কোরবানির পশু যেমন হওয়া চাই

মোঃ বশিরুল ইসলাম

ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। হাটগুলো ভরে উঠছে নানা আকারের গরু-ছাগলে। শহরের মানুষেরা বছরে একবারই সুযোগ পান হাটে গিয়ে গরু কেনার। তাই এতো গরুর মধ্য থেকে নিজের মনের মতো একটি ভালো গরু কেনা সহজ নয়। প্রায়ঃশই কোরবানী পশুর নিয়ে নানা ধরণের বিপত্তির মুখোমুখি পড়তে হয় ক্রেতাদের। বিশেষ করে পশুটি সুস্থ কিংবা স্টেরয়েড ব্যবহার করে গরুটিকে মোটাতাজা করা হয়েছে কিনা। তবে কিছু বিষয় খেয়াল করলে ভালো গরু চিনে নেওয়া সম্ভব। অনেকে গায়ের রং এর উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে গায়ের রং এর কারণে মাংসের গুণগত মান বা পরিমাণের কোন তারতম্য ঘটে না। তবে গায়ের রং যাই হোক না কেন পশুর সুস্থতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সারা বছর প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর প্রায় ৫০ ভাগ জবাই হয় কোরবানির ঈদের সময়। সে হিসাবে কোরবানির সময় এক কোটি ১৫ লাখের মতো গবাদিপশু দরকার। এজন্য পশুর চাহিদা ও মূল্য অনেক বেড়ে যায়। তাই অনেক অসাধু ব্যবসায়ী অসদুপায় অবলম্বন করে গরু মোটা করে থাকে। এজন্য মোটাতাজা গরু দেখলেই মনে হয় গরুটি বুঝি ঔষধ দ্বারা মোটা করা হয়েছে। ফলে বৈধ খামারীরাও ন্যায্য মূল্য পান না।

ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়া চলে খুব তোড়জোড়ে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণ না করে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও কৃষক ঈদের দু-তিন মাস আগে থেকে অতি সহজে তিন-চার গুণ ওজন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ডেক্সামিথাসন গ্রুপের ডেকাসন ট্যাবলেট খাওয়ায় এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও হরমোনাল ইনজেকশন দেয়। এছাড়া ভারত থেকে চোরাপথে আসা নিষিদ্ধ পাম নামক স্টেরয়েড ট্যাবলেট মাত্রাতিরিক্ত হারে গরুকে খাওয়ায়। এসব ক্ষতিকর স্টেরয়েডের কারণে গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অধিক মাত্রায় হরমোন প্রয়োগের কারণে গরুর ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ধরণের জটিল রোগ হয়ে থাকে। এছাড়া এসব গরুর কিডনি অতি দ্রুত অকার্যকর হতে থাকে। ফলে শরীরে কোষের মধ্যে পানির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং দ্রুত কোষ বিভাজন হতে থাকে। তাই এসব গরু অন্যসব গরুর চাইতে ফোলা থাকে। এ গরু খাবার কম খেয়ে পানির প্রতি আগ্রহ দেখায়। শরীরের মাংসালো অংশে জোরে চাপ দিলে দেবে যায়। মাছি তাড়ানোর জন্য ঘন ঘন লেজ নাড়াবে না। আবার ঔষধের অবশিষ্টাংশ মাংসে থেকে যেতে পারে। এসব গরুর গোশতের গুণগত মান মারাত্মকভাবে কমে যায়।

এসব গরুর গোশত খাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি হয়। এসব পশুর গোশতের মাধ্যমে গ্রহণকৃত অতিরিক্ত স্টেরয়েডের প্রভাবে কিডনি ও লিভার নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া শিশুরা অল্প বয়সে মুটিয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের চির বন্ধ্যাত্ব বরণ করতে হয়। এসব হরমোন এতটাই ক্ষতিকর যে গোশত রান্না করার পরও তা নষ্ট হয় না। এমনকি তাপে পরিবর্তিত হয়ে জটিল রাসায়নিক পদার্থে পরিণত হয়ে স্বাস্থ্যের জন্য আরো মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই গরু-ছাগল কেনার আগে যতটা সম্ভব যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে।

গরুতে প্রয়োগ করা স্টেরয়েডের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব গরুর গোশত খেলে নানা ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা আরো মারাত্মক আকারে দেখা দিতে পারে। তাই সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর সুস্থ পশুর গরু চোখ বড় ও উজ্জ্বল থাকবে, লেজ দিয়ে মাছি তাড়াবে, কান নাড়বে, অবসরে পান চিবানোর মত সবসময় চিবাবে। গরু বিরক্ত করলে সহজেই রেগে যাবে। গোবর স্বাভাবিক থাকবে, পাতলা পায়খানা করবে না। আর মুখের সামনে খাবার ধরলে যদি জিহ্বা দিয়ে টেনে নেয় এবং নাকের ওপরটা ভেজা ভেজা থাকে তাহলে বুঝতে হবে গরু সুস্থ। অসুস্থ গরু খাবার খেতে চায় না। তবে সকল গরুই কিন্তু অবৈধভাবে মোটাতাজা করা নয়। গরু মোটাতাজা করার বৈজ্ঞানিক ও বৈধ পদ্ধতিও আছে। তা হচ্ছে ইউরিয়া মোলাসেস পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে গরু প্রাকৃতিকভাবেই মোটাতাজা হয়ে ওঠে। বর্তমানে অনেক খামারীরাই এ পদ্ধতি অবলম্বন করছে।

ব্যবসায়ীরা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে, ট্রলারের সাহায্যে গরু হাটে নিয়ে আসে। ট্রাকে, ট্রলারে গরু এমনভাবে বাঁধা হয় যাতে নড়তে, বসতে না পারে। তাছাড়া হাটেও গরুকে সবসময় দাড় করিয়ে রাখা হয়। কারণ ক্রেতারা দাড়ানো পশুকেই ক্রয় করতে বেশি আগ্রহী হয়। তাই বিক্রেতা পশুকে বসতে দিতে চায় না। ফলে একজন ক্রেতা যখন হাট থেকে গরু কিনে বাড়ি নিয়ে যায়, তখন সেই গরু একবার বসলে আর দাড়াতে চায় না। কোন কিছু খেতেও আগ্রহ প্রকাশ করে না। তখন অনেকেই মনে করে পশু বোধ হয় মারাত্মক অসুস্থ। প্রকৃত অর্থে পশুটি তখন বেশ কান্ত থাকে। তাই পশুকে বিরক্ত না করে ৮-১০ ঘন্টা বিশ্রাম দিয়ে তারপর খাবার দিতে হবে। এ সময় পশুর সামনে শুধুমাত্র ঘাস ও পানি রাখা যেতে পারে, প্রয়োজনে পশু তা গ্রহণ করবে। পশুকে এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে কোন অবস্থাতেই বৃষ্টিতে না ভিজে এবং জায়গাটি শুকনো থাকে। প্রয়োজনে একটি অস্থায়ী একচালা ঘর তৈরি করা যেতে পারে। তাছাড়া পশুর শোয়ার জায়গাটিতে পাটের পুরনো বস্তা বিছিয়ে দিতে হবে।

কোরবানির জন্য দুই বছরের কম বয়সের গরু বা মহিষ এবং ১ বছর কম বয়সের ছাগল বা ভেড়া কোনভাবেই উপযুক্ত নয়। গাভী না কেনাই ভালো। কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে গাভীটি গর্ভবতী কিনা। গর্ভবতী গরু কোরবানি দেয়া যায় না।

ভারত থেকে আসা গরুগুলো অনেকটা পথ অতিক্রম করে আসার ফলে এরা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দেখে বুঝা যায় না এরা সুস্থ না অসুস্থ। তাই এক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আসুন, দেশি গরু ক্রয় করে খামারী ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করি।

লেখকঃ জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত),

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। মোবাইল-০১৭১৬-৫৮১০৮৬

ই-মেইল- mbashirpro1986@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare