কৃষি উৎপাদন ও উশর

ড. মো. আবু বকর*

ইসলাম একটি অতি বাস্তব ও অনুশীলন যোগ্য ধর্ম। এটা কোন নীতিকথার ধর্ম নয় যে শুধু মানুষকে উপদেশ বাণী শুনানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ কিংবা এটা কোন মন্ত্রভিত্তিক ধর্ম নয় যে শুধু মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে কোন বিশেষ কার্য সম্পন্ন হয়ে যাবে। বরং ইসলাম একটি সর্ম্পূন বাস্তবতা ও কর্মভিত্তিক ধর্ম যা মানুষকে সঠিক পন্থায় অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় কর্ম সম্পাদনের নির্দেশনা প্রদান করে। অনুসন্ধান পর্যবেক্ষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষনে দেখা যায় যে প্রকৃত পক্ষে এ নির্দেশনা একান্তভাবে বাস্তব ভিত্তিক এবং সর্ম্পূন বিজ্ঞান প্রসূত। এতে নেই কোন তথা কথিত ধর্মীয় আবেগ কিংবা নেই কোন অলীক কল্পনার স্থান। এ নির্দেশনা শুধু মাত্র ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর ব্যপ্তি রয়েছে মানুষের জীবনের সকল দিক এবং বিভাগে। এতে যেমনি রয়েছে নৈতিক, আধ্যাতিœক ও ধর্মীয় বিষয়ের নির্দেশনা ঠিক তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ের গাইড লাইন। কাজেই বাস্তব বিবেচনায় ইসলাম হচ্ছে মানবজাতির সঠিকভাবে অনুশীলনযোগ্য একটি পূর্নাঙ্গ জীবন পরিচালনা পদ্ধতি। এটি একটি টহরয়ঁব বা একমাত্র জীবন ব্যবস্থা যার কোন তুল্য পদ্ধতি নেই। ফলে ইসলামকে চিন্তা করতে হবে ইসলাম হিসাবে এর সাথে অন্য কোন ধর্ম বিশ্বাস তুলনীয় নয়। কারন ইসলামে সার্বিক নির্দেশনা এসেছে স্বয়ং সমগ্র সৃষ্টি স্রষ্ঠা ও লালন পালনকারী ও পূর্নভাবে নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছ থেকে ওহীর মাধ্যমে। এটা কোন অনুমান নির্ভর কিংবা চিন্তা ও গবেষণা লদ্ধ বিষয় নয়। এ বিষয়টি সামনে রেখে আমরা আলোচনায় প্রয়াস পাব কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট করে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে সুন্দর স্বাচ্ছন্দময় করতে ইসলাম কি পথ নির্দেশনা প্রদান করেছে। এ লক্ষ্যে আমরা বিচরণ করব ইসলামের গাইড বুক আল কোরআনের পাতায় পাতায় এবং প্রয়োজন হলে ছত্রে ছত্রে।

মানুষ সামাজিক জীব। ইসলাম মানুষকে সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের নির্দেশনা দিয়েছে এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা বসবাস নিরোৎসাহিত ও নিষেধ করেছে। সমাজে বসবাসের মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ব পালনের ও বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। ফলতঃ মানুষ পূর্নাঙ্গ সামজ কাঠামো ভিত্তিক জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়ে সমাজে বসবাসের মাধ্যমে সামাজিক জীব হিসাবে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। সমাজে বসবাসের ক্ষেত্রে কৃষি ভিত্তিক উৎপাদন থেকে কি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ প্রদান করেছেন তার আলোচনায় আজ আমরা “উশর” এর বিধান নিয়ে আলোচনা করব। “উশর” একটি ইসলামের অর্থনৈতিক পরিভাষা। শব্দটি আরবী “আশারা” শব্দ থেকে নির্গত। আশারা মানে “দশ” আর “উশর” হল এক দশমাংশ। ইসলামী অর্থনৈতিক পরিভাষায় বৃষ্টি ও স্বাভাবিক পরিচর্যায় সেচবিহীনভাবে উৎপাদিত কৃষি জাত ফসলের যাযা নিসাব পরিমাণ উৎপন্ন হয়ে পরিপক্কতা প্রাপ্ত হয় তার একদশমাংশ দানের জন্য নির্ধারিত হয়। গরীবদের মধ্যে দানের জন্য নির্ধারিত একদশমাংশ ফসলকেই “উশর” বলে। আল কোরআনের সূরা বাকারায় এ সর্ম্পকে নির্দেশনা রয়েছে। বলা হয়েছে”

ইয়া আয়ি্যূহাল্লাজিনা আমানু আন্ফিকুমিন্ তোওয়্যিবাতি মা কাসাবতুম ওয়ামিম্মা আখরাজনালাকুম মিনাল আরদি, ওয়ালা তাইয়াম্মামুল খাবীসা মিনহু তুনফিকুনা ওয়াআলাসতুম বি আ’ খিজীহি ইল্লা আনতুগমিদুফীহিঃ ওয়ালামু আন্নাল্লাহা ঘানিয়্যুন হামীদ। আশ্শাই তোয়ানু ইয়া য়িদুকুমূল ফাক্বরা ওয়া ইয়া’ মুরুকুম বিল ফাহশায়ে; ওয়াল্লাহু ইয়ায়িদুকুম মাগফিরাতাম মিন্হু ওয়া ফাদলান ওয়াল্লাহু ওয়াছিয়ূন আ’লীম। ইয়ূতিল হিকমাতা মাইয়্যাশাউ, ওয়ামাইয়্যূতাল হিক্মাতা ফাক্বাদ ঊতিয়া খাইরান্ কাছীরা। ওয়ামা ইয়্যায্াক্কারু ইল্লা উলুল আলবাব। (আল বাকারাঃ ২৬৭-২৬৯) অর্থাৎ, হে ঈমানদারগন, তোমরা যে অর্থ উর্পাজন করেছো এবং আমি জমি থেকে যা কিছু তোমাদের জন্য উৎপন্ন করে দিয়েছি তা থেকে উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় কর। তাঁর পথে খরচ করার জন্য তোমরা যেন সবচেয়ে খারাপ জিনিস বাছাই করার চেষ্টা করোনা। অথচ ঐ জিনিসই যদি কেউ তোমাদেরকে দেয়, তা হলে তোমরা কখনও তা নিতে রাজী হওনা, যদি না তোমরা চক্ষু বন্ধ করে রাখো। তোমাদের জেনে রাখা উচিৎ যে আল্লাহ কারো মূখাপেক্ষী নন। এবং তিনি সর্বোত্তম গুনে গুনান্বিত ও প্রসংশিত। শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কর্মনীতি গ্রহণে প্রলুদ্ধ করে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তার ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশ্বাস প্রদান করেন। আল্লাহ বড়ই উদারহস্ত প্রাচুর্য্যময়ও মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ। তিনি যাকে চান ঠিকমত (বিজ্ঞান সস্মত জ্ঞান) দান করেন। আর যে ব্যক্তি হিকমত লাভ করেছে সে আসলে বিরাট সম্পদ ও প্রচুর কল্যাণ লাভ করেছে। তবে এই সব উপাদান থেকে কেবলমাত্র বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল ও জ্ঞানবান লোকেরাই শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।

আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে ইসলাম নিছক কোন নীতি কথা কিংবা শুধু মাত্র উপদেশ বাণী স¤¦লিত কোন ধর্ম নয়। ইসলামের নিয়মনীতি, আইন ও বিধানের ব্যপ্তি রয়েছে মানুষের সামগ্রীক জীবনের সকল দিক ও বিভাগে। ইসলামে যেমন বিধান রয়েছে আল্লাহর উপাসনা, আরাধনা ও ইবাদত বন্দেগীর ঠিক তেমনি রয়েছে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের বিধান। ইসলাম মানুষকে তার মেধা ও দক্ষতা ব্যবহার করে যেমন সম্পদ উর্পাজন ও অর্জনের যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে তেমনি সমাজের অদক্ষ, কম মেধাবী ও সম্পদহীন লোকদের অধিকার সংরক্ষণ করেছে। আলকোরানে উল্লেখিত আয়াত গুলো সেই দিকেই ইঙ্গিত প্রদান করেছে। নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে মানুষ যা উপার্জন করে এবং জমি থেকে যা উৎপন্ন হয় তার উৎকৃষ্ট অংশ যেন ব্যয় করা হয়। যেন বেছে বেছে নিকৃষ্ট অংশ এর জন্য নির্ধারণ করা না হয়। ইসলামী নীতি ও বিধান বিশ্লেষণ শাস্ত্রের (ফেকার) বিশ্লেষণ অনুযায়ী মানুষের উপার্জিত সম্পদ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত (নিসাব) অর্জিত হলে তার অংশবিশেষ সমাজের গরীব, দূঃখী, সম্পদহীনদের জন্য নির্ধারিত হবে যা তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পদ উর্পাজন কারীর উপর আরোপ করা হয়েছে। অনুরুপ ভাবে আল্লাহ প্রদত্ত জমি থেকে যে শস্য বিশেষ সেচ কার্য ব্যতীত স¦াভাবিক ভাবে চাষাবাদ ও কৃষি নির্ভর ভাবে উৎপাদন করা হবে তার একদশমাংশ ১/১০ অংশ এবং কৃত্রিম সেচ প্রয়োগ করে যে শস্য উৎপাদিত হবে তার ১/২০  অংশ উশর হিসাবে নির্ধারিত হবে। ইসলামী ফেকাহ শাস্ত্রে এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা ও পর্যালোচনা এসেছে। পর্যায়ক্রমে আমরা এ বিষয়ে আরও আলোচনার প্রয়াস পাবো।  আজকে স্বল্প পরিসরে যে কথাটি বলতে চাই তা হল আলকোরানের নির্দেশ অনুযায়ী উৎপাদিত শস্যের উৎকৃষ্ট অংশ থেকে উশর দিতে হবে  নিকৃষ্ট অংশ থেকে নয়।

আয়াতাংশে উল্লেখিত হয়েছে যে শয়তান তোমাদের দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং লজ্জাজনক কর্মপন্থা গ্রহণে প্রলুদ্ধ করে। অথচ আল্লাহ তোমাদের কে তার ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশ্বাস প্রদান করেন। স¦াভাবিক ভাবে মানবীয় দূর্বলতার কারনেই হোক বা স্থুল অর্থনৈতিক সংকীর্ণতার কারনেই হোক সম্পদ উর্পাজনকারী বা শস্য উৎপাদন কারী তার সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দানের ক্ষেত্রে সংকীর্ণতার আশ্রয় নিতে পারে। মানুষ যেন এ স্থুল চিন্তার উর্ধ্বে উঠে সমাজের সম্পদহীন লোকদের কল্যাণে তার সম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হয় এ লক্ষ্যে তাদের প্রতি ক্ষমা ও অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। সমাজের বিত্তহীনদের অভূক্ত রেখে এক শ্রেণীর বিত্তশালীগণ বিত্ত বৈভবের প্রাচুর্যে বিভোর থাকতে পারেনা। অগাধ সম্পদের মালিক ব্যক্তিগণ যখন বিত্তহীনদের জন্য নির্ধারিত তাদের সম্পদ হিসাব করেন তখন তারা বিরাট অংকের হিস্যা লক্ষ্য করে তাদের নিজের দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত লজ্জাকর কর্মনীতি। কারণ যে সম্পদের অধিকার আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্যের জন্য নির্দিষ্ট করা তা নিজের অধিকারে জোরপূর্বক ও অন্যায়ভাবে রেখে দেওয়াই প্রকৃত প্রস্তাবে লজ্জাজনক।

উশর বাধ্যতামূলক হওয়ার শর্তসমুহ

ইতোপূর্বে আমরা উশর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশিত ইসলামের একটি সামাজিক অর্থনৈতিক বিধানের কথা উল্লেখ্য করেছি। এ পর্যায়ে আমরা উশর বাধ্যতামুলক হওয়ার শর্তসমুহ এবং এর সামাজিক ভিত্তি ও কল্যাণসমূহ আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। মুসলিম সমাজে ইসলামের মূল পাচঁটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত একটি অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে মোটামুটি ধারনা রয়েছে। যদিও এ মুল স্তম্ভটি অন্যান্য স্তম্ভের বিধান পালনে যে রূপ স্বতঃর্স্ফুতা ও তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়  এতে তেমনটি দেখা যায়না। এ স্তম্ভটি প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে কিছুটা অস্বচ্ছতা ও সংকীর্নতার আশ্রয় নেয়া হয়। বিষয়টিকে কিছুটা সংক্ষিপ্ত করার ও একটা প্রয়াস সমাজে লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ইসলামের যাকাতের বিধান হচ্ছে মালিকে নিসাব এর উপর ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। এ যাকাত পবিত্র কোরানে উল্লেখিত ৮টি খাতের এক বা একাধিক খাতে প্রদান করতে হবে। (চলবে)

—————————————-

*লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত)

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *