কুরবানীর পশু ক্রয় ও আমাদের করণীয়

 

মুনিরুজ্জামান

মহান আল্লাহ্ মানবজাতিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সাথে জানিয়ে দিয়েছেন তার ইবাদত করার নিয়ম কানুন। আর এসব  নিয়ম কানুন আমাদের হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন আল্লাহতালার প্রেরিত মহাপুরুষ নবী রাসুলগণ। এ ধারাবাহিকতায় আল্লাহ্ রাব্বুল আল-আমিন তার প্রিয় হাবিব মাহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে মুসলিম জাতি তথা উম্মতে মোহাম্মদির জন্য বছরে দুটো খুশির দিন ধার্য করেছেন। যা আমাদের কাছে ঈদুল-ফিতর ও ঈদুল-আজহা নামে পরিচিত।

মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মাধ্যমে এর প্রচলন হয় এবং তা আজও মহান আল্লাহ তালার নির্দেশে পালিত হয়ে আসছে গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মার মাঝে। যা মূলত আর্থিক ও জীবের কুরবানি আল্লাহর উদ্দেশ্যে বান্দার কাছ থেকে। মহান রাব্বুল আলামিন আপনার আমার কুরবানীর পশুর দাম তথা টাকার পরিমাণ দেখবেন না, দেখবেন না ক’টা পশু কুরবানী করছেন! শুধু দেখবেন আমাদের নিয়ত। আর এ জন্যই কুরবানীর পশুটি যেন তেন হলে চলবে না। আর আমরাও সবাই চাই আল্লাহ-তালার উদ্দেশ্যে আমাদের সর্বোচ্চটুকুই দিতে। কিন্তু একটা কথা ভাবতে গেলেও খারাপ লাগে যে, আমাদের দেশের বেশ কিছু বা প্রায় অধিকাংশ বাজার মধ্যস্বত্ব ভোগী এবং দালালদের দখলে। দালালদের চক্করে পরে প্রতিনিয়তই নানা ভাবে আমরা প্রতারিত হচ্ছি। অথচ কিছু বিষয় জানলে দালালদের খপ্পরে পড়লেও দালালদের শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দেয়াটা ধরতে পারব, ফলে পশু কিনে বাড়ি ফিরে আর আফসোস থাকবে না।

গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে পশু ক্রয়-বিক্রয়ের হাট গুলোতে প্রায় পাঁচ শতাধিক ভেট মেডিকেল টিম স্থাপন করা হয়েছিল। যা ছিল চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে এবার তা দ্বিগুণ করে হাজারের অধিক ভেট মেডিকেল টিম বসানো হবে। যারা পশু পরীক্ষাকরে সার্টিফাই করবেন পশু কুরবানির জন্য  উপযুক্ত কি না। যাতে সার্টিফাই করা গরু কিনতে পারেন সহজেই। তা সত্ত্বেও চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। আমাদের নিজেদেরই চোখ কান খোলা রেখে পশু কিনতে হবে। আমরা সাধারণত প্রতি বছরে একবার কুরবানির পশু ক্রয় করে থাকি। তাই পশুর শারীরিক অবস্থা ও বাজর দর সম্বন্ধে খুব একটা অবগত থাকি না। তাই ভাল পশু কেনার লক্ষ্যে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও দালালদের দারস্থ হতে হয়। আর দালালতো দালালই সুযোগ পেলে লোক ঠকাতে পটু। তবে আমরা নিজেরাই যদি পশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় যত সামান্য বিষয় জানি তাহলে আর বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে না।

কুরবানীর পশু কিনতে যে বিষয় গুলো সাধারাণত আমাদের  নজরে থাকে পশুটির গায়ের রং- আমরা সাধারণত লাল, খয়রি, কালো কিংবা লাল কালো মিশ্রিত প্রাণী বেশি পছন্দ করি, তাই অন্যান্য রং এর তুলানায় এই রঙের পশুর দাম দেড়- দু হাজার টাকা বেশি হয়।

(অসাধু ব্যবসায়ীরা মাঝে মাঝে গরুতে ফলস রং করে নিয়ে আসে)

শারীরিক কাঠামোঃ শারীরিক কাঠামো হবে শক্ত সামর্থ, হাড়ে চোখে পড়ার মত মাংস থাকবে। স্বাস্থ্যঃ আমরা অবশ্যি স্বাস্থ্যবান পশুটি কিনব কিন্তু অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবান কেনা মোটেও উচিত নয়। অতিরিক্ত ইউরিয়া বা ক্ষতিকর হরমনাল ঔষধ ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে।

মাংসে পরিমাণ; আর নিজ নিজ সামর্থ প্রভৃতি। আর সব থেকে যে বিষয়টা গুরুত্ব দেয়া উচিত তা হচ্ছে পশুটির  সুস্থতা কেননা অসুস্থ পশু কুরবানীর জন্য বিবেচ্য নয়।

সুস্থ পশু বৈশিষ্টঃ

             পশু নিয়মিত জাবর কাটবে।

             স্বাভাবিক ভাবে সুস্থ পশুরা মাথা নিচু বা পিঠ কুজো করে রাখে না, সুস্থ পশুতে আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সজাগ থাকবে।

             সুস্থ পশুতে কোন উদাসিন ভাব থাকবে না।

             চোখ দু’টো থাকবে উজ্জ্বল ও চঞ্চল।

             মাজেল (ঠোট) দু’টো হবে একটু ঠান্ডা ও ভেজা (ঘামের ফোটায়); উল্লেখ্য যে অতিরিক্ত ইউরিয়া খাইয়ে গরু মোটা করলে নাইট্রেট বিষক্রিয়ার কারণে মাজেল শুষ্ক থাকে।

             জিহ্বা দিয়ে নাক চাটবে, মুখ দিয়ে কোন লালা ঝরবে না।

             কান ও লেজ প্রয়োজন মত নড়াবে।

             দেহের লোম হবে মসৃন চকচকে হবে।

             শরীরে কোন পরজীবী (উকুন, আঠালি) থাকবে না।

             চামড়ায় কোন ক্ষত বা রক্তের দাগ অথবা লাঠি দিয়ে পিটানোর দাগ থাকবে না।

             শ্বাস প্রশ্বাস থাকবে স্বাভাবিক প্রতি মিনিটে গরু ১০-৩০ বার, ছাগল ২৫-৩৫ বার, মেষ ১০ থেকে ২০ বার।

             হাটালে কোন রকম খোরামি ভাব থাকবে না।

             শরীরে কোন প্রকার ফোলা টিউমারের মত অংশ থাকবে না। তবে জন্মগত কিছু চিহ্ন থাকে সে গুলোর জন্য কুরবানির কোন সমস্যা হবে না।

             মুখের সামনে খাবার ধরলে খেতে চাইবে।

             শরীরে হাত দিলে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

             পশুর কুরবানির উপযুক্ত বয়স হয়েছে কি না,তা দাঁত দেখে নির্নয় করতে হবে। সাধারণত পূর্ণাঙ্গ দুটি কেন্দ্রীয় স্থায়ী ছেদন দাঁত গজালে গরুর বয়স  ২ বছর, স্থায়ী দুটি মধ্যবর্তী দাঁত থাকলে ৩ বছর, ৬ টি পার্শ্ববর্তী স্থায়ী দাঁত থাকে তাহলে সাড়ে তিন বছর  এবং ৮ টি পূর্ণাঙ্গ দাত থাকলে ৪ বছর বয়স ধরা হয়ে থাকে।

পশু নির্বাচনে করনীয়ঃ

আমরা সাধারণত খামার বা পরিচিত পশু খামারীর কাছ থেকে অথবা বাজার থেকে পশু কিনে থাকি। খামার বা পরিচিত পশুপালনকারীদের নিকট থেকে কিনলে সুবিধে হয়। বিশেষ করে যে সব খামারের খামারিরা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু পালন করেন নিয়মিত টিকা প্রদান করে থাকেন তাদের কাছ থেকে নির্ভয়ে পশু কেনা যায়। ঝামেলা হয় হাটে গিয়ে কেনাতে। তবে নিম্নে উল্লেখিত বিষয় গুলো খেয়াল করলে সহজে সব ঝামেলা সমাধান করতে পারব ইনশাআল্লাহ্।

প্রস্তুতি- হাটে যাবার সময় পশু সম্বন্ধে ভালো ধারণা রাখে এরকম কাউকে সাথে নেওয়া ভালো। আর পকেটে দূরত্ব মাপার ফিতা নিয়ে নিন। যা গরুর ওজন জানতে সহায়তা করবে।

             প্রথমে পশুর কাছে না গিয়ে দূর থেকে দেখুন। পশুর হাটাচলা, অন্যান্য ক্রতারা পশুটিকে যখন দেখছে তখন পশুটি কেমন আচরণ করে তা লক্ষ্য করুন।

             এভাবে দূর থেকে দেখে তিন চারটি পশু নির্বাচন করুন।

             এবার কাছে গিয়ে দেখার পালা। পশুর দড়ি ধরে মালিককে পশুটিকে হাঁটাতে বলুন লক্ষ করুন। পশুর হাঁটা স্বাভাবিক আছে কি না।

             এরপর উপরে বর্ণিত সুস্বাস্থের বৈশিষ্ট গুলো মিলিয়ে নিন।

             বয়স দেখার জন্য যখন দাঁত দেখবেন তখন জিহ্বা ও মুখও ভালো ভাবে লক্ষ্য করুন কোন প্রকারের ঘা বা ক্ষত আছে কিনা।

             চামড়া কোন অংশে থ্যাতলানো থাকলেও সেই গরু পরিহার করে অন্য গরু পর্যবেক্ষণ করুন। চামড়ার মান ভাল কিনা সেটা বুঝবেন গরুর গলার অংশে চামড়া দেখে ও ধরে। যদি সেখানকার চামড়া ভারি হয় তাহলে বুঝবেন যে চামড়া উন্নতমানের।

             অতিরিক্ত মোটা, অতীব স্বাস্থ্যবান গরুর গায়ে টিপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে যদি দেখতে পাবেন যে, টিপ দেওয়া স্থানটি ভিতরের দিকে চুপসে গিয়েছে অর্থাৎ শরীরে পানি জমে গেছে এবং গরু শরীরের অতিরিক্ত ভারের কারণে ভালভাবে দাঁড়াতে বা হাটতে পারছে না তাহলে তা পরিহার করুন।

             একইভাবে ছাগল/খাসি/বকরি/মহিষ কেনার সময়ও তার চোখ, চামড়া, ক্ষুর, মুখ, মল ইত্যাদি দেখে নির্বাচন করতে হবে। মনে রাখবেন, একটি অসুস্থ পশু আপনার কুরবানির প্রধান অন্তরায়। সব ঠিকঠাক থাকলে এবার আমরা দাম নির্ণয়ের দিকে যেতে পারি।

পশুর দাম ঠিক করাঃ

পশুর হাটে সাধারণত কি পরিমাণ মাংস এই পশু থেকে পাওয়া যাবে তার উপর নির্ভর করে দাম ঠিক করা হয়। কসাইরা সাধারণত পশু দেখে আন্দাজ করেই সঠিক অথবা খুব কাছাকাছি ওজনের মাংসের পরিমাণ বলতে পারে। এটা তাদের অভিজ্ঞতার ফসল।  কিন্তু আমরা যেহেতু বছরে একবার পশু কিনি  আর মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকি এজন্য আমরা আন্দাজ ঠিকভাবে করতে পারি না। তাই আমাদের বিজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে।

যেভাবে জীবন্ত পশুর ওজন নির্ণয় করা যায়ঃ-

এ বাজারে যা নিতে হবে তা হলো শুধু একটা দূরত্ব বা কাপড় মাপার ফিতা আর সাথে  মোবাইলে ক্যালকুলেটরতো থাকছেই।

             প্রথমে পশুটির হার্ট গ্রিথ বা বুকের বেড়-সামনের পায়ের ঠিক পিছন দিক বরাবর মাপ নিতে হবে ফিতার সাহায্যে ইঞ্চিতে (রহপয)। নিচের ছবিতে প.

             এর পর শরীরের দৈর্ঘ্য-পশুর পেছনের পায়ের উচু হাড় থেকে গলার মাঝ বরাবর (সোল্ডার পয়েন্ট) এর দৈর্ঘ্য নিন ইঞ্চিতে। ছবিতে অ-

 

             এবার এই সূত্রটি ব্যবহার করুণ

 

আর সম্পূর্ণ পশুর ওজন থেকে ৩৫-৪৫% বাদ দিলে মোট সম্ভাব্য মাংসের পরিমাণ পাওয়া যাবে। এটি জাত অনুসারে পরিবর্তন হয়ে থাকে। আপনি নাড়িভুঁড়ি ইত্যাদির ওজন আন্দাজ করে বাদ দিয়ে মোট মাংসের পরিমাণ নির্ণয় করতে পারেন।

এবার বাজারের দামের সাথে মিল রেখে দর কষাকষি করে কিনে ফেলুন আপনার পছন্দের পশুটি।

উল্লেখ্য যে, কুরবানির জন্য গাভি গরু বা ছাগী যথাসম্ভব কেনা থেকে বিরত থাকায় ভালো, এতে করে পরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না । কেননা কিছু অসাধু মানুষ আছে যারা কুরবানির বাজারে জেনে না জেনে গর্ভবতী পশু বাজারে নিয়ে আষে।

পশু পরিবহনঃ

পশু কেনা হলে বাসায় ঠিক মত পশুটিকে আনা একটা বড় দায়িত্ব। হাট থেকে আপনার বাসা বা বাড়ি খুব দূরে হলে কুরবানির পশুটিকে ট্রাক বা পিকআপ এ নিয়ে আসুন। আর বাসা কাছে হলে ধীরে ধীরে হাঁটাতে হাঁটাতে নিয়ে আসুন। লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাড়াহুড়ো করে বা দৌড় দিয়ে শারীরিক শক্তি ক্ষয় করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা কুরবানির পশুগুলো সাধারণত অনেক দূর দূরান্ত থেকে হাটে আসে, অনেক ক্লান্ত থাকে।

কুরবানির পূর্বে পশুর যতœ:

যেহেতু ক’ দিন পরেই পশুটিকে কুরবানি দেয়া হবে তাই মানবিয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিশেষ খেয়াল রাখা উচিৎ।

             খাবার সরবরাহ- কুরবানির পশু ভেদে তাদের খাবার হিসেবে ভুসি, ঘাস, লতাপাতা বাজার থেকে কিনে অথবা গাছ থেকে মাঠ থেকে সংগ্রহ করে পরিমাণমত খেতে দিতে হবে।

             ভুসি পানির সাথে গুলিয়ে একটি মাঝারি সাইজের বালতিতে খেতে দিন সাথে মোলাসেস বা চিটাগুড় মিশালে খাবার সুস্বাদু করবে।

             কয়েক ঘণ্টা পরপর ঘাস, লতাপাতাও খেতে দিন। ভাতের মাড়ও খাওয়ানো যেতে পারে।  এতে গরুর ছাগলের পেট ভাল থাকে।

             গরু, ছাগল, মহিষ অর্থাৎ আপনার কুরবানির পশুকে অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পানিও পান করাতে হবে। এতে তার খাবারগুলো সহজে হজম হবে।

             কুরবানির পশুটির গোবর সাথে সাথে পরিষ্কার করে ফেলুন। এতে দুর্গন্ধ কম ছড়াবে এবং পরিবেশ পরিষ্কার থাকবে।

             এই গরমে তুলনামূলক ঠান্ডা ও নিরিবিলি জায়গায় রাখুন।

             পশুকে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকুন, এ ব্যাপারে বাচ্চাদের সতর্ক করে দিন।

             পশু কুরবানি করার পূর্ব প্রস্তুতিঃ

             আপনার কুরবানির পশুটিকে ভালোভাবে পরিষ্কার পানি ও সাবান বা ডিটারজেণ্ট দিয়ে ধুয়ে দিন। পশুকে গোসল করানোর  পর কিছুক্ষণ রোদে রাখুন যাতে করে শরীরে পানি শুকিয়ে যায়। তারপর আবার আরামদায়ক হবে এমন স্থানে রাখুন।

             পশুটিকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দিন।

             কুরবানি করার আগে থেকে কম পক্ষে ১২ ঘণ্টা পশুকে খাবার প্রদানে বিরত থাকুন। এ সময় পশু জাবর কাটুক, আর পর্যাপ্ত খাবার পানি সরবরাহ করুন। এতে মাংসের গুণগত মান বজায় থাকবে আর সহজে চামড়া ছড়ানো যাবে।

             পশু জবাই করা ছুরি, দা, বটি ভালো ভাবে ধার করে নিতে হবে আগে থেকে, কেননা ভোতা অস্ত্র দিয়ে পশু জবাই করলে তা হালাল হয় না। এতে ধর্মীয় নিষেধ আছে। তাই ছুরি, দা , ছুরি ধার করার সরঞ্জাম ইত্যাদি পরিষ্কার করে হাতের নাগালে রাখুন। সব ছুরি ও মাংস কাটার সরঞ্জাম ধারালো করে রাখুন। সহজেই ছুরি ধার করার জন্য বাজারে নাইফ শার্পনার পাবেন ২০০-৩০০ টাকার ভেতর।

             মাংস কাটার সুবিধার্থে দড়ি, বড় প্লাস্টিকের শিট কিনে রাখুন।

             পশুর কিছু অংশ উঁচু স্থান থেকে ঝুলিয়ে কাটলে অনেক সহজে কাটা যায়, যেমনঃ রানের অংশ। ঝোলানোর ব্যবস্থা যদি না থাকে তবে কিছু বাঁশ কিনে এনে নিজেই সাময়িক ভাবে তৈরি করে নিতে পারেন ।

পশু জবাইয়ের সময় করনীয়

             কুরবানির ঈদের নামাজ শেষে আমরা পশু জবাই করে থাকি। এ সময় যে বিষয় গুলি লক্ষ্য রাখতে হবে

             পশুটিকে পরিষ্কার জায়গায় শোয়াতে হবে।

             যেখানে রক্ত পড়বে সেখানে আগে থকে গর্ত করে রাখতে হবে সম্ভব না হলে পলিথিন বিছিয়ে রক্ত সংগ্রহ করতে হবে। পরে এই রক্তগুলো ভালো ভাবে মাটিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে। তা না করলে এই রক্ত জীবাণুর বংশবিস্তার ও রোগবিস্তারে সহায়ক হবে।

             জবাই করার সময় যে বিষয়টি খেয়াল রাখবেন তা হচ্ছে, জবাইয়ের পরে কুরবানির পশুটির শ্বাসনালী যেন কেটে না দেওয়া হয়। যা অনেকেই বা কসাইরা জেনে অথবা ভুলক্রমে করে থাকেন, এতে কিন্তু পশু কষ্ট পায় যা হুল দেয়া নামে পরিচিত, ধর্মীয় ভাবেও নিষেধ আছে এটা করার।

             চামড়া ছাড়ানোর সময় তাতে যেন মাংসের টুকরো লেগে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। এছাড়া বিক্রয় না হওয়ার আগ পর্যন্ত চামড়া এমন স্থানে রাখুন যেন তা কোন কাক, কুকুর ইত্যাদি প্রাণী নষ্ট করতে না পারে। কারণ এটা আপনার কাছে রক্ষিত গরিবের আমানত।

             জবাইয়ের পর করণীয়ঃ শহরে সাধারণত আশে পাশে সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিন থাকে না থাকলে পশুর আবর্জনা গর্ত করে পুঁতে ফেলুন।

             পরে থাকা রক্ত শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তা পানি ঢেলে পরিষ্কার করে ফেলুন, এবং ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে দিয়ে জীবাণু মুক্ত রাখুন।

             পশুর হাড়গোড় আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে  ফেলে রাখবেন না, এমন স্থানে ফেলুন যাতে তা পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সহজেই সরিয়ে নিতে পারে। অন্যথায় গর্ত করে নিজদায়িত্ব পুঁতে ফেলুন। মনে রাখবেন আপনার চারপাশ পরিষ্কার করার দায়িত্বও আপনার।

             সুযোগ থাকলে বড় কোন মাঠে অনেক জন নিজ নিজ পশু নিয়ে একত্রিত হয়ে কুরবানি দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন।  এতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের যেমন সুবিধা হবে, তেমনি পশু জবাই করতে আসা মৌলভী ও চামড়া সংগ্রহকারীদের সুবিধা হব। নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় কুরবানি দেয়ার চেয়ে এই পদ্ধতিটি অনেক বেশি সুবিধাজনক সহজ ও পরিবেশ বান্ধব।

কুরবানির পশুর জন্য আলাদা ভাবে যে বিষয় গুলো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খেয়াল রাখতে হবে-

             পশুর বয়সসীমাঃ উট-৫ বছর, গরুর ও মহিষ-৩ বছর,  ছাগল ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে -১ বছর  এর কমে জায়েজ হবে না। তবে দুম্বা যদি এমন হৃষ্ট পুষ্ট হয় যা এক বছরের মত দেখতে তা জায়েজ হবে বলে অনেকে মত দিয়েছেন কিন্তু এক্ষেত্রে কোন মতে ছয় মাসের কম হবে না। এটা ছাগল বা মেষের জন্য গ্রহণ যোগ্য নয়। তাই পরিচিত ছাড়া বাজারের কারোর মুখের কথায় এক বছরের পশু কিন্ত দাঁতাল নয় এরকম পশু  কিনা থেকে বিরত থাকুন।

             এক জনে একটি পশু কুরবানি দেয়াই উত্তম, উট, মহিষ, গরু  যেহেতু সাত জন মিলে দেয়া যায় এজন্য কোন মতে সাতের অধিক গ্রহণ যোগ্য নয়। তবে ২,৩,৪,৫,৬ ভাগে করা যেতে পারে। যৌথ কুরবানিতে অর্থের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে বেশি এমন কেউ যদি শরিক হন যিনি তার অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকা দেয় অথবা যদি কেউ আল্লাহ্র রাস্তায় কুরবানি ব্যতীত অন্য কোন নিয়াতে অংশীদার হয় তাহলে কুরবানী কবুল হবে না। এক জনের নিয়াতের জন্য সবার কুরবানি নষ্ট হবে।

             পশুর লোম বা পশম যাতে বেশি হয় সে দিকে খেয়াল রাখুন কেননা এতে সাওয়াব নির্ভর করে।

             অন্ধ, সিং, ভাঙ্গা, খোঁড়া যে কোন প্রকারের শারীরিক সমস্যা থাকলে তা কুরবানির জন্য প্রযোজ্য নয়। এজন্য পশু কেনার সময় শিং ভালো করে নেড়ে দেখতে হবে এতে করে কৃত্রিম ভাবে ভাঙ্গা শিং কেউ জোড়া লাগালে বুঝা যাবে।

             পাগল পশু কুরবানি দেয়া জায়েজ নয়। তাই বিশেষ করে ছাগল কেনার সময় হালকা করে মাথায় টোকা দিলে শব্দ করে তাহলে তা গিঁট ডিজিজ এর লক্ষণ, সুস্থ পশু চিৎকার করবে না।

             নিজে পশু জবাই করা উত্তম। অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে করিয়ে নেয়ার সময় কাছে দাঁড়িয়ে থাকুন।

             ময়লা আবর্জনা যথা স্থানে পুঁতে ফেলুন পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। চামড়া ভাল মত সংরক্ষণ করুণ এবং বিক্রি করুণ কেননা এটা কুরবানিরই অংশ। গবীর দুঃখীদের আমানত।

সর্তকতাঃ

             যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হাট বা বাজার থেকে পশু কিনুন। চোরা কারবারি বা অসৎ উপায়ে আমদানি করা পশু ক্রয় থেকে বিরত থাকুন।

হাট থেকে পশু কিনে ইজারাদারের কাছে আপনার পশুর হাসিল রশিদ ফি পরিশোধ করুন। ফি বাঁচানোর জন্য হাটের বাইরে থেকে কোন পশু ক্রয় করবেন না।

আলেম ওলামাদের মতে পশু ক্রয় হালাল না হলে কুরবানি হবে না।

             ভেট মেডিকেল টিমকে পশু পরীক্ষা করতে সহায়তা করুণ।

             তবে হ্যাঁ, গরুর মালিক বা রাখাল আপনার একান্ত পরিচিত হলে পশু সম্পর্কে ভালভাবে তথ্য নিয়ে আপনি পশু ক্রয় করতে পারেন।

সবাই ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন। মহান আল্লাহতালা আপনাদের কুরবানী গুলোকে কবুল করুন।

————————————–

লেখকঃ

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *