কৃষি উৎপাদন ও উশর

ড. মো. আবু বকর*

(পূর্ব প্রকাশের পর)

মালিকে নেসাব বলতে বুঝায় ৫২.৫০  তোলা রোপা বা ৭.৫০ তোলা স্বর্ণ কিংবা তার যে কোন একটির মূল্যের সমপরিমাণ অর্থের বা সম্পদের মালিককে। কিন্ত সমাজে এই হাড়ে হিসাবের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই তা আদায় করা হয় না।

বরং মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু টাকা দিয়ে নিম্ন মানের শাড়ী, লুঈি ক্রয় করে তা বিতরণ করা হয় গরীব নিঃস্বদের মধ্যে এবং তা করা হয় মোটামুটি ঢাকঢোল পিটিয়ে । যেমন ঘোষণা দেওয়া হয় অমুক তারিখে অমুক সাহেবের বাড়িতে যাকাতের কাপড় বিতরণ করা হবে। আরও চমক প্রদ হল এ বিষয়টা যে, যে  সকল শাড়ী, লুঈি দেওয়া হয় তা খুবই নি¤œমানের এবং যে সকল দোকান থেকে তা কিনে আনা হয় সেখানেও লিখা থাকে “এখানে যাকাতের শাড়ী পাওয়া যায়।” কাজেই বিষয়টি বুঝতে  অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে যাকাতের শাড়ী বলতে কোন মানের শাড়ীকে বুঝানো হয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল বিতরণ ব্যবস্থাটি, যাতে যেখানে উক্ত যাকাত পাওয়ার যোগ্যদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কথা তা না করে অধিক জনসংখ্যার এ গরীব দেশে ঢোলশহর করে নিস্বঃদেরকে ধন্যাঢ্যা ব্যক্তিদের দরজায় জমায়েত করা এবং তা বিতরণের ক্ষেত্রে প্রায়শই দূর্ঘটনা এমনকি মৃত্যুও হতে দেখা মোটেও বিরল নয়। কাজেই আমরা দেখছি ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক অর্থনৈতিক বিধান সঠিক ভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে সমাজে তার কল্যাণ যথাযথ ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

উশর যাকাতের অনুরূপ একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিধান। যাকাতের তুলনায় এ বিধানটি আমাদের সমাজে আরও কম প্রচলিত। ফলে উশর এর বিধান এর উপর মুসলিম সমাজের ধারণা খুবই সীমিত। আমরা যাকাতের ক্ষেত্রে তা প্রদানের হার এবং প্রদানের খাত সম্বন্ধে উল্লেখ করেছি । উশর ধার্য করা হয় শুধুমাত্র উৎপাদিত  শস্যের উপর। যা উদ্দেশ্যমূলক বা ইচ্ছাকৃত ভাবে উৎপাদন করা হয়। স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে উৎপাদিত কোন শস্য যা উৎপাদনের জন্য কোন প্রচেষ্টা নেয়া হয়নি বা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে উৎপাদন করা হয়নি যেমন কোন কোন আগাছা এমনিতেই জমিতে জন্মায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তার অর্থনৈতিক মূল্যও আছে, কিংবা বাশ যা উৎপাদনের জন্য কোন প্রচেষ্টা কার্যকরী নেই। এ সকল ক্ষেত্রে উশর ওয়াজিব হবে না। সহী আল বোখারীতে উল্লেখিত হয়েছে, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন ঃ যে সব জমিকে বৃষ্টির পানি ও নদীর পানি সিক্ত করে অথবা স্বভাবতও সিক্ত থাকে তা থেকে উশর অর্থাৎ ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ দান করতে হবে। আর যে সব জমি সেচের মাধ্যমে সিক্ত হয় তাতে এক দশমাংসের অর্ধেক দান করতে হবে।” হাদিসের বর্ণনায় উশরের জন্য উৎপাদন পরিচর্যার উপর ভিক্তি  করে  দুটি হারে নির্ধারণ করা হয়েছে, একটি এক দশমাংশ যা কম পরিচর্যার মাধ্যমে উৎপাদিত হয় এবং দ্বিতীয়টি ১/২০ অংশ যার উৎপাদন পরিচর্যা তূলনামূলক ভাবে বেশী। বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থায় সেচ ছাড়া ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রচলন রয়েছে । এমতাবস্থায় অধিক পরিচর্যার ক্ষেত্রে ১/২০ অংশ এবং অল্প পরিচর্যার ক্ষেত্রে ১/১০  অংশ দানের ও সংকেত প্রদান করা হচ্ছে   বলেই ধরে নেয়া যায়।

উশরের নিসাব

“নিসাব একটি ইসলামী অর্থনৈতিক পরিভাষা যা দ্বারা সম্পদের মালিককে সর্বনি¤œ কি পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হলে তার উপর যাকাত আদায়ের বাধ্যবাধকতা আরোপিত হবে এবং ফসলের ক্ষেত্রে সর্বনি¤œ কি পারমাণ ফসল উৎপাদিত হলে উশর প্রদান ওয়াজিব হবে তাকেই নিসাব বলে। উশরের বিধান আরোপ করার জন্য ফসলের কিংবা ফলের নিসাব হল পাঁচ “ওয়াসাক”। আরবী পদ্বতিতে পরিমাপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক ওয়াসাক হল ষাট‘সা’ এর সমান আর এক ‘সা’ হল ৩২৯৬ গ্রাম এর সমান। কাজেই এক ওয়সাক হচ্ছে ৩২৯৬ী৬০=১৯৭৭৬০ গ্রাম=১৯৭.৭৬ কি.গ্রাম.। অতএব উশরের নিসাব হচ্ছে ১৯৭.৭৬ী৫=৯৮৮.৮৮ কি.গ্রাম। কাজেই কোন উৎপাদনকারীর জমিতে একক ফসলের উল্লেখিত পরিমাণ ৯৮৮.৮৮ কি.গ্রাম. উৎপাদিত হলে তার উপর উশর প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি ফসল পৃথক পৃথক ভাবে পরিমাপ করতে হবে একত্রে নয়। যেমনঃ ধান ও গম পৃথক পৃথক ফসল ৯৮৮.৮৮ কেজি এর কম ধান উৎপন্ন হলে উৎপাদন কারীর উপর উশর ওয়াজিব হবে না অনুরূপ ভাবে গম অন্য একটি ফসল কাজেই উৎপাদিত গমের পরিমাণ ৯৮৮.৮৮ কেজির কম হলে উৎপাদন কারীর উপর উশর এর বাধ্যবাধকতা আরোপিত হবে না। উল্লেখ্য যে উশর প্রদান করতে হবে উৎপাদন কারীকে জমির মালিককে নয়। উৎপাদন কারী মালিক হলে তার উপর কিংবা জমির মালিক ফসলের অংশীদার হলে মালিক ও উৎপাদনকারী দু’জনই নিজ নিজ অংশ থেকে উশর প্রদান করবেন।

উশর ফরজ হওয়ার শর্ত সমূহ

* স্বাভাবিক ভাবে চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসল হতে হবে। আপনা আপনি বা কোন প্রচেষ্টা নিয়োগ ব্যতীত কোন ফসল উৎপাদিত হলে তার কোন অর্থনৈতিক মূল্য থাকলেও তার উপর উশর ফরজ হবে না

* জমির মালিক বা উৎপাদন কারী উভয়ে ঈমানদার হওয়ার প্রয়োজন। ইসলামের উপর ঈমান পোষণ করে না এমন ব্যক্তি জমির মালিক কিংবা উৎপাদন কারী হলে ও তার উপর উশর ফরজ নয়, কারণ ইসলামের বিধান কার্যকারী হবে শুধু ইসলামে ঈমান পোষণকারীগণের উপর।

* ফসলের উৎপাদনকারী বা জমির মালিক প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া ও চালাক চতুর হওয়া জরুরী নয়, নাবালেগ হলেও উশর আদায় করতে হবে।

* বর্গাব্যক্তির অধীন জমির ফসলের জমির মালিক ও বর্গা ভিত্তিতে উৎপাদনকারী উভয়েই তাদের নিজ নিজ অংশ থেকে উশর বা অর্ধব উশর আদায় করতে হবে।

* মোট উৎপাদিত ফসলের উপর উশর নির্ধারিত হবে । এক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে উশর নির্ধারণ করা চলবে না

* ফসল উৎপাদনে যে সেচ দেওয়া হয়েছে তাতে যদি বৃষ্টি ও সেচ যন্ত্র দ্বারা পানি দেওয়া হয়ে থাকে তবে যেটি অধিক পরিমাণ হবে অর্থাৎ বৃষ্টির পানি অধিক হলে ১/১০ অংশ আর সেচ যন্ত্র দ্বারা প্রদত্ত পানি বেশি হলে ১/১০ অংশ এর অর্ধেক উশর এর জন্য নির্ধারিত হবে।

* একই জমি থেকে এক বৎসরে একাধিক ফসল উৎপন্ন হলে প্রতিটি ফসল থেকেই উশর আদায় করতে হবে। যাকাতের ন্যায় প্রতি বৎসরে এক বার দিলেই আদায় হবে না।

উশর প্রদানের বিভিন্ন খাত

কোরআন শরীফে সুরা আত তওবায় সাদাকাত ও যাকাত আদায়ের আটটি খাত উল্লেখিত হয়েছে। তাহা নি¤œরূপঃ ইন্নামাস সাদাকাত লিল ফুকারায়ি ওয়াল মাসাকীনা, ওয়াল আ’মিলীনা আ’লাইহা ওয়াল মুআললাফাতি কুলুবুহুম ওয়াফির রিক্বাবি ওয়াল গারিমীনা ওয়াফীসাবীলিললাহি ওয়াবনিস সাবিল……(আত্ তাওবাহ ৬০)।

অর্থাৎ “ সাদাকাত বা যাকাত শুধু তাদেরই জন্য (হক) যারা (১) গরীব, (২) মিসকীন, (৩) যারা তা আদায়ের কাজে নিয়োজিত, (৪) যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন। এবং (৫) দাস মুক্তির জন্য, (৬) ঋণ গ্রস্থদের জন্য, (৭) আল্লাহর পথে, এবং (৮) বিপদগ্রস্থ পথচারী মুসাফিরদের জন্য।”

উশর আদায়ের জন্য ও উক্ত খাত সমুহ নির্দিষ্ট রয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রধিকার নির্ধারণ করে উক্ত আটটি খাত সমুহের যে কোন এক বা একাধিক খাতে ব্যয়ের জন্য উশর প্রদান করা যেতে পারে। প্রকৃত পক্ষে যাকাত এবং উশরের মধ্যে বুনিয়দি কোন পার্থক্য নেই। যাকাত হয় নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর এবং উশর হয় নিসাব পরিমাণ ফসল কিংবা ফল উৎপাদন হলে । তবে যাকাত সঞ্চিত  সম্পদের উপর বৎসরে একবার আদায় করতে হয় এবং উশর প্রত্যেক ফসলের উপর আদায় করতে হয়। এমনকি একই জমি থেকে বৎসরে তিনটি ফসল উৎপাদিত হলে তিনটিরই উশর আদায় করতে হবে।

উশর ইসলামিক জীবন ব্যবস্থার একটি অর্থনৈতিক বিধান। শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে যেমনি যাকাতকে একটি বিশেষ স্তম্ভ হিসাবে গণ্য করা হয় এবং ইবাদতের মর্যাদায় আদায়ের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় ঠিক তেমনি উশর ও যাকাতের অনুরূপ একটি বিধান যা আদায়ে ইসলামী শরীয়তে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। র্দূভাগ্যবশত: এদেশীয় মুসলিম সমাজে উশর আদায়ের তৎপরতা তেমনটি লক্ষণীয় নয়। এ বিষয়ে সাধারণ অজ্ঞতা এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। কাজেই উশর সংক্রান্ত শরয়ী এ বিধানটির ব্যপারে কৃষি উৎপাদনের সকল পর্যায়ে সূ-স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক।

—————————————-

*লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত),

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *