কৃষিতে নারী শ্রমিকদের অবদান ও স্বীকৃতি

দৃশ্যপট ১

মাদারীপুর জেলার রাজৈরের বাঘিয়ার বিলে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন দু’সন্তানের জননী আলো রায়। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির গৃহস্থলি কাজকর্ম সেরে সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত সারাদিন পুরুষের সাথে সমান পরিমাণ শ্রম দিয়ে আয় করেন মাত্র ১২০ টাকা যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক মজুরী পান ২’শ টাকা। শুধু আলো রায়ই নয়। প্রায় ৪ হাজার হেক্টর আয়তনের এই বাঘিয়ার বিলে আলো রায়ের মতো আঁখি বিশ্বাস, কমলা দেবী, মায়া রানীসহ আশে পাশের অসংখ্য নারী কৃষি শ্রমিক পুরো বিল জুড়ে বোরো ধানের মৌসুমে কাজ করেন। বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত চলে তাদের কর্মব্যস্ততা। পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম মজুরী পেলেও জীবন সংগ্রামে হার না মানা এই নারী শ্রমিকরা বছরের পর বছর ধরে এভাবেই এই বিলে কৃষি কাজ করে যাচ্ছেন। নারী কৃষি শ্রমিক আলো রায় বললেন, ‘এই বিলে বছরে একবার শুধু বোরো ধানের চাষ হয়। পুরুষ কৃষকদের পাশাপাশি আমরা নারী কৃষকরা সমান ভাবে শ্রম দিলেও ন্যায্য মজুরী পাই না। আমরা সমান কাজ করেও পুরুষদের প্রায় অর্ধেক মজুরী পাই।’ একই অভিযোগ আঁখি বিশ্বাস, কমলা দেবী, মায়া রানীদের। এই বিল থেকে প্রতি বছর কয়েক লাখ টন ধান উৎপাদন করা হয় যেখানে নারী কৃষি শ্রমিকদের বিরাট অবদান রয়েছে। বাঘিয়ার বিলের নারী কৃষি শ্রমিকদের দাবি, দেশের সমস্ত নারী শ্রমিকদের মজুরী বৈষম্য দূর করে সরকার পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মজুরী নীতিমালা সমান করে বাস্তবায়ন করে নারীদের নায্য অধিকারকে সুরক্ষিত করুক।

দৃশ্যপট ২

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বিনোদপুর টিপাপাড়া এলাকার আদিবাসী নারী শ্রমিক চানমনি টপ্য, পুষপ রানী, প্রিয়াংকাসহ আরো অনেকে কৃষি শ্রমের সাথে জড়িত।  তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমি থেকে আলু তোলার কাজ করছেন। মজুরি পান মাত্র ৭০ থেকে ৯০ টাকা। অপরদিকে পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয় দেড়শ থেকে ২০০ টাকা। একই উপজেলার নারী শ্রমিক বুলবুলি, কল্পনাসহ বেশ কজন জানান, ঘর সংসার ঠিক রাখতে তারা কৃষি জমিতে শ্রম দিচ্ছেন। কিন্তু তাদের যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় তা অমানবিক। পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি শ্রমিক লাইলিসহ বেশ কজন জানান, পীরগঞ্জে শত শত একর জমিতে আলু, হলুদ, আদা ও কচুর আবাদ হয়। এ ফসলগুলো নারীরাই ক্ষেত থেকে ঘরে নেওয়া পর্যন্ত কাজ করেন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার খুকিমাই, খাদিজা আক্তার, রোজিনা, জমিলা, লাইলী আক্তার, জোলেখা ও লাবনী বেগম নারী শ্রমিক। তারা অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালায়। একই সাথে কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা পাচ্ছে ১২০ টাকা আর নারী শ্রমিক হওয়ায় কারণে তারা পাচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। তারা ক্ষোভের সাথে জানান, নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা হলেও তারা এভাবে মজুরি বৈষ্যমের শিকার হচ্ছেন। নারী শ্রমিক অল্প পারিশ্রমিকে সন্তুষ্ট, কাজে পুরুষদের চেয়ে বেশি মনোযোগী, কাজের সময় অযথা আড্ডা না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে এ অঞ্চলে নারী শ্রমিকদের চাহিদা বেড়েছে। নারী শ্রমিক রহিমা বেগম ও লাইলী আক্তার জানান, অভাবে পড়ে তারা বাধ্য হয়ে অন্যের জমিতে কাজ করছেন। কিন্তু জমির মালিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছেন ।

দৃশ্যপট ৩

রাজশাহীর তানোর উপজেলার সরজাই ইউনিনের রুমি বেগম, চান্দুরিয়া ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম, মোহনপুর উপজেলার বুরইল ইউনিয়নের আকতুমা, পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের রাবেয়া বেগম- এর সবাই নারী কৃষি শ্রমিক। পেটের দায়ে তারা কৃষি জমিতে শ্রম বিক্রি করছেন। কিন্তু কৃষিতে নারী শ্রমিকদের কোন সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। অথচ তারাও শ্রমিক বলে পরিচিত। নারী কৃষি শ্রমিকদের অভিযোগ, এলাকার অনেক পুরুষ শ্রমিক কাজের জন্য বিভিন্ন স্থানে চলে যাওয়ায় এ অঞ্চলের নারী শ্রমিকরাই এখন কৃষিকাজ করছে। তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি কাজ করেও পারিশ্রমিক পাচ্ছে অনেক কম। উত্তরাঞ্চলে ৩ লাখের বেশি কৃষি নারী শ্রমিক রয়েছে। এরা পুরুষদের পাশাপাশি কৃষিজমিতে শ্রম বিক্রি করছে। কিন্তু তারা মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ পুরুষ শ্রমিক অভিবাসী। এরা জীবিকার তাগিদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে। পুরুষ শ্রমিকরা বাড়ির বাইরে অবস্থান করায় এ অঞ্চলে প্রতি বছরই নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। নারীরা এখন ক্ষেতে কাজ করছে। নারী শ্রমিকরা ক্ষেতে বীজতলা লাগানো, ক্ষেত পরির্চযা, ফসল ঘরে তোলাসহ সব ধরনের কাজ করছে। কিন্তু মজুরির বেলা পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম পাচ্ছে।

প্রেক্ষাপট

সৃষ্টির আদিপেশা কৃষি। এ কৃষির সৃষ্টি মানব সভ্যতার হয়েছে নারীর হাত দিয়ে। নারী ঘর সামলানোর পাশাপাশি সামাল দিচ্ছে কৃষিকে। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষিতে নারী শ্রমিকদের প্রকৃত অবস্থা কি তার কিছু রূপ উঠে এসেছে উপরের চারটি দৃশ্যপটে যেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক থেকে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ বাস করে গ্রামে। আর গ্রামের অধিকাংশ মানুষই কৃষিজীবী। আগে সাধারণত পুরুষরা কাজ করত মাঠে আর নারীরা কাজ করত বাড়িতে। ইদানিং অনেক জায়গায় প্রত্যক্ষভাবে কৃষিকাজে এগিয়ে আসছে নারীরা। তারা পুরুষের সাথে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। মাঠে ধান রোপণ করা থেকে শুরু করে সার দেয়া, আগাছা দমন, কীটনাশক ছিটানো, এমনকি ধান কাটাতে তাদের কোন আপত্তি নেই। কৃষকের মত মাথায় করে নারী আনছে বড় বড় ধানের বোঝা। অনেকে আবার বাড়ির পাশে কিংবা উঠোনে অনাবাদি জায়গায় শাক-সবজি, ফল-ফলাদির আবাদ করে সংসারে বাড়তি রোজগারের একটা পথ করে নিচ্ছে। এতে করে নিজের পরিবারের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শক্তিকে চাঙ্গা করছে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও তারা অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। দেশের পূর্বাঞ্চলে চা শিল্পের মত এতবড় সমৃদ্ধ শিল্পখাতের পেছনেও পাহাড়ি চা শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন থেকে শুরু করে আজকে কৃষির প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নারীর অবদান রয়েছে।

কৃষি কর্মকান্ডে নারী

দেশে মোট শ্রম শক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে নারী। আবার নারী শ্রম শক্তির মধ্যে ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সাথে জড়িত। এক জরিপে দেখানো হয় যে, কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে কৃষিকাজে সবচেয়ে বেশি নারী নিয়োজিত রয়েছেন। ফসলের প্রাক বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ পর্যন্ত অনেক কাজ নারী এককভাবেই করে। এছাড়াও বাড়ির বাইরে ফসলের মাঠে সবজি চাষ, মসলা উৎপাদন, শুঁটকি ও নোনা মাছ প্রক্রিয়াকরণ, মাছ ধরার জাল তৈরি, পোনা উৎপাদনের কাজও নারীরা করে। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগী পালনের কাজও নারীরা করে থাকে। বসতবাড়ীতে সামাজিক বনায়নের কাজও সম্পাদিত হয় নারীর হাত দিয়ে। বলা চলে কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোন পরিসংখ্যানে নারীর এ উপস্থিতির কোন হিসাব নেই। এমনকি কৃষি কাজে জড়িত এ বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিকের কোন মূল্যায়নও করা হয় না। এখনও গ্রামীণ সমাজে কৃষি ও চাষের কাজকে নারীর প্রাত্যহিক কাজের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। সেখানে মজুরি প্রদানের বিষয়টি অবান্তর। কোন কোন ক্ষেত্রে নামমাত্র মজুরি দেয়া হয়। একটি জরিপে দেখানো হয় যে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করলেও কৃষিখাতে নারী শ্রমিকের বৈধ পরিচিতি নেই। এছাড়া অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্য নারী শ্রমিকের মতই কৃষিখাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরাও তীব্রভাবে বৈষম্যের শিকার হন। কাজে স্বীকৃতির অভাব চরমভাবে লক্ষণীয়। এছাড়া নিয়মহীন নিযুক্তি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বল্প মজুরি, মজুরি বৈষম্য এবং আরও নানা ধরনের নিপীড়ন তো রয়েছেই।

কৃষিতে নারীর শ্রম

২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, কৃষিখাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। তবুও কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের তেমন কোন মূল্যায়ন নেই বললেই চলে। কৃষিকাজের সূচনা নারীর হাতে হলেও কৃষক বলতে আমরা পুরুষকে বুঝি। কৃষক হিসেবে একজন নারী যে কতটা সফল তা আমরা কখনো বিবেচনা করি না। আজও গ্রাম বাংলায় ক্ষেত নিড়ানি, বীজবপন, ধান লাগানো, ধান কাটা, ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত নারীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। সংসার সামলানোর পাশাপাশি নারীরা ফসল ফলানো পর্যন্ত সকল কাজে নিজেদের ভূমিকা পালন করছে। এমনকি দেশের অনেক অঞ্চলেই কৃষি কাজ ছাড়াও নারীরা মৎস্য পালন ও মৎস্য শিকারের কাজও করছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই নারীর এ সকল কাজের কোন আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। এমনকি গৃহপালিত পশুপালন থেকে শুরু করে কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের আয়ের টাকার ভাগও নারীকে দেয়া হয় না। ফলে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের অবদানের কথা কখনোই জাতীয় আয়ে বিবেচিত হয় না। এ সকল নারী কৃষি শ্রমিকরা আর্থিক ভাবে তো নয়ই সামাজিক দিক বিবেচনায়ও কোন স্বীকৃতি পান না।

কৃষিতে ক্রমবর্ধমান নারীশ্রমিক

দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির পঞ্চাশ লাখই নারী শ্রমিক। বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি বিশ লাখ নারী শ্রমিকের ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। এ সময়ে দেশে কৃষি, বন ও মৎস্য খাত, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছচাষ প্রভৃতি কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ লাখ হয়েছে। এ বৃদ্ধির হার ১১৬ শতাংশ। যদিও এসব নারীশ্রমিকের ৭২ শতাংশই অবৈতনিক পারিবারিক নারীশ্রমিক। ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এসব নারীর অবদানের স্বীকৃতি আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। শ্রমিক হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। অথচ এ সময় এ খাতে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে ২.৩ শতাংশ। কৃষি খাতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমেছে ১০.৪ শতাংশ। সার্বিকভাবে কৃষিতে নারীর অবদান থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কৃষিতে নারী শ্রমিক বা কিষানীর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষিতে যুগ যুগ ধরে অব্যাহত অবদান রাখলেও রাষ্ট্রে এখনো নারীর স্বীকৃতি মেলেনি। অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী ও নারী নেত্রীরা মনে করছেন দেশের কৃষি ও কিষাণ-কিষাণীর সার্বিক উন্নতির স্বার্থে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি’ জরুরি ভিত্তিতে হাতে নিতে হবে। সেই সাথে সরকারকে গ্রামীণ নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় প্রাতিষ্ঠনিক ব্যবস্থা ও কৃষিতথ্য পৌঁছে দেয়ার বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (সিএসআরএল)-এর ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫-০৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের এক কোটি বিশ লাখ নারী শ্রমিকের ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। যারা মূলত কৃষি, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছচাষ প্রভৃতি কৃষিকাজে নিয়োজিত। ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৯-১০ সময়ে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতে অংশ গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ৩৭ লাখ থেকে বেড়ে ৮০ লাখ হয়েছে। এ বৃদ্ধির হার ১১৬ শতাংশ। যদিও শ্রমবাজারে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ থাকলেও নিয়োজিত নারী শ্রমিকের ৭২ শতাংশই অবৈতনিক পারিবারিক নারী শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। অথচ এই সময়ে এই খাতে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে ২.৩ শতাংশ। ২০০২-০৩ সময়ের তুলনায় বর্তমানে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমেছে ১০.৪ শতাংশ।

নারী কৃষি শ্রমিকদের স্বীকৃতি

এ দিকে দেশের কৃষকদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যাতথ্য থাকলেও কিষাণীদের কোনো সংখ্যাতথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাছে নেই। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে প্রদত্ত এক কোটি ৩৯ লাখ কৃষক কার্ড বিতরণ করা হলেও কতজন কিষাণী এই  কৃষক কার্ড  পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা তা জানেন না। এ ব্যাপারে সিএসআরএলের জেন্ডার গ্র“পের সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, কৃষিতে কিষানীর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি। ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষি সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত থাকলেও তাদের স্বীকৃতি নেই। কৃষিতে নারীদের অবদান থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কৃষিতে নারীর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এর সাথে সরকারের নীতি-কৌশলের ব্যাপক যোগসূত্র রয়েছে। বর্তমান সরকারের কৃষি খাতে গতিশীল দিকনির্দেশনার একটি উদ্যোগ হলো ’কৃষক কার্ড’ বিতরণ। কৃষকপর্যায়ে প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষাণীদের অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।

গ্রামীণ নারীর শ্রম নির্ঘন্ট

শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী মানুষ যারা কাজ করছেন, কাজ করছেন না কিন্তু কাজ খুঁজছেনÑ জনগোষ্ঠীর এমন অংশকেই শ্রমশক্তি হিসেবে ধরা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে এক কোটি বিশ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতেই যুক্ত হয়েছে ত্রিশ লাখ কর্মসংস্থান। অর্থনীতির উদ্বৃত্ত শ্রমের ধারণায় কৃষিতে পারিবারিক শ্রমের প্রাধান্য থাকায় শ্রমের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা কখনো কখনো শূন্য হয়ে দাঁড়ায়। কৃষিতে নতুন কর্মসংস্থান নতুন কাজের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও তা একই সাথে বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে কৃষি খাতের গতিশীলতা, কৃষিতে ন্যায্য মজুরি অথবা কৃষি শ্রমিকের বাজারে প্রবেশগম্যতা কিছুতেই নিশ্চিত করে না। শ্রমশক্তির সংজ্ঞানুযায়ী, ২৯ শতাংশ নারীই কেবল শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। বাকিরা নিশ্চিতভাবে নানান অবৈতনিক পারিবারিক কাজে নিয়োজিত থাকার পরও শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে অদৃশ্যই থাকছেন। সিএসআরএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ নারী গৃহকর্মে সরাসরি অবদান রাখছেন। এদের অনেকে কিষানী, তবে তা শ্রমশক্তির বিবেচনায় ’অদৃশ্য’। গ্রামীণ নারীরা কৃষিতে শ্রম দিচ্ছেন। যার অধিকাংশই মজুরিবহির্ভূত পারিবারিক শ্রম। এক্ষেত্রে সারা দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। তবে সংখ্যাধিক্যের কারণে নিয়োজিত কিষানীকে ঠকিয়ে কম মজুরি দেয়ার প্রবণতাও সমানভাবে চলছে।

কৃষিতে নারী শ্রমিকদের অধিকার

জাতীয় জীবনে নারীর যথাযথ মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার কতগুলো আন্তর্জাতিক নীতি ও সনদে স্বাক্ষর করেছে যেগুলোয় মানুষ ও নাগরিক হিসেবে নারীর সমান অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮১ সালে ঘোষিত নারীর প্রতি বিরাজমান সব রকম বৈষম্য বিলোপের দলিল যা সংক্ষেপে সিডও সনদ নামে পরিচিত। ১৯৯৮ সনে কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিল ’অন্ন জোগায়  নারী’ এ স্লোগানটি। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে ১৮৯টি দেশের প্রায় ৩০ হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে নারী উন্নয়নের সামগ্রিক রূপরেখা হিসেবে ‘বেইজিং ঘোষণা ও প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশন’ গৃহীত হয়। নারী উন্নয়নের বৈশ্বিক নির্দেশিকা হিসেবে এ প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশনের আলোকে নিজ নিজ দেশে নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশনের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ এবং সমঅংশীদারিত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত জীবনের সব পরিমন্ডলে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের পথে বাধা সমূহ দূর করা। সেই সঙ্গে গৃহ, কর্মক্ষেত্র ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক সব পরিসরে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা এবং দায়দায়িত্ব সমবণ্টনের নীতি প্রতিষ্ঠিত করা।

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যেখানে নারী সেখানে নারীর উন্নয়ন ব্যতীত দেশের উন্নয়ন অসম্ভব। দেশে প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিলে বৈষম্য থেকে এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা সম্ভব। সমাজ তথা রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়নে নারীর কাজের সামাজিক ও আর্থিক স্বীকৃতি আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় সামাজিক বা পারিবারিকভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। সেই সঙ্গে এ খাতে নারীর মজুরি বৈষম্যসহ সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় কৃষিনীতিতে নারীর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী বিভিন্ন সময় নেয়া হলেও তা কখনো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন এ সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময় এসেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি এ খাতে নারীর অবদানকেও আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষিখাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি ও ন্যায্য মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কৃষি উৎপাদন কাজে নারীরা আরও আগ্রহী হবে। এর ফলে কৃষিখাতের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। জিডিপিতে কৃষির অবদানও বাড়বে। তাই কৃষিকাজে জড়িত নারী শ্রমিকদের মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক প্লাট প্যাথলজী বিভাগ

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare