কৃষিতে বালাইনাশকের ব্যবহারঃ সংকটে মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র

আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ
পূর্ব প্রকাশের পর

কৃষি ফসল ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে কীটনাশকের অপব্যবহার কমানো জরুরি৷ এজন্য প্রয়োজন আইনের শাসন, কঠোর নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু তদারকি৷ তিনি মনে করেন, নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে কীটনাশকের অপব্যবহার কমবে, দেশের মানুষ পাবে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যশস্যের নিশ্চয়তা৷ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. জহুরুল করিম এ প্রসংগে বলেন, জনবহুল দেশের চাহিদা মেটাতে শস্য নিবিড়তা ক্রমেই বাড়ছে৷ এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কীটনাশকের ব্যবহার৷ কৃষকদের প্রশিক্ষণের অপযার্প্ততা এবং অদক্ষতার কারণে ফসলে ব্যবহৃত কীটনাশকের বিষ মানবদেহে ঢুকে রক্তে মিশছে৷ তিনি মনে করেন, কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কমানো যাবে৷ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশে প্রায় সাড়ে চার (৪.৫) কোটি কৃষক পরিবার থাকলেও বছরে গড়ে ২৫-২৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার কৃষক নতুন প্রযুক্তি ও কীটনাশক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পায়৷ কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র হলো, খুব অল্প সংখ্যক কৃষকই বালাইনাশক ও কীটনাশক এর যথাযথ ব্যবহার সমর্্পকে সচেতন৷ কৃষকদের অধিকাংশই বালাইনাশক কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধি ও স্থানীয় কীটনাশক ব্যবসায়ীদের পরামর্শে ফসলে সার-কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা অধিকাংশ সময়ই মাত্রাতিরিক্ত হয়৷
বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (বিসিপিএ) সূত্রের হিসাবে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে তিন কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৫ কোটি ২৫ লাখ, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ছয় কোটি ৭৭ লাখ, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ১১ কোটি ৫৬ লাখ, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৮ কোটি ২০ লাখ, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৩ কোটি ৫৯ লাখ এবং ২০১০-১১ অর্থবছরের ছয় মাসে (২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কীটনাশক আমদানি হয়েছে৷ সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্রের দাবি, বৈধভাবে আমদানির সঙ্গে ভারত এবং চীন থেকে বছরে আরো প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার কীটনাশক অবৈধ পথে দেশে ঢুকে ব্যবসায়ীদের হাত হয়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে৷ যার মধ্যে বেশকিছু সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটকও হচ্ছে৷ কীটনাশকের মান যাচাইয়ে নিয়োজিত কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা সূত্র জানিয়েছে, ষাটের দশকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১২৩ ধরনের কীটনাশক এক হজার ৩৯০ টি বাণিজ্যিক নামে দেশে বাজারজাতকরণের রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে৷ এর মধ্যে কীটনাশক বিধিমালা না মানায় এবং মানসম্পন্ন না হওয়ায় ১১১টির রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়েছে৷ এর মধ্যে গতবছর বাতিল হয়েছে চারটির (ক্লাইথরিন ১০-এফসি, ডাইওজেনিল টি-৬০, পেসনন ৫৭-ইসি, সিওফেন ২০-ইসি)৷ সূত্রের দাবি, কীটনাশক দেশে তেমন উত্‍পাদন হয় না৷ এর অধিকাংশই আমদানি র্নিভর৷ আমদানির পর দেশীয় কম্পানিগুলো তা প্যাকেটজাত করে নিজস্ব নামে বাজারজাত করে থাকে৷ এদিকে গত বছর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) করা কৃষি উপকরণ ব্যবহারে কৃষকের অভিজ্ঞতা শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ৭৭ ভাগ কৃষক কৃষি উপকরণের (সার. বীজ, সেচ, কীটনাশক প্রভৃতি) সঠিক ব্যবহার জানেন না৷ আর অধিকাংশ কৃষকই কীটনাশক প্রয়োগ সম্পর্কে অজ্ঞ৷ ঐ গবেষণায় আরো বলা হয়, দেশের কৃষকরা সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত্রে ফসল সংগ্রহের মাত্র ২-৪ আগে এমনকি ফসল সংগ্রহের দিনও বালাইনাশক ও কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে ফলে ঐসব বালাইনাশকের রিসিডুয়াল ইফেক্ট মানবদেহে চলে আসে ৷ যা মানবদেহে নানা ধরনের জঠিলতা সৃষ্টি করে, জীবনীশক্তি হ্রাস করে এমনকি ক্যান্সারসহ নানবিদ জটিল রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে ৷
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে ফি বছর বাড়ছে খাদ্য চাহিদা ৷ অপরদিকে বালাই এর আক্রমণে উত্‍পাদিত খাদ্যশস্য বিপুল পরিমাণে নষ্ট হচ্ছে ৷ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর এক জরিপ থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে ১৮ ভাগ ফসলহানী ঘটে শুধুমাত্র কীট-প্রতঙ্গের কারণে৷ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ ভাগ ফসলহানী ঘটে শুধু রোগ বালাই এর কারণে এবং মাঠ পর্যায়ে ৫-৭ ভাগ ফসল নষ্ট হয় ইঁদুরের আক্রমণে৷ এছাড়াও আগাছাজনিত কারণেও ফসলহানী ঘটে থাকে৷ কৃষিজাত ফসলের নানাবিধ ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য সর্বাধুনিক দমন ব্যবস্থা হিসেবে দেশে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা চালু হলেও আইপিএম এর সর্বশেষ ব্যবস্থা -রাসায়নিক দমন ব্যবস্থাটিই এখনো সর্বধিক ব্যবহৃত উপায়৷ আবার মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে দেশব্যাপি বালাইনাশকের ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বালাইনাশকের সংখ্যাও ক্রমেই বেড়ে চলছে৷ পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বালাইনাশক ব্যবহারে যথাযথ নিয়মকানুন মেনে চলা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত৷
রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার দ্বারা ফসল রক্ষা এবং অতিরিক্ত উত্‍পাদন হলেও এর পিছনে বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় যে স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং পরিবেশ দূষিত হয়, তাতে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী হচ্ছে – এতে কোন সন্দেহ নেই৷ তাই রাসায়নিক কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কৃষক সমাজ তথা সমগ্র জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে হবে৷ প্রচলিত কীটনাশকের মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে ক্ষতিকর, সেগুলো চিহ্নিত করে উত্‍পাদন, আমদানী ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে৷ তাছাড়া কীটনাশক সংক্রান্ত আইনের সঠিক ও বাস্তব প্রয়োগের পাশাপাশি আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে৷ কৃষিবিদদের মতে, রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে জৈব বালাইনাশক ও আইপিএম পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উপায়ে বালাই দমন করা সর্বোত্তম৷ এতে অর্থের সাশ্রয় হবে, ফসলের উত্‍পাদন খরচ কমবে এবং মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষিত হবে৷
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, প্লান্ট প্যাথলজি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *