কত গাছে কত ফুল

পৃথিবীর তাবৎ গাছ গাছালি ফুল তৈরি করে তা কিন্তু নয়। তবে ফুল তৈরি এমন গাছ গাছালির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। যদিও পুষ্পধারী উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা কত তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবু পৃথিবী জুড়ে সপুষ্পক উদ্ভিদের সংখ্যা কমছে কম আড়াই লক্ষ তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই যে বিশাল পুষ্পক উদ্ভিদ রাজি এরা তাদের নিজস্ব বংশ রক্ষা আর বংশ বিস্তারের লক্ষ্যে প্রজনন কর্মের অংশ হিসেবে তৈরি করে নানা রকম ফুল। সে ফুলের রূপে মুগ্ধ কোন কোন প্রাণি আর সে রূপে মুগ্ধ পৃথিবীর তাবৎ মানুষ। বিমুগ্ধ বিস্ময়ে সে ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকে কত কত মানুষ। সে ফুলের আঘ্রাণ নিয়ে উজ্জীবিত হয় কত মানুষ। সে ফুলের বর্ণ বিভায় বিভোর হয় কতক মানুষ। চোখ মেলে তাকালে চারদিকে দেখা মেলে কত রকম ফুল। পায়ে হাটা মেঠো পথের দুপাশে ক্ষুদ্রাকার তৃণ জাতীয় গাছে আমাদের অলক্ষ্যে ফুটে থাকে কত ফুল। সারা দেশের মাঠে ঘাটে ফুটে থাকে কত রকম ঘাস ফুল। বনে-জঙ্গলে, আবাদি জমির আইলে, অনাবাদি জমিতে ফুটে থাকে কত কত ফুল। পাহাড়ে পর্বতে দেখা মেলে অজস্্র ফুলের গাছ গাছালি। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতিটি ঋতুতেই ফোটে কোন না কোন ফুল। এদেশে রয়েছে একেবারে ক্ষুদ্রাকৃতির ঘাস ফুল থেকে শুরু করে পদ্মফুল বা নাগলিঙ্গম ফুলের মত বিশালাকৃতির ফুলও। রয়েছে প্রায় সকল বর্ণের ফুল। আমাদের প্রিয় ভূ-খন্ডটি ছোট হলেও একেবারে কম নয় এর পুষ্পধারী গাছগাছালির জীববৈচিত্র্য।

ক্ষুদ্র কিন্তু জীব বৈচিত্রপূর্ণ দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এই ক্ষুদ্র জনপদে জন্ম নেয় তেমন পুষ্পধারী কিছু গাছ মানুষ বাছাই করে নিয়েছে তার সৌখিন বাগানের জন্য। বহু গাছ গাছালি মানুষ প্রবর্তন করে নিয়েছে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে। নিসর্গী, পুষ্প প্রেমী, ধর্মযাজক, পরিব্রাজক, বিদেশী শাসক, নার্সারী ম্যান, গবেষক এমনিতর বহু পেশার লোকজনের মাধ্যমে এদেশে চলে এসেছে নানা রকম ফুল গাছ। সে যেমন বৃক্ষজ, সে তেমনি গুল্মজ। সে যেমন মরসুমি, সে তেমনি অমরসুমি। সে যেমন চির সবুজ, সে তেমনি পত্রমোচী। সে যেমন স্থলজ, সে তেমনি জলজ। কোনটা আবার বড় বেশি নমনীয় কান্ড বিশিষ্ট তো কোনটা আবার দাঁড়িয়ে আছে শক্ত কান্ডের উপর। স্বাধীন লতা কোনটি তো পরাশ্রয়ী লতা কোন কোনটি। কোনটির মাটির নিচে কন্দ থাকে বলে এরা আসলে কন্দজ। কোনটি আবার শূণ্যে ঝুলন্ত অবস্থায় নান্দনিক এদের বলা হয় অর্কিড। বাংলার আনাচে কানাচে ফুটে থাকে কত ভিন্ন রকমের ফুল। ঋতুর পরিক্রমায় এখানে বনে বাদাড়ে আর রোপিত গাছ গাছালিতে দেখা দেয় নানা রকম ফুল। সে রূপ বৈচিত্র মুগ্ধ কবির কণ্ঠে ধরা দেয় এভাবে-

ঋতুর পরে ঋতু ফিরে আসে বসুন্ধরার কোলে

চিহ্ন পড়ে বনের ঘাসে ঘাসে ফুলের পরে ফুলে।

আবাদী পুষ্পতরুর সংখ্যাওতো এ দেশে এখন একেবারে কম নয়। সৌখিন বাগানী ও পুষ্প প্রেমী মানুষ দেশ বিদেশের নানা ফুল গাছ রোপণ করে দিচ্ছে তাদের বাগানে কিংবা বাসগৃহের আশে পাশে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বৃক্ষ রোপণ কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে রোপন করা হচ্ছে প্রতি বছর নানা রকম ফুলের গাছ গাছালি। তাছাড়া বেশ কিছু সংখ্যক খামারী এখন জনপ্রিয় কয়েকটি ফুল বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করতে শুরু করেছে নিয়মিত। ফলে চেনা জানা ফুল গাছের পাশাপাশি নতুন নতুন ফুল গাছও ঠাঁই করে নিচ্ছে ফুল চাষীদের মাঠে। কত রকমের ফুলের গাছ রয়েছে আমাদের। বৃক্ষজ ফুলের কথাই বলি প্রথম। বৃক্ষ মানেই এদের রয়েছে কান্ড। বড়, ছোট, সরু বা মোটা শক্ত কান্ড তাদের থাকবেই। কান্ডের কিছু দূর বৃদ্ধি হবার পর শুরু হয় এদের শাখা প্রশাখা বিস্তারের কাজ। এরই ফাঁকে ফাঁকে ধরতে শুরু করে ফুলের কলি। কোন প্রজাতির প্রতিটি কলিই থাকে আলাদা তো কোন কোনটাতে আবার একই পুষ্প দন্ডে ধরে অনেকগুলো কলি। এরা বহু বর্ষজীবি। শতায়ু হয় তেমন পুষ্পধারী বৃক্ষও আমাদের রয়েছে। এদের মধ্যে কোন কোন প্রজাতি আবার চির সবুজ প্রকৃতির। কখনও একবারে কোন ঋতুতে সব পাতা ঝরিয়ে দেবার স্বভাব তাদের নেই। তাকালেই  মনে হয় যেন গাছ ভরে আছে সবুজ পাতায়। অশোক, আকাশ নিম, কামিনী, ছাতিম, ডুলি চাঁপা, তমাল, নাগকেশর, নাগেশ্বর, পরশ পিপুল, বকুল, আকাশ মণি, চাঁপা তেমনি সব পুষ্পধারী চির সবুজ উদ্ভিদ। পুষ্পক বিশালদেহী চির সবুজ বৃক্ষও আমাদের আছে। লকেট ফুল, নাগকেশর, ছাতিম, আকাশনিম তেমনি সব বিশাল দেহী বৃক্ষ। মাঝারী আকৃতির পুষ্পধারী চির সবুজ বৃক্ষ আমাদের অনেক। হিমচাঁপা, হিজল, সোনাপুরি, মুচকুন্দ, বকুল, ডুলিচাঁপা, নাগেশ্বর, তমাল আসলে এ দলের অন্তর্ভূক্ত। চির সবুজ ক্ষুদ্র বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে কনকচাঁপা, লটকন, পলক জুঁই, কামিনী, কলকে এসব প্রজাতি। কোন কোনটা আবার পত্র মোচী স্বভাবের। সব পাতা ঝরিয়ে দিয়ে একেবারে উদোম হয়ে পড়ে শীতে। কৃষ্ণচূড়া, জারুল, শিরীষ, কনকচূড়া, কদম, কাঠবাদাম, গগণ শিরীষ, তেলসুর, নিম, পলাশ, জারুল এমনি সব পত্র মোচী পুষ্পধারী বৃক্ষ। এরকম উদোম বৃক্ষে কোন কোন উদ্ভিদ প্রজাতির সারা গা জুড়ে ফুটে থাকে নানা বর্ণের ফুল। শিমুল, হাড়গজা, মাদার, মণিমালা, রক্ত কাঞ্চন, জোড়া নিম এরা পত্র মোচী অবস্থায় সজ্জিত হয় ফুলে ফুলে। বিশাল দেহী পত্র মোচী বৃক্ষের মধ্যে অন্যতম হলো শিমুল, মহুয়া, তেলসুর, পারুল, কদম, গগন শিরীষ, শাল, সেগুন ইত্যাদি। স্বর্ণ শিমুল, রক্তন, মাদারী, মণিমালা, বরুন, পলাশ, পারুল, সোনাইল এসব হলো মাঝারী আকৃতির পত্র মোচী পুষ্পক বৃক্ষ। অর্ধ চির সবুজ প্রকৃতির পুষ্পক উদ্ভিদও রয়েছে আমাদের দেশে। কাঞ্চন, দেব কাঞ্চন এসব হলো অর্ধ চির সবুজ গাছ গাছালি। বছরে কয়েকবার পাতা জড়িয়ে দেয় তেমন উদ্ভিদের মধ্যে বিশাল দেহী নাগলিঙ্গম অন্যতম। মাদকতা ভরা বড় বড় ফুল ফুটে থাকে এর বিশাল কা- জুড়ে। বিশেষ ঋতুর জন্য রয়েছে আমাদের নানা রকম ফুল। সে কারণেই এরা মরসুমি ফুল। মরসুমি ফুল বাগানের ঔজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তোলে। ফুলের বর্ণ বৈচিত্র্য এদের প্রধান আকর্ষণ। গন্ধের চেয়ে বর্ণ বৈভবের জন্যই এরা এত প্রিয়। ছোট খাটো প্রকৃতির গাছ এরা। চির সবুজ গুল্মের পাশাপাশি কেয়ারী করে জন্মানো মরসুমি ফুল বাগানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহু গুণে। মরসুম অনুযায়ী এরা হতে পারে শীতকালীন কিংবা গ্রীস্মকালীন। কোন কোন প্রজাতি আবার গ্রীস্ম এবং বর্ষা দুই ঋতুকেই সমান আলিঙ্গন করে। বাহারি মরসুমি ফুলগুলোর বেশির ভাগই বিদেশী ফুল। শীতকালীন অর্থাৎ রবি মরসুমের ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে এস্টার, কার্ণেশান, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস, ডালিয়া, গাঁদা, পিটুনিয়া, কৃষ্ণকলি, জিনিয়া এসব ফুল। গ্রীস্মকালীন তথা খরিপ মরসুমের ফুলের মধ্যে দোপাটি, বোতাম ফুল, মোরগজবা, অ্যামারেন্ডাস ইত্যাদি অন্যতম। মোরগজবা, অপরাজিতা, সন্ধ্যামনি, জিনিয়া, সূর্যমুখী এগুলো গ্রীস্ম ও বর্ষার প্রজাতি। লম্বা সময় টিকে থাকে বলে দীর্ঘজীবী মরসুমি ফুলও বলা হয় এদের।

পুস্পধারী কন্দজ গাছের কিছু ফুলও আমাদের রয়েছে। বছরের একটা সময় মাটির নীচে লুকিয়ে থাকে এদের রুপান্তরিত কা- বা মূল। সময় এলে মাটি ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে কচি পাতা। কখনো আবার বেড়িয়ে আসে দীর্ঘ পুষ্প দন্ডের মাথায় ধরে রাখা ফুল, কখনোবা দু’টোই। এসব কন্দজ ফুল গাছকে অবশ্য লিলি নামেও অভিহিত করা হয়। ভারী চমৎকার সব ফুল ফুটে এসব কন্দজ ফুল গাছে। রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, কলাবতী, ভূই চাঁপা, দোলন চাঁপা, সুদর্শন বা সুখদর্শন এগুলো হলো আমাদের দেশে জন্মানো বিখ্যাত সব লিলি ফুল। অধিকাংশ প্রজাতির ফুলের রয়েছে চমৎকার গন্ধ। রজনীগন্ধা আর গ্লাডিওলাসতো কাটা ফুল হিসেবে জগৎ বিখ্যাত। স্বাধীন ভাবে দাঁড়াতে না পারলেও অন্যকে আশ্রয় করে বেড়ে বর্তে ওঠে তেমন লতা জাতীয় ফুল গাছও আমাদের রয়েছে। কোন গাছ বা দ-কে আশ্রয় করে এরা মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায়। বনে বাদাড়ে লতা জাতীয় ফুল গাছ চোখে পড়ে সহজেই। যতœ করে এর কোন কোনটা সৌখিন বাগানে স্থান করে দিলেও এদের অধিকাংশ রয়ে গেছে এখনো বুনো পরিবেশেই। লতা জাতীয় পুষ্পক উদ্ভিদের কোন কোন প্রজাতি স্বল্প মেয়াদী হলেও এদের অধিকাংশই আসলে দীর্ঘ মেয়াদী স্বভাবের। দীর্ঘ মেয়াদী স্বভাবের গাছ হলেও অধিকাংশ লতানো গাছ আসলে ফুল দেয় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে। মালতী লতা, পুলক তলা, মধুলতা, কাঁঠালী চাঁপা, বাগান বিলাস, অনন্ত লতা, অপরাজিতা, ঘন্টালাতা, চামেলী, জুঁই, ঝুমকা লতা, তারালতা, মধুমালতি পুষ্পধারী লতা জাতীয় ফুলের কিছু উদাহরণ।  পুষ্প প্রেমিকদের অতি প্রিয় ফুল হলো অর্কিড। ছোট গাছ জুড়ে বিশাল দন্ডে ফুটে থাকা নানা বর্ণের ফুল অর্কিডের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অল্প পাতার ভিড়ে ফুলগুলো এদের প্রধান আকর্ষণীয় বস্তু। গাছের ভিন্ন রকম গঠন কাঠামো আর ফুলের ভিন্নতর আকার-আকৃতি আর বর্ণ বৈচিত্র্য মিলে এক ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আমাদের মনযোগ আকর্ষণ করে অর্কিড। কাঁটা ফুল হিসেবে দীর্ঘ স্থায়িত্ব এদের সমাদর অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। ঝুলন্ত ছোট টবে পুরো পুষ্পিত অর্কিড গাছ যেন একটি কল্প তরু। অর্কিডের বৈচিত্র বিশাল। পনের হাজারের বেশি এর প্রজাতি সংখ্যা আর লিপিবদ্ধ জাতের সংখ্যা কমপক্ষে ত্রিশ হাজার। অর্কিডের মধ্যে সিংহ ভাগই অন্য উদ্ভিদকে আশ্রয় করে বাঁচে বলে এদের পরাশ্রয়ী অর্কিড বলা হয়। অর্কিডের কিছু প্রজাতি আবার ভূমি সংলগ্ন থাকে বলে এরা আসলে ভূমিজ বা ভূ-আশ্রয়ী। অ্যারিডেস ওডোরাটাম, ডেনড্রোরিয়াম, রা¯œা, বিঙ্কোস্টাইলিস, অ্যারুনডিনা এসব আমাদের দেশের কিছু সহজলভ্য অর্কিড। বাংলাদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে খাল-বিল, নদী-নালা আর হাওড়-বাওড়। বর্ষাকালে এসব নি¤œাঞ্চল জলাভূমিতে পরিণত হয়। নি¤œভূমিস্থ এসব জলাশয়ে ফুটে থাকে কত কত ভিন্ন রকম ফুল। বিলে-ঝিলে ফুটে থাকা আমাদের অতি প্রিয় ফুল শাপলাতো আমাদের জাতীয় ফুলই। শাপলা ছাড়াও আমাদের জলজ ফুলের মধ্যে রয়েছে চাঁদমালা, মাখনা, রক্তকমল, পদ্ম, শালুকের মত দৃষ্টি নন্দন সব ফুল। কেবল পদ্ম ফুলকে আবর্তন করেই কোন কোন স্থানে গড়ে উঠেছে পদ্ম পুকুর। জলোদ্যান গড়ে তোলার জন্য এসব জলজ ফুল গাছ অতি মূল্যবান উপকরণ।

লেখক:

ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare