কৃষিতে বালাইনাশকের ব্যবহারঃ সংকটে মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র

আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ

প্রথম পর্বঃ
পেস্টিসাইড বা বালাইনাশক মূলতঃ এক প্রকার বিষ যা ব্যবহৃত হয় ফসলের বিভিন্ন রকম আপদ তথা পোকামাকড়, জীবাণু, আগাছা ও ইঁদুর মারার জন্য৷ বিভিন্ন প্রকার পেষ্টিসাইড এর মধ্যে রয়েছে ইনসেক্টিসাইড বা কীটনাশক, ফানজিসাইড বা ছত্রাকনাশক, উইডিসাইড/হার্বিসাইড বা আগাছানাশক, মাইটিসাইড বা মাকড়নাশক এবং রোডেন্টিসাইড বা রোডেন্ট পেস্ট অর্থাত্‍ ইঁদুর মারার বিষ৷ সব ধরনের বালাই বা আপদ ফসল উত্‍পাদনে নানা রকম ক্ষতি সাধন করে থাকে৷ আর এ ক্ষতি মোকাবেলায় কৃষকরা বালাইনাশক বা পেষ্টিসাইড ব্যবহার করে থাকে ৷ ফসলকে রক্ষার জন্য কৃষকদের বালাইনাশকের যথেচ্চ ব্যবহার ফসলকে রক্ষা করলেও ধ্বংস করছে জীববৈচিত্র৷ বর্তমানে বালাইনাশকের ব্যবহার একদিকে ফসলের উত্‍পাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে অন্যদিকে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের মারাত্নক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ আবার দীর্ঘদিন বালাইনাশক ব্যবহার করার ফলে দিন দিন ক্ষতিকর পোকামাকড় ও জীবাণু বালাইনাশক প্রতিরোধী হয়ে পড়ছে৷
বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন এসোসিয়েশন এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬২ টি কোম্পানী বালাইনাশক আমদানি, রি-প্যাকিং, বিপণন ও বাজারজাতকরণ করে থাকে৷ বাংলাদেশে যে পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহার করা হয় তার সবই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়৷ দেশে মোট ১১ টি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে বালাইনাশকের সক্রিয় উপাদান আমদানী করে দেশে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য উত্‍পাদন করে থাকে, অন্যরা সরাসরি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ফিনিস্ড পণ্য আমদানি করে থাকে৷ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং এর বালাইনাশক প্রশাসন ও মাননিয়ন্ত্রন শাখা বাংলাদেশে রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত বালাইনাশকের মান নিয়ন্ত্রন করে থাকে৷ এ শাখার উদ্যোগে ২০০৬-০৭ ও ০৭-০৮ অর্থবছরে বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৫৮০ টি বালাইনাশকের রাসায়নিক পরীক্ষা পেষ্টিসাইড ল্যাবরেটরীতে সম্পন্ন করা হয় এবং রাসায়নিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত ৮০ টি ক্ষতিকর বালাইনাশক তাত্‍ক্ষণিকভাবে বাজার থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে ৷ বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ ধরনের ৭১ টি মাকড়নাশক, ৩৫ ধরনের ২৪৪ টি ছত্রাকনাশক, ৫৩ ধরনের ৬৮৮ টি কীটনাশক, ২২ ধরনের ১২২ টি আগাছানাশক, ২ ধরনের ১০ টি ইঁদুরনাশক বাজারে রয়েছে ৷ এছাড়াও ১ ধরনের ৬৮ টি নেমাটোডনাশক এবং স্টোরড্ গ্রেইন পেস্ট বা গুদামজাত শস্যের পোকা দমনের জন্য ৩ ধরনের ২৮ টি বিশেষ কীটনাশক রয়েছে৷ বাংলাদেশ মূলতঃ ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জামার্নী, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেস্টিসাইড আমদানি করে থাকে৷ নিম্নমান, রিসিডুয়াল ইফেক্ট ও মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ১০৯ টি পেষ্টিসাইড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে৷
কীটনাশক বা বালাইনাশকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে মানব মৃতু্যর বিষয়টি এখনো পর্যন্ত সারাবিশ্বে বহুলাংশে অপ্রকাশিত৷ যুক্তরাষ্ট ভিত্তিক পরিবেশ গবেষণা গ্রুপ- ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনষ্টিটিউট এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, কৃষি কাজে ব্যবহৃত কীটনাশকের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়ে যায় তাই সামপ্রতিক সময়ে মানুষের রোগ ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ বাংলাদেশে ফসল উত্‍পাদন ও রক্ষায় জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও বিভিন্ন প্রকার বালাইনাশকের প্রভাবে মানুষ, গবাদিপশু, মত্‍স্য সম্পদসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র এবং পরিবেশ আজ মারাত্নকভাবে হুমকির মুখে৷ দেশে সবচেয়ে বেশী বালাইনাশক ব্যবহার করা হয় শাক সবজি উত্‍পাদনে যা ক্রমশঃ জনস্বাস্থ্যকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে৷ কীটনাশক জমিতে ব্যবহার করার পর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই শাক-সব্জি বাজারে বিক্রির জন্য আনা হচ্ছে৷ সাধারণ মানুষ না জেনে অল্প ধুয়েই তা খাবার হিসেবে ব্যবহার করছে৷ কিন্তু কীটনাশকের বিষক্রিয়া এত প্রবল যে, ধোয়ার পরও তা মিলিয়ে যায় না৷ ফলে খাবারের সাথে মানবদেহে এবং খড়-কুটোর মাধ্যমে পশুর পেটে প্রবেশ করে সৃষ্টি করে নানান জটিল রোগ৷
বাংলাদেশে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কীটনাশক ব্যবহার হয় ১৯৫১ সালে৷ ১৯৫৬ সালে তত্‍কালীন সরকারের ‘প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইং’ প্রথমবারের মত বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডে দুই টন কীটনাশক আমদানী করে৷ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সন পর্যন্ত কীটনাশকের ক্ষেত্রে শতকরা একশ ভাগ ভতর্ুকি দিয়েছে৷ ঐ বছর ভতর্ুকি কমিয়ে শতকরা ৫০ ভাগে নামিয়ে আনা হয়৷ ১৯৭৯ সনে সরকারী ভতর্ুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং ১৯৮০ সন থেকে বেসরকারী খাতে কীটনাশক আমদানী অনুমোদিত হয়৷ শুরুর দিকে কীটনাশক ব্যবহার কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি স্লোগান ছিল- ‘বোকার ফসল পোঁকায় খায়’৷ সরকারী কতর্ৃপক্ষের প্রচারণায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠে বালাইনাশকের ব্যবহার৷ সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পক্ষে ফিলিপ গাইন রচিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সন থেকে ৯০ সনের মধ্যে বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে৷ ১৯৮৫-৮৬ সনে ব্যবহৃত কীটনাশকের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৩ মেট্রিক টন যা ১৯৯০-৯১ সনে বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৯ শ’ ৪৮ মেট্রিক টন৷ ১৯৯৯ সালে দেশে পেস্টিসাইড ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৩৪০ টন যা ২০১০ সালে বেড়ে দাড়ায় ৪৫ হাজার ১৭২ মেট্রিক টনে৷ এছাড়াও প্রতিবছর চোরাইপথে ভারত থেকে আসছে প্রচুর পরিমাণ কীটনাশক যেগুলো পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর৷ এগুলো দামে সস্তা এবং কাজ দেয় দ্রুত৷ চোরাইপথে আসা আজানল, গামাকসিন, হিলটন কীটনাশকের পাশর্্বপ্রতিক্রিয়া ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী৷ ৬শ’ ডিগ্রী তাপমাত্রাতেও এদের বিষক্রিয়া নষ্ট হয়না৷ ভারতের তৈরি কীটনাশক হিলডন ও হিলটন তুলা ছাড়া অন্য কোন ফসলের জমিতে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে সব ধরনের ফসলে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে৷ মূল দ্বারা শোষিত হয়ে এসব বিষ ছড়িয়ে পড়ছে গাছের শিরা উপশিরায়, এরপর চলে আসছে ফল ও ফসলে৷ এসব ফল ফসল ভক্ষণে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে মানবদেহ৷

সাম্প্রতিক বছরসমূহে বালাইনাশক ব্যবহারের তুলনামূলক চিত্র তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন এসোসিয়েশন
সাম্প্রতিক বছরসমূহে বালাইনাশক ব্যবহারের তুলনামূলক চিত্র
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন এসোসিয়েশন

আমদানী করা বালাইনাশকের শতকরা ৬০ ভাগ শুধুমাত্র ধান উত্‍পাদনে ব্যবহৃত হয়৷ তবে একক পরিমাণ জমিতে বালাইনাশকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশী হয় সবজি ফসলে৷ ফল ফসলে বালাইনাশক প্রয়োগের একটি নির্দিষ্ট সময় পর খাওয়া নিরাপদ ৷ এসময়কে বলা হয় অপেক্ষমান সময়৷ সব বালাইনাশকের অপেক্ষমান সময় এক নয়৷ অপেক্ষমানকাল উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত শাক-সব্জী অথবা ফল খাওয়া বা বাজারজাত করা উচিত্‍ নয়৷ ফসলভেদে এ অপেক্ষমান সময় কমপক্ষে ৩-৭ দিন৷ আমাদের দেশে কিছু কিছু ফল ফসলে প্রায় প্রতিদিনই বালাইনাশক প্রয়োগ করা হয়৷ এ বিষাক্ত সবজিগুলো খেয়ে মানুষের নানাবিধ শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়৷ পরিবেশ কমর্ীদের অভিযোগ, ধান উত্‍পাদনের জন্য কৃষকদের কীটনাশকের উপর নির্ভরশীলতার সুযোগে ‘এগ্রো-কেমিক্যাল’ কোম্পানীগুলো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং শিল্পোন্নত বিশ্বে নিষিদ্ধ কীটনাশক বাংলাদেশে আমদানী ও বাজারজাত করছে৷ দেশে ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে কয়েকটি অতি উচ্চ মাত্রায় বিষাক্ত যেগুলো মানুষ ও পরিবেশের জন্য অতিশয় ক্ষতিকর৷ এই শ্রেণীর অন্তভূর্ক্ত কীটনাশক “ডার্টি ডজন” নামে পরিচিত৷ এর বর্তমান সংখ্যা ১৮টি৷ এগুলো হলঃ ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর, ক্লোরোডেন, অলড্রিন, এনড্রিন, ডিয়েলড্রিন, কেমফাব্লোর, লিনডেন, বি.এইচ.সি, প্যারাথন, ডাইব্রোমা-ক্লোরোপেনটেন, প্যারাকু্যয়েট, টক্সাফেন, ২-৪ ডি, এলডিফার্ব, পেন্টাক্লোরোফেনল, মেথক্সি ইথানল, মারকারি ক্লোরাইড এভং ইথাইলিন ডাইব্রোমাইড৷ শিল্পোন্নত বিভিন্ন দেশে ফল ফসলে রেসুডুয়াল ইফেক্টের কারনে ‘ডার্টি ডজন’ পরিবারে অন্তভর্ূক্ত সব বালাইনাশকই নিষিদ্ধ৷ কিন্তু বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে মাত্র চার ধরনের বালাইনাশককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷
রাসায়নিক বালাইনাশক যথেচ্ছ ব্যবহার দেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর প্রতিনিয়ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে৷ অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে অত্যন্ত উপকারী প্যারাসাইট এবং ব্যাঙ ও সাপের মত উপকারী পতঙ্গভোজী প্রাণী ও সরীসৃপ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে৷ এর অধিক ব্যবহার কেবল ফসলের শত্রু পোকাই ধ্বংস করে না, অনেক উপকারী পোকা ধ্বংস করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে৷ সরেজমিন পরিদর্শনে বাংলাদেশের কৃষি জমির জীববৈচিত্রের যে চিত্র উঠে আসে- এক কথায় তা ভয়াবহ৷ কৃষি জমি বিশেষকরে ধানের জমিতে একসময় শামুক-ঝিনুক ও বিভিন্ন প্রকার ছোট মাছ দেখা যেত৷ এখন এগুলো একেবারেই অনুপস্থিত৷ প্রকৃতির লাঙ্গল বলা হয় যে কেঁচোকে তাও এখন আর কৃষি জমিতে পাওয়া যায়না৷ ফসলের জমিতে পোকামাকড় খাওয়ার জন্য পাখ পাখালির বিচরণ এখন কমে গেছে আশংকাজনকভাবে৷ ফসলের মাঠে ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত ভ্রমর আর মৌমাছির গুঞ্জনও কমে গেছে নানা রকম বিষাক্ততায়৷ এছাড়াও কৃষি পরিবেশে বিদ্যমান নানা রকম সরীসৃপ আজ বিলুপ্তপ্রায়৷ গবেষকরা জানান, বাংলাদেশে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ইতিমধ্যে ১২ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে৷ আগামী ১০ বছরে আরো প্রায় ২৫ ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদ বিপন্ন হওয়ার আশংকা করছেন পরিবেশবিদরা৷ ফসলের জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ অব্যাহতভাবে কমে যাওয়ায় মাটিতে বিভিন্ন উপকারী অনুজীব আর বেঁচে থাকতে পারছে না৷ সামপ্রতিক সময়ে ফসলের জমিতে আগাছানাশকের ব্যাপক ব্যবহার বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতিকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে৷ অন্যদিকে, অব্যাহতভাবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে নতুন প্রজাতির পোকার জন্ম হচ্ছে৷ যা প্রচলিত মাত্রায় কীটনাশক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাছানাশকের ব্যবহারের কারনে ভবিষ্যতে নতুন প্রজাতির আগাছার উদ্ভব ঘটবে যা কোন ভাবেই দমন করা যাবে না৷
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে তিনশর অধিক প্রজাতির কীট (পোকা) একাধিক কীটনাশক প্রতিরোধে সক্ষম৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত কীটনাশক বন্যা-বৃষ্টির পানি বাহিত হয়ে নদী-নালা ও পুকুরে ছড়িয়ে পড়ে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ক্ষতরোগ সৃষ্টি করছে৷ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের পুকুরসমূহে ক্ষতিকর মাত্রায় অর্গানোফসফরাস, কার্বামেট, ফুরাডান, ম্যালাথিয়ন কীটনাশক বিদ্যমান৷ চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা অনুষদের বিজ্ঞানিদের গবেষণায় দেখা গেছে, মাছে ডায়াজিনন, ফুরাডান ও বাসুডিনের অবশেষ ক্ষতিকর মাত্রায় উপস্থিত৷ ১৯৯৭ সালে বুয়েটে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, মানবদেহে বালাইনাশকের সহ্য ক্ষমতা যেখানে ০.০০৫ মিগ্রা/কেজি/দিন, সেখানে বাংলাদেশে এর পরিমাণ ০.০২ মিগ্রা/কেজি/দিন৷ তারা জলাশয়ের পানিতে সহ্যক্ষমতার প্রায় ২০ গুন বেশী ডিডিটি ও হেপ্টাক্লোর এর অস্তিত্ব পায়৷ বিষাক্ত কীটনাশক একইভাবে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে জনস্বাস্থ্যকে বিপজ্জনক করে তুলছে৷ এই বিষাক্ত পানি ব্যবহারে মানুষের স্নায়ুবিক দুর্বলতা এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে৷ হেলথ রিসোর্স ইনস্টিটিউট বলছে, কৃষি খামার ও উন্নয়নশীল দেশে অধিকাংশ মৃতু্যর ঘটনা বিশেষ করে ক্যান্সার, সংক্রামক ব্যাধি ও অন্যান্য অসুস্থতা কীটনাশক থেকে ঘটছে৷ তাদের মতে, কীটনাশক শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই নষ্ট করে ফেলে৷ কীটনাকের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের বমি বমি ভাব, অন্ত্রে ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী মাংসপেশী সংকোচন ও শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া প্রভুতি অসুবিধা দেখা দেয়৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণীবিন্যসে “অত্যন্ত বিষাক্ত” হিসেবে চিহ্নিত হেপ্টাক্লোর পাখি ও মানুষের জন্য অধিক ক্ষতিকর৷ এই কীটনাশকের সংস্পর্শে এলে মানুষ লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে৷ তাছাড়া গর্ভস্থ শিশুর মৃতু্য ও বিকলাংগ হওয়ার আশংকাও থাকে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে উন্নয়নশীল দেশসমূহে বিশ্বের ৩০ ভাগ বালাইনাশক ব্যবহার হলেও বালাইনাশক জনিত কারনে সংঘঠিত মৃতু্যর ৯৫ ভাগই হয়ে থাকে এসব দেশে৷
আমাদের দেশে শুঁটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত ও গুদামজাতকরণের জন্য নির্বিচারে ডিডিটি, নগস, বাসুডিন প্রভুতি কীটনাশক ব্যবহার হয়৷ বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, শুঁটকি মাছে ব্যাপকভাবে বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে৷ এই বিষাক্ত উপাদান গরম পানিতে ধোয়ার পরও শুটকি মাছে থেকে যাচ্ছে৷ অর্থাত্‍ রান্না করা শুটকি মাছও কোনভাবে বিষমুক্ত হচ্ছে না৷ ফলে তা চুড়ান্তভাবে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে৷ বিজ্ঞানীদের দাবী বাংলাদেশে মানবদেহে ১২ দশমিক ৫ পিপিএম (প্রতি ১০ লাখে) ডিডিটি রয়েছে যা ইংল্যান্ডের মানুষের দেহের তুলনায় প্রায় পাঁচগুন বেশী৷ বাংলাদেশে ১৪ বছর আগে ডিডিটি নিষিদ্ধ হলেও এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি এখনো৷
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবাদিপশুর এমনকি মায়ের দুধেও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কীটনাশকের অবশেষ পাওয়া গেছে৷ লন্ডন ভিত্তিক সংগঠন উইমেনস্ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের মতে, খাদ্যে বিদ্যমান কীটনাশক একেবারে মাতৃজঠর থেকেই শিশুর ক্ষতি করে৷ গবেষকদের দাবী, খাদ্যে কীটনাশককের অবশেষ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক স্তন ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী৷ এসব দেশে ৩০ থেকে ৫৪ বছর বয়সী মহিলাদের মৃতু্যর অন্যতম কারণ হলো স্তন ক্যান্সার৷ সমপ্রতি জাতিসংঘের ইউরোপ ভিত্তিক অর্থনৈতিক কমিশন এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে৷ উচ্চ বিষাক্ততাযুক্ত ১২টি কীটনাশকের বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় গড় ৫০ বছরে পুরুষের সন্তান উত্‍পাদন ক্ষমতা শতকরা ৪২ ভাগ কমে গেছে৷ এর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় ব্যাপকহারে রাসয়নিক কীটনাশকের অপব্যবহারের জন্য যে সব বিষয়কে দায়ী করা হয় সেগুলো হলো বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, কীটনাশক বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেযজ্ঞ ও বিশ্লেষণকারীর অভাব, মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট-কর্তৃপক্ষের কমর্ী স্বল্পতা, কীটনাশক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ব্যবহারকারীর অজ্ঞতা ও অসচেতনতা এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা ও সদিচ্ছার অভাব প্রভূতি৷
বেসরকারী সংস্থা ইনষ্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি এনালাইসিস এন্ড এডভোকেসি এবং প্রশিকা বিরাজমান সমস্যার সমাধানে বেশ কিছু পদক্ষেপকে চিহ্নিত করেছে৷ সংস্থার মতে মানবদেহ ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী “ডার্টি ডজন” ভূক্ত সব কীটনাশকের নিবন্ধন বাতিল এবং আমদানী ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা; ব্যবহ্নত কীটনাশকের অবশেষ (রেসিডিউ) বিশ্লেষণ; কীটনাশকের উত্‍পাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের সংগে সংশ্লিষ্টদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (আইপিএম) প্রচার ও সমপ্রসারণ; কীটনাশক নিবন্ধন, গুনগত মান, বিষ ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মকানুনের প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ; কীটনাশকের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি৷ পাশাপাশি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার চালিয়ে কীটনাশক ব্যবহার পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং “টেকসই” কৃষি ব্যবস্থা তথা পরিবেশের পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা যেতে পারে৷
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পোকা-মাকড়, রোগবালাই অনুপ্রবেশ ও বিস্তার রোধ এবং উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ অনুমোদনহীন উদ্ভিদজাত দ্রব্যাদি আমদানি-রফতানির জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান করে গতবছর ২০ মার্চ সংসদে ‘উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিল, ২০১১’ পাস হয়েছে৷ দ্য ডেস্ট্রাক্টিভ ইনসেক্ট অ্যান্ড পেস্ট অ্যাক্ট ১৯১৪ বাতিল করে ৯৭ বছর পর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ আইন ২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে৷ বাংলাদেশে কীটনাশকের আমদানি ও ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েই চলছে৷ ফসলের উত্‍পাদন বাড়াতে সব ধরণের কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করছেন কৃষকরা৷ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, দেশে কীটনাশকের আমদানি, প্রস্তুত ও ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে৷ (চলবে)

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, প্লান্ট প্যাথলজি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *