খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় দেশী ফলের অবদান

 

ড. মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার

বাংলাদেশ উষ্ণ-অবউষ্ণ জলবায়ুর দেশ। এ দেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল জন্মে। ফল অত্যন্ত পুষ্টিকর সুস্বাদু খাবার। ফল ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের অন্যতম উৎস। এটা রান্না ছাড়া সরাসরি খাওয়া যায় বিধায় বিদ্যমান পুষ্টিমান সবটুকুই দেহ গ্রহণ করতে পারে। এ সমস্ত উপাদান মানব দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি সহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক ফলের প্রাপ্যতা মাত্র ৩৫ গ্রাম যা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত নুন্যতম চাহিদার এক তৃতীয়াংশেরও কম। একদিকে নগরায়ন, শিল্পায়ন ও বসত বাড়ীর জন্য প্রতি দিন ২২০ হেঃ হিসাবে বছরে প্রায় ৮৩,০০০ হেঃ আবাদী জমি কমে যাচ্ছে, অপরদিকে জ্যমিতিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা মিটানো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ঃ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে যখন সকল জনসাধারণ সর্বদাই সুস্থ ও কর্মঠ জীবন যাপনের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা ও পছন্দসই খাদ্য সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে, সে অবস্থাকেই খাদ্য নিরাপত্তা বলা হয়। পুষ্টি নিরাপত্তা বলতে পরিবারের সকলের জন্য সুষম খাদ্য হিসাবে পর্যাপ্ত আমিষ, ভিটামিন, খনিজ উপাদান এবং নিরাপদ পানীয় এর সরবরাহকে বুঝায়। যে খাদ্যে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব কয়টি উপাদান পরিমাণমত থাকে তাকে সুষম খাদ্য বলা হয়। কোন একটি খাদ্যে এসব উপাদান সমপরিমাণ থাকে না বলেই বিভিন্ন খাদ্য খেয়ে মানুষের দেহের চাহিদা মেটাতে হয়। আর খাদ্যের মধ্যে এসব পুষ্টি উপাদান সঠিক পরিমাণে না থাকলে মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে এবং বৃদ্ধি ও মেধার বিকাশ ব্যহত হয়। উচচ পুষ্টি সম্পন্ন বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত এবং অপ্রচলিত ফলের উন্নত জাত চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে সুষম খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা যায়। তবে কেবলমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও মানুষ খাদ্য ও পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। তার বড় কারণ ক্রয়ক্ষমতার অভাব এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩০% লোক দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন শিক্ষার সাথে কৃষির শিল্পায়ন। অর্থাৎ কৃষিজাত দ্রব্যাদির উপর ভিত্তি করে অমৎড়-নধংবফ শিল্প গড়ে তোলা। এ ছাড়া উৎপাদন ঝঁংঃধরহ ্ ঝঃধনষব করার জন্য বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সর্বোপরি উৎপাদিত দ্রব্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ।

পুষ্টি ঘাটতি জনিত সমস্যা ও খাদ্যের গ্রহণ মাত্রাঃ খাদ্য গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য কেবলমাত্র বেঁচে থাকা নয় বরং সুস্থ সবল ও কর্মক্ষম হয়ে বেঁচে থাকা। শর্করা, আমিষ, তেল, খাদ্যপ্রাণ/ ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের অভাবে মানুষের অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। অধ্যাপক মোহাম্মাদ হোসেন এর মতে এদেশে অপুষ্টিজনিত সমস্যাগুলো নি¤œরূপঃ

১. শতকরা ৫০ ভাগ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

২. ০-৫ বছর বয়স্ক শতকরা ৭৫ ভাগ শিশু অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে।

৩. শতকরা ৭৫ ভাগ মহিলা ও শিশু এনিমিয়া বা রক্তশূন্যতা রোগে ভুগছে।

৪. প্রতি বৎসর ৩০ হাজার শিশু অন্ধ হচ্ছে।

৫. শতকরা ৭৬ ভাগ পরিবার ক্যালরীর অভাবে ভুগছে।

৬. শতকরা ৯০ বাগ পরিবার ভিটামিন এ এর অভাবে ভুগছে।

৭. শিশু মৃত্যুহার বাড়ছে (প্রতি হাজারে ১৪৬ জন)

৮. শতকরা ৮০ ভাগ লোক ভিটামিন-সি এর অভাবে ভুগছে।

৯. শতকরা ৯৬ ও ৯৩ ভাগ লোক যথাক্রমে রাইবোফ্লোবিন ও ক্যালসিয়ামের অভাবে ভুগছে।

১০. ১০ মিলিয়ন লোক গলাফোলা রোগে আক্রান্ত এবং ২৩.৯ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্তের ঝুঁকিতে আছে। দেশী ফলের পুষ্টিমান ও ব্যবহার ঃ প্রকৃতিতে যত প্রকার খাদ্য দ্রব্য উৎপাদিত হয় তার মধ্যে ফলই বেশি পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু। এর মধ্যে রয়েছে মানব দেহের প্রয়োজনীয় সকল গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। ফল বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস। কিন্তু অপ্রতুল সরবরাহ ও গ্রহণের কারণে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সুস্থ সবল জাতি গঠনে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।

ফলের ঔষধি ব্যবহারঃ ফল শুধু পুষ্টি উপাদান বিচার করেই খাওয়া হয় না। ফল আর্য়ুবেদী চিকিৎসায় ও ভেষজ ঔষধ তৈরীতে ব্যবহার হয়ে আসছে। এ ছাড়াও কিছু কিছু ফল সরাসরি রোগ নিরাময়ে/রোগীর পথ্য হিসাবে সমাজে প্রচলিত যার একটি তালিকা দেখানো হল ঃ

উল্লেখিত পুষ্টি উপাদান ছাড়াও ফলে এমন কিছু জৈব এসিড ও এনজাইম আছে যা আমাদের হজমে সহায়তা করে যেমন- লেবু জাতীয় ফলে সাইট্রিক এসিড, আঙ্গুর ও তেতুঁলে টারটারিক এসিড আছে। পেঁপেতে রয়েছে পেঁপেইন নামক হজমকারী এনজাইম।

ঔষধিগাছ ঃ ঔষধিগাছ হারবাল মেডেসিন ও রোগী নিরাময়ে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেমন, অর্জুন গাছের ছাল হার্টের শক্তি বৃদ্ধি করে। জামের বিচি ডায়বেটিস রোগের মহৌষধ। এছাড়া শিমূল, শতমূল, অশ্বগন্ধ, সোনাপাতা, উলটকম্বল, জৈন, অশোক ছাল, তালমাখনা, আমলকি, হরতকি, বহেরা, দারচিনি, অড়হর, নিম ইত্যাদি ঔষধিগাছ মানুষের শরীরের নানাবিধ রোগ নিরাময়ে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ফল চাষের বর্তমান অবস্থাঃ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে দেশী ও বিদেশী ফলসহ বাংলাদেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল জন্মে থাকে। প্রচলিত ফলের মধ্যে কলা, আম, আনারস, পেঁয়ারা, পেঁপে, লেবু, বাতাবীলেবু, লিচু, কুল, নারিকেল, উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে কামরাঙ্গা, লটকন, সাতকরা, আতা, শরীফা, জলপাই, বেল, আমড়া, কদবেল, আমলকি, জাম, ডালিম, সফেদা, জামরুল, গোলাপজাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য অপ্রচলিত ফল। বাংলাদেশে বহুরকমের ফল উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও মাথাপিছু দৈনিক ফলের প্রাপ্যতা মাত্র ৩৫-৪০ গ্রাম যা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত নূন্যতম চাহিদা মাত্রার অনেক কম (১১৫-১২০ গ্রাম) বর্তমানে বাংলাদেশে ১.৪৪ লক্ষ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ২২ লক্ষ টন ফল উৎপাদন হয়। অথচ দরকার প্রায় ৬৭.০ লক্ষ মেঃটন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ফলের প্রাপ্তির পরিমাণ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে যে সব ফল উৎপাদন হয় তার মধ্যে কলা, আম, কাঁঠাল, নারিকেল, পেঁয়ারা, আনারস ও তরমুজ সাতটি ফলের উৎপাদন ১৭.৫ লক্ষ মেঃটন যা মোট উৎপাদনের শতকরা ৮০ ভাগ।

ফল থেকে অধিক আয় ও ফল রপ্তানী: সাধারণত অন্যান্য খাদ্যশস্য অপেক্ষা কোন কোন ফলের গড় ফলন অনেক বেশি এবং যেহেতু ফলের মূল্যও অনেক বেশি, সেহেতু তা থেকে আয়ও বেশি হয়। বর্তমানে নার্সারীর আধুনিক উন্নত জাত ও কলমের চারা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে ফলন আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব। অন্যদিকে ফলের গড় ফলন ও বৈদেশিক বাজারমূল্য বিবেচনায় ব্যাপক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ফল ও ফলজাত দ্রব্যাদি রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বিধায় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বাড়বে।

বংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস এন্ড এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টাস এসোসিয়েশন এ মতে ফল রপ্তানির পরিমাণ আনুমানিক ২৫-৩০%। প্রতি কেজি ফলের মূল্য ২.৫০ থেকে ৩.৫০ আমেরিকান ডলার। রপ্তানীকৃত উল্লেখযোগ্য ফল সমূহ হল ঃ কাঁঠাল, আম, আনারস, জারালেবু, এলাচীলেবু, কুল, আমড়া, জলপাই, পেয়ারা, সতকরা, লটকন, নারিকেল, জাম, আতা, ডেফল, বাতাবীলেবু, বেল, কদবেল, কামরাঙ্গা, শরীফা, কাউফল, জামরুল, চালতা, আমলকী, সফেদা ইত্যাদি। প্রবাসী বাংলাদেশী, পাকিস্তানী এবং ভারতীয় বংশোদ্ভুত অভিবাসীগণের মাঝে বাংলাদেশী তাজা ফলের ব্যাপক চাহিদা। আকর্ষণীয় রং সম-আকার, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবহারের কারণে থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইনও আফ্রিকান দেশসমূহের ফলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশ্বের ৩৫টি দেশে কাঁচা ফলমূল, শাকসব্জী রপ্তানী হয়ে থাকলেও প্রধানতঃ ৭টি দেশে এর শতকরা ৯২ ভাগ রপ্তানী হয়ে থাকে। দেশগুলো হল যুক্তরাজ্য, ইতালি, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন।

ফল উৎপাদনের সমস্যাঃ

১. উচচ ফলনশীল জাতের অপ্রতুলতা।

২. অনিয়মিত ফল ধারণ।

৩. মৌসুম ভিত্তিক প্রাপ্যতা।

৪. উন্নত গুনাগুণ সম্পন্ন চারা/কলমের অভাব।

৫. ফল গাছের অপর্যাপ্ত পুষ্টি, সেচ ও ফসল ব্যবস্থাপনা।

৬. রোগ ও পোকামাকড়ের প্রার্দুভাব

৭. ফসল সংগ্রহোত্তর অভাব

৮. ফল চাষে কৃষকদের সচেতনতার অভাব

৯. বাজারজাতকরণে প্রতিবন্ধকতা।

ফল উৎপাদনের সম্ভবনা:

মাটি ও জলবায়ু ঃ বাংলাদেশ আদ্র ও উষ্ণ মন্ডলীয় দেশ। এদেশের উর্বর ও গভীর মাটি প্রায় সব ধরণের গ্রীষ্ম ও অবগ্রীষ্ম মন্ডলীয় ফল চাষের অনুকুলে। বর্তমানে এদেশে যে পরিমাণ ফল উৎপাদিত হচ্ছে তা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত মাত্রার মাত্র ৩৫% পূরণ করতে পারে। অবশিষ্ট ৬৫% ঘাটতি বিধায় দেশী ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রসারণ কাজের মাধ্যমে পাহাড়ী অঞ্চল, পতিত জমি, বসতবাড়ি, পুকুর পাড়, রাস্তার ধার, অফিস এলাকা প্রভৃতি জায়গায় দেশি ফল গাছ লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এদেশে দেশী ফলের গড় ফলন অত্যন্ত কম। উন্নত জাতের চাষ, কলমের চারা, উন্নত চাষাবাদ ও নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, দক্ষ সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

মাঠ ফসলের তুলনায় ফলের চাষ অধিক লাভজনক। তাই সম্প্রতিকালে বিভিন্ন ফলের মধ্যে আম, কাঠাল, লিচু, পেয়ারা ও কুলের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোথাও অপ্রচলিত ফলের বাগান হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে বাণিজ্যিক চাষাবাদের কারণে অপ্রচলিত অনেক ফল ভবিষ্যতে দেশ থেকে বিলিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে আপেলকুল, বাউকুল, আ¤্রপালি, বোম্বে লিচু, থাই পেয়ারা ইত্যাদি ফল উৎপাদনে এক বিরাট সাড়া জাগিয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০২০ সালে ১৭ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম হিসাবে ঐ সময়ে ফলের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ৭৫ লক্ষ টন।

দেশী ফলের বাজারজাতকরণঃ কোন পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌছানো সামগ্রিক কর্মকান্ড ও প্রক্রিয়াকে বাজারজাতকরণ বলা হয়। ফল বাজারজাতকরণে প্রচুর লোক থাকে। উৎপাদক, পরিবহনকারী, ব্যবসায়ী ছাড়াও ব্যাংক, সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারী, প্রকৌশলী, সরবরাহকারী, জাহাজ, ইনন্সুরেন্স কোম্পানীর এজেন্ট, কাস্টমস অফিসার বিজ্ঞাপনদাতা অনেকেই বাজারজাতকরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তাজা ফল হচ্ছে পচনশীল দ্রব্য এবং এসব দ্রব্য বিতরণ, বাজারজাতকরণের সময় নানাবিদ কারণে (শরীরবৃত্তীয়, অনুজীব, চাপ ইত্যাদি) প্রচুর ক্ষতি হয়। যে দুটি কারণে প্রচুর ক্ষতি হয় তা হলো ঃ (ক) জ্ঞানের অভাব এবং অদক্ষ ও অসতর্ক পরিবহণ (খ) প্রয়োজনীয় ও যথার্থ যন্ত্রপাতি, পরিবহণ ব্যবস্থা, প্যাকিং ব্যবস্থা ইত্যাদি ও অবকাঠামো যথা- প্যাকিং হাউজ, কোল্ড স্টোরেজ, কেন্দ্রীয় পাইকারী বাজার ইত্যাদির অভাব। বর্তমান মার্কেটিং চ্যানেলে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ হয় না। তাই মার্কেটিং ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন এনে সমবায় ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সহ যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে।

বৃক্ষের গুরুত্ব ঃ বৃক্ষ নেই প্রাণের অস্তিত্ত্ব নেই। অফুরন্ত সৌন্দর্যের এক মধুর নিকুঞ্জ আমাদের এই পৃথিবী। এই পৃথিবীকে সবুজে শ্যামলে ভরে দিয়েছে প্রাণ প্রদায়ী বৃক্ষরাজী। মানুষের সুন্দরভাবে বেঁেচ থাকার জন্য যে সব মৌলিক চাহিদা রয়েছে তার অধিকাংশ পুরণ করে বৃক্ষ। বৃক্ষ পৃথিবীর আদি প্রাণ। এই আদি প্রাণ মৃত্তিকা থেকে তাদের প্রাণরস গ্রহণ করে। যতটুকু প্রাণরস গ্রহণ করে তার ৭০%ভাগ বাষ্পাকারে পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেয়। আবার জীবন ধারণের জন্য যে বৃক্ষ আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাচিয়ে রাখে প্রতিদিনে আমরা তাদের নিধন করি নির্মমভাবে। ধারিত্রি সম্মেলন ১৯৯২ সালের ৩ জুন থেকে ১৪ জুন ব্রাজিলের রাজধানী রিও-ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিশ্ব সম্মেলন ১৭০টি দেশের প্রতিনিধি আশংকা প্রকাশ করেন যে, বিশ্বজুড়ে যে সর্বনাশা বৃক্ষ নিধন চলছে তা বিশ্বকে এক কঠিন সমস্যায় ফেলবে। প্রতি সেকেন্ডে উজার হচ্ছে এক একর বনভুমি। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, একই সঙ্গে বৃক্ষ নিধন ও বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে বিশ্বকে বসবাসের উপযোগ্য করে রাখতে হবে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সবাইকে অনুরোধ করেছেন কমপক্ষে তিনটি গাছ লাগাতে-তার একটি ফলজ, একটি বনজ ও একটি ঔষধি গাছ।

খাদ্যাভাস পরিবর্তন ঃ বর্তমানে দানাদার শস্যের উপর চাপ কমানোর জন্য খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন একান্ত জরুরী। পৃথিবীর উন্নয়নশীল একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী দানাদার খাদ্য চাল সবচেয়ে বেশী পরিমাণে খেয়ে থাকি। বৎসরে প্রায় ১৮৩ কেজি (৫০০গ্রাম)/ ১৬৫কেজি (৪৫৪গ্রাম)/ জন আর সেখানে শ্রীলংকা মাত্র ৮৩কেজি/জন/বৎসর আর দক্ষিণ কোরিয়া/ জাপান/ চীন মাত্র ৪০-৪৫ কেজি/ জন/ বৎসর দৈনিক মাত্র ৫০গ্রাম/ জন কমিয়ে খেলে বৎসরে প্রায় ২৮ লক্ষ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে, আর যদি ১০০ গ্রাম খাদ্য কমানো যায় এবং তা যদি সব্জি/ফল দিয়ে পূরণ করা যায় তাহলে বছরে প্রায় ৫২ লক্ষ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত হবে। এতে খাদ্য আমদানী করা দূরে থাক উপরন্তু খাদ্য রপ্তানী করা যাবে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে ফলের সাথে সব্জিও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পাবে। যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিদিন ৬৮৬ গ্রাম/জন, জাপান ৪৫০ গ্রাম/জন, চায়না ২৯০ গ্রাম/জন, ভারত ১২৪ গ্রাম/জন সেখানে বাংলাদেশ প্রতিদিন ৪৫গ্রাম/জন সব্জি খায়। যা একজন মানুষের চাহিদার মাত্র এক পঞ্চমাংশ। ফল ও সব্জিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল থাকে যা শরীর সুস্থ ও সবল রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। তাই প্রতিদিন অন্তত কিছু পরিমাণ সবজি এবং একটি ফল খেতে ভুলবেন না।

উপসংহার ঃ প্রযুক্তিগত কার্যক্রম প্রয়োগের মাধ্যমে দেশী ফলের ফলন বৃদ্ধি এবং মান সম্পন্ন ফল উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। অধিক উৎপাদিত দেশী ফল পুষ্টিহীনতা দূরীকরণের পাশাপাশি দানাদার খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস সংকোচিত করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে। দেশী ফল বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, আনারস,আপেল কুল, থাই পেয়ারা, ইত্যাদি ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করলে ফলভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প কারখানা গড়ে উঠার সাথে সাথে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উপরন্তু মানসম্পন্ন তাজা ফল ও ফল থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকৃত দ্রব্যাদি রপ্তানীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ফলে জাতীয় অর্থনীতি সবল হবে এবং মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় যথেষ্ট অবদান রাখবে।

 

লেখকঃ কৃষি কর্মকর্তা, ডিএই

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *