কৃষির সমস্যা সমাধানে শেকৃবির ‘৯০ মিনিট স্কুল

বশিরুল ইসলামঃ

শহরাঞ্চলে ফুল, ফল ও সবজির পারিবারিক বাগান এখন আর কেবলই সৌখিনতা বা পারিবারিক প্রয়োজন নয়। পরিবেশ রক্ষা আর নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে অনেক দেশেই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গাড়ি বারান্দা, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাস ভূমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুলের গাছের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে সবুজ নগরায়ন। আমাদের দেশেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছাদ বাগানের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এদেশে ছাদ বাগানের সূচনা । কিন্তু এই বাগান করতে গিয়ে অনেকেই আবার বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। যেমন-গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়া, পোকামাকড়ের আক্রমণ, কোন ফসলের কোন রোগের জন্য কোন ওষুধ কার্যকর, গাছ মরে যাওয়া, আশানুরূপ উৎপাদন না হওয়া, কখন কোন গাছ লাগাতে হবে ইত্যাদি। এ জাতীয় সমস্যার সমাধানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিনের উদ্যোগে চালু করা হয়েছে ‘৯০ মিনিট স্কুল’ নামে বিশেষ সেবা। এ সেবার আওতায় বিশেষ প্রশিক্ষনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের গ্রাফটিং বা কলমের চারা তৈরী করার কলা কৌশলও শিখানো হচ্ছে হাতে কলমে।

এ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় প্রশ্ন ও উত্তর পর্বের। প্রতি শুক্রবার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদে সকাল ১০টা হতে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত (৯০ মিনিট) চলে এ প্রশ্ন ও উত্তর পর্ব। এ সময় বাগান মালিকরা তাদের সমস্যার কথা জানান এবং অধ্যাপক ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন সেসব সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দেন। এ সেবা ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওগুলো পরবর্তীতে  আর্কাইভে থাকছে।

অধ্যাপক ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন বলেন, বাগান করতে গিয়ে বাগানিরা প্রায়ই বিভিন্ন ধরণের সমস্যার মুখে পড়েন। এ নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্ন করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপযুক্ত উত্তর পান না। এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার কথা চিন্তা করেই আমরা ৯০ মিনিট স্কুলের কার্যক্রম শুরু করেছি। তিনি আরও বলেন, এই প্রশ্নোত্তর পর্বের উদ্যোক্তা ফেসবুক গ্রুপ গ্রীন বাংলাদেশ। এ গ্রুপে প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট বিষয় উপর বাগানিদের সমসাময়িক সমস্যা জানতে চাওয়া হয়। এরপর বাগানিরা সেখানে তাঁদের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। এই সাত দিনের প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয় শুক্রবার। প্রশ্নকারী ব্যক্তিরা তাঁদের প্রশ্নের উত্তর সরাসরি জানতে পারছে সেখানে। এ ছাড়া আগ্রহী লোকজনকে হাতে-কলমে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

জুরাইন থেকে আগত শাকিলা ইসলাম জানান, তার বাসার ছাদে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মরিচগাছের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে। গাছ থেকে আশানুরূপ ফলনও পাচ্ছেন না তিনি। এসব সমস্যার সমাধান জানতে তিনি ছুটে এসেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ মিনিট স্কুলে। এখানে এসে উপযুক্ত সমস্যা সমাধান পেয়ে তিনি খুবই খুশি।

প্রশিক্ষণার্থীর শাহনাজ পারভীন ৯০ মিনিট স্কুল ফেইসবুক পেইজে লিখেছেন, ব্যক্তিগত সমস্যার কারনে সকালে ক্লাসে যাওয়া সম্ভব হয় না। এমন করে যদি সবগুলি ক্লাসের ভিডিও পাই তাহলে না যেতে পারার দুঃখটা কমে। এই দূরশিক্ষণের মাধ্যমে একদম প্রত্যন্ত এলাকার একজন বেগুন চাষী বা পাহাড়ি কোন মেয়ের শখের লেবু গাছ বাঁচানোর জন্য কি করতে হবে তা সহজেই বুঝতে পারবে। তাদের হতাশা আর অসহায়ত্ব কেটে যাবে। কৃষিবিভাগ যা করতে পারছে না তাদের হাজার হাজার কর্মী নিয়ে আপনি একাই এই ভিডিও আপলোডের মাধ্যমে তা করে যাচ্ছেন। তিনি আরও লিখেছেন, গ্রামের বা রক্ষনশীল পরিবারের মেয়েরা যাদের বাইরে চলাচল ও লোকের সাথে কথা বলায় ততটা স্বাধীনতা নাই। কিন্তু বাসার আঙিনায় বা ছাদে ছোট্ট একটা বাগান আছে। তাদের জন্য এটা খুবই কার্যকর উদ্যোগ।

২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া এ স্কুলের কর্মসূচি ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করছে। প্রতি শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেড় থেকে দুইজন অংশগ্রহণ করছে। বাণিজ্যিকভাবে ভাসমান সবজি চাষ, গোলাপ চাষ, প্লান্ট নিউট্রিউশন, দেয়াল কার্পেট গাছ, মাটি ও মাটি তৈরি নিয়ে কথা, ক্যাকটাস চাষ, টবে কিভাবে গাছ লাগাতে হয় প্রভূতি বিষয় সম্পর্কে ক্লাস নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমসমায়িক বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হচ্ছে। এখানে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

ড. জামাল উদ্দিন বলেন, বাগান করার পর উচ্ছিষ্ট বা অবশিষ্ট গাছের চারা ফেলে না দিয়ে অপরকে উপহার হিসেবে দেয়ার জন্যও আমরা উৎসাহ দিতে ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি।

————————————–

শেকৃবি থেকে

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare