কাটারিভোগ কালিজিরা ও বালাম ধানের ফলন বাড়ানোর উদ্যোগ

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল

নীলফামারীর সৈয়দপুরে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগ, কালিজিরা ও বালাম জাতের ধানের আবাদ ফিরিয়ে আনতে ও ফলন বাড়াতে বিশেষ পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ চলছে। সৈয়দপুরের ১ নম্বর কামার পুকুর ইউনিয়নের অসুরখাই গ্রামে সজীব সীড্স নামে স্বনামধন্য একটি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ জৈব  কৃষি প্রযুক্তিতে ওই পরীক্ষামূলক চাষের তিনটি প্রদর্শনী প্লট করেছে।

জানা গেছে, এক সময় রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগ, কালিজিরা ও বালাম জাতের ধান চাষের ব্যাপক প্রচলন ছিল। এ ধানের জাতগুলো চাষাবাদ করে কৃষকরা পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলন এবং ভাল দাম পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতো। কিন্তু কালের বির্বতনে ওই জাতের ধানগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে হাঁটছে। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের ফলে বর্তমানে পুরাতন জাতের ধান চাষাবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার সজীব সীড্স নামের একটি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত প্রায় জাতের ধানের চাষাবাদ ফিরিয়ে আনতে এবং ফলন বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটির স্বত্তাধিকারী এক বিশেষ পদ্ধতিতে বিলুপ্ত প্রায় কাটারিভোগ,কালিজিরা ও বালাম ধান প্রদর্শনী প্লট করেছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে ‘জধরংবফ নবফ ঋঁৎৎড়ি ্ ঞরিহ ঢ়ষধহঃধঃরড়হ ঞবধপযহরয়ঁব’  নতুন এ পদ্ধতিতে উল্লিখিত তিন জাতের ধানের চাষ করা হয়েছে এবারের আমন মৌসুমে। এ পদ্ধতির উদ্ভাবক হচ্ছেন ঞ. শধঃধুধসধ. ওই জাপানীজ শস্য বিজ্ঞানী ১৯৫১ সালের এই পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেন। চাষাবাদের এ পদ্ধতি উদ্ভাবনকালে তিনি একটি ধানের চারা জমিতে লাগানোর পর ৮৪টি কুশি পান। ফলনও মিলে আশানুরূপ।

সজীব সীড্স নামের প্রতিষ্ঠানটির স্বত্ত্বাধিকারী মো. আহসান-উল-হক বাবু জানান, ইন্টারনেটে কৃষি বিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে তিনি এই পদ্ধতি খুঁজে পান। সেটি ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে তা নিয়ে বেশ কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি সে অনুযায়ী আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগ, কালিজিরা ও বালাম জাতের ধান চাষাবাদের মনস্থির করেন। যেই চিন্তা, সেই কাজ। তিনি বীজ সংগ্রহে নেমে পড়েন। সিলেটের এ বি কৃষি প্রকল্প এবং ঢাকার গীতাঞ্জলী অর্গানিক এগ্রো নামের অপর একটি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিলুপ্ত জাতের ধানের বীজ সংগ্রহ করেন বলে তিনি জানান। সিলেটের এ বি কৃষি প্রকল্প নামের প্রতিষ্ঠানটির মালিক হচ্ছে আব্দুল বাছিত সেলিম এবং ঢাকার গীতাঞ্জলী অর্গানিক এগ্রোর স্বত্তাধিকারী মি. জামান ।

সংগৃহীত বীজ বপনের ১৪ দিনের মধ্যে তা জমিতে লাগানো হয়। তিন জাতের ধানের চারা ৫৫ শতক  নিজের জমিতে লাগান আহসান-উল-হক। এর মধ্যে কাটারিভোগ ১৫ শতক, কালিজিরা ১৫ শতক ও বালাম ২৫ শতক জমিতে লাগানো হয়েছে। সম্প্রতি বীজতলা থেকে তুলে জমিতে ওই চারা লাগানো হয়। একটি করে জধরংবফ নবফ ওপর সারিবদ্ধভাবে চারা লাগানো হয়েছে। বেডের সাইজ প্রস্থে ৩ ফুট। একটি সারি থেকে অপর সারির দূরত্ব ১ দশমিক ৮ ফুট। চারা থেকে চারার দূরত্ব ১ দশমিক ৩ ফুট। রোপণের সময় জধরংবফ নবফ ওপর একটি করে চারা লাগানো হলেও ইতোমধ্যে একটি চারা থেকে কাটারিভোগ ও কালিজিরা জাতে সর্বোচ্চ ১৫২ টি কুশি এবং বালাম জাতে ১২২টি কুশি বের হয়েছে। এ প্রদর্শনী প্লটে বায়োগ্যাস স্লারী, মেহগনি খৈল, ভার্মি কম্পোট, হাঁড়ের গুড়া প্রয়োগ করা হয়। এছাড়াও স্বল্প পরিমাণে প্রয়োগ করা হয় ডিএপি, এমওপি এবং ইউরিয়া সারও। চারা রোপণের ১৪০ দিন থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে ধান কেটে ঘরে তোলা যাবে এবং ফলনও মিলবে আশাতীত। জধরংবফ নবফ এর ফাঁকা জায়গায় সেচ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিচু জায়গায় অ্যাজোলা দেওয়া হয়েছে। অ্যাজোলা মূলতঃ উদ্ভিদের এক ধরণের খাবার। ময়লাযুক্ত পানিতে অ্যাজোলা জš§ নেয়। অ্যাজোলায় উদ্ভিদের ১৪টি খাদ্য উপাদান বিদ্যমান। অ্যাজোলা প্রাকৃতিভাবে নাইট্টোজেন সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে ওই নাইট্রোজেন ফসলে খাবার হিসেবে যোগান দেয় বলে কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

সজীব সীড্সের স্বত্তাধিকারী মো. আহসান-উল-হক জানান, তাঁর মূল উদ্দেশ্য বিলুপ্ত জাতের ধান চাষাবাদ ফিরিয়ে আনা। তাছাড়াও আধুনিক এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বেশি ফলনের পাশাপাশি তিনি বীজ সংরক্ষণ করে তা সাধারণ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান। যাতে করে এ অঞ্চলের চাষীরা আবারো উল্লেখিত ঐতিহ্যবাহী জাতের বিলুপ্ত প্রায় ধান চাষের প্রতি বেশি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠে।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)  কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান সজীব সীড্সের  কাটারিভোগ, কালিজিরা ও বালাম জাতের ধানের প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন করেছেন। তিনি বিলুপ্ত প্রায় জাতের ধানের চাষাবাদ দেখে মুগ্ধ হন এবং এর উদ্যোক্তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কৃষিবিদ শাহ্ আলম, রংপুরের তাজহাট কৃষি ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ কৃষিবিদ মো. মনিরুজ্জামান, নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. আফতার হোসেন, সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোছা. হোমায়রা মন্ডল হিমু, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বাসুদেব দাস ও  আসাদুজ্জামান আশা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

————————————–

লেখকঃ

মফস্বল সম্পাদক, কালের কণ্ঠ, বসুন্ধরা

বারিধারা, মোবাইলঃ ০১৭১১-৩৬৪৪৮৫

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *