কৃষি বিপণনে আল কোরানের নির্দেশনা

ড. মো. আবু বকর*

কৃষি বার্তার প্রারম্ভিক এ অধ্যায়টিতে আমরা কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে আল কোরআনের গাইড লাইন এর উপর ভিত্তি করে আলোচনা উপস্থাপন করে থাকি। ইতোপূর্বে আমরা কৃষির উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোরআনে হাকিমের নির্দেশনা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের এ লেখাটিতে আমরা কৃষি বিপণন বিষয়ে আলোচনায় প্রয়াস পাব। মানুষ জীবিকার অন্বেষণে বিভিন্ন পন্থা তালাশ করে। বিপণন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপার্জন পন্থা যা মানুষকে বৈধ পন্থায় সূন্দরভাবে জীবিকার্জনে সুযোগ করে দেয়। বলা বাহুল্য কৃষিজাত উৎপন্ন দ্রব্যের বিপনন ও অকৃষিজাত দ্রব্যের বিপণনে কোরানে ঘোষিত মৌল নীতি সমূহে বুনিয়াদী কোন পার্থক্য নেই। এ বিষয়টি সর্বজনবিদিত যে ভৌগোলিক ও পরিবেশ অঞ্চল এবং মাটির গঠন প্রকৃতির তারতম্য হেতু পৃথিবী পৃষ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাদকৃত ফসলের তারতম্য রয়েছে। সব ভৌগোলিক অবস্থায় সর্ব প্রকার মাটিতে বৎসরের সকল সময় একই প্রকার কৃষিজাত দ্রব্যাদী ও ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। অথচ সকল প্রকার কৃষিজ দ্রব্য ফসল ও ফল ফলাদী উৎপাদিত হয় মানুষের প্রয়োজনে। কিন্তু কাম্যতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের নাগালের মধ্যে না থাকলে তা যেমন ব্যবহৃত হতে পারেনা তেমনিভাবে উৎপাদনকারী ও অতিরিক্ত উৎপাদনের কল্যাণমূলক ফলাফল ভোগ করতে পারেনা। কাজেই উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়ের পারস্পরিক কল্যাণের নিমিত্তেই বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠে। উৎপাদনকারী তার নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত দ্রব্য বিক্রয়ের মাধ্যমে যে আয় করবে তা দিয়ে যা তার পক্ষে উৎপন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না এমন জীবনোপকরণ ক্রয় ও সংগ্রহের মাধ্যমে জীবন পরিচালনায় স্বচ্ছলতা আনায়ন করবে এটাই মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবী। কিন্তু এ দাবী পূরনের ক্ষেত্রে মানুষ যেন নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়নতার সীমা লংঘন না করে এবিষয় নিশ্চিত করার জন্যই মানুষও সমগ্র সৃস্টি লোকের মহান স্রষ্ঠা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরানের মাধ্যমে নিদের্শ প্রদান করেছেন। উত্তম বিষয় ও ন্যায়নুগত বিপনন ব্যবস্থায় যে সকল বিবেচনা করা প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিমাপ তার অন্য তম ন্যায় ও বিশ্বাস পরানতার দাবী হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বিক্রয় যোগ্য পন্য সঠিক পরিমাপের মাধ্যমে  ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদন করবে। বিক্রেতা যখন কোন ক্রেতাকে কোন পণ্য ওজন করে দেয় তখন সে যেন দাড়ি পাল্লাকে সোজা রেখে ওজন করে দেয়। ঠিক তেমনি কোন ক্রেতা যদি নিজে ওজন করে নেয় তখন সে যেন সঠিক ওজনও পরিমাপ করে নেয়। মানুষের স্বাভাবিক মানবিক দুর্বলতার কারণে মানুষ তার বিপরিতটাও করতে পারে অর্থ্যাৎ নিজে ওজন করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশী নেওয়া এবং অন্যকে ওজন করে পন্য প্রদানের ক্ষেত্রে কম করে দিতে পারে। এ বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করে সর্তক করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরানে করিমে এরশাদকরেন “ওয়াইলুল-লিল্মুত্বাফ্ িফিনাল্লাযিনা ইযাক্তালু আলান্নাসি ইয়াস্ তাওফুন ওয়াইজা কালুহুম আও ওয়াযানুহুম ইয়ুখ্সিরুন্। আলা ইয়াযুননু উলাইকা আন্নাহুম মাবউছুন। লিয়াওমিন্ আযীম। ইয়াওমা ইয়া কুমুন্নাসু লিরাব্বিল আ’লামীন” (সুরাআলমুত্বাফ্ফিফীন:১-৬) অর্থাৎ মাপে কমদাতাদের জন্য সর্বনাশা পরিনাম। যারা মানুষের কাছ থেকে যখন মেপে নেয় তখন পুরো পুরি নেয়। আর যখন মানুষদেরকে মেপে দেয় তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করেনা ভয়াবহ মহাবিপদের? সে দিন সব মানুষ জগৎ সমূহের প্রতিপালকের সামনে দাড়াবে। উদৃত আয়তটি ওজনে কম দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। ওজনে কম দেওয়া একটি হীন ও জঘন্য অপরাধ। এ কাজটি সর্বকালেই নিন্দনীয় ছিল। হযরত শোয়াইব (আঃ) এর কওমকে আল্লাহ তায়ালা এ অপরাধের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ প্রসংঙ্গে সুরা আল আরাফের ৮৫ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে “ফা আওফুল কাইলা ওয়াল মীযানা ওয়ালা তাবখাসূন্নাসা আশইয়া আহুম”। অর্থাৎ সুতরাং তোমরা পরিমাপ ও ওজন পূর্ণরূপে করবে এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দিবে না।

অনুরূপভাবে হুদ (আঃ) এর জাতিকেও একই উপদেশ প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সীমা লংঘনকারী ঐ জাতি গুলো তাদের কথা মানল না। ফলে তাদেরকে শক্তভাবে পাকরাও করা হল। এ সম্পর্কে বলা হল “ফা আখাযাত হুমুর রাজফাতু ফাআস্বাহু ফীদারিহিম যাছিমীন” (আল আরাফ-৯১) অর্থাৎ অতঃপর তাদেরকে পাকরাও করল ভূমি কম্প, ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইলো। একই ভাবে আল্লাহ তায়ালা ইনসাফ্ সহকারে পূর্ণরূপে পরিমাপ ও ওজন করার নছিহত প্রদান করেছেন কোরআন শরীফের একাধিক আয়াতে। সূরা আল’আন আমে বলা হয়েছে; “ওয়াআত্তফুল কাইলা ওয়াল মীযানা বিল কিস্তি লানুকাল্লিফ নাফসান ইল্লা উস আহা ওয়াইজা কুলতুম ফা’দিলু ওয়ালাও কানা যাকুরবা ওয়াবি আহদিল্লাহি আওফু যালিকুম ওয়াচ্ছাকুম বিহি লা’আল্লাকুম তাযাক্কারুন”। (আল আন আম-১৫২) অর্থাৎ আর পরিমাপ ঠিকভাবে করব্ েএবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত কষ্ট দেইনা। যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায় পরায়নতা বহাল রাখবে যদিও সে আত্মীয় হয়। আর আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা পুরন করবে। এ সব নির্দেশ তিনি তোমাদেরকে এজন্য দিচ্ছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। সূরা আর রহমানে বলা হয়েছে “ওয়াছ ছামায়া রাফাআ’ হা ওয়া ওয়াদ্ধায়াল মীযান। আল্লাতাত্বগাও ফিল মীযান। ওয়া আক্বীমুল ওয়াযনা বিল ক্বিসত্বি ওয়ালা তুখসীরুল মীযান”। (আর রহমান ৭-৯) অর্থাৎ আর তিনিই আসমানকে সূউচ্চে স্থাপন করেছেন এবং মীযানও স্থাপন করেছেন। যেমন তোমরা মাপ ও পরিমান নির্ধারনে বাড়া বাড়ী না কর। আর ন্যায় পরায়নতার সাথে তোমরা ওজন ও পরিমাপের পদ্ধতি কায়েম কর এবং ওজন ও পরিমাপে কম দিওনা।

কোরানে উল্লিখিত আয়াতের “তাত্বগাওফি” শব্দের শাব্দিক অর্থ দ্বারা ওজন কম করা বুঝালেও ইসলামী পরিভাষায় এর ব্যপক তাৎপর্য রয়েছে। যে কোন প্রকার প্রাপকের প্রাপ্য পূর্ণমাত্রায় আদায় না করাই এর মৌল অর্থ। গবেষণা কাজে নিয়োজিত বিজ্ঞানী তার মেধাকে সঠিক ভাবে কাজে না লাগানো একটি পরিমাপ কম করার সামিল। অনুরূপ ভাবে বিদ্যালয়ে পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষক বৃন্দ যদি সঠিক ভাবে পাট দান না করে প্রাইভেট টিউশনির সূযোগ সৃষ্টি করেন তাও হবে এক প্রকার “তাত্বগাও” অতএব সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিই নিজ নিজ কাজ সমাধা করার ক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রকাশই “তাত্বগাত্ত” বা পরিমাণমত প্রদান না করার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। এ ছাড়া বেচাকেনার ক্ষেত্রে পরিমাপ বা পরিমাণমত প্রদান না করার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। এ ছাড়া বেচাকেনার ক্ষেত্রেও পরিমাপ বা ওজনে কম দেওয়ার একটা অস্বাভাবিক ও অস্বাস্থ্যকর প্রবনতা চালু হয়ে গেছে। এ প্রবনতা যাতে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হতে না পারে সে জন্যই মহান আল্লাহ তার নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছেন। বলা হয়েছে “ইয়া আয়ূহাল্লাজিনা আমানু ইজানুদীয়ালিস সালাতি মি ইয়াওমিল জুমূয়ানাতি ফাছ আও ইলা যিকরিল্লাহি ওয়া যারুল বায়্য়া। যালিকুম খায়রুল লাকুম ইন্কুন্তুম্ তায়লামুন। ফাইজা কুদ্ধিয়াতিস সালাতি ফানতাসিরু ফিল আরদ্ধে ওয়াবতাঘু মিন্ ফাদলিল্লাহ, ওয়াজ কুরুল্লাহা কাছিরান লাওয়াল্লাকুম তুফলিহুন”। (সুরা জমু-আ-১০) অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ জুমার দিনে যখন আযান দেয়া হয় তখন তোমরা বেচা কেনা বন্ধ করে আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। ইহাই তোমাদের জন্য কল্যাণ কর যদি তোমার (প্রকৃত কল্যান সর্ম্পকে)জানতে। তারপর যখন সালাত  শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা জমিনে ছরিয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করবে ও আল্লাহকে  বেশি বেশি  স্মরন  করবে   যাতে তোমরা সফলকাম হও।

কাজেই  বুঝা  যাচ্ছে যে মহান রাব্বুল  আলামিন  পন্য  বেচাকেনাই  শুধূ  নয়  বরং  সকল কাজের উপর আল্লাহর  নির্দেশকে স্থান  দেয়ার ব্যপারে  নির্দেশনা জারি  করেছেন। মানুষ যদি  এ  নির্দেশনাকে  মেনে  নিয়ে বেচা কেনাসহ জীবনের সকল কার্য সম্পাদন  করে তবে সে  যেমনি আল্লাহর হুকুম  মানার কারনে পর কালের সাফল্য লাভ করবে ঠিক তেমনি  মানুষের প্রতি মানুষের যে অধিকার তা  আদায়  ও  সংরক্ষণের ফলে সামাজিক শান্তি বিরাজ করবে। সমাজের ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সদ্ভাব ওভ্রাতৃত্ব বোধ জাগ্রত হবে। এজাতীয় বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত লোকদের সম্পর্কে কোরানে হাকিমে বলা হয়েছে “রিজালুল লাতুলহীহিম তিজারাতু ওঁয়ালা বাইউন্ আন যিকরিল্লাহি ওয়া ইকামিছ চালাতি ওয়াইতাইয্ যাকাতি, ওয়াখাফুনা ইয়াওমান তাতা ক্কাল্লাবু ফীহিল কুলুবু ওয়াল আবসার” (সূরা আন নুর-৩৭) অর্থাৎ এমন  সব লোক যাদেরকে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য কেনাবেচা কিছুই আল্লাহর স্মরন থেকে নামায কায়েম করা থেকে ও যাকাত আদায় করা থেকে ভুলাতে পারেনা, তারা ভয় করে সেদিনকে যেদিন অন্তর সমূহ ও দৃষ্টি সমুহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। কৃষিজাতপন্যের বিপনন একটি অতিব গুরুত্বপৃর্ন সামাজিক রাষ্ট্রিয় কাজ। একাজ আঞ্জাম দেওয়ায় যারা জড়িত হবেন তাদের মধ্যে যদি আল্লাহর নিদের্শ পালনে ঘাটতি বা দুর্বলতা থাকে তবে তারা সমাজের অন্যান্য অনেক সদস্যগনকে ক্ষতি-গ্রস্থ করতে পারে।

মানুষের খাদ্য হিসেবে নির্ধারিত প্রায় সকল পন্য কৃষিজাত উৎপন্ন দ্রব্য থেকে তৈরি হয়। আখেরাতের জওয়াবদিহির অনুভূতি যার অন্তরে জাগরুক নাই  তার পক্ষে খাদ্যেভেজাল মেশানো, ক্রেতার চোখ ফাকি দিয়ে ওজনে কম দেওয়া অফিস প্রদানের চোখ এড়িয়ে অফিসের কাজে শিথিলতা করা ইত্যাদি রকম বেরকম অপকর্ম করা সম্ভব। পক্ষান্তরে তৌহিদ রেসালাত ও আখেরাতে বিশ্বাশী ব্যাক্তি কখনও মানুষকে ফাকি দেওয়ার চিন্তা করতে পারে না।কারন মানুষের চোখকে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলেও সমগ্র সৃষ্টির অনুপরমাণু যারদৃষ্টি সীমায় সে মহান স্রষ্ঠার চোখকে ফাকি দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। কাজেই কৃষি বিপণনে নিয়োজিত ব্যাক্তিবর্গ যদি আল্লাহর নির্দেশমেনে বিপণন কার্য পরিচলনা করেন তবে তা সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

————————————–

*লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার, (অবসর প্রাপ্ত) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare