস-মুরগির বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। রোগের লক্ষণ ধরা পড়লে স্থানীয় পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তাছাড়া পশুপাখির রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন অর্থাৎ টিকা দিন।

মাছ

চারা পুকুরের মাছ ৫-৭ সেন্টিমিটার পরিমাণ বড় হলে মজুদ পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিন। সঙ্গে সঙ্গে গত বছর মজুদ পুকুরে ছাড়া মাছ বিক্রি করে দিন। বন্যার কারণে মাছ যাতে পুকুর হতে বেরিয়ে না যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখুন। এ জন্যে পুকুর পাড় বেঁধে উঁচু করে দিন অথবা জাল বা বেড়া দিয়ে মাছ আটকিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিন। পানি বেড়ে গেলে মাছের খাদ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় পুকুরে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করুন এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন। মৎস্য বিভাগের পরামর্শ নিয়ে মাছ চাষের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে উদ্যোগ দিন।

প্রিয় পাঠক, আজ তাহলে এ পর্যন্তই। কথা হবে আগামী সংখ্যায় আগষ্ট মাসের কৃষি নিয়ে। সবাই ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *