এ সময়ের কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. এ. মান্নান

সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি অক্টোবর মাসের কৃষির বিস্তারিত পরিবেশনা।

ধান

আমন ধানে মাজরা পোকা দমনে নিয়মিত আলোর ফাঁদ ব্যবহার করুন। ধান ৮০% পাকলেই কাটতে শুরু করা উচিত। সে হিসেবে আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আমন ধান কাটা শুরু হয়ে যাবে। রোদেলা দিন দেখে ধান কাটুন। আগামী মৌসুমের জন্য বীজ রাখতে চাইলে সুস্থ সবল ভালো ফলন দেখে ফসল নির্বাচন করুন। এরপর কেটে, মাড়াই-ঝাড়াই করুন এবং রোদে শুকাতে দিন। শুকানো গরম ধান আবার ঝেড়ে পরিষ্কার করুন এবং ছায়ায় রেখে ঠান্ডা করুন। পরিষ্কার ঠান্ডা ধান বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করুন। বীজ রাখার পাত্রটিকে মাটি বা মেঝেতে রেখে পাটাতনের উপর রাখতে হবে। পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে হলে ধানের সাথে নিম, নিশিন্দার পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিন। ধানের খড় গবাদিপশুর খাদ্য। এ জন্য খড় ভালো করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করবেন।

গম

এ মাসের শেষের দিকে তথা কার্তিক মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম বীজ বপনের প্রস্তুতি নিতে হবে। দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। অধিক ফলনের জন্য গমের আধুনিক জাত ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কর্তৃক উদ্ভাবিত গমের আধুনিক জাত ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কর্তৃক উদ্ভাবিত গমের আধুনিক জাতগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় কয়েকটি জাত হচ্ছে আনন্দ, বরকত, আকবর, কাঞ্চন, অঘ্রাণী, সৌরভ, প্রতিভা, গৌরব। বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করে নেয়া দরকার। অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে বীজ শোধন করুন।

সেচ দিয়ে অথবা সেচ ছাড়া দু’ভাবে গম চাষ করা যায়। সেচযুক্ত চাষের জন্য বিঘাপ্রতি বীজের পরিমাণ লাগবে ১৬ কেজি এবং সেচবিহীন চাষের জন্য সাড়ে ১৩ কেজি। বপনের সময় সারি  থেকে সারি ২০ সেমি. এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ৪-৫ সেমি. রেখে ৪-৫ সেমি. গভীরে বীজ বপন করতে হয়। সেচযুক্ত চাষের জন্য জমিতে বিঘাপ্রতি ২৪-৩০ কেজি ইউরিয়া, ১৮-২৪ কেজি টিএসপি, ৫-৭ কেজি এমপি, ১৪-১৬ কেজি জিপসাম এবং ২৫০ গ্রাম দস্তা সার প্রয়োগ করা দরকার। সেচবিহীন চাষের ক্ষেত্রে সারের এ মাত্রা হলো ইউরিয়া ১৮-২৪ কেজি, টিএসপি ১৮-২৪ কেজি, এমপি ৪-৬ কেজি, জিপসাম ৯-১২ কেজি এবং দস্তা ২৫০ গ্রাম। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার জমি তৈরির শেষ চাষের সময় এবং ইউরিয়া ৩ কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের ১৭-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এরপর প্রতি ৩০-৩৫ দিন পর পর ২ বার সেচ দিলে খুব ভালো ফলন পাওয়া যায়।

ভূট্টা

ভূট্টা একটি বহুমুখী ফসল। ভূট্টা চাষের প্রস্তুতি নেয়ার উপযুক্ত সময় এখন। বৃষ্টির পানি জমে না এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি যার মাটি বেলে দো-আঁশ বা এঁটেল দো-আঁশ এমন জমি ভুট্টা চাষের জন্য নির্বাচন করুন। কার্তিক মাসের ১৫ তারিখ হতে অগ্রহায়ণ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত বীজ বপন করতে পারলে বেশি লাভ পাওয়া যায়। আমাদের দেশে চাষের উপযোগী, ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো- বর্ণালী, শুভ্রা, খই ভুট্টা, মোহর, বারি ভুট্টা-৫, বারি ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১, প্যাসিফিক-১১, প্যাসিফিক-৬০, প্যাসিফিক-৭১০ এসব। বপনের আগে বীজ শোধন করে নিন। এ জন্য প্রতি কেজি বীজের জন্য ২ গ্রাম গ্রানোসোন বা এগ্রোসন অথবা ৫ গ্রাম ভিটাভেক্স-২০০ বেশি উপযোগী। এক হেক্টর জমিতে বপনের জন্য ২৫-৩০ কেজি ভুট্টা প্রয়োজন হয়। তবে খই ভুট্টা বা হাইব্রিডের ক্ষেত্রে বীজের মাত্রা এর অর্ধেক হলেই চলে। সারিতে বীজ বপন করুন এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখুন ৭৫ সেমি. ও বীজ থেকে বীজের দূরত্ব হবে ২৫ সেমি। বীজ মাটির ২.৫-৩ সেমি. গভীরে বপন করুন। প্রতি হেক্টর জমিতে সারের মাত্রা হলো ইউরিয়া ২৭৫-৩২৫ কেজি, জিপসাম ১৫০-১৭৫ কেজি, দস্তা ১০-১৫ কেজি, বরিক এসিড ৫-৮ কেজি এবং ৪-৫ মেট্রিক টন জৈব সার। ভুট্টা বপনের পর নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করুন।

শাকসবজি

শীতকালীন শাকসবজি চাষের উপযুক্ত সময় এখন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বীজতলায় উন্নতজাতের দেশী বিদেশী ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, সবুজ ফুলকপি, বাটিশাক, টমেটো বেগুন এসবের চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলায় বীজ বপন করুন। নিজের প্রয়োজন ছাড়াও বিক্রির জন্য বেশি পরিমাণ চারা উৎপাদন করতে পারেন। সবজি চাষের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। বিশেষ করে হঠাৎ বৃষ্টিতে যেন রোপণকৃত চারা নষ্ট না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রোপণের পর আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, সেচ নিকাশসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে। তাছাড়া লালশাক, মুলাশাক, গাজর, মটরশুটির বীজও সময়মত বপন করতে পারেন।

আলু

কার্তিক মাসের প্রথম থেকেই আলুর জমি তৈরি, সার প্রয়োগ এবং বীজ বপন শুরু করতে হয়। হালকা মাটি অর্থাৎ বেলে দো-আঁশ মাটি আলু চাষের জন্য বেশি উপযোগী। অধিক ফলনের জন্য বীজ আলুর ভালো জাতগুলো হলো ডায়মন্ড, কার্ডিনাল, প্যাট্রোনিজ, হীরা, অরিগো, আলিশা, কিওপেট্রা, গ্রানোলা, বিনেলা, কুফরিসন্দুরী। প্রতিবিঘা জমির জন্য আলু বীজের প্রয়োজন হয় ২০০-২৬৬ কেজি। এক বিঘা জমিতে ৪৩ কেজি ইউরিয়া, ২৯ কেজি টিএসপি, ৩৩ কেজি এমপি, ২০ কেজি জিপসাম, ২ কেজি দস্তা প্রয়োগ করা দরকার। তাছাড়া বিঘাপ্রতি ৪০-৫০ মণ জৈবসার ব্যবহার করলে ফলন বেশি হয়। বীজ আলু বড় হলে কেটে টুকরো করে লাগানো যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে প্রতি টুকরাতে যেন ৩-৪টি চোখ বা কুঁড়ি থাকে। বীজ বপনের জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৫০-৬০ সেমি. এবং সারিতে বীজ থেকে বীজের দূরত্ব হবে ২০-২৫ সেমি। বীজ বপনের গভীরতা হবে ৫-৭ সেমি.।

মিষ্টি আলু

মিষ্টি আলু চাষাবাদের প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। দো-আঁশ বা বেলে মাটি মিষ্টি আলু চাষের জন্য উপযুক্ত। তবে নদী তীরের পলি মাটি এ ফসলের জন্য খুবই ভালো। কমলা সুন্দরী, তৃপ্তি এবং দৌলতপুরী মিষ্টি আলুর তিনটি আধুনিক জাত। এ তিনিটি জাত ছাড়াও স্থানীয় জাতের আরো মিষ্টি আলু রয়েছে। তিন গিঁটযুক্ত ২৫-৩০ সেমি. লম্বা ৭৫০-৮০০ খন্ড লতা এক বিঘা জমির জন্য প্রয়োজন হয়। আধুনিক জাতের চাষাবাদের বেলায় সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেমি. এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৩০ সেমি. বজায় রাখা দরকার। স্থানীয় জাতের বেলায় এ দূরত্ব কিছুটা কম হলেও চলে। সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি ৪০-৫০ মণ গোবর বা জৈব সার, ৫ কেজি ইউরিয়া, ১৪ কেজি টিএসপি ও ২০ কেজি এমপি সার ব্যবহার করা উচিত।

সরিষা ও তেল ফসল

এবার সরিষা চাষের কথা। সরিষার প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে টরি-৭, রাই-৫, কল্যাণীয়া, সোনালী, সম্পদ, সম্বল, দৌলত, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ উল্লেখযোগ্য। জাতভেদে সামান্য তারতম্য হলেও বিঘাপ্রতি গড়ে ১-১.৫ কেজি সরিষার বীজ প্রয়োজন। আবার সারের মাত্রা হলো প্রতি বিঘা জমিতে ৩৩-৩৭ কেজি ইউরিয়া, ২২-২৪ কেজি টিএসপি, ১১-১৩ কেজি এমপি, ২০-২৪ কেজি জিপসাম, ১ কেজি জিংক সালফেট। সরিষা ছাড়াও অন্যান্য তেল ফসল যেমন-তিল, তিসি, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী এ সময় চাষ করা যায়। যে সব জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়, সেখানে স্বল্পকালীন টরি-৭ জাতের সরিষা চাষ করা ভাল হবে।

ডাল ফসল

ডাল হলো গরিবের আমিষ। আমিষের ঘাটতি পূরণ করতে ভালো ফসল চাষের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। মসুর, মুগ, মাসকলাই খেসারি, মটর, ফেলন, অড়হর, সয়াবিন, ছোলাসহ অন্যান্য ডালফসল এ সময় চাষ করতে পারেন। এজন্য উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সময়মতো বীজ বপন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, পরিচর্যা, সেচ, বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে হবে। পানি নেমে গেলে পলিপড়া মাটিতে বিনা চাষে মাসকলাই ও খেসারী বীজ বপন করা যেতে পারে।

আখ

আখ চাষের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে জমি তৈরি করে আখের চারা রোপণ করা উচিত। আখ রোপণের জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ৯০ সেমি. থেকে ১২০ সেমি. এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৬০ সেমি.। এভাবে চারা রোপণ করলে বিঘাপ্রতি ২২০০-২৫০০ চারার প্রয়োজন হয়।

অন্যান্য করণীয়

এ মাসে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া চাষ করা যায়। সব ফসলের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণ করা উচিত। মনে রাখবেন এ মৌসুমে পানির অভাব হয়। তাই বেশি ফলন পেতে হলে জমিতে সেচ প্রয়োগ করুন নিয়ম মাফিক।

পশুসম্পদ

গবাদিপশুর আবাসস্থল মেরামত করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। গবাদিপশুকে খড়ের সাথে তাজা ঘাস খাওয়ান। ভুট্টা মাসকলাই, খেসারি, রাস্তার ধারে বা পতিত জায়গায় বপন করে গবাদিপশুকে খাওয়ানো যায়। এতে গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও দুধ দুটোই বাড়ে। গর্ভবতী গাভী এবং বাছুরের যতœ নিন নিয়মিত। কার্তিক মাসে গবাদিপশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো দরকার। তাছাড়া গবাদিপশুর তড়কা, গলাফোলা, মুরগির রাণীতে, হাঁস-মুরগির কলেরাসহ অন্যান্য রোগের প্রতিষেধক টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করুন। এ জন্য পশু চিকিৎসকের সহযোগিতা নিন।

মাছ

এ সময় পুকুরের আগাছা পরিষ্কার, সম্পূরক খাবার প্রয়োগ, সার প্রয়োগ করতে হয়। তাছাড়া জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি। রোগ প্রতিরোধের জন্য একর প্রতি ৪৫-৬০ কেজি চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে। মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শ নিতে মৎস্যবিদের শরণাপন্ন হোন।

————————————–

সুপ্রিয় পাঠক, আবার কথা হবে আগামী মাসে। সবাই ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন এবং এই প্রত্যাশা রেখে শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare