কচু চাষে নিউটনের স্বপ্নপূরণ

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল

 

ছিলেন বেসরকারি জুট মিলের শ্রমিক। কিন্তু আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জীবন চালানোও দায় হয়ে পড়েছিল। তাই চাকরী ছেড়ে দিয়ে কৃষিকাজে মনোযোগী হলেন। ৩৪ শতক জমি বর্গা নিয়ে ধানের পাশাপাশি পানি কচু চাষ শুরু করেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর ঘোনা মাদারডাঙ্গা গ্রামের যুবক নিউটন মন্ডল। তাও প্রায় বছর আট আগের কথা। ওই ধান চাষে লাভ না দেখলেও পানি কচু চাষে সাফল্য পান নিউটন। এখন কচু চাষই বদলে দিয়েছে নিউটনের জীবন-জীবিকা। কচু চাষকেই ঘিরেই এখন স্বপ্ন দেখছে তাঁর পরিবার। শুধু পরিবার বললেও ভুল হবে নিউটনের দেখানো পথে হাটছেন ডুমুরিয়ার অনেক চাষি। কচু চাষকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন তারাও।

 

কচু চাষে
কচু চাষ

কৃষক নিউটন মন্ডল বলেন, ‘এক সময় একটি বেসরকারি জুট মিলে চাকরী করতাম। কিন্তু মিলের বেতন দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর ছিল। তাই চাকরী ছেড়ে বাড়িতে এসে কৃষিকাজ শুরু করি। কিন্তু ধান চাষেও লাভ ছিল না। এ অবস্থায়  ৩৪ শতক জমি বর্গা নেই। সেখানে ধানের পাশাপাশি স্ত্রীর পরামর্শে এক অংশে স্থানীয় কিছু পানি কচুর চারা রোপণ করি। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরতে হয়নি। গত বছরও কচু চাষ করে লক্ষাধিক টাকা আয় করেছি। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক ভালো আছি।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৫ শতক জমিতে ৭ হাজার পিস কচুর চারা রোপণ করেছিলাম। কচুগুলো প্রায় ১০-১২ ফুট লম্বা ও ২০-৩০ কেজি ওজন হয়। কচুর লতি, ফুল ও কচু  বিক্রি থেকে ৫ লাখের মতো টাকা আয় করেছি। এ থেকে ছয়টি গরু কিনেছি। আগামী মৌসুমেও এ চাষ অব্যাহত থাকবে।’

কচু চাষ প্রসঙ্গে নিউটন বলেন, ‘আমি দেশী জাতের কিছু পানি কচু ও চারা সংগ্রহ করে সম্পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে চারা রোপণ করি। পরবর্তীতে চারা পরিচর্যার পাশাপাশি সরিষার খৈল, গোরোজিন দস্তা, ড্যাব, এমপি সার, গুটি ইউরিয়া ও থিয়োবিট ব্যবহার করে সফলতা পেয়েছি।’

নিউটনের স্ত্রী প্রীতিলতা মন্ডল বলেন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ভিন্ন কিছু চাষের চেষ্টা থেকেই এই কচু চাষের ধারণা ও সাফল্য পেয়েছি। এখন অনেকেই দূর-দুরান্ত থেকে কচু চাষ দেখতে আসেন। আমরাও চাই সবার মাঝে এই সাফল্য ছড়িয়ে যাক। কচু চাষের সাফল্যের পর আমরা একটি গরুর খামার ও চিংড়ি ঘের করেছি। মেয়েটিকেও স্কুলে পাঠিয়ে ভালো আছি।’

এদিকে স্বল্প ব্যয়ে ও সময়ে এ কচু চাষে অধিক টাকা লাভবান হওয়ায় রংপুর ঘোনা মাদারডাঙ্গা এলাকার কৃষক নিউটন মন্ডলের দেখা দেখি আরও অনেকেই কচু চাষের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় কৃষক ব্রজলালের বিশ্বাস, কেশব লাল, রিপন, কার্তিক, সুব্রত, বিশ্বজিৎ গুরুপদ মল্লিক, রবি ও অমল, ধীমানসহ অনেকেই এখন কচু চাষে সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন।

কৃষক ব্রজলাল বিশ্বাস বলেন, জমিতে ধানের চাষ করতাম। কিন্তু তেমন লাভবান না হওয়ায় এবার নিউটনের সহযোগিতা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শে প্রায় এক বিঘা জমিতে কচু চাষ করছি। তবে এবার আর লোকসান গুণতে হবে না। একই অভিমত দেন আরেক চাষী কেশব লাল মন্ডল।

ডুমুরিয়ার উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা শেখ হারুন অর  রশিদ বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পরামর্শে নিউটন মন্ডলের দেখাদেখি এবার এলাকার অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে কচু চাষ করছেন। তাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কচু চাষে তিনটি ফসল আসে। এর মধ্যে কচুর লতি, ফুল এবং কচু। যা মানবদেহের জন্য পুষ্টিকর একটি খাদ্য। কচু চাষে এখানকার অনেকের ভাগ্য খুলেছে।’

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আব্দুল লতিফ জানান, পানি কচু মানবদেহের পুষ্টি ও কৃষকের আর্থিক চাহিদা পূরণে সম। এবার বাণিজ্যিকভাবে কৃষকরা কচু চাষ করছেন। পানি কচু চাষে স্বল্প ব্যয় হওয়ায় নিউটনের দেখাদেখি অনেক কৃষক এবার কচু চাষে আগ্রহী হয়েছে। খুলনায় এবার ৪৯ হেক্টর জমিতে শুধু পানি কচু চাষ হয়েছে, আর হেক্টর প্রতি ৩০ টন কচু আবাদ হয়।

————————————–

লেখকঃ

মফস্বল সম্পাদক, কালের কণ্ঠ, বসুন্ধরা, বারিধারা

মোবাইলঃ ০১৭১১-৩৬৪৪৮৫

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *