কৃষিতে সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষিতে এসেছে আশাতীত সাফল্য। ১৯৭১ সালে দেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। ভূমির অনুপাতে লোকসংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিবছর লোক সংখ্যা বাড়ছেই। সে তুলনা কৃষি জমি এক শতাংশও বাড়ছে না। বরং কৃষি জমিতে স্থাপনা, কারখানা রাস্তাঘাট তৈরি হচ্ছে। তারপরও ক্ষয়িষ্ণু আবাদি জমি থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম, ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগুচ্ছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দেড় টন চাল উৎপাদিত হতো। এখন হেক্টর প্রতি উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি। তাছাড়া হেক্টর প্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বে গড় ৫ দশমিক ১২ টন। বাংলাদেশে এ হার ৬ দশমিক ৯৮ টন। খাদ্যশস্যে প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মাছ রফতানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। ব্লাক বেঙ্গল ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম। বাংলাদেশের ব্লাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের সেরা জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আম উৎপাদনের বিশ্বে মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনে। আর আলু উৎপাদনকারী শীর্ষ দশ দেশের কাতারে এসেছে দেশ। বাংলাদেশ থেকে আলু, সবজি আর আম রফতানি হচ্ছে বিদেশে। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য উদাহরণ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এখন ইলিশের উৎপাদন বহুল পরিমাণে বেড়েছে। চিংড়ি রফতানি থেকে প্রতি বছর আমাদের আয় ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উৎপাদন ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদনও বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে বৃদ্ধি পেয়েছে এসব পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের জনপ্রতি প্রাপ্যতা।

আজ আমাদের কৃষি সাফল্যের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। তা হচ্ছে, আমাদের কৃষকরা বছরের পর বছর তাদের বহু কষ্টে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। কোনো ভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য।  তাছাড়া প্রতি বছর একশতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে চাষাবাদ তথা খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন হয়তো উন্নতমানের  প্রযুক্তি এবং উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাহলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। এজন্য এখন থেকেই যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে বলে আমরা মনে করি।

২. প্রিয় পাঠক, ইংরেজি নববর্ষ ২০১৮ সালে কৃষিবার্তার সকল পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপন দাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি রইল আমাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। নতুন বছরে সকলের জীবনে বয়ে আসুক অনাবিল সুখ আর সমৃদ্ধি সে কামনা নিরন্তর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare