কোরবানীর পশুর চামড়া ছাড়াতে করণীয়

কৃষিবিদ মিলন আহমেদ
বছর ঘুরে আবারও এল কোরবানির ঈদ৷ মানুষ কোরবানির পশু বেচাকেনায় ব্যস্ত৷ প্রতিবছর কোরবানির পর পশুর চামড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও বেচাকেনা নিয়ে আপনি পড়েন নানা ঝামেলায়৷ অথচ কোরবানির আগে ও পরে কিছু বিষয়ের প্রতি যদি লক্ষ্য রাখেন, তাহলে এই ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া যায় সহজেই৷ সেই সঙ্গে বেড়ে যায় আপনার দানকৃত চামড়ার বিক্রির টাকার পরিমাণ৷ আমাদের দেশে চামড়া ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আট ভাগে চামড়ার মান মূল্যায়ন করে থাকে৷ ‘এ’ ভাগকে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে সর্বনিম্ম মূল্যায়ন করা হয় এইচ ভাগকে৷ কীভাবে রক্ষা করবেন আপনার কোরবানির পশুর চামড়ার মান, এবার এ নিয়েই নিম্মে কিছু টিপস দেওয়া হল৷
চামড়ার মান রক্ষা
সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে চামড়ার ক্ষতি ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে থাকে৷ ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে পশুর চামড়াকে রক্ষা করতে বর্তমান বিশ্বে সাধারণত ড্রাই ট্রিটমেন্ট, সল্ট ট্রিটমেন্ট ও ফ্রিজিং করে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়৷ উন্নত দেশগুলোতে চামড়া সংরক্ষণে ড্রাই ট্রিটমেন্ট ও ফ্রিজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও তা ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ বলে আমাদের দেশে সল্ট ট্রিটমেন্ট বা লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়৷ কোরবানির আগে ও পরে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখলেই অতিসহজে চামড়ার গুণগত মান রক্ষা করতে পারবেন৷
কোরবানির আগেঃ অনেকেরই ধারণা, কোরবানির গরুটির গায়ের রঙের ওপরই হয়তো নির্ভর করে এর চামড়ার দাম৷ আর তাই কালো অথবা লাল গরুটির দাম কিছুটা চড়িয়েই হাঁকেন বিক্রেতা৷
* পশু কেনার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, আগে থেকেই গরুর চামড়ায় কোনো গভীর ক্ষতচিহ্ন বা দাগ যেন না থাকে৷
* কোরবানির অনেক আগেভাগেই যদি পশু কিনে থাকেন তাহলে পশুর বাসস্থান হিসেবে এমন কোনো স্থান নির্বাচন করুন যেখানে পশুর গায়ে আঁচড় বা ক্ষত হবে না৷ পশুর থাকার জায়গায় খড় বা চট বিছিয়ে দিন৷
* পশু বাঁধা ও কোরবানির কাজে পাটের রশি ব্যবহার করুন৷ নাইলন বা প্লাস্টিকের দড়ি, লোহার শিকল পরিহার করুন৷
* ঈদের দিন সকাল থেকেই পশুকে শক্ত খাবার (খড়, ভুসি, কাঁচা ঘাস ইত্যাদি) দেওয়া থেকে বিরত থাকুন৷ বেশি করে পরিষ্কার পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি তরল খাবার খাওয়াতে পারেন৷ এতে কোরবানির পর পশুর চামড়া ছাড়ানো অনেক সহজ হবে৷
* পশু কোরবানির স্থান হিসেবে সমতল জায়গা বেছে নিন৷ এ ক্ষেত্রে এবড়োথেবড়ো রাস্তা ও কংক্রিটের মেঝে পরিহার করুন৷
* কোরবানির কাজে অপেক্ষাকৃত দক্ষ লোক ঠিক করতে হবে৷ আনাড়ি লোক দিয়ে চামড়া ছাড়াতে গেলে চামড়া কেটে যেতে পারে৷
* কোরবানির জন্য শোয়ানো অবস্থায় পশুটিকে যেন টানাহেঁচড়া না করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে৷
* কোরবানির পশু জবাই করার কাজে বড় ও চামড়া ছাড়ানোর কাজে ধারালো মাথা ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করতে হবে৷
* কোরবানির কাজে ব্যবহৃত বাঁশ বা লাঠি যেন মসৃণ হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি৷
* সঠিক নিয়মে কোরবানির পশু শোয়ানো হলে সাধারণত চামড়া অক্ষত থাকে৷
কোরবানির পরেঃ কোরবানির চামড়ার গ্রেডিং ঠিক রাখতে হলে কোরবানির পর চামড়া ছাড়ানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত৷ এ ছাড়া চামড়া ছাড়ানোর পরে হাতেগোনা কিছু আনুষঙ্গিক কাজ করলে চামড়ার মান অক্ষুন্ন থাকে৷
* চামড়া ছাড়ানোর সময় তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়৷ কোরবানি ও চামড়া ছাড়ানোর কাজ অভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে করুন৷
* চামড়া ছাড়ানোর পর দ্রত চামড়ায় লেগে থাকা রক্ত, চর্বি ও মাংসকণা সরিয়ে ফেলতে হবে৷ কেননা রক্ত-মাংস লেগে থাকা চামড়ায় ব্যাকটেরিয়া দ্রুত আক্রমণ করতে পারে৷
* চামড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার সময় টেনেহিঁচড়ে নেবেন না৷ চামড়া যানবাহনে তোলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন৷
* চামড়া দ্রুত বিক্রি করতে না চাইলে লবণ দিয়ে চামড়াটি ছড়িয়ে রাখতে হবে৷
* সাধারণত চামড়ায় ওজনের ২০ শতাংশ হারে লবণ ব্যবহার করা হয়৷ অর্থাত্‍ একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হলে লবণ ব্যবহার করতে হবে তিন থেকে চার কেজি৷
* প্রতিবছর কোরবানির আগে ‘বাংলাদেশ লেদার ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড গুডস অ্যাসোসিয়েশন’ চামড়া কেনার একটি নির্দিষ্ট দাম ঘোষণা করে৷ সেদিকে লক্ষ রাখলে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় করার সময় লোকসান হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়৷
* ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া এনে বিক্রি করতে হলে অবশ্যই সল্ট ট্রিটমেন্ট (লবণ ব্যবহার) করে আনতে হবে৷
* চামড়াকে পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে নেপথলিন ব্যবহার করা যেতে পারে৷
উপরোলি্লখিত টিপস সঠিকভাবে মেনে চললে চামড়ার গুণগত মান যেমন ঠিক থাকবে, তেমনই প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যাবে চামড়ার দাম৷ সেই সঙ্গে উন্নত হবে দেশের চামড়া শিল্প৷ কেননা আমাদের দেশের ট্যানারিগুলো তাদের সারা বছরের প্রয়োজনীয় চামড়ার ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করে থাকে কোরবানির ঈদের সময়৷
সূত্র: ইন্টারনেট অবলম্বনে

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *