এ সময়ে কৃষি

কৃষিবিদ ড. এম. এ. মান্নান

প্রিয় পাঠক, বর্ষা ঋতু চলে আসছে চলুন জেনে নেয়া যাক এ সময়ে কৃষিতে আমাদের করণীয় কী। প্রথমেই আমাদের প্রধান ফসল ধান।

আমন ধানের বীজতলা তৈরী

আমন ধানের বীজতলা তৈরীর সময় হয়েছে এখন। উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরী কররুন। জমির চারদিকে ভালো করে আইল বেঁধে পানি আটকিয়ে চাষ দিন। ৫-৬ টি আড়াআড়ি চাষ দিয়ে জমির মাটি থকথকে কাদা করুন এবং মই দিয়ে সমান করুন। এরপর ৩ ফুট চওড়া করে জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে বেড তৈরী করুন। দু’ বেডের মাঝখানে এবং জমির চারদিকে ২০ ইঞ্চি চওড়া নালা তৈরি করুন। এ নালা দিয়ে পরবর্তীতে সেচ, নিকাশ ও অন্যান্য পরিচর্যা করা সহজ হবে। বীজ তলায় ভালো জাতের বীজ বপন করুন। রোপা আমনের উন্নত জাত গুলো হল-বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-৫, বিআর-১০, বিআর-২৫, ব্রিধান-৩০, ব্রিধান-৩১, ব্রিধান-৩২, ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৩৪, ব্রিধান-৩৭, ব্রিধান-৩৮, ব্রিধান-৩৯, ব্রিধান৪০, ব্রিধান-৪১ বিনাশাইল। এসবের মানসম্পন্ন বীজ নিজের সংগ্রহে না থাকলে বিএডিসির বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, বিশ্বস্ত ডিলার বা অভিজ্ঞ বীজ উৎপাদনকারী চাষি ভাইয়ের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করুন এবং বীজ তলায় বপন করুন। বীজ গজানোর হার কমপক্ষে ৮০% হতে হবে। প্রতিবর্গ মিটারে ৮০-১০০ গ্রাম বীজ লাগবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। মনে রাখবেন, মূল জমিতে রোপণের জন্য ধানের চারার বয়স ৩০ দিনের হতে হবে।

আউশ ধান

এ সময় আউশ ধান পাকতে শুরু করে। ক্ষেতের ৮০% ধান পেকে গেলে তা কেটে মাড়াই ঝাড়াই করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। ধান মাড়াই করার জন্যে ব্রি  ওপেন ড্রাম পাওয়ার থ্রেসার’ বা ব্রি ধান গম পাওয়ার থ্রেসার, শুকানোর জন্য ড্রায়ার মেশিনের সাহায্য নিতে পারেন। খেয়াল রাখবেন, শুকনো বীজের আর্দ্রতা যেন ১২% এর বেশি না হয়।

পাট

পাট গাছের বয়স চার মাস হলে পাট গাছ কেটে নিন। পাট গাছ কাটার পর চিকন ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আটি বেধে দুই /তিন দিন দাড় করিয়ে রাখুন। এতে গাছের পাতা ঝরে যাবে। পাতা ঝরে গেলে ৩/৪ দিন পাট গাছ গুলোর এক ফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। এরপর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিন। জাগ দেয়ার জন্য খুব গভীর পানির দরকার নেই। জমিতে এক থেকে দেড় ফুট পানি থাকলে সেখানেও জাগ দেয়া যায়। তবে পাট গাছের পরিমাণ অধিক হলে গভীর পানির প্রয়োজন হয়। জাগ দেয়ার পর জাগের উপর কচুরিপানা বা খড় বিছিয়ে দিলে ভালো হয়। জাগ দেয়ার পর নিয়মিত গাছ পরীক্ষা করে দেখুন। পাটের আঁশ যেন খুব বেশি পচে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। পাট পচে গেলে পানিতে পাটের আঁটি ভাসিয়ে রেখে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিন। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকানোর উদ্যোগ নিন।

এছাড়া পানি স্বল্পতা হেতু রিবণ পদ্ধতিতে পাট পঁচানো যায়। এই পদ্ধতিতে পাট পচানো : ১০০ থেকে ১২০ দিন বয়সে পাট কেটে পাতা ঝরিয়ে নিয়ে গাছের গোড়া থেতলে নিতে হবে। তারপর ৪ থেকে ৫টি গাছের ছাল এক সাথে ডাবল রোলার রিবনারের সাহায়্যে পাটের ছাল ছাড়িয়ে নিতে হবে। ছালগুলোকে গোলাকার মোড়া বাঁধতে হবে। তারপর গোলাকার মোড়াগুলো গর্তের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে হবে। এজন্য আগেই গর্ত করতে হবে। আর সে গর্তের পরিমাপ ১০ থেকে ১২ ফুট লম্বা, চওড়া ৬ থেকে ৮ ফুট এবং ২ ফুট গভীর হতে হবে। পলিথিন দিয়ে গর্তের তলা ও কিনারা আবৃতি করতে হবে। মোড়াগুলো কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।  পচন ক্রিয়া তাড়াতাড়ি করার জন্য ইউরিয়া সার মিশিয়ে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ১০০০ কেজি কাঁচা ছালের জন্য ১কেজি ইউরিয়া মিশাতে হবে। তারপর ৭ থেকে ৮দিন পর ছালগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে আঁশ সংগ্রহ করে রোদে শুকাতে হবে।

রিবণ পদ্ধতিতে পাট পচানোই বেশি লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব। আপনি ইচ্ছে করলেই পাটের বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থাও নিতে পারেন। আষাঢ় মাসেই এ উদ্যোগ নেয়া দরকার। পাট গাছের বয়স ১০০ দিন হলে গাছের মাথা থেকে এক বারে ডগা কেটে নিন। এসব ডগাকে আবার টুকরো কররুন। তবে খেয়াল রাখবেন প্রতি টুকরোয় যেন দু’টি করে গিঁট থাকে। এসব টুকরো ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাত করে রোপণ করুন। দেখবেন রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে এবং পরবর্তীতে এসব চারায় প্রচুর ফল ধরবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।

শাক সবজি

এ সময় উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন, গ্রীষ্মকালীন টমাটো ইত্যাদি। এসব সবজির আগাছা পরিষ্কার করুন এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিন। সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিন। সবজির বাড়বাড়তি বেশি হলে ১৫-২০% লতা-পাতা কেটে দিন। এতে ফলন বাড়বে। কুমড়া জাতীয় সবজির অধিক ফলনের জন্যে হাত দিয়ে পরাগায়ন করুন।

ভূট্টা

খরিফ মৌসুমের ভূট্টার মোচা সংগ্রহের উপযুক্ত সময় এখন। পরিপক্ক ভুট্টার মোচা কেটে ঘরের বারান্দায় বা ভেতরে ঝুলিয়ে রাখুন। এরপর রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। ভুট্টার মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা হাত দিয়ে নিচের দিকে বাঁকিয়ে দিন। এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।

বৃক্ষ রোপণ

আষাঢ় মাসে প্রচুর বৃষ্টি হয়। মাটিতে রস থাকে। এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্যে খুবই উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিন। বনজ ফল ও ঔষুধি গাছের চারা রোপণ কররুন। ফলের চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করে গর্তে পরিমাণমত সার দিয়ে চারা রোপণ করা উচিত। এক ফুট চওড়া, এক ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে দিন দশেক পর চারা বা কলম লাগাতে হবে। চারা লাগানোর পর ঘেরা দেয়া প্রয়োজন। সে সাথে চারাকে সোজা রাখার জন্যে খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। ফল চাষের জন্য চারার চেয়ে কলম রোপণ করাই উত্তম। বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থ সবল চারা বা কলম রোপণ করুন।

মাছ চাষ

বর্ষা মৌসুমে বন্যায় মাছ চাষের অনেক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্যে পুকুরের পাড় উঁচু  করে দেয়া জরুরি। অন্যথায় বন্যায় পুকুরের পাড় ডুবে যেতে পারে। বন্যার সময় পুকুরে মাছ আটকানোর জন্যে জাল, বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আষাঢ় মাস মাছের পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়। মাছ চাষের জন্যে মিশ্র পদ্ধতি অবলম্বন করুন। পুকুরে তিন স্তরের উপযোগী মাছের পোনা ছাড়ুন। একই সঙ্গে পুকুরে খাবার দিন নিয়মিত এবং মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যে জাল টানুন। বড় পুকুরে, হাওড়ে, বিলে, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন। যে কোনো পরামর্শের জন্যে আমাদেরকে লিখুন।

পশুপালন

খড়, শুকনো ঘাস, ভূসি, কুঁড়া খেতে দিন। কাঁচা ঘাস খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ান। মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়াবেন না। বর্ষাকালে গবাদিপশুর গলাফোলা, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা রোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। এ জন্যে প্রতিষেধক টিকা দিন। কৃমির আক্রমণ রোধ করতে কৃমির ওষুধ খাওয়ান। গবাদিপশুকে ঠান্ডা এবং শুকনো জায়গায় রাখুন। হালচাষের পর গররুকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। বর্ষাকালে হাঁস-মুরগির বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করার জন্যে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নিন। হাঁস-মুরগির ঘর যাতে জীবাণুমুক্ত এবং আলো বাতাসপূর্ণ থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। পশুপাখি পালন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে হলে পশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

প্রিয় পাঠক, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণ করুন। নিজে সমৃদ্ধশালী হোন, দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে অবদান রাখুন। কৃষি বিষয়ক যে কোনো পরামর্শের জন্যে আমাকে লিখুন। আল্লাহ হাফেজ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *