কুচিয়া মাছঃ মৎস্য রপ্তানী খাতে অপার সম্ভাবনা

মো.ইউসুফ আলী

সাপ আকৃতির মাছ কুচিয়া। বৈজ্ঞানিক নাম ‘মনোপটেরাস কুচিয়া’। বাংলাদেশে বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি প্রজাতির একটি। অথচ দেশীয় প্রজাতির মাছটির রয়েছে প্রচুর বৈদেশিক চাহিদা। প্রতিবছরই বাংলাদেশের বিভিন্ন খাল-বিল থেকে আহরিত কুচিয়া দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি হয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৭ লাখ ডলারের কুচিয়া রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরেও ছিল প্রায় এক কোটি ডলার। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট ও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে কিছুদিন আগেও আমাদের জানা ছিল না কুচিয়ার প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও পোনা লালন পালন ব্যবস্থা। তবে সম্প্রতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বদ্ধ পরিবেশে বিপন্ন প্রজাতির মাছটির প্রজনন ও পোনা উৎপাদন, খাবার ব্যবস্থাপনায় সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের মৎস্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হারুনুর রশীদ। পিএইচডি শিক্ষার্থী মাকসুদ আলমের সহায়তায় দীর্ঘ ৪ বছরের গবেষণা করে তিনি ওই সফলতা পান। কুচিয়া মাছের কৃত্রিম প্রজননের ফলে দেশীয় জলাশয়ে উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে যেমন বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। তেমনি মাছটি বিদেশে রপ্তানীর ফলে মৎস্য রপ্তানী খাতে যুক্ত হবে অপার সম্ভাবনার দ্বার।

কুচিয়া মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্পর্কে গবেষক ড. হারুনুর রশিদ জানান, কুচিয়া মাছ দেখতে বাইম মাছের মতোই। খেতে খুবই সুস্বাদু। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অর্থায়নে ২০১৩ সালে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মাছটির পোনা উৎপাদন নিয়ে আমরা গবেষণা শুরু করি। গবেষণার প্রথম দিকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা থেকে কুচিয়া সংগ্রহ করে প্রজননের জন্য হরমোন প্রয়োগ করি। কিন্তু অন্য সব মাছের মতো কুচিয়ায় প্রজনন হরমোন দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন করানো সম্ভব হয়নি। পরে আমরা পুকুরের কৃত্রিম প্রজনন উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশে সৃষ্টি করে প্রজননের চেষ্টা করি। সম্প্রতি আমরা বদ্ধ পরিবেশেই কুচিয়ার প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছি।

মাছটি সম্পর্কে ড হারুন বলেন, আমাদের দেশে উপজাতিদের কাছে মাছটি খুবই জনপ্রিয় খাবার। সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানীকৃত মাছটির দুই প্রজাতি দেখা যায়। এর মধ্যে আমাদের দেশের ‘মনোপটেরাস কুচিয়া’ নামক জাতটি ওজনে প্রায় ৩০০ থেকে ২০০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। অপরদিকে চীনের ‘মনোপটেরাস এলভাস’ কুচিয়ার ওজন সাধারণত ১০০০ গ্রামের বেশি হয় না। ফলে বিদেশে বাংলাদেশি কুচিয়ার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশের বাইরে কুচিয়ার ব্যাপক চাহিদা থাকায় এ দেশের ময়মনসিংহ, শেরপুরের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থনে প্রকৃতি থেকে প্রজননম ক্ষম কুচিয়া সংগ্রহ করা হচ্ছে। আহরিত কুচিয়া সাধারণত দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করা হয়। প্রতিবছরই ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৭ লাখ ডলারের কুচিয়া রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরে যা ছিল প্রায় এক কোটি ডলার ছড়িয়েছিল।

 

ক্যাপসনঃ : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বদ্ধ জলাশয়ে বিপন্ন প্রজাতির

কুচিয়ার প্রজনন ও পোনা উৎপাদন করেন ড. হারুনুর রশিদ (ইনসেটে)

দেশীয় প্রজাতির কুচিয়া (উপরে) কুচিয়ার ডিম (নিচে)

পোনা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ড. রশিদ বলেন, ‘কুচিয়ার পোনা উৎপাদনের থেকেও কঠিন কাজ হলো পোনাকে বাঁচিয়ে রাখা। কুচিয়ার পোনা আমাদের প্রচলিত খাবার গ্রহণ না করায় পোনাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে কুচিয়ার বাণিজ্যিক পোনা উৎপাদনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পোনার খাবার। তবে আমরা উৎপাদিত পোনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন ধরণের খাবার নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি, আমরা খাবার বিষয়টি নির্ধারণ করতে পারলে কুচিয়ার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।’

ড. হারুন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘কুচিয়া মাছকে প্রচলিত প্রজনন হরমোন দিয়ে উদ্দীপ্ত করে কৃত্রিম প্রজনন করা সম্ভব হয়নি। চীন-ভিয়েতনাম তাদের কুচিয়া প্রজাতিকে হরমোনের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজননে সফল হয়েছে। ফলে তারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপক হারে পোনা উৎপাদন করতে পারছে। আমাদের দেশীয় কুচিয়ার হরমোনের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন করতে পারলে আমরাও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোনা উৎপাদন করতে পারবো। সরকারি-বেসরকারী পর্যায়ে সহযোগিতা পেলে আমরাও হরমোন উদ্ভাবন করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি কুচিয়ার বিপন্নতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করতে পারব আশা রাখি।

————————————–

কৃষিবার্তা প্রতিনিধিঃ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

মোবাইল- ০১৭২১ ৫১২৫৪০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *