খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর ভূমিকা

ড. এম. মনজুরুল আলম মন্ডল*

বাংলাদেশ শুধু ডিজিটালের দিকেই এগোচ্ছে না। খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও এগিয়ে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ছোট আয়তনের এই দেশ এখন বছরে চার কোটি টন চাল উৎপাদনে সক্ষম। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা যার নেপথ্যে কৃষি বিজ্ঞানীরা। কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার ধারা। নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত দেখছে দেশবাসী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জ্বলন্ত উদাহরণ এ বছর পাট, সবজিসহ ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানি। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর এ দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক। আর কৃষকের নেপথ্যে কাজ করেছেন বাংলাদেশর ১০ টি  গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিজ্ঞ গবেষকরা। কৃষকের শ্রম, কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও সরকারের সদিচ্ছায় পাট, সবজি ও ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের এ রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। আর এতে পাল্টে গেছে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট বা জিডিপির গ্রাফ। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে শুধু কৃষি খাতে জিডিপির অবদান ২১%। আর কৃষিশ্রমে ৪৮%। কৃষির সাব-সেক্টরসহ এ পরিসংখ্যান ৫৬%।

অপরদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার কারণে খরা, উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রা, বন্যা, লবণাক্ততা ইত্যাদি সমস্যা নতুন মাত্রায় যোগ হয়ে বাংলাদেশের বিরাট জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। এ সমস্ত সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবন করেছে ১৫ টি ফসলের মোট ৯৩টি লাগসই, উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন জাত যথা- ধান-১৯ টি, চীনাবাদাম- ৯ টি, সয়াবীন-৫ টি, সরিষা-১০ টি, তিল-৪ টি, মুগ-৯ টি, ছোলা-১০ টি, মসুর- ১০ টি, মাষ-১ টি, খেসারী-১ টি, গম-১ টি, পাট- ২ টি, পাটশাক-১ টি, রসুন-১ টি, মরিচ-১ টি এবং টমেটো-১২ টি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত আট বছরে বিনা উদ্ভাবন করেছে ৫৫ টি ফসলের জাত, যার বেশিরভাগই বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার কারণে সৃষ্ট কৃষির হুমকি সমূহ মোকাবেলায় অত্যন্ত উপযোগী। এদের ফলন সনাতন জাতের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি। বিনা’র এসব উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা সহনশীল ধান, সরিষা, গম, বাদাম ও সয়াবিনের ৯ টি, আকস্মিক বন্যা মোকাবেলায় ধানের ২টি, খরা সহনশীল ধান, তিল, মসুর, মুগ ও ছোলার ১০ টি, মঙ্গা মোকাবেলায় ২ টি, তাপমাত্রা সহিঞ্চু ধানের ১ টি, দ্বিগুণ ফলনের রসুনের ১ টি এবং সুগন্ধী ও রফতানি উপযোগী ২টি ধানের জাত। আধুনিক চাষের জন্য মাটি, পানি ও সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৩০ টির বেশি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। ৫ টি লাভজনক ধানভিত্তিক শস্যক্রম উদ্ভাবন,  ফসলের বালাই ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করা হয়েছে। এছাড়াও উক্ত হুমকিসমূহ মোকাবেলায় কৃষিতে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিনা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে এবং অনেক ফসলের আরও বেশী লাগসই মিউট্যান্ট উদ্ভাবন করেছে যা আগামীতে জাত হিসাবে ছাড় হবে বলে আশা

করা হচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কাঙ্খিত ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ বির্নিমাণে  এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসডিজি বাস্তবায়নের পূর্ব শর্ত, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহের অবদান নিম্নরুপঃ

১. মঙ্গা নিরসনে বিনা’র অবদানঃ রংপুর সহ দেশের বেশ কিছু এলাকায় আশ্বিন-কার্তিক মাসে চাষী ভাইদের কোন কাজ থাকে না, ঘরে খাবার থাকে না, গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্যও কোন গো-খাদ্য থাকে না। এ অবস্থাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মঙ্গা’ বলা হয়। মঙ্গা নিরসনে বিনা কর্তৃক স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন বিনাধান-৭ উদ্ভাবন করা হয়েছে যা বীজতলায় বীজ ফেলা থেকে ফসল কর্তন পর্যন্ত মাত্র ১১০-১১৫ দিন সময় লাগে। আশ্বিন-কার্তিক মাসে অন্যান্য জাতের আমন ধানে যখন ফুল আসা শুরু করে তখন বিনাধান-৭ কাটা শুরু হয়। ২০০৭ সালে বিনাধান-৭ অবমুক্ত হওয়ার পরে মঙ্গা এলাকার চাষী ভাইয়েরা এটাকে লুফে নেয়। বর্তমানে মঙ্গা এলাকায় বিনাধান-৭ ও ব্রিধান-৩৩ চাষের ফলে মঙ্গা দূর হয়েছে। তাই মঙ্গা যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেই ভাবনা থেকেই সম্প্রতি  বিনা কর্তৃক আরও স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন বিনাধান-১৬ অবমুক্ত করা হয়েছে যার জীবন কাল মাত্র ১০০-১০৫ দিন। জাত দু’টি রংপুর অঞ্চলে ব্যাপক ভাবে চাষ করার ফলে মঙ্গা দূর হয়ে উক্ত অঞ্চলটি বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ এলাকায়  পরিণত হয়েছে এবং ক্ষুদ্র কৃষক ও শ্রমিক গণের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে।

২. আকস্মিক বন্যা সমস্যার সমাধানে বিনা’র ভূমিকাঃ বাংলাদেশের আকষ্মিক বন্যা নিয়মিত ঘটনা। বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের জেলাসমূহ বিশেষ করে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাংগাইল, মানিকগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলায় আকস্মিক বন্যার কারণে ধান চাষ দারুনভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত বন্যাসহিষ্ণু জাত বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ উদ্ভাবিত হওয়ায় বন্যা প্রবণ এলাকায় ধানের চাষ অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে। চারা রোপণের ২-৩ দিন পর থেকে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেলে চারা গাছের উপরের অংশ পচে গেলেও মূল গাছ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিক ফলন দিয়ে থাকে। ফলে আমন মৌসুমে আকস্মিক বন্যা প্রবন এলাকায় বিনাধান-১১, বিনাধান-১২ ও বিনাধান-১৩ চাষ করে একদিকে যেমন কৃষকগণ লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণেও অনন্য ভূমিকা রাখছে।

৩. বন্যা পরবর্তি কৃষি পুনর্বাসনে বিনা’র ভূমিকাঃ বাংলাদেশে প্রায়ই রোপা আমন ধান লাগানোর সময় অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে দেশব্যাপী বা দেশের অংশ বিশেষে বন্যা দেখা দেয়। ফলে চাষী ভাইয়েরা সময়মত ধান লাগাতে পারে না। বন্যা উত্তর অসময়ে ধানের চারা লাগানোর কারণে বাংলাদেশে বর্তমান আমন ধানের বেশির ভাগ জাত ভাল ফলন দিতে পারে না। বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত বিনাশাইল জাতটি দেরিতে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে  লাগালেও হেক্টরপ্রতি ৩.৫-৪.০ টন ফলন দিতে পারে। এটি চাষ করার জন্য কম সেচ ও সারের প্রয়োজন। এর চাল নাইজারশাইল ধানের মত লম্বা ও সরু। ভাত ঝরঝরা হয় ও খেতে খুবই সুস্বাদু ফলে এর বাজার মূল্য বেশী হওয়ায় কৃষকগণ অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছে।

৪. লবণাক্ত এলাকায় রবি মৌসুমে পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে বিনা’র ভূমিকাঃ আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সমুদ্রের লোনা পানি  প্রবেশ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি জমি ক্রমাগত লবণাক্ত হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে ধান চাষ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। বিনা উদ্ভাবিত বিনাধান-৮ যা ৮-১০ ডেসি সিমেন/মিটার মাত্রার লবণ সহনশীল এবং বিনাধান-১০ যা ১০-১২ ডেসি সিমেন/মিটার মাত্রার লবণ সহনশীল। ইতোমধ্যে জাত দু‘টি উল্লেখিত জেলাসমূহে ব্যাপকহারে চাষাবাদ করে কৃষকগণ অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন। অপর দিকে, বিনা উদ্ভাবিত বিনাগম-১, ১০-১২ ডেসি সিমেন/মিটার মাত্রায় লবণ সহনশীল। অধিকন্তু, বিনা উদ্ভাবিত লবণ সহিষ্ণু দু’টি চীনাবাদামের জাত, বিনাচিনাবাদাম -৫ ও বিনাচিনাবাদাম-৬ লবণাক্ত এলাকায় (৮ ডেসি সিমেন/মিটার) ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে এবং সরিষার ৪ টি জাত বিনাসরিষা-৫, বিনাসরিষা-৬, বিনাসরিষা-৭ ও বিনাসরিষা-৮ লবণাক্ততা সহনশীল (৬-৮ ডেসি সিমেন/মিটার) হওয়ায় যে সকল জমি রবি মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে পতিত থাকে তাতে চাষ করা সম্ভব। বর্তমানে বিনা উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতগুলো দেশের দক্ষিণাঞ্চলে চাষ হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

৫. ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিতে বিনা’র ভূমিকা (একই জমিতে বছরে ২টি ফসলের স্থলে ৩টি ফসল উৎপাদন)ঃ দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাসস্থান, রাস্তা ও কলকারখানা তৈরীর ফলে দেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের বিকল্প নেই। প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ জমিতে আমন ও বোরো ধানের চাষ হয়। একই জমিতে বছরে ৩টি ফসল উৎপাদন করতে হলে অবশ্যই আমন ও বোরো  ধানের মাঝখানে  অন্য একটি ফসল চাষ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্প জীবনকাল  বিশিষ্ট আমন, বোরো ও রবি ফসলের জাত। বিনা’র স্বল্প মেয়াদী আমন ধান, বিনাধান-৭, বিনাধান-১৫, বিনাধান-১৬ এবং বিনাধান-১৭ চাষ করে আশ্বিনের শেষে অথবা কার্তিকের প্রথম দিকে কর্তন করে কার্তিক মাসে সহজেই  স্বল্প মেয়াদী সরিষার জাত বিনাসরিষা-৪, বিনাসরিষা- ৯ এবং বিনাসরিষা-১০ চাষ করা যায়। সরিষা ফালগুনের প্রথমেই কর্তন করে বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত বোরো মৌসুমের নাবী জাত, বিনাধান-১৪ চাষ করা যায়। বর্তমানে এই শস্য ক্রম লাগসই এবং সবচেয়ে বেশী লাভজনক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিনাধান-১৪ ফেব্রুয়ারি মাসের ২য় সপ্তাহ হতে মার্চ মাসের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ করলেও ব্রিধান ২৮ আপেক্ষা ১.০ টন বেশি ফলন (গড়ে প্রতি হেক্টরে ৬.৮৫ টন) দিতে পারে। বাংলাদেশের বোরো চাষের আওতায় ৪০ লক্ষ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ২০ লক্ষ হেক্টর জমিতে বিনাধান-৭, এর পর  বিনাসরিষা-৪ বা বিনাসরিষা-৯ তারপর বিনাধান-১৪ শস্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে ২০ লক্ষ হেক্টর জমি থেকে ২০ লক্ষ টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন সম্ভব হবে। এছাড়াও ২০ লক্ষ হেক্টর জমিতে কমপক্ষে ২৫ লক্ষ টন সরিষা পাওয়া যাবে যা আমাদের মোট ভোজ্য তেলের বর্তমান চাহিদা থেকেও বেশি। বাংলাদেশে বর্তমানে ভোজ্য তেলের মোট চাহিদা ১২ লক্ষ টন (জনপ্রতি প্রতিদিন ২২ গ্রাম হিসেবে ১৬ কোটি মানুষের জন্য)।

৬. খরা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে বিনা’র অবদানঃ বিনাচীনাবাদাম-২ জাতটি চরে যেখানে পানি সেচের কোন ব্যবস্থা নাই সেখানেও ভাল ফলন (৩.০ টন/হেক্টর) দেয়। যে সব এলাকায় সেচের সুবিধা কম সেখানে খরা সহনশীল তিলের জাত বিনাতিল-১, বিনাতিল-২ ও বিনাতিল-৩ চাষের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের ভোজ্য তেলের ঘাটতি কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। জাতগুলো চাষের জন্য মাত্র ১/২টি সেচই যথেষ্ট। জাতগুলোর ফলন যথাক্রমে ১.৪, ১.৮ ও ১.৭ টন/হেক্টর। বিনাতিল-১ এর বীজে তেলের পরিমাণ অন্যান্য জাত অপেক্ষা অনেক বেশি (৫০%)। বিনাতিল-১ এর বীজের রং সাদাটে হওয়ায় কনফেকশনারিতে এর ব্যবহার অন্যান্য জাত অপেক্ষা বেশি। তাছাড়া, মুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় তিনটি জাত বিনামুগ-৫, বিনামুগ-৭ ও বিনামুগ-৮ এবং ছোলা (বিনাছোলা-৬) ও মসুরের (বিনা মসুর-৮ এবং বিনা মসুর-১০) জাতগুলি খরা সহনশীল হওয়ায় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা প্রবণ এলকায় ব্যাপকভাবে চাষ করে কৃষকগণ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

৭. পুষ্টি নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে বিনা উদ্ভাবিত জাতসমূহের অবদানঃ ২০১৪ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায় বাংলাদেশে এখনও শতকরা ৪১ ভাগ শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও ৩৬ ভাগ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। এর মূল কারণ তাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পরিমিত মাত্রায় আমিষ, চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকে। বিনা উদ্ভাবিত ধান (বিনাধান-৭, বিনাধান-৮, বিনাধান-১০, বিনাধান-১১, বিনাধান-১২, বিনাধান-১৪, বিনাধান-১৭), ডাল (বিনামুগ-৫, বিনামুগ-৮, বিনামসুর-৫, বিনামসুর-৮, বিনামসুর-১০, বিনাছোলা-৫), তেল (বিনাসরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, বিনা সরিষা-১০, বিনা তিল-১, বিনা তিল-৪, বিনা সয়াবিন-২, বিনাচিনাবাদাম-৪, বিনা চিনাবাদাম-৫, বিনা চিনাবাদাম-৬), মসল্লা (বিনারসুন-১, প্রচলিত জাতের চেয়ে ফলন দ্বিগুন) ও পাটশাকের (বিনা পাটশাক-১) জাতগুলো দেশে ব্যাপকভাবে চাষ হওয়ায় এ ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এ ছাড়াও বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ জনগণের নিকট পৌঁছানোর নিমিত্ত বিনা’র বিজ্ঞাণীগণ কর্তৃক নিয়মিতভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক জার্নাল, জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় বিনা’র প্রযুক্তিসমূহ ছাপানো হয়। এছাড়া বিনা কর্তৃক প্রতি বছর কৃষি কর্মী ও কৃষককে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। বিনা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিষয়ে কৃষি প্রযুক্তি হাত বই ও লিফলেট ছাপানো হয় যা কৃষি কর্মী ও কৃষকদের মাঝে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়। কৃষি গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক আণবিক গবেষণা সংস্থা (IAEA), বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (FAO), বিশ্ব ব্যাংক (WB), ICRISAT এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (IDB) হতে সম্মাননা এবং স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এছাড়া স্বাধীনতা দিবস পদক, বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক ও পরিবেশ পদকসহ মোট ২৬ টি সম্মাননা এবং পদক অর্জন করেছে।

লেখকঃ প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা,  বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ-২২০২।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare