গবাদীপশুর গলাফুলা রোগ

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান

সব সৃষ্টি মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন। মানুষ অন্য প্রাণীর সকল প্রকার সুবিধা ভোগ করে। গবাদী পশু মানুষের সবচেয়ে বেশী উপকারে লাগে। গবাদী পশু লালন পালন করে মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি নিজের পুষ্টির চাহিদা পুরণ করে থাকে। তবে গবাদী পশু লালন পালনের সময় অনেক রোগ বালাইর সৃষ্টি হয় যা অনেক সময় প্রাণীর মৃত্যুর কারণ ও হয়।

গবাদীপশুর এই মারাত্মক রোগ গুলোর মধ্যে গলাফোলা বা হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া অন্যতম একটি। এই রোগের পশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি। বেশির ভাগ সময় ঠিক মত চিকিৎসার অভাব হলে প্রায় শতভাগ পশু মারা যায়। এটি ব্যকটেরিয়া জনিত মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। যা সহজেই অন্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ে। গরু মহিষের ক্ষেত্রে মারাত্মক এই ঘাতক রোগটি প্রায়ই দেখা যায়।

রোগের কারণঃ এই রোগের জীবাণু   নামক ব্যকটেরিয়া যা বৈশিষ্টগত ভাবে স্পোর সৃষ্টিকারী, গ্রাম পজিটিভ, মাটি বাহিত রোগ মারাত্মক ছোয়াচে রোগ। এর জীবাণুর দুইটা টাইপ আছে যা সাধারণত বি২, এবং ই২। বি২ টাইপ দ্বারা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে এই রোগ ছড়ায়, তবে মিশর এবং সুদানে এর প্রভাব অনেকটা কমে এসেছে। এই রোগের জীবাণু বহিসেলিও

ইপিডেমিওলজিঃ হেমোরেজিক সেপটিওসেমিয়া বা গলা ফুলা এশিয়ার মধ্যে গরু এবং মহিষের বেশি দেখা যায়। আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপের কিছু অংশে এবং মধ্য প্রাচ্যে দেখা যায় সচারচর।

বছরের প্রায় সব সময়েই এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও বর্ষাকাল এবং বর্ষার শেষে এর প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়। বাড়ন্ত বয়সের প্রাণীদের ক্ষেত্রে এদের প্রকোপ বেশি এবং মৃত্যুর হার বেশি দেখায়। আর যেসব প্রাণীর বয়স ১৬-১৮ মাস বয়স তাদের ক্ষেত্রে আরো বেশি দেখা যায়। সাধারণত মহিষে গরুর তুলনায় তিনগুণ বেশি রোগটা দেখা যায়। যেসব এলাকায় মহিষকে ধান চাষের কাজে লাগাতে দেখা যায় সেই সব এলাকায় বেশি দেখা যায়। কিছু কিছু (৫) প্রাণী এই রোগের জীবাণুর বাহক হিসেবে কাজ করে। কিছু প্রাণী উচ্চ তাপমাত্রার সাথে বিষক্রিয়া এবং সাবমেন্ডিবুলার অংশে ফোলা ফোলা উপসর্গ দেখা দিয়ে মারা যায়।

সাধারণত নিচু এলাকায় এর রোগের বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

যে যে কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়ঃ

পুষ্টি ঘাটতি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রাণী থাকলে। পরজীবীর আক্রমণ বেশি হলে। পশুকে দিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ কাজ করা হলে। তীব্র গরম ও তীব্র শীতের ফলে। দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ করালে। কাদাযুক্ত মাটিতে না খাইয়ে কাজ করালে।

রোগ যেভাবে ছড়ায়ঃ

আক্রান্ত প্রাণী হতে অন্য প্রাণীতে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সংস্পর্শে। মহিষ এটাকে বহন করে এবং তা অন্য জায়গায় ছড়াতে সাহায্য করে। খাদ্যের মাধ্যমে অথবা বাতাসের মাধ্যমে। প্রথম থাকে টনসিলের জায়গায়। এটুল এর মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

রোগের প্রকাশিত লক্ষণ সমুহঃ

এটা একটা মারাত্মক ছোয়াচে রোগ। তাই এই রোগের লক্ষণ প্রধানত তিনটা ধাপে সম্পর্ণ হয়ে থাকে।

১। সেপ্টিসেমিক ফর্ম (Septicemic form)

পতীব্র এবং অতি তীব্র অবস্থায় রোগে লক্ষণ প্রকাশের ৮-২৪ ঘন্ঠার মধ্যে পশু মারা যায়। কারণ এই রোগের স্থায়ীত্ব অনেক কম।

পপ্রথমে আক্রান্ত প্রাণীতে জ্বর, লালাক্ষরণ, নাক দিয়ে পানি ঝরা, নির্জীবতা, অলসতা এবং হাটাচলার ক্ষেত্রে অনিচ্ছা দেখা যায়।

             ঘাড়ের চারপাশে মাঝে মাঝে ফুলে থাকতে দেখা যায়। যা পরবর্তিতে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

             আক্রান্ত ফোলা জায়গায় সিরিঞ্জ দ্বারা ফুটো করলে হলুদ রঙ্গের তরল পদার্থ দেখা যায়।

             মিউকাস মেম্ব্রেন টা শুকিয়ে যায় অনেকাংশে।

২। পালমোনারী অবস্থা (Pulmonary Form)ঃ এই অবস্থা সাধারণত

             পশু হঠাৎ করে মাটিতে পড়ে যায় এবং ১-২ ঘন্ঠার মধ্যে মারা যায়।

           অনেক সময় এই অবস্থা দীর্ঘক্ষণ থাকে তবে তা ভাল হওয়ার সম্ভবনা খুব কম থাকে।

            ঘাড়ের অংশ ফুলে যাওয়ার ফলে শ্বাসনালীতে চাপ পড়ে ফলে পশুর শ্বাসপ্রশ্বাসে খুব সমস্যা হয়।

            নিউমোনিয়াও দেখা যায় ।

৩। পরিপাকনালী সম্পর্কীয় (Intestinal Form)ঃ

            রক্ত মিশ্রিত পাতলা পায়খানা,আমশয় এবং পেট ব্যাথার উপস্থিতি বোঝা যায়।

ময়না তদন্তের ফলাফলঃ

           অধিকাংশ প্রাণী মৃত্যুর পরে দেখলেও তাদের এই ফোলা ফোলা অংশ দেখা যায়।

            মাথায়, ঘাড়ে এবং চোয়ালের পাশে ফোলা লক্ষ্য করা যায়।

            রক্তাভ তরল পদার্থ দেখতে পাওয়া যায় পেরিকার্ডিয়াল স্যাক এবং থোরাসিক এবং এবডোলিনাম কেভিটিতে।

           রক্ত দেখা যায় লিম্ভ গুলোতে।

রোগ নির্নয়ঃ গলা ফোলা রোগ নির্ণয়ে নিচের বিষয় গুলো লক্ষণীয়ঃ

এপিডেমিওলজিকাল এবং প্রকাশিত লক্ষণ দেখে বোঝা যায়।

চিকিৎসাঃ

যদি খুব দ্রুত চিকিৎসা নেয়া যায় তাহলে পশুকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়। তাই দ্রুত অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। এক্ষেত্রে  সালফোনামাইড (Sulfonimide), টেট্রাসাইক্লিন (Tetracycline), পেনিসিলিন (Penicilin) এবং ক্লোরাম্ফেনিকল (Cloramphenicol) বেশ কার্যকর।

১. ৩৩ সালফাডিমিডিন সোডিয়াম (Sulfadimidine Sodium) প্রথমে ১৫-৩০ মিলি গ্রাম প্রতি ৫০ কেজি ওজন হিসেবে দিতে হবে। ৩-৭ দিন মাংসে অথবা চামড়ার নিচে দিতে হবে।

২. অক্সি টেট্রাসাইক্লিন (Oxytetracycline) ৩-৫ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি হিসেবে (১০ মিলি ১০০ কেজি) মাংশে দিতে হবে ৫-৭ দিন।

৩. আরো ভাল কাজ করার জন্য পেনিসিলিন + স্ট্রেপটোমাইসিন ২.৫ গ্রাম প্রতি ১০০ কেজি ওজন হিসেবে মাংশে প্রত্যহ একবার করে ৫-৬ দিন দিতে হবে।

প্রতিকার ও নিয়ত্রণঃ এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হলো সময় মত এর টিকা প্রদান করা। আর এই রোগের টিকা সাধারণত  তিন প্রকারের পাওয়া যায় বাজারে।

১. ব্যাকটেরিয়া (Plain Bacteriun)

২. Oil Adjuvent Vaccine :

গরুর ক্ষেত্রে (২ বছরের উপরের বয়স্ক)-২ মিলি চামড়ার নিচে প্রতিটি গরুকে বছরে একবার। বাছুরের ক্ষেত্রে ১ চামড়ার নিচে।

৩. Alum Precipitated-

গরুতে ৫ মিলি/ এনিমেল/ বছর/ মাংসে

ছাগল এবং ভেড়ার ক্ষেত্রে -২মিলি/ ছাগল/ বছর/ চামড়ার নিচে।

তাছাড়া প্রাণীর আবাসস্থল পরিস্কার রাখার পাশাপশি বিশুদ্ধ পানি ও খাবার প্রদান করতে হবে। আর কোন প্রাণী অসুস্থ হলে সাথে সাথে তাকে আলাদা রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলো মেনে চিকিৎসা গ্রহণ করলে পশুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখা যায়।

————————————–

লেখক।

ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্স অনুষদ,

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

মোবাইলঃ ০১৭২৩৭৮৬৮৭৭ ,

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare