গমের ব্লাস্ট রোগ দমনে বীজ শোধন একটি কার্যকরী পদক্ষেপ

ড. মোঃ আবুল কাসেম

গম বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দানাদার ফসল। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য যোগাতে ধানের পরেই গমের স্থান। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট প্রায় ৪.৩৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১৩.৪৭ লক্ষ মেট্রিক টন গম উৎপাদন হয়। দেশে বিভিন্ন দুর্যোগে ধান ফসলে প্রায়ই ব্যাপক ক্ষতি হয়, কাজেই দানাদার ফসলের জন্য একমাত্র ধানের উপর নির্ভর করা উচিৎ নয়। গম শীতকালীন ফসল হওয়ায় বন্যা, ঝড়োহাওয়া ইত্যাদি দুর্যোগে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কাজেই নিরাপদ খাদ্য সরবরাহে দেশের মেরুদন্ডকে শক্ত রাখতে বেশি বেশি গম চাষের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

 

gom_230316_barisalnewscom-thumbnail

 

বাংলাদেশে গমের প্রধান দু’টি রোগ থাকলেও গম গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলি বেশ দক্ষতার সাথেই চাষ হয়ে আসছিল কিন্তু গত শীত মৌসুমে (২০১৬ খ্রি.) গমের নতুন রোগ ব্লাস্ট এর প্রাদুর্ভাব হওয়ায় গম উৎপাদনে বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে আসে এবং মাঠের পর মাঠ গম ক্ষেত পুড়িয়ে দেয়া হয়। ৮ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির গম নষ্ট হয়েছে। জনপ্রিয় কৃষি সাংবাদিক জনাব শাইখ সিরাজ এর মতে প্রায় ২.৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু বড় কথা – চোর বাড়ী চিনে ফেলেছে, বার বার সে হানা দিবে। কাজেই পরবর্তী বছরগুলোতে গম চাষে ব্লাস্ট রোগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক হতে হবে। ২০০ থেকে ২৫০ সে. তাপমাত্রা, লাগাতার ৫-৭ দিন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, উচ্চ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং ঐ সময় যদি গমের শীষ বের হতে থাকে তবে উক্ত রোগের স্বল্প স্পোরের উপস্থিতি থাকলেও দ্রুত তা বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ (ইপিডেমিক) আকারে দেখা দিতে পারে (চিত্র-১)। এই রোগ পাইরিকুলেরিয়া অরাইজি ট্রিটিকাম নামক ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে। এই অনুজীবটি বীজ বাহিত। তবে অনেক বিজ্ঞানীর মতে ছত্রাকটি সিসটেমিক নয় অর্থাৎ বীজ থেকে গাছের ভিতর সঞ্চালিত হয়ে শীষ পর্যন্ত যেতে পারে না। তবে প্রকৃত ক্ষতি হয় যদি শীষ বের হওয়া পর্যায়ে ব্যাপক আক্রমণ হয়। শীষে আক্রমণ হতে হলে বীজ থেকে জন্মিয়ে ঘাসে অবস্থান করে এবং শীষ পর্যায়ে অনুকূল পরিবেশ হলে বাতাসে বা বৃষ্টির ঝাপটায় শীষে আক্রমণ করতে পারে। কাজেই বীজ শোধন করলে জীবাণুর প্রধান ও প্রাথমিক উৎস ধ্বংস হয়। অতএব, গম চাষ করতে হলে বীজ শোধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের একাধিক পরীক্ষায় দেখা যায় প্রভ্যাক্স ২০০ ডাবলিউপি নামক ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করলে বীজের গায়ে বা ভিতরে অবস্থিত জীবাণু (পাইরিকুলেরিয়া অরাইজি ট্রিটিকাম) মারা যায়। তাছাড়া দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার ৮ টি জেলার ব্লাস্ট আক্রান্ত মাঠ থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. এম. বাহাদুর মিঞা এবং তাঁর সহকর্মীগণ ৩৪টি নমুনা সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত নমুনা হতে মোট ১২টি আইসোলেট পিউরিফাই করা  সম্ভব  হয়েছে । উক্ত আইসোলেটগুলির মধ্যে ল্যাব ও মাঠে পরীক্ষিত সবচেয়ে শক্তিশালী অনুজীবটিও প্রভ্যাক্স ২০০ ডাবলিউপি নামক ছত্রাকনাশকে সম্পুর্ণ ধ্বংস হয় (চিত্র-২)। কাজেই বীজ শোধন করে বপন করলে উক্ত ক্ষতিকারক ছত্রাকের প্রাথমিক উৎস ধ্বংস হবে। বীজ শোধনের নিয়ম- ১০০ মিঃ লিঃ বিশুদ্ধ পানিতে ২ গ্রাম ঔষধ গুলিয়ে ১ কেজি বীজের গায়ে ভালভাবে মিশিয়ে পরে স্বাভাবিক বাতাসে শুকিয়ে বপন করতে হবে। অর্থাৎ ১ একর জমিতে যদি ৫০ কেজি বীজ লাগে, তাতে ১০০ গ্রাম প্রভ্যাক্স ২০০ ডাবলিউপি ব্যবহার করতে হবে যার বাজার মুল্য ৪০০ টাকা। বীজ শোধনে যেহেতু রোগের প্রধান  উৎস ধ্বংস হয় কাজেই ঘাস বা অন্য মাধ্যম থেকে জীবাণু না এলে উক্ত জমিতে সে মৌসুমে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হবে না। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে সরজমিনে গবেষণার প্রয়োজন।  বেশ কিছু পরীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায়, গমের ব্লাস্ট রোগ ধানে হয় না। বাংলাদেশেও ব্লাস্ট আক্রান্ত গমের জমির পাশেই ধানের জমি ছিল কিন্ত সেখানে ধানে উক্ত রোগের কোন আক্রমণ দেখা যায়নি। গমের ১২টি ব্লাস্ট আইসোলেট ব্যবহার করে উক্ত জীবাণুগুলোর কোনটির দ্বারা ধান, শ্যামা, আঙ্গুলি, চাপড়া, দূর্বা, ক্ষুদে শ্যামা ঘাস বা ভুট্টা আক্রান্ত হয় কি না বা উক্ত রোগের বিকল্প বাহক কিনা তা পরীক্ষার জন্য ধান (টিএন-১) ও উক্ত উদ্ভিদগুলি  সংগ্রহ করে কৃত্রিম ভাবে চাষ করা হয়েছে অর্থাৎ বিষয়টি পরীক্ষাধীন রয়েছে। অত্র প্রতিষ্ঠানের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব, বায়োটেকনোলজি, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ যৌথভাবে উক্ত রোগ প্রতিরোধের বিভিন্ন কলা কৌশলের উপর গবেষণা পরিচালনা করছে এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ করা একটি জটিল কাজ হলেও তা অসাধ্য নয়; হয়তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

————————————–

লেখকঃ

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ,

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *