কোথা হতে এলো প্রিয় ফুল

একটা সময় ছিল যখন ফুলের আবাস ছিল বনে জঙ্গলে,পাহাড়ে পর্বতে কিংবা অনাবাদী পতিত জমিতে। মানুষের যতœ ছাড়াই প্রাকৃতিক ভাবে এরা বেড়ে উঠতো। প্রতিযোগিতায় যে টিকে থাকতে পারতো সে সন্তান সন্ততি তৈরি করতো। এ ভাবেই চলতো এদের বংশ রক্ষা ও বংশ বিস্তারের কাজ। এখনও বনে বাদাড়ে, গ্রামের মেঠো পথের দু’ধারে, খাল-বিল-নদীর পাড়ে কিংবা পাহাড়ে পর্বতে গজায় কত ফুল। প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মানো বুনো ফুলের গাছ থেকে মানুষ যতœ করে বোনার জন্য সেই কবে শুরু করেছে তার বাছাই কর্মকান্ড। যতœ করে মানুষ কোন কোন ফুল গাছ তার বাড়ির কোণে এক চিলতে খালি জায়গায় লাগিয়ে দিত শখ করে। দিনে দিনে বুনো ফুল আবাদি ফুলের মর্যাদায় আসীন হয়ে উঠলো। মানুষ ততদিনে তার সৌখিন বাগানে ফুলের জন্য একটি স্থান করে দিল।

ফসলের মতো ফুলেরও স্ব স্ব জন্মস্থান রয়েছে। পৃথিবীর নানা স্থানে একেক রকম ফুলের উৎপত্তি ঘটেছে। পৃথিবীর নানা অঞ্চলের মানুষ তাদের ভৌগোলিক পরিবেশে পাওয়া সপুষ্পক গাছ গাছালি থেকে বাছাই করে নিয়েছে যার যার প্রিয় ফুল গাছ। কোন কোন ফুলের উৎপত্তি স্থল একাধিক স্থানের হলেও অধিকাংশ ফুলের উৎপত্তি ঘটেছে আসলে এক একটি নির্দিষ্ট স্থানে। কালক্রমে সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে গেছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে, কখনো আবার মহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। নতুন স্থানে এসে কোন কোনটা বেশ ভালই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কোন কোনটার বাড় বাড়ন্ত দেখলে কে বলবে যে হাজার হাজার বছর ধরে এটি ঐ পরিবেশে জন্মাচ্ছে না?

আমাদের দেশে যত ফুল দেখি এর সিংহ ভাগের জন্ম স্থানই কিন্তু ভারত বর্ষে নয়। দেখে দেখে খুব আপন হয়ে গেছে বলে কত ফুলকেইনা আমরা আমাদের নিজস্ব ফুল বলে মনে করি। এ সব ফুলের উৎস খুঁজতে গেলে যখন জানতে পারি এরা এ দেশের নিজস্ব ফুল নয় তখন মনটি কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। এদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত তেমনি কিছু বিদেশী ফুল আমাদের অতি প্রিয় ফুল হয়ে উঠেছে। আমাদের কল্পনায়ও এরা যে ভিনদেশী ফুল তার লেশ মাত্র নেই। রক্তজবা ছেলে বেলা প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় দেখেছি। হিন্দু বাড়িতে তো এটি ছিল এক অনিবার্য ফুল গাছ। পূজা অর্চণায় এদের ব্যবহার এদেরকে এ দেশীয় ফুলের মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে যে রক্ত জবার গাছ সে কিনা চীনের প্রজাতি। ছাত্র-জীবনে একে ব্যবচ্ছেদ করেই আমাদের ফুলকে চেনা জানার কাজটি শুরু করেছি। গ্রামে গঞ্জে শত বাগানে চোখে পড়তো গন্ধরাজের গাছ। সুগন্ধবাহী সাদা সাদা মাঝারি ফুলের এই গাছটি আমাদের নয় ভাবতেই কেমন করে ওঠে মন। গন্ধে আকুল করা গন্ধরাজের উৎপত্তি স্থলতো চীন দেশে। এমনকি ছোট বেলায় নদীর পাড়ের বিশাল দেহী বকুল গাছের ফুল দিয়ে ফুলের মালা গাঁথতে গাঁথতে একবারও কি মনে এসেছে এটি আমাদের নিজস্ব ফুল গাছ নয়। পশ্চিম ভারত, শ্রীলংকা, আন্দামান কিংবা প্রতিবেশী মায়ানমার থেকে এসেছে এই ফুল।

আমাদের দেশে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র পাওয়া যায় তেমন একটি ফুল হলো গাঁদা। বাণিজ্যিক ভাবে এই ফুলটির আবাদও করা হচ্ছে বেশি। আসল কথা সাজ সজ্জায় এই ফুলটিকে ব্যবহার করা হয় সবচেয়ে বেশি। দামে সস্তা, গাছে ধরে প্রচুর, দেখতেও সুন্দর এই গাঁদা ফুলের জন্মস্থান যে দক্ষিণ আমেরিকার মেক্সিকো একথা কষ্ণিন কালেও ভাবিনি। কিংবা আমাদের দালান-কোঠা, ঘর-বাড়ির আঙ্গিনায় বা ফটকে বা সহায়ক কোন শক্ত বস্তুকে অবলম্বন করে তরতরিয়ে বেয়ে ওঠে নিজের অস্তিত্ব যখন জানান দেয় নয়নতারা, সেটি যে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ থেকে নানা পথ ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দেশে এসেছে কজনইবা আমরা তা জানি। আমাদের অতি প্রিয় এক ফুল হলো হা¯œাহেনা। গ্রীষ্মে বর্ষার সন্ধ্যায় ডালের শীর্ষে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা সাদা সাদা সুগন্ধী এই ফুলটির আদি নিবাস যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক’জন আমরা এর খোঁজ রাখি।

ফাগুন এসে পত্র মোচী কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে আগুনের যে মেলা বসিয়ে দেয় তা নিয়ে আমাদের কত আবেগ। একে ছাড়া যেন ফাল্গুনই কেমন ফিকে হয়ে পড়ে। সেই কৃষ্ণচূড়ার নিবাস হলো মাদাগাস্কারে। মালতি লতার রূপে মুগ্ধ কবি একে নিয়ে শব্দের পর শব্দ জুড়ে দিয়ে নির্মাণ করেন চমৎকার সব সংগীত। সেই মালতি লতার আসল বাড়ি হলো মালয়েশিয়া। কিংবা শরৎ এলেই সবার অলক্ষ্যে রাতে ফুটে রাতেই ঝরে যায় যে ফুল তারই একটি হলো শিউলি। আমাদের অতি প্রিয় এই ফুলটির আদি নিবাস হলো মধ্য ভারত।

আমাদের আর একটি প্রিয় ফুল চন্দ্রমল্লিকা। সাদা, হলুদ, লাল, গোলাপি, কমলা ও বেগুনীর নানা মিশেলে তৈরি চমৎকার এই ফুলটির জন্মস্থান আসলে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ। কোন দালান-কোঠা ঘর-বাড়ির দেওয়াল আঁকড়ে বেয়ে ওঠা চমৎকার আর একটি কাষ্ঠলতা জাতীয় সবুজ গাছ হলো বাগান বিলাস। বেগুনী, গোলাপী, লাল, কমলা, পাটকেলে, হলুদ, সাদা এমনিতর কত রকম বর্ণ বিভা দিয়ে মাতিয়ে তোলে আমাদের মন। এর আদি নিবাস হলো দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে। যাকে ছাড়া আমাদের উপহার দেওয়া ফুলের ঝাঁপি অসম্পূর্ণ অনিবার্য সেই রজনীগন্ধাও যে বিদেশী কে জানতো। এমনকি আমাদের ফুলদানি সাজাবার সুগন্ধবাহী এমন ফুল আর কটাইবা আছে। কাটা ফুল হিসেবে অতি জনপ্রিয় এই ফুলটির উৎপত্তি স্থল আসলে মেক্সিকোতে। কবে কখন আমাদের দেশে এসে এরা কেমন আমাদের জল-হাওয়া-মৃত্তিকার সাথে মিশে গিয়ে যেন আমাদেরই হয়ে ওঠেছে। নিসর্গী আর পুষ্প প্রেমীদের আনুকূল্য পেয়ে কেমন চমৎকার সব নামও অর্জন করেছে এরা। বিদেশী হলেও আমাদের মন কেড়েছে যে সব ফুল প্রজাতি ভিনদেশী নামে এদের ডাকতে আমাদের ভাল লাগেনি। সে কারণেই বিদেশে জন্ম নেওয়া কত ফুল প্রজাতি এদেশে এসে ধারণ করেছে চমৎকার সব বাংলা নাম। কী গভীর মমতায় এদের নামকরণ করেছেন আমাদের পুষ্প প্রেমী মানুষ। কনকচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, পান্থপাদপ, মণিমালা, শিরীষ, আকাশমণি, রক্ত করবী, গন্ধরাজ, রাধা চূড়া, সন্ধ্যামণি, স্বর্ণ চ্যামেলী, হা¯œাহেনা, অনন্ত লতা, চন্দ্র মল্লিকা, রজনী গন্ধা এমনি কত ফুল ধারণ করেছে নতুন বাংলা নাম। এদের মায়াবতী রূপ আমাদের মন ভুলিয়েছে। নইলে এমন মনোহরা নাম এরা পেয়েছে কী করে? অনেক ফুল প্রজাতি এ দেশে ফুলের বাগানে স্থান করে নিলেও নতুন বাংলা নাম অর্জনের মধ্য দিয়ে এদের ভিনদেশী দশা এখনও গোছাতে পারেনি। অ্যালামান্তা, মুসান্ডা, গ্লাডিওলাস, ক্যাশিয়া, নার্গিসাস, আইপোমিয়া, জ্যাকারান্ডা, জিনিয়া, কসমস, টিউলিপ, ডায়ান্থাস, রডোডেনড্রন, মানিপ্ল্যান্ট, মর্ণিং গ্লোরী এসব এদের নিজস্ব নাম নিয়েই মিশে গেছে আমাদের পরিবেশে।

আমাদের ফুলের বেশির ভাগই এসেছে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে। এসেছে কেবল বলব কেন, প্রতিদিনই আসছে নতুন ফুলের গাছ। প্রাচীন কালে পর্যটক, নিসর্গী, ভিনদেশী বণিক আর রাজা বাদশাদের আনুকূল্যে এদেশে ফুল এসেছে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে। এই আধুনিক কালে এসে নার্সারী ম্যান, ফুল চাষী ও সৌখিন ফুল বাগানীর আনুকূল্য পেয়ে আজও বিদেশী ফুল নানা পথ ঘুরে চলে আসছে আমাদের দেশে।

বাংলাদেশে সুদৃশ্য পুষ্পধারী বৃক্ষ প্রজাতির সংখ্যা একেবারে কম নয়। নাম করতে গেলে এদের সংখ্যা পৌঁছে যাবে দেড় শয়ের কাছাকাছি। এর অধিকাংশ প্রজাতি এসেছে পৃথিবীর নানা দেশ বা অঞ্চল থেকে। আমেরিকা মহাদেশে উৎপত্তি লাভ করা বেশ কয়েকটি সপুষ্পক বৃক্ষ এখানে বেশ ভালই আসন গেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতিই এরা মূলত। ইপিল-ইপিল, কাঠ গোলাপ, জ্যাকারান্ডা, নাগলিঙ্গম, মেহগনি, মেঘশিরীষ, লটকন, হিম চাঁপা বা উদয়পদ্ম সে অঞ্চলের বৃক্ষ সব। অস্ট্রেলিয়ার বৃক্ষও রয়েছে অল্প কয়েকটি এবং বেশ নজর কেড়েছে এরা মানুষের। অ্যারোকেরিয়া, ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি তার কিছু উদাহরণ মাত্র। আকাশমণি, মণিমালা, আর সেগুন হলো মায়ানমারের প্রজাতি। আমাদের চেনা জানা দেবদারু শ্রীলংকার উদ্ভিদ। কিংবা চমৎকার ভক্ষণযোগ্য পুষ্প প্রধান বক ফুলের জন্মস্থান মালয়।

সুদৃশ্য পুষ্পরাজি সমৃদ্ধ কোন কোন বৃক্ষের জন্মস্থান আমাদের দেশ বা বৃহত্তর ভূ-ভারতেও রয়েছে। উদাল, কদম, করঞ্জা, রক্ত কাঞ্চন, কামিনী, কেয়া, গড় শিঙ্গা, গামারি, গুলাল, গোল সাগু, ঘোড়া নিম, ছাতিম, জারুল, ডুলি চাঁপা, নাগকেশর, নিম, পলাশ, পারুল, পালান, বট, বাঁশপাতি, বাবলা, মহুয়া, মাদার, কনকচাঁপা, লকেট ফুল, লাল সোনাইল, শিমুল, শেফালি, চাঁপা, হাড়গজা, হিজল এসব হলো এই অঞ্চলের সপুষ্পক বৃক্ষ।

শ-খানেকের মত গুল্ম জাতীয় পুষ্পক উদ্ভিদ জন্মানো হয় এদেশে। এদের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রজাতি হলো অঞ্জন, কুন্দ, ত্রুসানন্দ্রা, ঝাঁটি, দাঁতরাঙ্গা, ধুতুরা, নাগবল্লী, শ্বেত কাঞ্চন এরকম হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতির মধ্যে রয়েছে টগর, লঙ্কা জবা, ল্যান্টানা, সন্ধামণি বা কৃষকালি, হেলিকনিয়া ইত্যাদি। চীনের কিছু প্রজাতিও বেশ জনপ্রিয় এদেশে। এদের মধ্যে উল্লেখ করবার মত নামগুলো হলো গন্ধরাজ, জবা, স্থলপদ্ম ও সহ¯্রবেলী। আমাদের অতি প্রিয় হা¯œাহেনা আর রাঁধা চূড়ার আদি নিবাস তো ওয়েষ্ট ইন্ডিজে।

লতা জাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদের মধ্যে ভারতীয় প্রজাতি রয়েছে বেশ কয়েকটি। অপরাজিতা, উলট চাল, কঙ্গিয়া, কুমারি লতা, জুঁই, নীল বনলতা, ভাদ্রা, মাধবীলতা, মালতীলতা ইত্যাদি। ক্রান্তীয় আমেরিকা অঞ্চলের বেশ কয়েকটি পরাশ্রয়ী ফুলগাছও দেখতে পাওয়া যায় আমাদের দেশে। অনন্ত লতা, সোনাঝুরি লতা, তারা লতা, নীল মণি লতা, রেল লতা, লতা পারুল এরই কিছু উদাহরণ। দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি লতা এদেশে বেশ ঝাঁকিয়ে বসেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো বাগান বিলাস, ঘন্টা লতা বা অ্যালমা, ঝুমকালতা আর মর্ণিং গ্লোরী।

মরসুমি ফুলের মধ্যে আমাদের অতি প্রিয় ফুলগুলোর সবই প্রায় বাইরের। পৃথিবীর নানা উৎপত্তি স্থল থেকে নানা পথ ঘুরে এরা এসে পৌঁছেছে এদেশে। এভাবেই মেক্সিকো থেকে এসেছে কসমস, গাঁদা, জিনিয়া, ডালিয়া আর লুপিন। দক্ষিণ ফ্রান্সের কার্ণেশন হাল আমলে আমাদের দেশে ভালই সাড়া জগিয়েছে। তাছাড়া চীনের হলি হক আর দক্ষিণ আমেরিকার পিটুনিয়াও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এ দেশে।

ডজনখানেক কন্দজ সপুষ্পক উদ্ভিদ এ দেশের বাগানে দেখা যায়। এর একটিরও জন্মস্থান এই বঙ্গে নয়। এরা সবাই আসলে ভিনদেশী। আর এদের মধ্যে কেবল দোলন চাঁপা ভারতীয় প্রজাতি। খুব চেনা জানা প্রিয় গ্লাডিওলাস দক্ষিণ আফ্রিকার প্রজাতি। কলাবতীর জন্মস্থান ক্রান্তীয় আমেরিকা। এ দেশে বেশি দেখা মেলে সেরকম জলজ সপুষ্পক উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে অর্ধ ডজনের মতো উদ্ভিদ। এদের অধিকাংশই হয় বঙ্গজ নয়তো বঙ্গজ আর ভারতীয়। তাছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই উৎপত্তি লাভ করেছে অর্কিড। ভারতীয় উপমহাদেশে উপ-হিমালয় অঞ্চলে অনেক রকম অর্কিডের দেখা মিলে। বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলেও এদের কিছুটা দেখা মেলে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare