কর্মসংস্থান ও দারিদ্র বিমোচনে শসা চাষ

নিতাই চন্দ্র রায়

ধান, পাট, গম, সরিষা প্রভৃতি ফসলের চেয়ে সবজি চাষ অধিক লাভজনক। সবজি চাষের সুবিধা হলো-অল্প সময়ে অধিক ফলন পাওয়া যায়। মৌসুমের শুরুতে উৎপাদিত শাক-সবজির দাম থাকে বেশি। বাজারে সব সময়ই সবজির  প্রচুর চাহিদা থাকে। পাইকাররা কৃষকের মাঠ থেকে   সরাসরি সবজি ক্রয় করে নিয়ে যায়। একই জমিতে একই সময়ে রিলে ক্রপ হিসেবে একাধিক সবজির চাষ করা যায়।  ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই পদ্ধতিটি ইদানিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষকরাই তাদের মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে এইসব পদ্ধতি উদ্ভাবন করছেন । ধনেপাতা ও পু্ইঁশাক, পুঁইশাক ও লতিকচু, কাঁচামরিচও আমঝুরি বেগুন- এসব শাক-সবজির রিলে ক্রপিং  এখন মাঠে বেশ দৃশ্যমান হচ্ছে। এতে একটি সবজির পরিপক্কতার সময়ে ওই সবজি ফসলটির কোনো ক্ষতি না করে আর একটি সবজির চাষ করা হয় এবং অনেক কম সময়ে কৃষক দ্বিতীয় সবজিটি তুলে বাজারে বিক্রি করার সুযোগ পায়।

শসা বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় সবজি। সারা বছর বাজারে শসা পাওয়া যায়। কচি অবস্থায় সালাদ হিসেব এবং সরাসরি খাওয়াতে শসার জুড়ি নেই। রেল, স্টিমার ও চলন্তবাসে  সরাসরি খাওয়ার জন্য অনেক মানুষ ফেরিকরে ঝাল-লবণ যুক্ত কাঁচা শসা বিক্রি করে। শসার প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য অংশে ৯৬ গ্রাম জলীয় অংশ, ০.৬ গ্রাম আমিষ, ২.৬ গ্রাম শ্বেতসার, ১৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম , ০.২ মিলিগ্রাম লৌহ, ৪০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন এবং ১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি রয়েছে। সারা বিশ্বে আবাদকরা সবজির মধ্যে শসার স্থান চতুর্থ। শসার রয়েছে নানা যাদুকরী গুণ। রূপচর্চা ও মেদ নিয়ন্ত্রণসহ নানা উপযোগীতা রয়েছে এই সহজলভ্য সবজিটির। শসার অনেক গুণের মধ্যে ১৪ টি গুরুত্বপূর্ণ গুণ উল্লেখ করা হলো- ১. শসা দেহের পানি শূণ্যতা দূর করে। ২. দেহের ভিতর ও বাইরের তাপ শোষণ করে। ৩.শসার মধ্যে যে পানি থাকে, তা আমাদের দেহের বর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে অদৃশ্য ঝাড়–দারের মতো কাজ করে। ৫. প্রতিদিন আমাদের দেহে যেসব ভিটামিন দরকার, তার বেশির ভাগই শসার মধ্যে রয়েছে। ৫. শসায় উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সিলিকেট আছে, যা ত্বকের পরিচর্যায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ৬. শসায় উচ্চমাত্রায় পানি ও নি¤œ মাত্রার ক্যালরিযুক্ত উপাদান আছে, ফলে যারা দেহের ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য শসা আদর্শ টনিক হিসেবে কাজ করে। ৭. শসা চোখের জ্যোতি বাড়াতে সাহায্য করে। ৮. শসা ডায়াবেটিকস থেকে মুক্তি দেয়। কোলস্টেরল কমায় ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ৯. মুখের দুর্গন্ধযুক্ত সংক্রমণে আক্রান্ত মাড়ির চিকিৎসায় শসা দারুন কাজ করে। ১০. শসার মধ্যে থাকা সিলিকা আমাদের চুল ও নখকে সতেজ ও শক্তিশালী রাখে। ১১. শসায় প্রচুর সিলিকা আছে। গাজরের রসের সাথে শসার রস মিশিয়ে খেলে দেহের ইউরিক এসিডের মাত্রা কমে আসে। ফলে গেঁটে বাতের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ১২. মাথা ধরা ও শরীর ম্যাজম্যাজ করা থেকে শসা নিস্কৃতি দেয়। ১৩. শসা শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা ঠিক রাখে। এতে কিডনি সুস্থ ও সতেজ থাকে। নিয়মিত শসা খেলে কিডনিতে সৃষ্ট পাথরও গলে যায়।

কোনাবাড়ি, গ-খোলা, চকরামপুর ও রসুলপুর গ্রামের শত শত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সারা বছর শাক-সবজির চাষ করে তাদের ভাগ্য উন্নয়নে সক্ষম হয়েছেন। এইসব কৃষকের নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের জমি লীজ বা বর্গা নিয়ে তারা চাষ করছেন-পুঁইশাক, ধনেপাতা, বেগুন, শসা, ক্ষীরা, লালশাক, লতিকচু, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, ঝিঙ্গা, ডাটা, করলাসহ নানা রকমের সুস্বাদু শাক-সবজি। কোনা বাড়ি পূর্ব পাড়ার  মোঃ মাজাহারুল ইসলাম গত বছর ৪৫ শতক জমিতে শসার চাষ করে খরচ বাদে লাভ করেন ৯০ হাজার টাকা। ওই একই গ্রামের জিয়ারুল ইসলাম নামের আর একজন কৃষক গত বছর ১৩ শতক জমিতে শসার চাষ করে খরচ বাদে নিট লাভ করেন ৩৫ হাজার টাকা। হুমায়ুন কবীর নামের একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী ৬৬ শতক জমিতে গত বছর শসা চাষ করে সব খরচ বাদে এক লাখ টাকা লাভ করে। এবছর সে ৭২ শতক জমিতে শসা, পুঁইশাক ও লতিকচুর চাষ করেছে। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে আবুল কালাম নামের একজন কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রথম কোনাবাড়িতে শসার আবাদ শুরু করেন। আবুল কালামের নিজের কোনো জমি ছিলনা। সে শসার চাষ করে  এক একর জমি ও পাকা বাড়ির মালিক হয়েছেন। তার দেখাদেখি কোনাবাড়ি ও পাশের গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছে শসার চাষ। কোনাবাড়িতে  দেশী জাতের শসাই বেশি চাষ হয়। কারণ পাইকারদের কাছে হাইব্রিড শসার চেয়ে দেশী শসার চাহিদা বেশি। চাষীরা নিজেরাই শসার বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করেন। বিএডিসি বারোমাসি ও পটিয়া জায়েন্ট নামের ২টি স্থানীয় জাতের বীজ উৎপাদন করে। এছাড়া কয়েকটি বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রীন কিং, আলভী, বীরশ্রেষ্ট, শীতল, হিমেল, গ্রীনফিল্ড, আদুরি, তিতুমীর, কিরণ, নন্দিনী ও গ্রীন লাইন নামে শসা বীজ বাজারজাত করছে। এ বছর কোনাবাড়ি ও গন্ডখোলা গ্রামে কম করে হলেও এক হাজার কৃষক প্রায় ৩০০ একর  জমিতে শসার চাষ করেছেন। শসা চাষে ৭৫ থেকে ১২০ দিন  সময় লাগে। তাই এই স্বল্প মেয়াদী ফসল চাষে কৃষকের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া । ঈদ, রোজা ও নববর্ষের সময়ে এই সবজিটির  দাম বেড়ে যায়। কৃষকেরা বলেন, বর্তমানে শসার মৌসুম পুরোপুরি শুরু হয়নি। এখন কোনাবাড়ি থেকে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ট্রাক শসা ঢাকা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়  সরবরাহ করা হচ্ছে। মৌসুম শুরু হলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ট্রাক শসা কোনাবাড়ি ও গন্ডখোলা থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়। অনুকূল আবহাওয়া থাকার কারণে গত বছর শসার বাম্পার ফলন হয়েছিল এবং দামও ছিল ভাল। বর্তমানে প্রতিমণ শসা এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও কৃষক শসা চাষ করে বেশ লাভবান হবেন। শসা চাষে কৃষক বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন  হচ্ছেন। সমস্যাগুলি হলো- এক. বিভিন্ন পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাই দমনে কৃষকের বাস্তব জ্ঞানের অভাব। দুই. প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ না পাওয়া। তিন. সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা। চার. হরতাল ও অবরোধের সময় পানির দামে শসা বিক্রি। পাঁচ. পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব ইত্যাদি। এসব সমস্যার সমাধান হলে শসা চাষ দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনবাড়ি, গ-খোলা, বিররামপুর, চকরামপুর ও রসুলপুর  এলাকাসহ সারা দেশে সম্ভাবনার  এক নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

————————————–

লেখকঃ সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ, ৪৫/১ হিন্দু পল্লী ত্রিশাল, পৌরসভা, ময়মনসিংহ।

মোবাইল; ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *