কৃষি শিক্ষার উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়ে

বশিরুল ইসলাম

এক সময় লোকে মনে করতো, কৃষি শিক্ষা পড়বে ছেলেরা, মেয়েরা পড়বে গার্হস্থ্য বিজ্ঞান। বর্তমানে এ ধারণার মূলোৎপাটন হয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে এবং কৃষি শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন ছাত্রীদের জয়জয়কার। কৃষি শিক্ষার উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া ক্ষেত্রে আজ ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের সকল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থীরা। মেধা মননে কিংবা সৃষ্টিশীল কাজে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই তারা। ফসলের মাঠ থেকে শুরু করে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, প্রয়োগ, কৃষি গবেষণায় যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করে চলেছে আজকের কৃষি কন্যারা।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারিসহ কৃষির উচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষিবিদ তৈরি করার গুরুদায়িত্ব পালন করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর বের হয়ে আসছে হাজার হাজার নারী কৃষিবিদ। এরা ছুটে যাচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, কৃষকের হৃদয়ের কাছে। যেখানে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে গর্বিত ইতিহাস। আর তাই এখন সবাই বলে গ্রাম আর এখন সে গ্রাম নেই, বদলেছে এর অনেক কিছু। সে সাথে বদলে গেছে মানুষের যাপিত জীবন। এ কাজে গতি বৃদ্ধিতে পুরুষ কৃষিবিদদের সাথে ভূমিকা পালন করছে নারী কৃষিবিদরাও।

বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে চারটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৪৩ শতাংশ ছাত্রী অধ্যয়নরত। ২০০৯ সালে ছিল ৩০ শতাংশ। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ শতাংশ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০.৪৭ শতাংশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১.৬৩ শতাংশ এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫.৭৮ শতাংশ ছাত্রী বর্তমানে অধ্যায়নরত। এ পরিসংখ্যান থেকেই বুঝা যাচ্ছে-কৃষি শিক্ষার নারীদের অংশ গ্রহণ বেড়ে চলছে। শুধু কী লেখাপড়া, শিক্ষকতা পেশা এ ৪ টি বিশ^বিদ্যালয়ে ২২ শতাংশ নারী জড়িত রয়েছে।

চারটি পূনাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ যে সকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে এখানকার প্রতিটি ছাত্রীই তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। শিক্ষক আর গবেষকদের নয়া প্রযুক্তি নিয়ে মাঠ পর্যায়েও তারা কৃষাণ-কৃষাণিদের সঙ্গে মতবিনিময় করছে, পরামর্শ দিচ্ছে। ভাল ফলাফল করা জন্য মেয়েরা আজ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী পদক থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে সফল হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশা থেকে শুরু করে বিসিএস, বিএডিসি, বিআরআরআই, বিএআরআই, এসআরডিআইসহ বিভিন্ন সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি ব্যাংক, এনজিও, কোম্পানি, চা-বাগান, আখ, পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সাথে কাজ করছে। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর মতো সাফল্যও রয়েছে তাদের ঝুলিতে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের এ সাফল্য যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে নারী কৃষি শিক্ষার গুরুত্ব তেমন সমৃদ্ধ করছে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

কৃষি শিক্ষা নারী অংশগ্রহণ বাড়লেও চাকরিতে অনেক পিছিয়ে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও পারিবারিক ও সামাজিক বাধায় অনেক নারী চাকরি করেন না বা ইচ্ছা থাকলেও করতে পারেন না। যে কারণে শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আরও কম। কিন্তু যে ক’জন চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন তারা যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে টিকে আছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাকরিতে পিছিয়ে আছে নারীরা। ৩৫ তম বিসিএসে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোট ১৫৮ জনের মধ্যে নারী ৫০ জন, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ১০ জনের মধ্যে নারী ৩ জন, মৎস্য কর্মকর্তা ২৯ জনের মধ্যে নারী ৯ জন আর ভেটেরেনারী সাজর্ন ২৭ জনের মধ্যে নারী ৭ জন। তবে পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর এসব স্তরেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।

নারীর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। বিশেষ করে মফস্বল এলাকার মেয়েদের বেলায় এটা আরও বেশি। উচ্চ মাধ্যমিকে উঠলে অনেকের বিয়ে হয়ে যায়। বিশেষ করে এই স্তর পার হলে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের হার খুবই বেড়ে যায়। এ ছাড়া দারিদ্র, আবাসন-যাতায়াত সুবিধার সংকট, হাতের নাগালে কলেজ কিংবা বিশ^বিদ্যালয় সংকট। এখনও প্রতি গ্রামে স্কুল নেই। কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় আরও দূরে। ফলে কষ্ট করে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলেও নিরাপত্তার কারণে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার আর দেন না অভিভাবকরা। এ কারণে চাকরিতেও নারীর সংখ্যা কম। তাই এ বিষয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্র ও সমাজে ‘নারী-পুরুষের সাংবিধানিক সমানাধিকার’ ধারণাটির সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষাকে আরো বেশী নারীদের কাছে প্রশস্থ ও সহজলভ্য করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, সবাই মেয়েদের নিয়ে ইতিবাচক ভাবতে হবে, তবে মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। শুধু কৃষি শিক্ষায় নয় যেকোনো বিষয়েই তারা অনেক ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারবে।

নারী শিক্ষার উন্নয়নের ফলে একদিকে যেমন নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছে অন্যদিকে তারা তাদের মেধা ও প্রতিভা দিয়ে কৃষি সেক্টরে চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করছে। নারী স্ব স্ব অবস্থানে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবে, এই প্রত্যাশা নিয়ে নারী দিবসে বাংলাদেশের সকল নারীকে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা, আর পৃথিবীর সকল নারীর জন্য শুভকামনা।

———————————————-

লেখকঃ

জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare