কৃষি ভিত্তিক শিল্প স্থাপনে মৌমাছি পালন

ড. মো. আবু বকর*

কৃষি মানুষের আদি এবং প্রাচীনতম পেশা। জীবন ধারনের জন্য খাদ্যর প্রয়োজন। আর খাদ্য সরবরাহর মূল উৎস হচ্ছে। কৃষি। খাদ্য ছাড়াও মানুষের জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান যথা- বস্ত্র বা দেহাবৃত করার সরঞ্জাম চিকিৎসা বা রোগ নিরাময়ের উপাদান, শিক্ষার সরঞ্জাম, বা জীবন মান উন্নত করার সরঞ্জামাদি কৃষি জাত দ্রব্য থেকেই পাওয়া যায়। এজন্য উৎপাদিত কৃষি দ্রব্যকে রূপান্তর করার প্রয়াজনীয়তা দেখা দেয়-এর ফলে খুব সাধারণ বা গতানুগতিক দ্রব্য ও মূল্য সংযোজিত হয়ে দামী হয়ে যায়। শিল্পের ভাষায় তাকে বল Value added product. কৃষিতে বাংলাদেশের উৎকর্ষ বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি ভিত্তিক শিল্পের (Agro based industry) দিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে। কারণ কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি এবং কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমিকের বিকল্প কর্মসংস্থান বা উপার্জন ক্ষেত্র প্রাপ্তির ফলে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফল কৃষি দ্রব্যাদির বর্তমান মূল্য উৎপাদনকারীকে উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে পারছে না। এছাড়া মৌসুম ভিত্তিক কৃষি পণ্য উৎপাদিত হওয়ার কারণে ভরা মৌসুমে উৎপাদিত পণ্যের দাম নিম্নগামী হয় এবং মৌসুম শেষে তার মূল্য হয় উর্ধমূখী যা প্রকৃত উৎপাদনকারীকে সঠিক মুনাফা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু যদি কৃষিজাত বিভিন্ন পণ্য শিল্প ব্যবহারের সুযোগ থাকতো তাহলে ভরা মৌসুম অপেক্ষাকৃত নিম্ন মূল্য উৎপাদনকারী কৃষক তা বিক্রয় করতে বাধ্য হতো না। কৃষক অধিক আগ্রহ নিয়ে আরও অধিক উৎপাদনে তৎপর হতো এবং এর ফলে পণ্যের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেতো। কাজেই বুঝা যাচ্ছে যে, কৃষিক্ষেত্রে উত্তর উত্তর উন্নতির জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন খুবই গুরুত্বের দাবী রাখে। আমাদের ও সমগ্র সৃষ্টির মহান প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য কৃষির কথা যেমনি বলেছেন ঠিক তেমনি কৃষি ভিত্তিক শিল্পের নিদর্শন ও মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বর্ণনা করেছেন।

আমরা জানি খেজুর ও আঙ্গুর এর রস একটি মূল্যবান তৃপ্তিদায়ক ও উপাদেয় পানীয়। আমাদের দেশ খেজুর এর রস শুধুমাত্র শীতকালেই গাছ কেটে নিংড়ানোর রেওয়াজ আছে। অনুরূপভাবে তালগাছ কেটেও রস সংগ্রহ করা যায়, যা পানীয়ও হয় এবং তা থেকে অন্যান্য খাদ্য বস্তু তৈরী করা যায়। খেজুর ও আঙ্গুর এর রস থেকে প্রাপ্ত খাদ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পবিত্র কোরআনে জানিয়ে দিয়েছেন। বলা হয়েছে:

“ওয়ামিন ছামারতিন নাখীল ওয়াল আ’নাবে তা’ওখিজুনা মিনহু ছাকারাও ওয়া রিজকান হাসানা ইন্নাফী জালিকা লআয়াতাল্লি কাওমি ইয়াফিল্লুন”(সূরা- নাহলঃ-আঃ ৬৭)

[অর্থাৎ “খেজুর গাছ এবং আঙ্গুরের ছড়া হতে ও আমরা তোমাদেরকে একটি জিনিস পান করাই যাকে তোমরা যেমন পবিত্র রিযিক হিসাবে পান কর তেমনি আবার এ থেকে মাদক দ্রব্যও তৈরী করে থাক। নিঃসন্দহে এতে বিবেক বুদ্ধি প্রয়াগকারীদের জন্য একটি নিদর্শন রয়ছে।”]

উল্লিখিত আয়াতে খেজুর ও আঙ্গুর এর রসকে যেমন উত্তম খাদ্য বা পানীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঠিক তেমনি তার বিপরীত মুখী ব্যবহার অর্থাৎ মদ্য হিসেবে পান করার কথাও উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে। রূপান্তরে অন্যান্য ফলের রস এর মাধ্যমে কৃষি ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে এ আয়াপত। আয়াতের মর্মানুযায়ী মানুষ ইচ্ছা করলে উত্তম পানীয় তৈরীর শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে পারে অথবা কোন পাপিষ্ঠ আল্লাহর নির্দেশের তোয়াক্কা না করে মাদক দ্রব্যের শিল্পও স্থাপন করতে পারে। মাদককে আল্লাহ তায়ালা করেছেন হারাম আবার ফলের স্বাভাবিক রস পান মানুষের জন্য বৈধ। কারণ শরীরের উপর এর কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। আঙ্গুর এর রস থেকে উৎপাদিত মাদকতাপূর্ণ পানীয়কে আরবীতে খামুর বলা হয়েছে। পানীয় হিসাবে এর প্রতিক্রিয়া বলা হয়েছেঃ

“ইয়াছআলুনাকা আনিল খামরি ওয়াল মাইছির, কুলফিহিমা ইসমুন কাবীরও ওয়ণঅমানাফিউল্লিন্নাস, ওয়া ইস মুহুমা আকবারু মিন নাফয়্ীহিমা”। (সূরা আল বাকারাঃ–আঃ ২১৯)

[অর্থাৎ লোকে আপনাকে ‘খামুর’ ও ‘মাইসির’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন উভয়ের মধ্যেই মহাপাপের কারণ এবং কিছু উপকার ও নিহীত রয়েছে। তবে উপকারের তুলনায় পাপের মাত্রা অনেক বেশি।]

ইতোপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে খামুর বলা হয় আঙ্গুর এর রস থেকে তৈরি মাদকতা পূর্ণ Fermented করে তৈরি করা হয় এজাতীয় পানীয়কে রসায়নের ভাষায় বলে এলকোহল (Alcohol) মদ জাতীয় পানীয় আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ করে দেয়ার পূর্বে আরবে উক্ত মাদক সেবনের প্রচলন ছিল। মদ পানের ফলে মানুষের স্বাভাবিক বোধশক্তি (General conciousness) হারিয়ে যায়। মদ্যপায়ীর আচরণগত বৈকল্য তাকে পশুত্বের পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসে। এছাড়াও শারীর বৃত্তিক দিক থেকেও মদ্যপান স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যকৃতের উপরও তার ক্ষয়িঞ্চু দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মানুষের নিকট ‘খামুর’ এর ভাল ও মন্দ উভয় দিক আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। মুমিনগণ আল্লাহর নির্দেশের উপরই নির্ভর করে পক্ষান্তরে নির্দেশ অমান্যকারীগণ নিজের মন মগজ ভিত্তিক চিন্তাধারার উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। যে সকল দ্রব্য সেবন করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়, তার উৎপাদন ব্যবসা বিলিবন্টন ও তার উৎকর্ষের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করাও বৈধ নয়। কাজেই কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত মূলনীতি অনুসরণ না করে কেউ যদি ফলের রস তৈরির শিল্পের পরিবর্তে মদ তৈরির শিল্প স্থাপন করে খোদা বিমুখ ও খোদাদ্রোহী সমাজ ব্যবস্থায় তা যথেষ্ট লাভজনক প্রতীয়মান হতে পারে। তবে সুস্থ্য ও পুত পবিত্র সমাজ গঠনে তা পরিনামে ক্ষতিকরই প্রমাণিত হতে বাধ্য। এ ছাড়া খোদাভীরু সামাজ ব্যবস্থায় এ শিল্প মোটেই লাভজনক হবে না। মদ্যপান ক্ষতিকর বিধায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকেই তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। বলা হয়েছে:

“ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু ইল্লামাল খামরু ওয়াল মাইসিরু, ওয়াল আনসাবু, ওয়াল আজলামু রিজছিমমিন আ’ মালিশ্ শাইতোয়ান, ফাজতানিবুহু লা’ আল্লাকুম তুফলিহুন।” (সুরা আল মায়িদা: আ: ৯৭)।

[অর্থাৎ হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, মূর্তিপুজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর (তীর) খুবই ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা ইহা বর্জন কর, এতে আশা করা যায় যে তোমরা সফলকাম হতে পারবে।] এই নীতির উপর ভিত্তি করে তামাক উৎপাদনের উপরও অনুরূপ সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করা যায়। কৃষিজাত ফসলের মধ্যে তামাক একটি লাভজনক ফসল। কারণ তা সিগারেট উৎপাদনের কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর, স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিটি সিগারেট এর প্যাকেটে “ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর” এ সতর্কীকরণ বক্তব্য লিখে দেয়া হয়েছে। এরপরও খোদাবিমুখ ও খোদাদ্রোহী কোম্পানীগুলো এর উৎপাদন বিতরণ ও বিপনন অব্যাহত রেখেছে। অথচ ইসলাম ধূমপানকে নিষিদ্ধ পানীয়ের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে কারণ তা মানুষের স্বাস্থ্য হানির কারণ ঘটায়। পক্ষান্তরে কৃষিজাত পন্য হিসেবে তামাক নিকোটিন (Nicotin) তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে যা বালাই নাশক (Pesticides) তৈরিসহ আরও অনেক কল্যাণমূলক কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। যা দ্বারা স্বাস্থ্যের ক্ষতিতো হবেই না বরং পরিবেশ বান্ধক (Environment friendly) বালাইনাশক তৈরি হতে পারে। যা দ্বারা মানবতা সামগ্রিকভাবে কল্যাণ লাভ করতে পারে।

উদ্ভাবিত আরও একটি পণ্যের দিকে লক্ষ্য করা যেতে পারে আর তা হচ্ছে সিল্ক বা রেশম। মানুষের জন্য পরিধেয় তৈরিতে রেশমের জুড়ি নেই। অতি উন্নতমানের পোশাক তৈরি হয় রেশম থেকে। এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“জান্নাতু আ’দনিই ইয়াদখুলুনাহা ইয়্যুহাল্লাও না ফীহা আসায়িব্রা মিন জাহাবি ওয়া ল’লুওয়া ওয়া লিবাছুহুম ফিহা হারির।”

৩৩) [অর্থাৎ “সেই চিরকালীন বেহেশত যাতে তারা প্রবেশ করবে সেখানে তাহাদিগকে স্বর্ণের কংকন ও মনিমুক্তা দ্বারা সজ্জিত করা হবে। সেখানে তাদের পোশাক হবে রেশমী কাপড়ের।”]

রেশম উৎপাদন একটি খাটি কৃষি পেশা। এর উপর ভিত্তি করে বৃহৎ শিল্প স্থাপন হতে পারে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার অনেক নমুনা বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশে এ শিল্পের বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের জন্য রেশম বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। রেশম পোকার লালা থেকে উৎপাদিত এ শিল্পের বিষয়ে আমাদের মহান প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে তারই প্রেরিত বানী, কোরআন শরীফ এর মাধ্যমে জ্ঞান দান করেছেন। দুনিয়ায় এ শিল্প বিকাশ লাভ করেছে। এ শিল্পের পন্য উৎপাদন উন্নয়ন বিতরণ ও বিপনণ এর ক্ষেত্রে কোন বিধি নিষেধ আরোপিত হয়নি তবে এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষকে বিরত থাকার বিধি আরোপিত হয়েছে। এ বিধান স্বাস্থ্যসম্মত বলেই পন্ডিতগণ অনুধাবন করতে পেরেছেন। মাহাবিজ্ঞানী আল্লাহ তায়ালার এমন কোন বিধান নেই যা মানুষের জন্য কল্যাণকর নয় কিংবা মানুষকে তার প্রকৃত পাওনা থেকে বঞ্চিত কিংবা ক্ষতিগ্রস্থ করে।

কৃষি ভিত্তিক অন্য একটি শিল্পের উদাহরণ হচ্ছে দিয়াশলাই শিল্প যার ইঙ্গিত কোরানে প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে:

“আল্লাজি যা’য়ালা লাকুম মিনাস্ শাজারিল আখ্ধোয়ারি না’ রান ফাইজা আনতুম মিনহু তু’ক্কিদুন।” (সুরা – ইয়াসিন – আঃ ৮০)

[অর্থাৎ “তিনি (সেই মহান আল্লাহ) যিনি তোমাদের জন্য শ্যামল সবুজ গাছ হতে আগুন সৃষ্টি করেছেন। তোমরা এ দ্বারা চুলা ধরাতে পার।”]

পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে জঙ্গলে শুকিয়ে থাকা কাঠের সাথে কাঠের ঘর্ষনের ফলে আগুন জ্বলে উঠে এ আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আগুন জ্বলার ও জ্বালাবার এ পদ্ধতি থেকে পর্যায়ক্রমিক উন্নতির মাধ্যমে মানুষ আজ কাঠ দ্বারা নিরাপদ দিয়াশলাই বানাতে শিখেছে। জিনিসটি মানুষের জন্য দৈনন্দিন জীবনে এতই গুরুত্বপূর্ন যে মানুষ এ ছাড়া একদিনও চলতে পারে না। এর ফলে বিস্তৃতি লাভ করেছে দিয়াশলাই শিল্পের। কৃষির উন্নতির সাথে সাথে মানুষ উদ্ভাবন করেছে কৃষিভিত্তিক শিল্পের। এ উদ্ভাবনীর অনেক ক্ষেত্রেই ইঙ্গিত রয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে। শিল্প উদ্ভাবন এর ক্ষেত্রে তার উৎপাদিত পণ্যের উপযোগীতার বিষয়েও আল্লাহতায়ালার নির্দেশনা রয়েছে। এ নির্দেশনা অনুসরণ করে শিল্প বিকাশের দিকে মনোযোগী হলে একদিকে যেমন নতুন শিল্প বিকাশ লাভ করবে অন্য দিকে আল্লাহর নির্দেশের অনুসরণের ফলে মানুষ প্রকৃত কল্যাণ লাভ করবে। (চলবে)

————————————–

*লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare