কৃষিবিদ ড. মো: শরফ উদ্দিন এর বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার অর্জন

 

কৃষিবার্তা ডেস্ক: কৃষিবিদ ড. মো. শরফ উদ্দিন, পিতা: আলহাজ্ব মো. আব্দুর রশীদ, মাতা: মোসা: সারাবান তোহুরা, রাজশাহী জেলার একজন কৃতি সন্তান। তিনি ১৯৭৯ সালে রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দুই সন্তানের জনক। ছোট বেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী। রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার কসবা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি এবং রাজশাহী সরকারী সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর কৃষির প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় ভর্তি হন এশিয়া মহাদেশের এতিহ্যবাহী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে। সেখান থেকেই তিনি কৃষিতে অনার্স ও উদ্যানতত্ত্বে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স চলাকালীন সময়েই তিনি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে চাকুরীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথমবারেই চাকুরীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, রহমতপুর বরিশালে কর্মজীবন শুরু করেন। সেই কেন্দ্রে তিনিই প্রথম আমের চারা-কলম উৎপাদনের জন্য নার্সারী স্থাপন করেন এবং দক্ষিণাঞ্চলে বারি উদ্ভাবিত জাতগুলোর সম্প্রসারণ শুরু করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোভাট স্কাউট কার্যক্রমের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং রোভার স্কাউটের চুড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট’স রোভার স্কাউট এ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এই স্বীকৃতি উনার চাকুরী জীবনে অনুপ্রেরণার সঞ্চার করে। তিনি ২০০৬ সালে আমের উচ্চতর গবেষণা করতে আগ্রহ প্রকাশ করলে উনাকে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনস্বার্থে বদলী করা হয়। এখানে তিনি আমের ৩ জাত মুক্তায়নের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তিনিই বাংলাদেশে বেলের প্রথম বাণিজ্যিক জাত বারি বেল-১ উদ্ভাবন করেন। এছাড়াও তার উদ্ভাবিত কুলের একটি নাবীজাত মুক্তায়নের অপেক্ষায় আছে। তিনি আম রপ্তানিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ২০০৮ সালে আমকে কোয়ারেন্টাইন বালাইমুক্ত করার জন্য ব্যাগিং নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিতে ভালো মানের আম উৎপাদন হলেও আমের মৌসুমে কয়েকবার ব্যাগ পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু সেটি আমচাষীদের জন্য কোনভাবেই সম্ভব ছিলনা ফলে সেই গবেষণাটি সেখানেই স্থগিত করা হয়। মাথায় চিন্তা একটিই বাংলাদেশী আম রপ্তানি করতে হবে। এর মধ্যেই সুযোগ আসে আমের উচ্চতর গবেষণা করার জন্য। ন্যাশন্যাল এগ্রিকালচার টেকনোলটি প্রজেক্ট ফেজ-১ এর আওতায় চাইনিজ একাডেমী অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সসেস, বেইজিং হতে বাংলাদেশী ও চাইনিজ আমের উপর গবেষণা করে গৌরবের সাথে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি পিএইচডি চলাকালিন সময়ে চীনের প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চল সমুহ পরিদর্শন করেন এবং ভালো মানের ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের জন্য ১৫ দিনের একটি আন্তজার্তিক কর্মশালায় অংগ্রহণ করেন। সেখানেই মূলত: তিনি আম রপ্তানির কৌশলসমুহ রপ্ত করেন। পিএইচডি শেষে তিনি পুনরায় পূর্বের কর্মস্থালে ফিরে আসেন এবং রপ্তানিকে কেন্দ্র করে গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেন। উদ্ভাবন করেন ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি। উনার হাত ধরেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হতে প্রথম ব্যাগিং প্রযুক্তিতে আমের রপ্তানি শুরু হয়। আমচাষীরা প্রযুক্তিটি খুব ভালোভাবেই ব্যবহার করছেন এবং প্রচুর পরিমাণে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করছেন। এর ফলে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানি হঠাৎ করেই বেড়ে যায় এবং ৬৬৫ টন আম রপ্তানি হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদনে জাত ভেদে ১৫-৬২ বার বালাইনাশকের ব্যবহার হতো। এখন তা কমে এসেছে ৩-৪ বারে। এখন ক্রেতারা ইচ্ছে করলেই নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম ক্রয় করতে পারবেন ও তাদের পছন্দের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। ড. শরফ উদ্দিনের উদ্ভাবন আমচাষীদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আমচাষ করেও যে কোটিপতি হওয়া যায় তার প্রমাণ লাউঘাটা এলাকার মজিবর রহমান, নাককাটি তলার কাজী সেতাউর রহমান। মজিবর রহমান একাই ব্যাগিং করেছে ১০ লাখ আমে। আর কাজী সেতাউর রহমানের নেতৃত্বে ৫০-৬০ লাখ ব্যাগিং হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের। আম উৎপাদনকারী অঞ্চলে এপ্রিল-মে মাসে সাধারণত কোন কাজ থাকে না। ফলে তারা অলস সময় অতিবাহিত করতেন। কিন্তু এখন প্রত্যেকটি আমের ব্যাগ বেধে উপার্জন করেন ৭০ পয়সা থেকে ১.০ টাকা। আরও একটি মজার বিষয় হলো আমে ব্যাগ পরানোর কাজটি সকলে মিলে একসাথে করতে পারেন। যেমন স্কুল বা কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, বাড়ির মালিক, বসবাসকারী পুরুষ বা মহিলা, ছেলে-মেয়েরা। শুধু তাই নয় এই বছর সারা দেশে প্রায় আড়াই কোটি আমে ব্যাগ পরেছে। প্রতি বছর এর পরিমাণ বাড়বে এটি বিজ্ঞানীর আশাবাদ। আমে প্রয়োজন হবে না কার্বাইড, ফরমালিনের মতো বিষাক্ত ক্যামিকেলের ব্যবহার। প্রয়োজন হবে না প্রশাসন, র‌্যাব পুলিশের যৌথ অভিযান। নিরাপদ, বিষমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের জন্য ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বীকৃতি স্বরূপ উনাকে পুরস্কারটি প্রদান করা হয়। শুধু কি তাই চাষীর সুযোগ থাকবে না অতিরিক্ত বালাইনাশকের ব্যবহারের। প্রযুক্তিটির ব্যবহার ফল উৎপাদনে মাঠ পর্যায়ে নিশ্চিত হলে বালাইনাশকের ব্যবহার কমবে ৭০-৯০ ভাগ। এই বিজ্ঞানির দেশীয় ও আন্তজার্তিক জার্নালে ৩৯ টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, কৃষিকথা, কৃষি বিষয়ক ম্যাগাজিনে কৃষির চলমান বিভিন্ন সমস্যা, সমাধান ও সম্ভবনা নিয়ে প্রায় ১৩০ টির মতো জনপ্রিয় লেখা প্রকাশ করেছেন। তিনি “অঢ়ঢ়ষরবফ ঢ়ষধহঃ এবহড়সরপং ধহফ ইরড়ঃবপযহড়ষড়মু” বইয়ে আমের উন্নয়নের জন্য মলিকুলার গবেষণার প্রয়োগ বিষয়ে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন এবং জাতীয় বৃক্ষ আমগাছ বইয়ে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি সম্পর্কে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে চলমান গবেষণা সমুহের অন্যতম হলো বারোমাস আম উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন ফল ও সবজিতে বালাইনাশকের ব্যবহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। দেশের সকল মানুষের জন্য সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য হোক দেশীয় মৌসুমি ফল সেই লক্ষ্যেই গবেষণা কাজ করবেন আগামিতে এমনটিই জানিয়েছেন এই বিশিষ্ট ফল বিজ্ঞানী।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *